‘ঘরে অন্তত তিন দিনের খাবার ও পানীয় জল রাখুন। বিদ্যুৎ চলে গেলে ব্যবহারের জন্য টর্চলাইট, অতিরিক্ত ব্যাটারি ও ব্যাটারিচালিত রেডিও রাখুন। প্রয়োজনীয় ওষুধ, কিছু নগদ অর্থ এবং জরুরি যোগাযোগের তথ্যও হাতের কাছে রাখুন।’
ইউরোপের একাধিক দেশের নাগরিকদের এমন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো দেশে প্রস্তুতির সময়সীমা এক সপ্তাহ, আবার জার্মানির সরকারি নির্দেশিকায় সম্ভব হলে ১০ দিন স্বনির্ভর থাকার মতো সামগ্রী রাখার কথা বলা হয়েছে।
এমন নির্দেশনা জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে—বিশ্ব কি বড় কোনো যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে? নাকি সামনে আসছে এমন কোনো মহাবিপর্যয়, যার জন্য সরকারগুলো আগেভাগে নাগরিকদের প্রস্তুত করছে?
বাস্তবতা হলো, ইউরোপের সরকারগুলো একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধ বা বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দিয়ে এসব নির্দেশনা জারি করেনি। বরং যুদ্ধ, সাইবার হামলা, চরম আবহাওয়া, মহামারি, নাশকতা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অচল হয়ে যাওয়ার মতো একাধিক ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নাগরিকদের প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষণে এ ধরনের উদ্যোগকে বলা হয় ‘সিভিলিয়ান প্রিপেয়ার্ডনেস’ বা বেসামরিক নাগরিকের জরুরি প্রস্তুতি।
নরওয়ে
২০২৪ সালের মে মাসে নাগরিকদের জরুরি প্রস্তুতির নির্দেশনা হালনাগাদ করে। আগে যেখানে অন্তত তিন দিন নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর প্রস্তুতি রাখার পরামর্শ ছিল, সেখানে সময়সীমা বাড়িয়ে এক সপ্তাহ করা হয়। দেশটির নাগরিক সুরক্ষা অধিদপ্তর বলেছে, বিদ্যুৎ, পানি ও মোবাইল নেটওয়ার্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা বন্ধ হয়ে গেলে পরিবারগুলোকে যেন অন্তত সাত দিন নিজেদের সামর্থ্যে চলতে পারে, সেই প্রস্তুতি রাখতে হবে।
ফিনল্যান্ড
দেশটি ২০২৪ সালের নভেম্বরে নাগরিকদের জন্য নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করে। সেখানে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা, পানি সরবরাহ বন্ধ হওয়া, যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন, চরম আবহাওয়া, বড় দুর্ঘটনা, মহামারি এবং সামরিক সংঘাতের মতো পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে। দেশটির সরকারি নির্দেশনায় খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী ঘরে রাখার পাশাপাশি সংকটের সময় কীভাবে কাজ করতে হবে, সে বিষয়ে সচেতন হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সুইডেন
নাগরিকদের জরুরি প্রস্তুতির নির্দেশিকা হালনাগাদ করেছে। বিশেষ করে দেশটির সঙ্গে রাশিয়ার দীর্ঘ সীমান্ত এবং ইউরোপের উত্তরাঞ্চলের কৌশলগত অবস্থানের কারণে সামরিক নিরাপত্তা তাদের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা। তবে এসব নির্দেশনায় কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে আসন্ন হামলার ঘোষণা নেই।
ডেনমার্ক
অন্তত তিন দিনের প্রস্তুতি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দেশটির জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই সময়টুকু নাগরিকেরা নিজেদের সামলাতে পারলে উদ্ধারকারী ও জরুরি সেবাকর্মীরা সবচেয়ে বিপন্ন মানুষদের সহায়তায় বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন।
জার্মানি
নাগরিক সুরক্ষা ও দুর্যোগ সহায়তা দপ্তর (বিবিকে) সম্ভব হলে ১০ দিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত রাখার পরামর্শ দিয়েছে। তবে অন্তত তিন দিনের প্রস্তুতিকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। তাদের নির্দেশিকায় চরম আবহাওয়া, সাইবার হামলা, নাশকতা এবং যুদ্ধের ঝুঁকির কথা স্পষ্টভাবে এসেছে।
ইইউ
২০২৫ সালের ২৬ মার্চ ইউরোপীয় কমিশন ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’ ঘোষণা করে। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন স্বনির্ভর থাকার প্রস্তুতি গড়ে তোলার কথা বলা হয়। অর্থাৎ, ইউরোপজুড়ে একই মেয়াদের নির্দেশনা নেই; দেশগুলোর ঝুঁকি মূল্যায়ন ও জাতীয় নীতির ভিত্তিতে প্রস্তুতির সময়সীমা আলাদা।
যুদ্ধের ছায়া
ইউরোপের এই নতুন নিরাপত্তা-ভাবনার অন্যতম পটভূমি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর ইউরোপের দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা ও বেসামরিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে। যুদ্ধটি দেখিয়েছে, সামরিক সংঘাত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। জ্বালানি সরবরাহ, খাদ্যপণ্য, পরিবহন, যোগাযোগ ও অর্থনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়ে।
আরও বিপদ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তুতি কৌশলে যুদ্ধের পাশাপাশি সাইবার হামলা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি সরবরাহব্যবস্থা, হাসপাতাল, পরিবহন ও টেলিযোগাযোগে বড় ধরনের সাইবার হামলা বা নাশকতা হলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দ্রুত ব্যাহত হতে পারে। ব্যাংকিং ও ডিজিটাল লেনদেন অচল হলে খাবার কেনা বা জরুরি সেবা পাওয়াও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
জলবায়ু
জলবায়ু পরিবর্তনও বড় উদ্বেগের কারণ। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দাবানল, তাপপ্রবাহ, বন্যা ও ঝড়ের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা জরুরি সেবা এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে। কোনো অঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে কিংবা বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে কয়েক দিন নিজেদের ব্যবস্থায় চলতে হতে পারে।
কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতাও সরকারগুলোর প্রস্তুতি পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সে সময় চিকিৎসাসামগ্রী, ওষুধ, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল। ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৫ সালের মজুত কৌশলসংক্রান্ত নথিতেও মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
মোকাবিলার প্রস্তুতি
সরকারি নির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো, বড় সংকটের প্রথম কয়েক দিন যেন নাগরিকেরা পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় সহায়তার ওপর নির্ভরশীল না থাকেন। দুর্যোগের পরপরই উদ্ধারকারী দল, হাসপাতাল, পুলিশ ও অন্যান্য জরুরি সেবার ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়। পরিবারগুলো নিজেদের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে পারলে জরুরি সংস্থাগুলো অসহায় ও বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের সহায়তা করতে পারে।
এ কারণেই নাগরিকদের এমন খাবার রাখতে বলা হচ্ছে, যা দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এবং সহজে খাওয়া বা রান্না করা সম্ভব। পাশাপাশি পানীয় জল, প্রয়োজনীয় ওষুধ, টর্চ, ব্যাটারিচালিত রেডিও, পাওয়ার ব্যাংক ও কিছু নগদ অর্থ রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। অনেক নির্দেশিকায় এসব সামগ্রী একবারে কিনে জমিয়ে না রেখে নিয়মিত ব্যবহারের সঙ্গে মিলিয়ে মজুত হালনাগাদ রাখার কথাও বলা হয়েছে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ?
তাহলে কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন? এসব নির্দেশনা থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই। তবে ইউরোপের সরকারগুলোর পদক্ষেপে একটি বিষয় স্পষ্ট—তারা এখন আর কোনো একটি নির্দিষ্ট বিপর্যয়কে সামনে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে না। বরং একই সঙ্গে যুদ্ধ, মহামারি, জলবায়ু দুর্যোগ, সাইবার হামলা ও অবকাঠামোগত বিপর্যয়ের মতো নানা পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা গড়ে তুলতে চাইছে।
আধুনিক পৃথিবী প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর যত বেশি নির্ভরশীল হয়েছে, এসব ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে সমাজের স্বাভাবিক কার্যক্রম তত বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। উন্নত দেশগুলোর নাগরিক প্রস্তুতির এই উদ্যোগ সেই বাস্তবতারই স্বীকৃতি। এটি আসন্ন মহাযুদ্ধের ঘোষণা নয়; বরং অনিশ্চিত পৃথিবীতে রাষ্ট্র ও নাগরিক—উভয়ের দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬
‘ঘরে অন্তত তিন দিনের খাবার ও পানীয় জল রাখুন। বিদ্যুৎ চলে গেলে ব্যবহারের জন্য টর্চলাইট, অতিরিক্ত ব্যাটারি ও ব্যাটারিচালিত রেডিও রাখুন। প্রয়োজনীয় ওষুধ, কিছু নগদ অর্থ এবং জরুরি যোগাযোগের তথ্যও হাতের কাছে রাখুন।’
ইউরোপের একাধিক দেশের নাগরিকদের এমন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো দেশে প্রস্তুতির সময়সীমা এক সপ্তাহ, আবার জার্মানির সরকারি নির্দেশিকায় সম্ভব হলে ১০ দিন স্বনির্ভর থাকার মতো সামগ্রী রাখার কথা বলা হয়েছে।
এমন নির্দেশনা জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে—বিশ্ব কি বড় কোনো যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে? নাকি সামনে আসছে এমন কোনো মহাবিপর্যয়, যার জন্য সরকারগুলো আগেভাগে নাগরিকদের প্রস্তুত করছে?
বাস্তবতা হলো, ইউরোপের সরকারগুলো একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধ বা বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দিয়ে এসব নির্দেশনা জারি করেনি। বরং যুদ্ধ, সাইবার হামলা, চরম আবহাওয়া, মহামারি, নাশকতা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অচল হয়ে যাওয়ার মতো একাধিক ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নাগরিকদের প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষণে এ ধরনের উদ্যোগকে বলা হয় ‘সিভিলিয়ান প্রিপেয়ার্ডনেস’ বা বেসামরিক নাগরিকের জরুরি প্রস্তুতি।
নরওয়ে
২০২৪ সালের মে মাসে নাগরিকদের জরুরি প্রস্তুতির নির্দেশনা হালনাগাদ করে। আগে যেখানে অন্তত তিন দিন নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর প্রস্তুতি রাখার পরামর্শ ছিল, সেখানে সময়সীমা বাড়িয়ে এক সপ্তাহ করা হয়। দেশটির নাগরিক সুরক্ষা অধিদপ্তর বলেছে, বিদ্যুৎ, পানি ও মোবাইল নেটওয়ার্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা বন্ধ হয়ে গেলে পরিবারগুলোকে যেন অন্তত সাত দিন নিজেদের সামর্থ্যে চলতে পারে, সেই প্রস্তুতি রাখতে হবে।
ফিনল্যান্ড
দেশটি ২০২৪ সালের নভেম্বরে নাগরিকদের জন্য নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করে। সেখানে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা, পানি সরবরাহ বন্ধ হওয়া, যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন, চরম আবহাওয়া, বড় দুর্ঘটনা, মহামারি এবং সামরিক সংঘাতের মতো পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে। দেশটির সরকারি নির্দেশনায় খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী ঘরে রাখার পাশাপাশি সংকটের সময় কীভাবে কাজ করতে হবে, সে বিষয়ে সচেতন হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সুইডেন
নাগরিকদের জরুরি প্রস্তুতির নির্দেশিকা হালনাগাদ করেছে। বিশেষ করে দেশটির সঙ্গে রাশিয়ার দীর্ঘ সীমান্ত এবং ইউরোপের উত্তরাঞ্চলের কৌশলগত অবস্থানের কারণে সামরিক নিরাপত্তা তাদের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা। তবে এসব নির্দেশনায় কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে আসন্ন হামলার ঘোষণা নেই।
ডেনমার্ক
অন্তত তিন দিনের প্রস্তুতি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দেশটির জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই সময়টুকু নাগরিকেরা নিজেদের সামলাতে পারলে উদ্ধারকারী ও জরুরি সেবাকর্মীরা সবচেয়ে বিপন্ন মানুষদের সহায়তায় বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন।
জার্মানি
নাগরিক সুরক্ষা ও দুর্যোগ সহায়তা দপ্তর (বিবিকে) সম্ভব হলে ১০ দিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত রাখার পরামর্শ দিয়েছে। তবে অন্তত তিন দিনের প্রস্তুতিকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। তাদের নির্দেশিকায় চরম আবহাওয়া, সাইবার হামলা, নাশকতা এবং যুদ্ধের ঝুঁকির কথা স্পষ্টভাবে এসেছে।
ইইউ
২০২৫ সালের ২৬ মার্চ ইউরোপীয় কমিশন ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’ ঘোষণা করে। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন স্বনির্ভর থাকার প্রস্তুতি গড়ে তোলার কথা বলা হয়। অর্থাৎ, ইউরোপজুড়ে একই মেয়াদের নির্দেশনা নেই; দেশগুলোর ঝুঁকি মূল্যায়ন ও জাতীয় নীতির ভিত্তিতে প্রস্তুতির সময়সীমা আলাদা।
যুদ্ধের ছায়া
ইউরোপের এই নতুন নিরাপত্তা-ভাবনার অন্যতম পটভূমি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর ইউরোপের দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা ও বেসামরিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে। যুদ্ধটি দেখিয়েছে, সামরিক সংঘাত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। জ্বালানি সরবরাহ, খাদ্যপণ্য, পরিবহন, যোগাযোগ ও অর্থনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়ে।
আরও বিপদ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তুতি কৌশলে যুদ্ধের পাশাপাশি সাইবার হামলা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি সরবরাহব্যবস্থা, হাসপাতাল, পরিবহন ও টেলিযোগাযোগে বড় ধরনের সাইবার হামলা বা নাশকতা হলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দ্রুত ব্যাহত হতে পারে। ব্যাংকিং ও ডিজিটাল লেনদেন অচল হলে খাবার কেনা বা জরুরি সেবা পাওয়াও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
জলবায়ু
জলবায়ু পরিবর্তনও বড় উদ্বেগের কারণ। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দাবানল, তাপপ্রবাহ, বন্যা ও ঝড়ের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা জরুরি সেবা এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে। কোনো অঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে কিংবা বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে কয়েক দিন নিজেদের ব্যবস্থায় চলতে হতে পারে।
কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতাও সরকারগুলোর প্রস্তুতি পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সে সময় চিকিৎসাসামগ্রী, ওষুধ, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল। ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৫ সালের মজুত কৌশলসংক্রান্ত নথিতেও মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
মোকাবিলার প্রস্তুতি
সরকারি নির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো, বড় সংকটের প্রথম কয়েক দিন যেন নাগরিকেরা পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় সহায়তার ওপর নির্ভরশীল না থাকেন। দুর্যোগের পরপরই উদ্ধারকারী দল, হাসপাতাল, পুলিশ ও অন্যান্য জরুরি সেবার ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়। পরিবারগুলো নিজেদের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে পারলে জরুরি সংস্থাগুলো অসহায় ও বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের সহায়তা করতে পারে।
এ কারণেই নাগরিকদের এমন খাবার রাখতে বলা হচ্ছে, যা দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এবং সহজে খাওয়া বা রান্না করা সম্ভব। পাশাপাশি পানীয় জল, প্রয়োজনীয় ওষুধ, টর্চ, ব্যাটারিচালিত রেডিও, পাওয়ার ব্যাংক ও কিছু নগদ অর্থ রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। অনেক নির্দেশিকায় এসব সামগ্রী একবারে কিনে জমিয়ে না রেখে নিয়মিত ব্যবহারের সঙ্গে মিলিয়ে মজুত হালনাগাদ রাখার কথাও বলা হয়েছে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ?
তাহলে কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন? এসব নির্দেশনা থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই। তবে ইউরোপের সরকারগুলোর পদক্ষেপে একটি বিষয় স্পষ্ট—তারা এখন আর কোনো একটি নির্দিষ্ট বিপর্যয়কে সামনে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে না। বরং একই সঙ্গে যুদ্ধ, মহামারি, জলবায়ু দুর্যোগ, সাইবার হামলা ও অবকাঠামোগত বিপর্যয়ের মতো নানা পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা গড়ে তুলতে চাইছে।
আধুনিক পৃথিবী প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর যত বেশি নির্ভরশীল হয়েছে, এসব ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে সমাজের স্বাভাবিক কার্যক্রম তত বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। উন্নত দেশগুলোর নাগরিক প্রস্তুতির এই উদ্যোগ সেই বাস্তবতারই স্বীকৃতি। এটি আসন্ন মহাযুদ্ধের ঘোষণা নয়; বরং অনিশ্চিত পৃথিবীতে রাষ্ট্র ও নাগরিক—উভয়ের দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা।

আপনার মতামত লিখুন