সংবাদ

সুনামগঞ্জে কাজে আসছে না কোটি টাকার বজ্রনিরোধক যন্ত্র


লতিফুর রহমান রাজু, সুনামগঞ্জ
লতিফুর রহমান রাজু, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম

সুনামগঞ্জে কাজে আসছে না কোটি টাকার বজ্রনিরোধক যন্ত্র
ছবি : সংগৃহীত

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল বিশ্বের অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর ধান কাটা ও মাছ ধরার মৌসুমে এখানে বজ্রপাতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। তবে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেওয়া কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে জনমনে চরম অসন্তোষ ও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিপুল ব্যয়ে স্থাপিত আধুনিক বজ্রনিরোধক যন্ত্রগুলো গত দুই বছরে একটি বজ্রপাতও প্রতিহত করতে পারেনি।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে সুনামগঞ্জ সদর, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও শাল্লা উপজেলায় ১৮টি আধুনিক বজ্রনিরোধক দণ্ড (লাইটিং অ্যারেস্টার) স্থাপন করা হয়। তুরস্ক থেকে আমদানিকৃত প্রতিটি যন্ত্রের পেছনে ব্যয় হয়েছে ৬ লাখ টাকা।

কারিগরি তথ্য অনুযায়ী, এই যন্ত্রগুলোর ৩০০ ফুট ব্যাসার্ধের মধ্যে বজ্রপাত টেনে নিয়ে সরাসরি মাটিতে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা। একই সঙ্গে ওই স্থানে কতটি বজ্রপাত হয়েছে, তা গণনা করার সক্ষমতাও রয়েছে এগুলোর। কিন্তু স্থাপনের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও যন্ত্রগুলোর গণনাকারী হিসাব (কাউন্ট) এখন পর্যন্ত শূন্য।

হাওরপাড়ের বাসিন্দাদের অভিযোগ, যন্ত্রগুলো স্থাপনের ক্ষেত্রে কৃষকদের চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বোরো মৌসুমে কৃষকেরা যখন হাওরের মাঝখানে কাজ করেন, তখন তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকেন। কিন্তু যন্ত্রগুলো হাওরের গভীরে স্থাপন না করে লোকালয়ের কাছাকাছি বসানো হয়েছে।

তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জুনাব আলী বলেন, ‘বড় বড় হাওরগুলোতে কোনো দণ্ড স্থাপন না করে জনবসতির পাশে বসানোয় এগুলো কৃষকদের কোনো কাজে আসছে না।’

এদিকে গত চার বছরে জেলায় সরকারি হিসাবেই বজ্রপাতে ৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ১১ এপ্রিলও চার উপজেলায় পাঁচজন কৃষক প্রাণ হারিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্ক তাড়া করে ফিরছে প্রান্তিক কৃষকদের।

হাওর গবেষক ও বেসরকারি সংস্থা ‘হাউস’-এর নির্বাহী পরিচালক সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, ‘নাসা ও মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির গবেষণা অনুযায়ী, মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সারা বিশ্বের মধ্যে সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে দণ্ড স্থাপন করায় এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে সঠিক স্থানে এগুলো স্থাপন করা জরুরি।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, হাওরের উঁচু স্থানে ধান মাড়াইয়ের জায়গার পাশে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের পরিকল্পনা থাকলেও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না।

এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘জীবন আগে, পরে জীবিকা। আকাশে কালো মেঘ দেখা দিলে মানুষ যেন সতর্ক থাকেন, সে জন্য ইউএনওদের মাইকিং করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।’

সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল জানান, বজ্রপাতে নিহত কৃষকদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া বজ্রপাত প্রতিরোধে জাতীয় সংসদে ইতিমধ্যে ৭১ বিধিতে একটি নোটিশ দিয়েছেন তিনি, যা গৃহীত হয়েছে। আগামী ২৭ এপ্রিল এ বিষয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬


সুনামগঞ্জে কাজে আসছে না কোটি টাকার বজ্রনিরোধক যন্ত্র

প্রকাশের তারিখ : ২১ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল বিশ্বের অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর ধান কাটা ও মাছ ধরার মৌসুমে এখানে বজ্রপাতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। তবে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেওয়া কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে জনমনে চরম অসন্তোষ ও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিপুল ব্যয়ে স্থাপিত আধুনিক বজ্রনিরোধক যন্ত্রগুলো গত দুই বছরে একটি বজ্রপাতও প্রতিহত করতে পারেনি।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে সুনামগঞ্জ সদর, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও শাল্লা উপজেলায় ১৮টি আধুনিক বজ্রনিরোধক দণ্ড (লাইটিং অ্যারেস্টার) স্থাপন করা হয়। তুরস্ক থেকে আমদানিকৃত প্রতিটি যন্ত্রের পেছনে ব্যয় হয়েছে ৬ লাখ টাকা।

কারিগরি তথ্য অনুযায়ী, এই যন্ত্রগুলোর ৩০০ ফুট ব্যাসার্ধের মধ্যে বজ্রপাত টেনে নিয়ে সরাসরি মাটিতে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা। একই সঙ্গে ওই স্থানে কতটি বজ্রপাত হয়েছে, তা গণনা করার সক্ষমতাও রয়েছে এগুলোর। কিন্তু স্থাপনের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও যন্ত্রগুলোর গণনাকারী হিসাব (কাউন্ট) এখন পর্যন্ত শূন্য।

হাওরপাড়ের বাসিন্দাদের অভিযোগ, যন্ত্রগুলো স্থাপনের ক্ষেত্রে কৃষকদের চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বোরো মৌসুমে কৃষকেরা যখন হাওরের মাঝখানে কাজ করেন, তখন তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকেন। কিন্তু যন্ত্রগুলো হাওরের গভীরে স্থাপন না করে লোকালয়ের কাছাকাছি বসানো হয়েছে।

তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জুনাব আলী বলেন, ‘বড় বড় হাওরগুলোতে কোনো দণ্ড স্থাপন না করে জনবসতির পাশে বসানোয় এগুলো কৃষকদের কোনো কাজে আসছে না।’

এদিকে গত চার বছরে জেলায় সরকারি হিসাবেই বজ্রপাতে ৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ১১ এপ্রিলও চার উপজেলায় পাঁচজন কৃষক প্রাণ হারিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্ক তাড়া করে ফিরছে প্রান্তিক কৃষকদের।

হাওর গবেষক ও বেসরকারি সংস্থা ‘হাউস’-এর নির্বাহী পরিচালক সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, ‘নাসা ও মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির গবেষণা অনুযায়ী, মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সারা বিশ্বের মধ্যে সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে দণ্ড স্থাপন করায় এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে সঠিক স্থানে এগুলো স্থাপন করা জরুরি।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, হাওরের উঁচু স্থানে ধান মাড়াইয়ের জায়গার পাশে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের পরিকল্পনা থাকলেও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না।

এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘জীবন আগে, পরে জীবিকা। আকাশে কালো মেঘ দেখা দিলে মানুষ যেন সতর্ক থাকেন, সে জন্য ইউএনওদের মাইকিং করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।’

সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল জানান, বজ্রপাতে নিহত কৃষকদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া বজ্রপাত প্রতিরোধে জাতীয় সংসদে ইতিমধ্যে ৭১ বিধিতে একটি নোটিশ দিয়েছেন তিনি, যা গৃহীত হয়েছে। আগামী ২৭ এপ্রিল এ বিষয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত