সংবাদ

ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে চলছে ভোট, দুই দলই মরিয়া


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম

ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে চলছে ভোট, দুই দলই মরিয়া
ছবি: এআই

যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই এই ভোটে নির্ধারিত হবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি, নাকি বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টি। নির্বাচনের ফল শুধু আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব বদলাবে না, আগামী দুই বছর ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি বাস্তবায়ন, বাজেট, আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের ওপর কংগ্রেসের নজরদারির ক্ষেত্রেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

এবার প্রতিনিধি পরিষদের (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে এবং সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ৩৫টিতে ভোট হচ্ছে। সিনেটের ৩৫টি আসনের মধ্যে ৩৩টি নিয়মিত নির্বাচন, বাকি দুটি বিশেষ নির্বাচন। এ ছাড়া ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচনসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের পদেও ভোট হচ্ছে। নির্বাচনের আগে কংগ্রেসের দুই কক্ষই রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে ডেমোক্র্যাটদের লক্ষ্য অন্তত একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।

আগাম ভোট প্রায় ৬ কোটি

নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের আগাম ভোট ও ডাকযোগে ব্যালট পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। এবার নির্বাচনের আগেই ৫ কোটি ৭০ লাখের বেশি ভোটার আগাম ভোট দিয়েছেন বলে ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার ভোটিং ল্যাবের হিসাব উদ্ধৃত করেছে সিবিএস নিউজ।

আগাম ভোটের ক্ষেত্রে নির্বাচনের নির্ধারিত দিনের আগেই ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়া যায়। আবার ডাকযোগে ব্যালট সংগ্রহ করে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। কোন অঙ্গরাজ্যে কারা ডাকযোগে ভোট দিতে পারবেন, পরিচয় যাচাইয়ের নিয়ম কী এবং কখন ব্যালট গণনা শুরু হবে—এসব বিষয় অঙ্গরাজ্যভেদে ভিন্ন। এ কারণে কোনো কোনো জায়গায় নির্বাচনের দিন ভোট শেষ হওয়ার আগেই আগাম ভোটের ফল গণনা শুরু হতে পারে, আবার কোথাও নিয়ম অনুযায়ী পরে গণনা হয়।

দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণে সমীকরণ

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুটি কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট। প্রতিনিধি পরিষদে ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে ভোট হওয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ২১৮টি আসন। নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুব বেশি নয়। ফলে অল্প কয়েকটি আসনের ফলই কক্ষটির নিয়ন্ত্রণ বদলে দিতে পারে।

সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে এবার ৩৫টিতে ভোট হচ্ছে। এর মধ্যে ৩৩টি নিয়মিত নির্বাচন এবং দুটি বিশেষ নির্বাচন। ফ্লোরিডায় সাবেক সিনেটর মার্কো রুবিওর ছেড়ে যাওয়া আসনে এবং ওহাইওতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ছেড়ে যাওয়া আসনে ভোট হচ্ছে। সিনেটে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ৫১টি আসন প্রয়োজন। তবে দুই দলের আসন সমান হলে ভাইস প্রেসিডেন্টের ভোটে সিদ্ধান্ত হতে পারে। বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান হওয়ায় ৫০-৫০ সমতায়ও দলটি নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে।

গণমাধ্যমের হিসাবে, নির্বাচনের আগে সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি; ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমর্থনভিত্তিক অবস্থানে রয়েছেন দুই স্বতন্ত্র সিনেটরসহ ডেমোক্র্যাটপন্থী সদস্যরা। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে অন্তত চারটি আসনের নিট উন্নতি প্রয়োজন। প্রতিনিধি পরিষদেও কয়েকটি দোদুল্যমান আসন ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ট্রাম্পের নীতির ওপর রায়

মধ্যবর্তী নির্বাচনকে যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের কাজের ওপর ভোটারদের মূল্যায়ন হিসেবেও দেখা হয়। এবার জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, অভিবাসননীতি, অর্থনীতি এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ নির্বাচনি প্রচারে গুরুত্ব পেয়েছে। প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা ও তার প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের প্রতি জনসমর্থনও ভোটের ফলকে প্রভাবিত করতে পারে।

ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের অন্তত একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির ওপর নজরদারি বাড়াতে পারবেন। বাজেট, আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে শুনানি এবং তদন্তের সুযোগও বাড়বে। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করা সহজ হবে। আর সিনেটের নিয়ন্ত্রণ বদলালে প্রেসিডেন্টের মনোনীত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তা ও বিচারপতিদের নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্প প্রশাসনের আইন ও নীতি বাস্তবায়নের পথ তুলনামূলকভাবে সহজ থাকবে। ফলে এই নির্বাচনকে শুধু আসন জয়ের প্রতিযোগিতা নয়, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের পরবর্তী দুই বছরের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণের লড়াই হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

৫০ অঙ্গরাজ্যে হাজার পর্যবেক্ষক

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে প্রায় এক হাজার পর্যবেক্ষক ও মনিটর নিয়োগ করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো ৫০টি অঙ্গরাজ্যেই এই পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে বিভাগটি জানিয়েছে। তাদের দায়িত্ব হলো নির্বাচনি আইন মানা হচ্ছে কি না, ভোটারদের অধিকার সুরক্ষিত থাকছে কি না এবং নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা।

এর আগে ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের অধীনে বিচার বিভাগ ২৪টি অঙ্গরাজ্যে পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছিল। এবারের পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমকে বিভাগটি তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

নির্বাচন ঘিরে আইনি বিতর্কও রয়েছে। নির্বাচনের আগের দিন ক্যালিফোর্নিয়ার ডাকযোগে আসা কিছু ব্যালট আলাদা করে রাখার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ মুহূর্তের আবেদন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করে দেন। অন্যদিকে, ভোটারদের পরিচয় যাচাই ও ভোটের নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

গাধা ও হাতি যেভাবে

যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রতীক গাধা ও হাতি। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতীক গাধা, রিপাবলিকান পার্টির প্রতীক হাতি। নির্বাচনি প্রচার, রাজনৈতিক কার্টুন, পোস্টার ও প্রচারসামগ্রীতে প্রাণী দুটির ব্যবহার দীর্ঘদিনের।

এই প্রতীক জনপ্রিয় করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন উনিশ শতকের রাজনৈতিক কার্টুনশিল্পী টমাস নাস্ট। ১৮৬২ থেকে ১৮৮৬ সাল পর্যন্ত ‘হার্পারস উইকলি’ পত্রিকায় কাজ করার সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী কার্টুনশিল্পী হয়ে ওঠেন।

১৮২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অ্যান্ড্রু জ্যাকসনকে বিরোধীরা ‘জ্যাকঅ্যাস’ বা গাধা বলে বিদ্রূপ করত। জ্যাকসন পরে সেই অপমানজনক পরিচয়কেই নিজের নির্বাচনি প্রচারে ব্যবহার করেন। অন্যদিকে, ১৮৭৪ সালে নাস্টের আঁকা ‘থার্ড টার্ম প্যানিক’ কার্টুনে ‘দ্য রিপাবলিকান ভোট’ লেখা একটি হাতিকে ভীত ও দিশাহারা অবস্থায় দেখানো হয়। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ইউলিসিস এস গ্র্যান্ট তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় থাকতে চান—এমন গুজব ও রাজনৈতিক আতঙ্ককে ব্যঙ্গ করেছিল কার্টুনটি। এর পর হাতি রিপাবলিকানদের প্রতীক হিসেবে আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

নাস্ট দুই দলের নেতাদের দুর্বলতা, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি তুলে ধরতে গাধা ও হাতি—দুই প্রাণীকেই ব্যঙ্গ করেছেন। তবে সময়ের সঙ্গে বিদ্রূপের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত প্রাণী দুটি দলীয় পরিচয়ের প্রতীকে পরিণত হয়। রিপাবলিকানরা হাতিকে নিজেদের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে। ডেমোক্র্যাটরা গাধাকে আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় প্রতীক ঘোষণা না করলেও প্রচার ও সমাবেশে এর ব্যবহার রয়েছে।

ফলের অপেক্ষা

এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের রায় শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যা নির্ধারণ করবে না; ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি দুই বছরের রাজনৈতিক পরিসরও অনেকটা নির্ধারণ করবে। আগাম ভোটের বড় সংখ্যা, দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে নির্বাচনের ফলের দিকে নজর রাখছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।

ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার পর প্রাথমিক ফল প্রকাশ শুরু হবে। তবে সব আসনের ফল একসঙ্গে জানা যাবে না। বিশেষ করে যেসব আসনে ভোটের ব্যবধান কম থাকবে, সেগুলোর চূড়ান্ত ফল পেতে সময় লাগতে পারে। শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাচ্ছে, তা-ই হবে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

ফল কখন জানা যাবে

যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যভেদে ভোটকেন্দ্র খোলা ও বন্ধের সময় আলাদা। ফলে সব জায়গার ভোট একসঙ্গে শেষ হবে না। প্রথম দফায় ইন্ডিয়ানা ও কেনটাকির কিছু এলাকায় স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় ভোটকেন্দ্র বন্ধ হবে। বাংলাদেশ সময় তখন বুধবার ভোর ৫টা। এরপর সন্ধ্যা ৭টায় জর্জিয়া, সাউথ ক্যারোলাইনা ও ভারমন্টসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ভোট শেষ হবে। বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল ৬টা।

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ভোটকেন্দ্র বন্ধ হবে ওহাইও ও নর্থ ক্যারোলাইনায়। বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৬টা। রাত ৮টায় ফ্লোরিডা, মেইন, পেনসিলভানিয়া, মিশিগানসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ভোটগ্রহণ শেষ হবে। বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টা। রাত ৯টায় আইওয়া, টেক্সাস, উইসকনসিনসহ আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ভোট শেষ হবে। বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টা।

প্রাথমিক ফল আসতে শুরু করলেও শুরুতেই সার্বিক চিত্র পাওয়া যাবে না। কোন এলাকায় আগে ভোট গণনা শেষ হচ্ছে, সেখানে কোন দলের সমর্থন বেশি এবং আগাম ভোট ও ডাকযোগে আসা ব্যালট গণনার নিয়ম কী—এসবের ওপর ফল প্রকাশের গতি নির্ভর করবে। কোনো কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে ভোটের ব্যবধান কম হলে চূড়ান্ত ফল জানতে কয়েক দিনও লাগতে পারে।

আলাস্কার মতো অঙ্গরাজ্যে বিকল্প পছন্দের ভোট গণনার কারণে পূর্ণাঙ্গ ফল আরও পরে প্রকাশিত হতে পারে। সিবিএস নিউজের তথ্য অনুযায়ী, আলাস্কার র‌্যাঙ্কড-চয়েস ভোটের পূর্ণাঙ্গ ফল ১৮ নভেম্বরের আগে পাওয়া যাবে না।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে চলছে ভোট, দুই দলই মরিয়া

প্রকাশের তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই এই ভোটে নির্ধারিত হবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি, নাকি বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টি। নির্বাচনের ফল শুধু আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব বদলাবে না, আগামী দুই বছর ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি বাস্তবায়ন, বাজেট, আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের ওপর কংগ্রেসের নজরদারির ক্ষেত্রেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

এবার প্রতিনিধি পরিষদের (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে এবং সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ৩৫টিতে ভোট হচ্ছে। সিনেটের ৩৫টি আসনের মধ্যে ৩৩টি নিয়মিত নির্বাচন, বাকি দুটি বিশেষ নির্বাচন। এ ছাড়া ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচনসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের পদেও ভোট হচ্ছে। নির্বাচনের আগে কংগ্রেসের দুই কক্ষই রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে ডেমোক্র্যাটদের লক্ষ্য অন্তত একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।

আগাম ভোট প্রায় ৬ কোটি

নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের আগাম ভোট ও ডাকযোগে ব্যালট পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। এবার নির্বাচনের আগেই ৫ কোটি ৭০ লাখের বেশি ভোটার আগাম ভোট দিয়েছেন বলে ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার ভোটিং ল্যাবের হিসাব উদ্ধৃত করেছে সিবিএস নিউজ।

আগাম ভোটের ক্ষেত্রে নির্বাচনের নির্ধারিত দিনের আগেই ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়া যায়। আবার ডাকযোগে ব্যালট সংগ্রহ করে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। কোন অঙ্গরাজ্যে কারা ডাকযোগে ভোট দিতে পারবেন, পরিচয় যাচাইয়ের নিয়ম কী এবং কখন ব্যালট গণনা শুরু হবে—এসব বিষয় অঙ্গরাজ্যভেদে ভিন্ন। এ কারণে কোনো কোনো জায়গায় নির্বাচনের দিন ভোট শেষ হওয়ার আগেই আগাম ভোটের ফল গণনা শুরু হতে পারে, আবার কোথাও নিয়ম অনুযায়ী পরে গণনা হয়।

দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণে সমীকরণ

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুটি কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট। প্রতিনিধি পরিষদে ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে ভোট হওয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ২১৮টি আসন। নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুব বেশি নয়। ফলে অল্প কয়েকটি আসনের ফলই কক্ষটির নিয়ন্ত্রণ বদলে দিতে পারে।

সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে এবার ৩৫টিতে ভোট হচ্ছে। এর মধ্যে ৩৩টি নিয়মিত নির্বাচন এবং দুটি বিশেষ নির্বাচন। ফ্লোরিডায় সাবেক সিনেটর মার্কো রুবিওর ছেড়ে যাওয়া আসনে এবং ওহাইওতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ছেড়ে যাওয়া আসনে ভোট হচ্ছে। সিনেটে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ৫১টি আসন প্রয়োজন। তবে দুই দলের আসন সমান হলে ভাইস প্রেসিডেন্টের ভোটে সিদ্ধান্ত হতে পারে। বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান হওয়ায় ৫০-৫০ সমতায়ও দলটি নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে।

গণমাধ্যমের হিসাবে, নির্বাচনের আগে সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি; ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমর্থনভিত্তিক অবস্থানে রয়েছেন দুই স্বতন্ত্র সিনেটরসহ ডেমোক্র্যাটপন্থী সদস্যরা। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে অন্তত চারটি আসনের নিট উন্নতি প্রয়োজন। প্রতিনিধি পরিষদেও কয়েকটি দোদুল্যমান আসন ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ট্রাম্পের নীতির ওপর রায়

মধ্যবর্তী নির্বাচনকে যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের কাজের ওপর ভোটারদের মূল্যায়ন হিসেবেও দেখা হয়। এবার জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, অভিবাসননীতি, অর্থনীতি এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ নির্বাচনি প্রচারে গুরুত্ব পেয়েছে। প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা ও তার প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের প্রতি জনসমর্থনও ভোটের ফলকে প্রভাবিত করতে পারে।

ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের অন্তত একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির ওপর নজরদারি বাড়াতে পারবেন। বাজেট, আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে শুনানি এবং তদন্তের সুযোগও বাড়বে। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করা সহজ হবে। আর সিনেটের নিয়ন্ত্রণ বদলালে প্রেসিডেন্টের মনোনীত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তা ও বিচারপতিদের নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্প প্রশাসনের আইন ও নীতি বাস্তবায়নের পথ তুলনামূলকভাবে সহজ থাকবে। ফলে এই নির্বাচনকে শুধু আসন জয়ের প্রতিযোগিতা নয়, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের পরবর্তী দুই বছরের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণের লড়াই হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

৫০ অঙ্গরাজ্যে হাজার পর্যবেক্ষক

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে প্রায় এক হাজার পর্যবেক্ষক ও মনিটর নিয়োগ করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো ৫০টি অঙ্গরাজ্যেই এই পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে বিভাগটি জানিয়েছে। তাদের দায়িত্ব হলো নির্বাচনি আইন মানা হচ্ছে কি না, ভোটারদের অধিকার সুরক্ষিত থাকছে কি না এবং নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা।

এর আগে ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের অধীনে বিচার বিভাগ ২৪টি অঙ্গরাজ্যে পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছিল। এবারের পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমকে বিভাগটি তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

নির্বাচন ঘিরে আইনি বিতর্কও রয়েছে। নির্বাচনের আগের দিন ক্যালিফোর্নিয়ার ডাকযোগে আসা কিছু ব্যালট আলাদা করে রাখার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ মুহূর্তের আবেদন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করে দেন। অন্যদিকে, ভোটারদের পরিচয় যাচাই ও ভোটের নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

গাধা ও হাতি যেভাবে

যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রতীক গাধা ও হাতি। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতীক গাধা, রিপাবলিকান পার্টির প্রতীক হাতি। নির্বাচনি প্রচার, রাজনৈতিক কার্টুন, পোস্টার ও প্রচারসামগ্রীতে প্রাণী দুটির ব্যবহার দীর্ঘদিনের।

এই প্রতীক জনপ্রিয় করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন উনিশ শতকের রাজনৈতিক কার্টুনশিল্পী টমাস নাস্ট। ১৮৬২ থেকে ১৮৮৬ সাল পর্যন্ত ‘হার্পারস উইকলি’ পত্রিকায় কাজ করার সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী কার্টুনশিল্পী হয়ে ওঠেন।

১৮২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অ্যান্ড্রু জ্যাকসনকে বিরোধীরা ‘জ্যাকঅ্যাস’ বা গাধা বলে বিদ্রূপ করত। জ্যাকসন পরে সেই অপমানজনক পরিচয়কেই নিজের নির্বাচনি প্রচারে ব্যবহার করেন। অন্যদিকে, ১৮৭৪ সালে নাস্টের আঁকা ‘থার্ড টার্ম প্যানিক’ কার্টুনে ‘দ্য রিপাবলিকান ভোট’ লেখা একটি হাতিকে ভীত ও দিশাহারা অবস্থায় দেখানো হয়। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ইউলিসিস এস গ্র্যান্ট তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় থাকতে চান—এমন গুজব ও রাজনৈতিক আতঙ্ককে ব্যঙ্গ করেছিল কার্টুনটি। এর পর হাতি রিপাবলিকানদের প্রতীক হিসেবে আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

নাস্ট দুই দলের নেতাদের দুর্বলতা, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি তুলে ধরতে গাধা ও হাতি—দুই প্রাণীকেই ব্যঙ্গ করেছেন। তবে সময়ের সঙ্গে বিদ্রূপের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত প্রাণী দুটি দলীয় পরিচয়ের প্রতীকে পরিণত হয়। রিপাবলিকানরা হাতিকে নিজেদের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে। ডেমোক্র্যাটরা গাধাকে আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় প্রতীক ঘোষণা না করলেও প্রচার ও সমাবেশে এর ব্যবহার রয়েছে।

ফলের অপেক্ষা

এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের রায় শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যা নির্ধারণ করবে না; ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি দুই বছরের রাজনৈতিক পরিসরও অনেকটা নির্ধারণ করবে। আগাম ভোটের বড় সংখ্যা, দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে নির্বাচনের ফলের দিকে নজর রাখছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।

ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার পর প্রাথমিক ফল প্রকাশ শুরু হবে। তবে সব আসনের ফল একসঙ্গে জানা যাবে না। বিশেষ করে যেসব আসনে ভোটের ব্যবধান কম থাকবে, সেগুলোর চূড়ান্ত ফল পেতে সময় লাগতে পারে। শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাচ্ছে, তা-ই হবে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

ফল কখন জানা যাবে

যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যভেদে ভোটকেন্দ্র খোলা ও বন্ধের সময় আলাদা। ফলে সব জায়গার ভোট একসঙ্গে শেষ হবে না। প্রথম দফায় ইন্ডিয়ানা ও কেনটাকির কিছু এলাকায় স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় ভোটকেন্দ্র বন্ধ হবে। বাংলাদেশ সময় তখন বুধবার ভোর ৫টা। এরপর সন্ধ্যা ৭টায় জর্জিয়া, সাউথ ক্যারোলাইনা ও ভারমন্টসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ভোট শেষ হবে। বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল ৬টা।

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ভোটকেন্দ্র বন্ধ হবে ওহাইও ও নর্থ ক্যারোলাইনায়। বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৬টা। রাত ৮টায় ফ্লোরিডা, মেইন, পেনসিলভানিয়া, মিশিগানসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ভোটগ্রহণ শেষ হবে। বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টা। রাত ৯টায় আইওয়া, টেক্সাস, উইসকনসিনসহ আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ভোট শেষ হবে। বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টা।

প্রাথমিক ফল আসতে শুরু করলেও শুরুতেই সার্বিক চিত্র পাওয়া যাবে না। কোন এলাকায় আগে ভোট গণনা শেষ হচ্ছে, সেখানে কোন দলের সমর্থন বেশি এবং আগাম ভোট ও ডাকযোগে আসা ব্যালট গণনার নিয়ম কী—এসবের ওপর ফল প্রকাশের গতি নির্ভর করবে। কোনো কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে ভোটের ব্যবধান কম হলে চূড়ান্ত ফল জানতে কয়েক দিনও লাগতে পারে।

আলাস্কার মতো অঙ্গরাজ্যে বিকল্প পছন্দের ভোট গণনার কারণে পূর্ণাঙ্গ ফল আরও পরে প্রকাশিত হতে পারে। সিবিএস নিউজের তথ্য অনুযায়ী, আলাস্কার র‌্যাঙ্কড-চয়েস ভোটের পূর্ণাঙ্গ ফল ১৮ নভেম্বরের আগে পাওয়া যাবে না।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত