একদিকে বাংলাদেশ, অন্যদিকে ভারত। মাঝখানে সীমান্তের শূন্যরেখা। আর সেই সরু জমির আইলে বসে আছে ১১টি মানুষ। যাদের কেউই নিজের বলে গ্রহণ করছে না। ৩৬ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে খোলা আকাশের নিচে রোদ, বৃষ্টি আর অনিশ্চয়তার মধ্যে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা।
তাদের মধ্যে রয়েছেন ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক নারীসহ তিন জন, তিন জন পুরুষ চারটি শিশুর মধ্যে একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী।
রোববার (৭ জুন) খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দুই দেশের শূন্যরেখায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন নারী ও শিশুসহ এই ১১ জন।
ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্তে এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য যেন মানবতার জন্য এক নির্মম প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অবস্থানের মাঝখানে আটকে পড়া এসব মানুষের অপরাধ কী সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
শুক্রবার (৫ জুন) ভোরে বিএসএফ তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করলে বিজিবি তা প্রতিহত করে। এরপর থেকে তারা না পারছেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে, না পারছেন ভারতে ফিরে যেতে। রাষ্ট্রের সীমানা যেন তাদের জন্য অদৃশ্য এক কারাগারে পরিণত হয়েছে।
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী রোজিনা আক্তারের কান্নাভেজা কণ্ঠ সীমান্তের নীরবতা ভেঙে দেয়। সে জানায়, পরিবারের সঙ্গে ভারতের কলকাতায় বসবাস করছিল। আটক হওয়ার পর প্রায় ১২ দিন বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ঘোরানোর পর শেষ পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও সীমান্তে এনে ফেলে রাখা হয়েছে তাদের। তার একটাই আকুতি আমাদের বাড়ি ফিরতে দিন।
সীমান্তের মাঠে বসে থাকা শিশুদের চোখে ভয়, নারীদের চোখে অনিশ্চয়তা আর পুরুষদের মুখে অসহায়ত্ব স্পষ্ট। খাবার নেই, পর্যাপ্ত পানি নেই, নেই চিকিৎসার নিশ্চয়তা। স্থানীয় কিছু মানুষ মানবিক কারণে খাবার ও পানি পৌঁছে দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা নারীর অবস্থা। যেকোনো সময় প্রসববেদনা শুরু হতে পারে। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী শিশুটির স্বাস্থ্য নিয়েও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। কিন্তু সীমান্তের এই অচলাবস্থায় তাদের ভাগ্যে কী ঘটবে, তার উত্তর কারও কাছে নেই।
এ বিষয়ে ৪২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মঈন হাসান বলেন, বিজিবির পক্ষ থেকে বিএসএফের সঙ্গে পতাকা বৈঠক করে এই অবৈধ পুশইনের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী যদি তাদের সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে হস্তান্তর করা হয়, তবেই আমরা নিয়ম মেনে গ্রহণ করবো। অন্যথায় কোনোভাবেই অবৈধ উপায়ে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
প্রশ্ন উঠছে রাষ্ট্র কি শুধু সীমান্ত রক্ষা করবে, নাকি সীমান্তে আটকে পড়া মানুষের জীবন ও মর্যাদারও দায়িত্ব নেবে? দুই দেশের কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে এসব মানুষ যেন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছেন একেকটি জীবন্ত পরিসংখ্যানে।মানবাধিকারকর্মীদের মতে, কোনো মানুষই রাষ্ট্রহীন হতে পারে না। কিন্তু মশালগাঁও সীমান্তের এই ১১ জন যেন বাস্তবতার নির্মম এক উদাহরণ যেখানে দুই দেশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তারা অপেক্ষা করছেন শুধু একটি পরিচয়ের জন্য, একটি নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, দুই রাষ্ট্রের সীমারেখায় অসহায় দাঁড়িয়ে থাকা ১১টি জীবনের দায়িত্ব নেবে কে? মানচিত্রের রেখা কি মানুষের জীবনের চেয়েও বড়?

রোববার, ০৭ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬
একদিকে বাংলাদেশ, অন্যদিকে ভারত। মাঝখানে সীমান্তের শূন্যরেখা। আর সেই সরু জমির আইলে বসে আছে ১১টি মানুষ। যাদের কেউই নিজের বলে গ্রহণ করছে না। ৩৬ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে খোলা আকাশের নিচে রোদ, বৃষ্টি আর অনিশ্চয়তার মধ্যে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা।
তাদের মধ্যে রয়েছেন ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক নারীসহ তিন জন, তিন জন পুরুষ চারটি শিশুর মধ্যে একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী।
রোববার (৭ জুন) খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দুই দেশের শূন্যরেখায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন নারী ও শিশুসহ এই ১১ জন।
ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্তে এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য যেন মানবতার জন্য এক নির্মম প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অবস্থানের মাঝখানে আটকে পড়া এসব মানুষের অপরাধ কী সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
শুক্রবার (৫ জুন) ভোরে বিএসএফ তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করলে বিজিবি তা প্রতিহত করে। এরপর থেকে তারা না পারছেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে, না পারছেন ভারতে ফিরে যেতে। রাষ্ট্রের সীমানা যেন তাদের জন্য অদৃশ্য এক কারাগারে পরিণত হয়েছে।
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী রোজিনা আক্তারের কান্নাভেজা কণ্ঠ সীমান্তের নীরবতা ভেঙে দেয়। সে জানায়, পরিবারের সঙ্গে ভারতের কলকাতায় বসবাস করছিল। আটক হওয়ার পর প্রায় ১২ দিন বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ঘোরানোর পর শেষ পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও সীমান্তে এনে ফেলে রাখা হয়েছে তাদের। তার একটাই আকুতি আমাদের বাড়ি ফিরতে দিন।
সীমান্তের মাঠে বসে থাকা শিশুদের চোখে ভয়, নারীদের চোখে অনিশ্চয়তা আর পুরুষদের মুখে অসহায়ত্ব স্পষ্ট। খাবার নেই, পর্যাপ্ত পানি নেই, নেই চিকিৎসার নিশ্চয়তা। স্থানীয় কিছু মানুষ মানবিক কারণে খাবার ও পানি পৌঁছে দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা নারীর অবস্থা। যেকোনো সময় প্রসববেদনা শুরু হতে পারে। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী শিশুটির স্বাস্থ্য নিয়েও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। কিন্তু সীমান্তের এই অচলাবস্থায় তাদের ভাগ্যে কী ঘটবে, তার উত্তর কারও কাছে নেই।
এ বিষয়ে ৪২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মঈন হাসান বলেন, বিজিবির পক্ষ থেকে বিএসএফের সঙ্গে পতাকা বৈঠক করে এই অবৈধ পুশইনের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী যদি তাদের সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে হস্তান্তর করা হয়, তবেই আমরা নিয়ম মেনে গ্রহণ করবো। অন্যথায় কোনোভাবেই অবৈধ উপায়ে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
প্রশ্ন উঠছে রাষ্ট্র কি শুধু সীমান্ত রক্ষা করবে, নাকি সীমান্তে আটকে পড়া মানুষের জীবন ও মর্যাদারও দায়িত্ব নেবে? দুই দেশের কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে এসব মানুষ যেন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছেন একেকটি জীবন্ত পরিসংখ্যানে।মানবাধিকারকর্মীদের মতে, কোনো মানুষই রাষ্ট্রহীন হতে পারে না। কিন্তু মশালগাঁও সীমান্তের এই ১১ জন যেন বাস্তবতার নির্মম এক উদাহরণ যেখানে দুই দেশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তারা অপেক্ষা করছেন শুধু একটি পরিচয়ের জন্য, একটি নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, দুই রাষ্ট্রের সীমারেখায় অসহায় দাঁড়িয়ে থাকা ১১টি জীবনের দায়িত্ব নেবে কে? মানচিত্রের রেখা কি মানুষের জীবনের চেয়েও বড়?

আপনার মতামত লিখুন