বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের মধ্যে রান্নার বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সৌরবিদ্যুৎচালিত কুকার নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। বাজারে ১২ ও ২৪ ভোল্টের চুলা, রাইস কুকার এবং মাল্টি কুকারের মতো পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে এসব যন্ত্র কেনার আগে এর কার্যপদ্ধতি, বিদ্যুতের চাহিদা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার।
বিশেষ করে ১২ বা ২৪ ভোল্টের কুকার দেখলেই সেটি সরাসরি সোলার প্যানেলে চালানো যাবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। রান্নার জন্য কত বিদ্যুৎ প্রয়োজন, প্যানেলের ক্ষমতা কত এবং ব্যাটারি ও চার্জ কন্ট্রোলার যন্ত্রটির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না - সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে।
সোলার কুকারের প্রযুক্তি দুই ধরনের
সৌরশক্তি ব্যবহার করে রান্নার ব্যবস্থা মূলত দুই পদ্ধতিতে কাজ করে। একটি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, অন্যটি সূর্যের তাপ কাজে লাগায়।
১. সৌরবিদ্যুৎচালিত ইলেকট্রিক কুকার
এ ধরনের যন্ত্রে সোলার প্যানেলের উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়। বিদ্যুৎ সরাসরি সরবরাহ করা যায় অথবা ব্যাটারিতে জমা রেখে পরে কাজে লাগানো যায়। ১২ ও ২৪ ভোল্ট বলতে এখানে ডিসি বিদ্যুতের ভোল্টেজ বোঝানো হয়েছে।
বিশেষভাবে তৈরি রাইস কুকার বা হিটিং পট চালাতে এই বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়। তবে কুকারের ওয়াট অনুযায়ী সোলার প্যানেল ও ব্যাটারির সক্ষমতা নির্ধারণ করতে হয়।
২. সূর্যের তাপে রান্নার কুকার
এই পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ বা ব্যাটারির প্রয়োজন হয় না। প্রতিফলক আয়না কিংবা বিশেষ সৌর টিউবের সাহায্যে সূর্যের তাপ একটি নির্দিষ্ট স্থানে কেন্দ্রীভূত করে খাবার রান্না করা হয়। ফলে এ ধরনের কুকার ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত রোদ থাকা জরুরি।
দুই প্রযুক্তির কার্যপদ্ধতি আলাদা। তাই কেনার সময় পণ্যটি সৌরবিদ্যুতে চলে, নাকি সরাসরি সূর্যের তাপ ব্যবহার করে - তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশে দাম ও প্রাপ্যতা
দেশের অনলাইন বাজারে ১২ ও ২৪ ভোল্টের কুকার, চুলা এবং মাল্টি কুকারের মতো পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। দারাজসহ বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মেও এসব পণ্য বিক্রির তথ্য রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শুধু চুলার দাম ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকার মধ্যে হতে পারে। আবার কিছু প্যাকেজের দাম দেখানো হয়েছে ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকা। তবে প্যাকেজের মধ্যে কী কী সরঞ্জাম রয়েছে, তার ওপর দামের পার্থক্য নির্ভর করতে পারে।
কেনার আগে বিক্রেতার কাছ থেকে পণ্যের মজুত, ওয়ারেন্টি ও ভোল্টেজ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। পাশাপাশি প্যাকেজের দামে ব্যাটারি, উপযোগী রান্নার পাত্র কিংবা অন্যান্য সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত আছে কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি।
কীভাবে চালাতে হয়
সৌরবিদ্যুৎচালিত রাইস কুকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণত সোলার প্যানেল, এমপিপিটি চার্জ কন্ট্রোলার ও ব্যাটারির সমন্বয় প্রয়োজন হয়। প্রথমে প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ চার্জ কন্ট্রোলারের মাধ্যমে ব্যাটারিতে জমা হয়। পরে ব্যাটারি থেকে নির্দিষ্ট ভোল্টেজের ডিসি বিদ্যুৎ কুকারে সরবরাহ করা হয়।
এরপর কুকারে চাল ও পানি দিয়ে প্রচলিত নিয়মেই ভাত রান্না করা যায়। কিছু মডেলে স্যুপ তৈরি, সবজি সিদ্ধ কিংবা খাবার গরম করার সুবিধাও থাকে।
অন্যদিকে সূর্যের তাপে চলা কুকারে নির্দিষ্ট স্থানে খাবারের পাত্র বসাতে হয়। প্রতিফলক বা সৌর টিউবের অবস্থান এমনভাবে ঠিক করতে হয়, যাতে সূর্যের আলো ও তাপ রান্নার পাত্রে কেন্দ্রীভূত হয়। মেঘলা আবহাওয়ায় পর্যাপ্ত তাপ না পাওয়ায় রান্না করতে বেশি সময় লাগতে পারে।
কেনার আগে যে বিষয়গুলো যাচাই করবেন
কুকারের গায়ে ১২ বা ২৪ ভোল্ট লেখা থাকাই যথেষ্ট নয়। কেনার আগে কয়েকটি বিষয় জেনে নেওয়া প্রয়োজন:
দেশে সৌরবিদ্যুৎচালিত কুকার নিয়ে গবেষণা
বাংলাদেশেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে রান্নার প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনার্জির গবেষকেরা ২০২৩ সালে সৌরবিদ্যুৎচালিত ডিসি ইন্ডাকশন কুকারের নকশা ও কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।
এস. এম. এন. শামস, এফ. সুলতানা, এ. সাহা ও এম. এ. হক 'Power point tracker mounted solar powered DC induction cooker' শিরোনামে গবেষণাটি করেন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ জার্নাল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চে (বিজেএসআইআর) এটি প্রকাশিত হয়। গবেষণায় সোলার প্যানেল, এমপিপিটি চার্জ কন্ট্রোলার ও ব্যাটারির সমন্বয়ে রান্নার ব্যবস্থা তুলে ধরা হয়েছে।
বিকল্প হলেও প্রাথমিক খরচের হিসাব জরুরি
লোডশেডিং কিংবা বিদ্যুৎ-সংকটের সময়ে সৌরবিদ্যুৎচালিত কুকার বিকল্প ব্যবস্থা হতে পারে। তবে যন্ত্রটি কিনলেই রান্নার খরচ পুরোপুরি শূন্য হয়ে যাবে, এমন নয়। প্যানেল, ব্যাটারি ও কুকার কেনার জন্য শুরুতেই অর্থ ব্যয় করতে হয়।
তাই পরিবারের দৈনিক রান্নার পরিমাণ, কুকারের বিদ্যুৎ চাহিদা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের খরচ বিবেচনা করে ব্যবস্থা নির্বাচন করা উচিত। সঠিক ক্ষমতার যন্ত্র ও উপযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থাকলেই এ প্রযুক্তি ব্যবহারিক সুবিধা দিতে পারে।

শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের মধ্যে রান্নার বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সৌরবিদ্যুৎচালিত কুকার নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। বাজারে ১২ ও ২৪ ভোল্টের চুলা, রাইস কুকার এবং মাল্টি কুকারের মতো পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে এসব যন্ত্র কেনার আগে এর কার্যপদ্ধতি, বিদ্যুতের চাহিদা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার।
বিশেষ করে ১২ বা ২৪ ভোল্টের কুকার দেখলেই সেটি সরাসরি সোলার প্যানেলে চালানো যাবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। রান্নার জন্য কত বিদ্যুৎ প্রয়োজন, প্যানেলের ক্ষমতা কত এবং ব্যাটারি ও চার্জ কন্ট্রোলার যন্ত্রটির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না - সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে।
সোলার কুকারের প্রযুক্তি দুই ধরনের
সৌরশক্তি ব্যবহার করে রান্নার ব্যবস্থা মূলত দুই পদ্ধতিতে কাজ করে। একটি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, অন্যটি সূর্যের তাপ কাজে লাগায়।
১. সৌরবিদ্যুৎচালিত ইলেকট্রিক কুকার
এ ধরনের যন্ত্রে সোলার প্যানেলের উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়। বিদ্যুৎ সরাসরি সরবরাহ করা যায় অথবা ব্যাটারিতে জমা রেখে পরে কাজে লাগানো যায়। ১২ ও ২৪ ভোল্ট বলতে এখানে ডিসি বিদ্যুতের ভোল্টেজ বোঝানো হয়েছে।
বিশেষভাবে তৈরি রাইস কুকার বা হিটিং পট চালাতে এই বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়। তবে কুকারের ওয়াট অনুযায়ী সোলার প্যানেল ও ব্যাটারির সক্ষমতা নির্ধারণ করতে হয়।
২. সূর্যের তাপে রান্নার কুকার
এই পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ বা ব্যাটারির প্রয়োজন হয় না। প্রতিফলক আয়না কিংবা বিশেষ সৌর টিউবের সাহায্যে সূর্যের তাপ একটি নির্দিষ্ট স্থানে কেন্দ্রীভূত করে খাবার রান্না করা হয়। ফলে এ ধরনের কুকার ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত রোদ থাকা জরুরি।
দুই প্রযুক্তির কার্যপদ্ধতি আলাদা। তাই কেনার সময় পণ্যটি সৌরবিদ্যুতে চলে, নাকি সরাসরি সূর্যের তাপ ব্যবহার করে - তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশে দাম ও প্রাপ্যতা
দেশের অনলাইন বাজারে ১২ ও ২৪ ভোল্টের কুকার, চুলা এবং মাল্টি কুকারের মতো পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। দারাজসহ বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মেও এসব পণ্য বিক্রির তথ্য রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শুধু চুলার দাম ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকার মধ্যে হতে পারে। আবার কিছু প্যাকেজের দাম দেখানো হয়েছে ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকা। তবে প্যাকেজের মধ্যে কী কী সরঞ্জাম রয়েছে, তার ওপর দামের পার্থক্য নির্ভর করতে পারে।
কেনার আগে বিক্রেতার কাছ থেকে পণ্যের মজুত, ওয়ারেন্টি ও ভোল্টেজ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। পাশাপাশি প্যাকেজের দামে ব্যাটারি, উপযোগী রান্নার পাত্র কিংবা অন্যান্য সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত আছে কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি।
কীভাবে চালাতে হয়
সৌরবিদ্যুৎচালিত রাইস কুকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণত সোলার প্যানেল, এমপিপিটি চার্জ কন্ট্রোলার ও ব্যাটারির সমন্বয় প্রয়োজন হয়। প্রথমে প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ চার্জ কন্ট্রোলারের মাধ্যমে ব্যাটারিতে জমা হয়। পরে ব্যাটারি থেকে নির্দিষ্ট ভোল্টেজের ডিসি বিদ্যুৎ কুকারে সরবরাহ করা হয়।
এরপর কুকারে চাল ও পানি দিয়ে প্রচলিত নিয়মেই ভাত রান্না করা যায়। কিছু মডেলে স্যুপ তৈরি, সবজি সিদ্ধ কিংবা খাবার গরম করার সুবিধাও থাকে।
অন্যদিকে সূর্যের তাপে চলা কুকারে নির্দিষ্ট স্থানে খাবারের পাত্র বসাতে হয়। প্রতিফলক বা সৌর টিউবের অবস্থান এমনভাবে ঠিক করতে হয়, যাতে সূর্যের আলো ও তাপ রান্নার পাত্রে কেন্দ্রীভূত হয়। মেঘলা আবহাওয়ায় পর্যাপ্ত তাপ না পাওয়ায় রান্না করতে বেশি সময় লাগতে পারে।
কেনার আগে যে বিষয়গুলো যাচাই করবেন
কুকারের গায়ে ১২ বা ২৪ ভোল্ট লেখা থাকাই যথেষ্ট নয়। কেনার আগে কয়েকটি বিষয় জেনে নেওয়া প্রয়োজন:
দেশে সৌরবিদ্যুৎচালিত কুকার নিয়ে গবেষণা
বাংলাদেশেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে রান্নার প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনার্জির গবেষকেরা ২০২৩ সালে সৌরবিদ্যুৎচালিত ডিসি ইন্ডাকশন কুকারের নকশা ও কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।
এস. এম. এন. শামস, এফ. সুলতানা, এ. সাহা ও এম. এ. হক 'Power point tracker mounted solar powered DC induction cooker' শিরোনামে গবেষণাটি করেন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ জার্নাল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চে (বিজেএসআইআর) এটি প্রকাশিত হয়। গবেষণায় সোলার প্যানেল, এমপিপিটি চার্জ কন্ট্রোলার ও ব্যাটারির সমন্বয়ে রান্নার ব্যবস্থা তুলে ধরা হয়েছে।
বিকল্প হলেও প্রাথমিক খরচের হিসাব জরুরি
লোডশেডিং কিংবা বিদ্যুৎ-সংকটের সময়ে সৌরবিদ্যুৎচালিত কুকার বিকল্প ব্যবস্থা হতে পারে। তবে যন্ত্রটি কিনলেই রান্নার খরচ পুরোপুরি শূন্য হয়ে যাবে, এমন নয়। প্যানেল, ব্যাটারি ও কুকার কেনার জন্য শুরুতেই অর্থ ব্যয় করতে হয়।
তাই পরিবারের দৈনিক রান্নার পরিমাণ, কুকারের বিদ্যুৎ চাহিদা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের খরচ বিবেচনা করে ব্যবস্থা নির্বাচন করা উচিত। সঠিক ক্ষমতার যন্ত্র ও উপযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থাকলেই এ প্রযুক্তি ব্যবহারিক সুবিধা দিতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন