সংবাদ

দেশে ক্ষুদ্রঋণ বাস্তবতা


শাহ মো. জিয়াউদ্দিন
শাহ মো. জিয়াউদ্দিন
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪৮ পিএম

দেশে ক্ষুদ্রঋণ বাস্তবতা
ক্ষুদ্রঋণ কি সত্যিই দারিদ্র্য বিমোচনের কার্যকর মাধ্যম, নাকি এটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে নতুন ধরনের ঋণনির্ভরতা ˆতরি করছে?

আসলে ঋণ কী? এই ব্যবস্থাটি কখন চালু হয়? ঋণের ইংরেজি শব্দ ‘ক্রেডিট’। ‘ক্রেডিট’ শব্দটি লাতিন creditum থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘বিশ্বাস’। অর্থাৎ এমন একটি বিশ্বাস, যার ভিত্তিতে একজন ব্যক্তি অন্যকে অর্থ বা সম্পদ দেন, যখন গ্রহীতা তাৎক্ষণিকভাবে তা পরিশোধ করতে সক্ষম না হলেও ভবিষ্যতে পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেন। অন্যভাবে বলা যায়, ঋণ এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে আদান-প্রদান আইনানুগ, বিধিসম্মত এবং বহু অপরিচিত মানুষের মধ্যেও বিস্তৃত হতে পারে। এই বিশ্বাসই অর্থনৈতিক কার্যক্রমের একটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

ইংরেজিতে ‘ক্রেডিট’ শব্দটির ব্যবহার শুরু হয় প্রায় ১৫২০ সালে। এটি মধ্যযুগীয় ফরাসি ‘credit’ (বিশ্বাস, আস্থা), ইতালীয় এবং লাতিন (বিশ্বাস করা) থেকে উদ্ভূত। ‘ক্রেডিটর’ শব্দটি ঋণদাতা অর্থে ১৫শ’ শতকের মধ্যভাগ থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পরবর্তীতে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ‘ক্রেডিট ইউনিয়ন’, ‘ক্রেডিট রেটিং’ প্রভৃতি শব্দেরও প্রচলন ঘটে, যা ঋণব্যবস্থাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোবদ্ধ করে তোলে।

বাংলাদেশে ব্রিটিশ আমলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হলেও তা মূলত শহরকেন্দ্রিক ছিল। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব ছিল সীমিত। ফলে গ্রামে গ্রামে মহাজনি প্রথা বিস্তার লাভ করে। কৃষকরা চাষাবাদের জন্য কিংবা ˆদনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হতেন। এক মন ধান ঋণ নিলে দেড় মন ফেরত দেওয়া কিংবা কয়েক মাসের ব্যবধানে টাকার পরিমাণ দ্বিগুণের কাছাকাছি হয়ে যাওয়া—এসব ছিল তখনকার সাধারণ চিত্র। এতে কৃষকেরা ক্রমাগত ঋণের ফাঁদে আটকে পড়তেন এবং অনেক সময় জমি হারাতেন।

এই বাস্তবতায় ‘কাবুলিওয়ালা’ ঋণব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এটি ছিল একটি অনানুষ্ঠানিক ও ব্যক্তিনির্ভর ঋণপ্রদান পদ্ধতি। মানুষ প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ নিতে পারত, তবে এর শর্ত ছিল কঠোর। অনেক ক্ষেত্রে অলংকার বা মূল্যবান সম্পদ বন্ধক রাখতে হতো। সুদের হার ছিল অত্যন্ত বেশি এবং সময়মতো পরিশোধ না করলে চক্রবৃদ্ধি হারে ঋণ বৃদ্ধি পেত। ঋণ আদায়ে চাপ প্রয়োগ, এমনকি নির্যাতনের ঘটনাও অ¯^াভাবিক ছিল না। তবুও প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্পের অভাবে দরিদ্র জনগোষ্ঠী এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল।

এই শোষণমূলক প্রথার বিপরীতে একটি মানবিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯০৫ সালে তিনি পতিসরে কালীগ্রাম কৃষি সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে কৃষকদের ¯^ল্প সুদে ও জামানতবিহীন ঋণ দেয়া হতো। এর উদ্দেশ্য ছিল মহাজনদের উচ্চ সুদের ঋণের ফাঁদ থেকে কৃষকদের মুক্ত করা এবং তাদের উৎপাদনশীল কার্যক্রমে সহায়তা করা। এই উদ্যোগ পরবর্তীকালে আধুনিক ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

¯^াধীনতা যুদ্ধের সময় এবং তার পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ¯ে^চ্ছাসেবী গোষ্ঠী সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে যুক্ত হয়। এদের অনেকেই পরবর্তীতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিও হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। শিক্ষা, ¯^াস্থ্য, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে তারা কাজ শুরু করে। এই প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।

১৯৭৬ সালে চট্টগ্রামের জোবরা গ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়। পরে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত ব্যাংকে রূপ নেয়। নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস এই উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণকে একটি ˆবশ্বিক মডেলে উন্নীত করেন। তার ধারণা ছিল—¯^ল্প পরিমাণ ঋণ, সহজ শর্তে এবং জামানত ছাড়াই প্রদান করলে দরিদ্র মানুষ নিজের উদ্যোগে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড শুরু করতে পারে।

বর্তমানে বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির অধীনে শত শত প্রতিষ্ঠান এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কোটি কোটি মানুষ, বিশেষ করে নারী, এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ক্ষুদ্রঋণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর উচ্চ আদায় হার, যা প্রায় শতভাগের কাছাকাছি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার তুলনায় অনেক ক্ষেত্রেই বেশি।

তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি কিছু জটিল বাস্তবতাও সামনে আসছে। দেশে দারিদ্র্যের হার সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায়। একই সঙ্গে এমন ঘটনাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে একজন ব্যক্তি একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করছেন। ফলে একটি ঋণ শোধ করতে আরেকটি ঋণ নেয়ার প্রবণতা ˆতরি হচ্ছে। সাপ্তাহিক কিস্তির চাপ সামাল দিতে গিয়ে অনেকেই ঋণের চক্রে আবদ্ধ হয়ে পড়ছেন।

ক্ষুদ্রঋণের কাঠামোগত ˆবশিষ্ট্যের কারণে এটি একটি ঘূর্ণায়মান প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। ঋণ পরিশোধের সঙ্গে সঙ্গে নতুন ঋণ পাওয়া যায়, যা একদিকে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ ˆতরি করে, অন্যদিকে অতিরিক্ত ঋণগ্রহণের ঝুঁকিও বাড়ায়। এতে দেখা যায়, একজন ঋণগ্রহীতার মোট দায় তার সম্পদের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়, যদিও তিনি নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করায় আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হন না।

এই পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে—ক্ষুদ্রঋণ কি সত্যিই দারিদ্র্য বিমোচনের কার্যকর মাধ্যম, নাকি এটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে নতুন ধরনের ঋণনির্ভরতা ˆতরি করছে? এর উত্তর একমাত্রিক নয়। একদিকে এটি বহু মানুষের জীবিকা উন্নয়নে সহায়তা করেছে, অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে ঋণের অতিরিক্ত চাপ নতুন সংকটেরও জন্ম দিচ্ছে।

সুতরাং, ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থাকে একপাক্ষিকভাবে মূল্যায়ন না করে এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিক বিবেচনায় নেয়া জরুরি। নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রয়োজন কার্যকর তদারকি, ¯^চ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক শিক্ষার ওপর জোর দেয়া। একই সঙ্গে ঋণের ব্যবহার উৎপাদনশীল খাতে হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

বর্তমান বাস্তবতায় বলা যায়, ঋণ একটি প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক উপকরণ হলেও এর সঠিক ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা না গেলে তা ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ খাত সেই ˆদ্বত বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬


দেশে ক্ষুদ্রঋণ বাস্তবতা

প্রকাশের তারিখ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

আসলে ঋণ কী? এই ব্যবস্থাটি কখন চালু হয়? ঋণের ইংরেজি শব্দ ‘ক্রেডিট’। ‘ক্রেডিট’ শব্দটি লাতিন creditum থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘বিশ্বাস’। অর্থাৎ এমন একটি বিশ্বাস, যার ভিত্তিতে একজন ব্যক্তি অন্যকে অর্থ বা সম্পদ দেন, যখন গ্রহীতা তাৎক্ষণিকভাবে তা পরিশোধ করতে সক্ষম না হলেও ভবিষ্যতে পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেন। অন্যভাবে বলা যায়, ঋণ এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে আদান-প্রদান আইনানুগ, বিধিসম্মত এবং বহু অপরিচিত মানুষের মধ্যেও বিস্তৃত হতে পারে। এই বিশ্বাসই অর্থনৈতিক কার্যক্রমের একটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

ইংরেজিতে ‘ক্রেডিট’ শব্দটির ব্যবহার শুরু হয় প্রায় ১৫২০ সালে। এটি মধ্যযুগীয় ফরাসি ‘credit’ (বিশ্বাস, আস্থা), ইতালীয় এবং লাতিন (বিশ্বাস করা) থেকে উদ্ভূত। ‘ক্রেডিটর’ শব্দটি ঋণদাতা অর্থে ১৫শ’ শতকের মধ্যভাগ থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পরবর্তীতে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ‘ক্রেডিট ইউনিয়ন’, ‘ক্রেডিট রেটিং’ প্রভৃতি শব্দেরও প্রচলন ঘটে, যা ঋণব্যবস্থাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোবদ্ধ করে তোলে।

বাংলাদেশে ব্রিটিশ আমলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হলেও তা মূলত শহরকেন্দ্রিক ছিল। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব ছিল সীমিত। ফলে গ্রামে গ্রামে মহাজনি প্রথা বিস্তার লাভ করে। কৃষকরা চাষাবাদের জন্য কিংবা ˆদনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হতেন। এক মন ধান ঋণ নিলে দেড় মন ফেরত দেওয়া কিংবা কয়েক মাসের ব্যবধানে টাকার পরিমাণ দ্বিগুণের কাছাকাছি হয়ে যাওয়া—এসব ছিল তখনকার সাধারণ চিত্র। এতে কৃষকেরা ক্রমাগত ঋণের ফাঁদে আটকে পড়তেন এবং অনেক সময় জমি হারাতেন।

এই বাস্তবতায় ‘কাবুলিওয়ালা’ ঋণব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এটি ছিল একটি অনানুষ্ঠানিক ও ব্যক্তিনির্ভর ঋণপ্রদান পদ্ধতি। মানুষ প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ নিতে পারত, তবে এর শর্ত ছিল কঠোর। অনেক ক্ষেত্রে অলংকার বা মূল্যবান সম্পদ বন্ধক রাখতে হতো। সুদের হার ছিল অত্যন্ত বেশি এবং সময়মতো পরিশোধ না করলে চক্রবৃদ্ধি হারে ঋণ বৃদ্ধি পেত। ঋণ আদায়ে চাপ প্রয়োগ, এমনকি নির্যাতনের ঘটনাও অ¯^াভাবিক ছিল না। তবুও প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্পের অভাবে দরিদ্র জনগোষ্ঠী এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল।

এই শোষণমূলক প্রথার বিপরীতে একটি মানবিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯০৫ সালে তিনি পতিসরে কালীগ্রাম কৃষি সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে কৃষকদের ¯^ল্প সুদে ও জামানতবিহীন ঋণ দেয়া হতো। এর উদ্দেশ্য ছিল মহাজনদের উচ্চ সুদের ঋণের ফাঁদ থেকে কৃষকদের মুক্ত করা এবং তাদের উৎপাদনশীল কার্যক্রমে সহায়তা করা। এই উদ্যোগ পরবর্তীকালে আধুনিক ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

¯^াধীনতা যুদ্ধের সময় এবং তার পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ¯ে^চ্ছাসেবী গোষ্ঠী সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে যুক্ত হয়। এদের অনেকেই পরবর্তীতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিও হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। শিক্ষা, ¯^াস্থ্য, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে তারা কাজ শুরু করে। এই প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।

১৯৭৬ সালে চট্টগ্রামের জোবরা গ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়। পরে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত ব্যাংকে রূপ নেয়। নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস এই উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণকে একটি ˆবশ্বিক মডেলে উন্নীত করেন। তার ধারণা ছিল—¯^ল্প পরিমাণ ঋণ, সহজ শর্তে এবং জামানত ছাড়াই প্রদান করলে দরিদ্র মানুষ নিজের উদ্যোগে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড শুরু করতে পারে।

বর্তমানে বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির অধীনে শত শত প্রতিষ্ঠান এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কোটি কোটি মানুষ, বিশেষ করে নারী, এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ক্ষুদ্রঋণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর উচ্চ আদায় হার, যা প্রায় শতভাগের কাছাকাছি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার তুলনায় অনেক ক্ষেত্রেই বেশি।

তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি কিছু জটিল বাস্তবতাও সামনে আসছে। দেশে দারিদ্র্যের হার সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায়। একই সঙ্গে এমন ঘটনাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে একজন ব্যক্তি একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করছেন। ফলে একটি ঋণ শোধ করতে আরেকটি ঋণ নেয়ার প্রবণতা ˆতরি হচ্ছে। সাপ্তাহিক কিস্তির চাপ সামাল দিতে গিয়ে অনেকেই ঋণের চক্রে আবদ্ধ হয়ে পড়ছেন।

ক্ষুদ্রঋণের কাঠামোগত ˆবশিষ্ট্যের কারণে এটি একটি ঘূর্ণায়মান প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। ঋণ পরিশোধের সঙ্গে সঙ্গে নতুন ঋণ পাওয়া যায়, যা একদিকে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ ˆতরি করে, অন্যদিকে অতিরিক্ত ঋণগ্রহণের ঝুঁকিও বাড়ায়। এতে দেখা যায়, একজন ঋণগ্রহীতার মোট দায় তার সম্পদের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়, যদিও তিনি নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করায় আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হন না।

এই পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে—ক্ষুদ্রঋণ কি সত্যিই দারিদ্র্য বিমোচনের কার্যকর মাধ্যম, নাকি এটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে নতুন ধরনের ঋণনির্ভরতা ˆতরি করছে? এর উত্তর একমাত্রিক নয়। একদিকে এটি বহু মানুষের জীবিকা উন্নয়নে সহায়তা করেছে, অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে ঋণের অতিরিক্ত চাপ নতুন সংকটেরও জন্ম দিচ্ছে।

সুতরাং, ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থাকে একপাক্ষিকভাবে মূল্যায়ন না করে এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিক বিবেচনায় নেয়া জরুরি। নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রয়োজন কার্যকর তদারকি, ¯^চ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক শিক্ষার ওপর জোর দেয়া। একই সঙ্গে ঋণের ব্যবহার উৎপাদনশীল খাতে হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

বর্তমান বাস্তবতায় বলা যায়, ঋণ একটি প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক উপকরণ হলেও এর সঠিক ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা না গেলে তা ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ খাত সেই ˆদ্বত বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

[লেখক: উন্নয়নকর্মী]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত