সংবাদ

ভুল সংবাদ নয়, তারা ষড়যন্ত্রে যুক্ত: চিফ প্রসিকিউটর


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম

ভুল সংবাদ নয়, তারা ষড়যন্ত্রে যুক্ত: চিফ প্রসিকিউটর
'শাপলা চত্বর হত্যাযজ্ঞ' মামলায় দীপু মনি ও সাংবাদিক রুপা-মনি গ্রেপ্তার

রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে ‘হত্যাযজ্ঞের’ ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি এবং দুই সাংবাদিক ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবুকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।

চিফ প্রসিকিউটরের দাবি,  এই সাংবাদিকরা নিছক ‘ভুল সংবাদ’ পরিবেশন করেননি, বরং তারা শাপলা চত্বরের হত্যাযজ্ঞ আড়াল করা এবং আগের সরকারকে ‘ফ্যাসিস্ট’ হয়ে উঠতে সহায়তার মতো সুনির্দিষ্ট ষড়যন্ত্রের (কন্সপিরেসি) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) প্রসিকিউশনের আবেদনের শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই তিনজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়। একইসঙ্গে আগামী ৭ জুন তাদের পুনরায় ট্রাইব্যুনালে হাজিরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই দিন মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেছে আদালত।

এর আগে সকালে কারাগার থেকে দীপু মনি, ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবুকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। গত ৭ মে প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের বিরুদ্ধে হাজিরা পরোয়ানা (প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট) জারি করেছিল ট্রাইব্যুনাল।

শুনানিতে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম ট্রাইব্যুনালে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিবরণ তুলে ধরেন। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির বিষয়ে তিনি বলেন, "২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে যখন হত্যাযজ্ঞ চলে, তখন দীপু মনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। ওই ঘটনার পর তিনি আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার করেছিলেন যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা একদল উচ্ছৃঙ্খল মানুষকে নির্মূল করেছে।"

অন্যদিকে দুই সাংবাদিকের ভূমিকা সম্পর্কে প্রসিকিউটর বলেন, "শুরু থেকেই হেফাজতে ইসলামের ওই মহাসমাবেশকে ঘিরে একাত্তর টেলিভিশনের মাধ্যমে সাংবাদিক ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবু উসকানিমূলক বক্তব্য প্রচার করেছিলেন।"

পেশা দেখার সুযোগ নেই: এর আগে আসামিপক্ষের একজন আইনজীবী দাবি করেছিলেন, সাংবাদিকরা কেবল সংবাদ পরিবেশন করেছেন, মামলায় তাদের সম্পৃক্ত থাকার কোনো কারণ নেই। বিষয়টিকে তিনি প্রতিদিনকার ‘মুরগি চুরি’র সঙ্গে তুলনা করে ব্যঙ্গও করেছিলেন।

সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, "মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আসামির পেশা দেখার কোনো সুযোগ নেই।"

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, " অপরাধ করার ক্ষেত্রে কে সাংবাদিক, কে আইনজীবী, কে ডাক্তার—কেউ কোন পেশার সেটা দেখার কোনো সুযোগ নাই। আমরা অপরাধের বিচার করি। কোনো সাংবাদিক যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন, তিনি কি বিচারের আওতায় আসবেন না?"

গ্রেপ্তার সাংবাদিক ফারজানা রুপার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, "তিনি হেফাজতের এই ঘটনার সারারাত সেখানে ছিলেন এবং তিনি বিকৃত সংবাদ প্রচার করেছেন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটাকে তিনি ‘কনসিল’ (গোপন) করেছেন। সারা দেশবাসীর কাছে তিনি ভিন্ন অপপ্রচার করেছেন, এটা কি সাংবাদিকতা?"

‘সমীকরণ’ নামের একটি টিভি প্রতিবেদনের উদাহরণ টেনে আমিনুল ইসলাম বলেন, "প্রাথমিকভাবে আমরা তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ পাচ্ছি। ওই ফুটেজের মধ্যে উনি এমনভাবে তথ্য বিকৃত করেছেন যে, তিনি বলছিলেন সেখানে একজন মানুষেরও হতাহতের ঘটনা ঘটে নাই। অথচ স্পটের মধ্যে আজকে ৩২ জন মানুষের পরিচয় আমরা পেয়েছি।"

কোনো ভুল প্রতিবেদন প্রকাশের দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ হতে পারে কি না—এমন প্রশ্নে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, "ভুল প্রতিবেদনের জন্য আমরা তাকে অভিযুক্ত করিনি। বরঞ্চ অভিযোগটা হলো, তিনি এই পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। শাপলা চত্বরে যে ঘটনাটা ঘটবে, তিনি আগে থেকেই এই টোটাল মেকানিজমের মধ্যে জড়িত ছিলেন। তদন্তে যদি তার কোনো অ্যাবেটমেন্ট (সহায়তা) বা কন্সপিরেসি (ষড়যন্ত্র) না পাওয়া যায়, তিনি বেনিফিট পাবেন।"

রাষ্ট্রকে ‘ফ্যাসিস্ট’ হয়ে উঠতে হলুদ সাংবাদিকরা সহযোগিতা করেছেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, "একটা মানুষ একা একা ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠে না। একটা সরকারকে ফ্যাসিস্ট করার ক্ষেত্রে অনেক সাংবাদিকের তখন ভূমিকা ছিল। যারা হলুদ সাংবাদিকতা করেন, যাদের কারণে আজকে এতগুলো মানুষের হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, আপনারা কি তাদের বিচার চাইবেন না?"

এদিকে প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালকে জানিয়েছে, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশ ঘিরে ঢাকাসহ দেশের চারটি স্থানে ৫৮ জন নিহত হওয়ার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত সংস্থা। এর মধ্যে ঢাকায় ৩২ জন, নারায়ণগঞ্জে ২০ জন, চট্টগ্রামে পাঁচজন এবং কুমিল্লায় একজন নিহতের পরিচয় ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে।

এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে আরও ছয়জন হেভিওয়েট আসামি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন- সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, বরখাস্তকৃত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহিদুল হক, পুলিশের সাবেক উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্যা নজরুল ইসলাম, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল এবং একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬


ভুল সংবাদ নয়, তারা ষড়যন্ত্রে যুক্ত: চিফ প্রসিকিউটর

প্রকাশের তারিখ : ১৪ মে ২০২৬

featured Image

রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে ‘হত্যাযজ্ঞের’ ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি এবং দুই সাংবাদিক ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবুকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।

চিফ প্রসিকিউটরের দাবি,  এই সাংবাদিকরা নিছক ‘ভুল সংবাদ’ পরিবেশন করেননি, বরং তারা শাপলা চত্বরের হত্যাযজ্ঞ আড়াল করা এবং আগের সরকারকে ‘ফ্যাসিস্ট’ হয়ে উঠতে সহায়তার মতো সুনির্দিষ্ট ষড়যন্ত্রের (কন্সপিরেসি) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) প্রসিকিউশনের আবেদনের শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই তিনজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়। একইসঙ্গে আগামী ৭ জুন তাদের পুনরায় ট্রাইব্যুনালে হাজিরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই দিন মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেছে আদালত।

এর আগে সকালে কারাগার থেকে দীপু মনি, ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবুকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। গত ৭ মে প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের বিরুদ্ধে হাজিরা পরোয়ানা (প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট) জারি করেছিল ট্রাইব্যুনাল।

শুনানিতে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম ট্রাইব্যুনালে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিবরণ তুলে ধরেন। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির বিষয়ে তিনি বলেন, "২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে যখন হত্যাযজ্ঞ চলে, তখন দীপু মনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। ওই ঘটনার পর তিনি আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার করেছিলেন যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা একদল উচ্ছৃঙ্খল মানুষকে নির্মূল করেছে।"

অন্যদিকে দুই সাংবাদিকের ভূমিকা সম্পর্কে প্রসিকিউটর বলেন, "শুরু থেকেই হেফাজতে ইসলামের ওই মহাসমাবেশকে ঘিরে একাত্তর টেলিভিশনের মাধ্যমে সাংবাদিক ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবু উসকানিমূলক বক্তব্য প্রচার করেছিলেন।"

পেশা দেখার সুযোগ নেই: এর আগে আসামিপক্ষের একজন আইনজীবী দাবি করেছিলেন, সাংবাদিকরা কেবল সংবাদ পরিবেশন করেছেন, মামলায় তাদের সম্পৃক্ত থাকার কোনো কারণ নেই। বিষয়টিকে তিনি প্রতিদিনকার ‘মুরগি চুরি’র সঙ্গে তুলনা করে ব্যঙ্গও করেছিলেন।

সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, "মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আসামির পেশা দেখার কোনো সুযোগ নেই।"

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, " অপরাধ করার ক্ষেত্রে কে সাংবাদিক, কে আইনজীবী, কে ডাক্তার—কেউ কোন পেশার সেটা দেখার কোনো সুযোগ নাই। আমরা অপরাধের বিচার করি। কোনো সাংবাদিক যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন, তিনি কি বিচারের আওতায় আসবেন না?"

গ্রেপ্তার সাংবাদিক ফারজানা রুপার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, "তিনি হেফাজতের এই ঘটনার সারারাত সেখানে ছিলেন এবং তিনি বিকৃত সংবাদ প্রচার করেছেন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটাকে তিনি ‘কনসিল’ (গোপন) করেছেন। সারা দেশবাসীর কাছে তিনি ভিন্ন অপপ্রচার করেছেন, এটা কি সাংবাদিকতা?"

‘সমীকরণ’ নামের একটি টিভি প্রতিবেদনের উদাহরণ টেনে আমিনুল ইসলাম বলেন, "প্রাথমিকভাবে আমরা তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ পাচ্ছি। ওই ফুটেজের মধ্যে উনি এমনভাবে তথ্য বিকৃত করেছেন যে, তিনি বলছিলেন সেখানে একজন মানুষেরও হতাহতের ঘটনা ঘটে নাই। অথচ স্পটের মধ্যে আজকে ৩২ জন মানুষের পরিচয় আমরা পেয়েছি।"

কোনো ভুল প্রতিবেদন প্রকাশের দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ হতে পারে কি না—এমন প্রশ্নে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, "ভুল প্রতিবেদনের জন্য আমরা তাকে অভিযুক্ত করিনি। বরঞ্চ অভিযোগটা হলো, তিনি এই পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। শাপলা চত্বরে যে ঘটনাটা ঘটবে, তিনি আগে থেকেই এই টোটাল মেকানিজমের মধ্যে জড়িত ছিলেন। তদন্তে যদি তার কোনো অ্যাবেটমেন্ট (সহায়তা) বা কন্সপিরেসি (ষড়যন্ত্র) না পাওয়া যায়, তিনি বেনিফিট পাবেন।"

রাষ্ট্রকে ‘ফ্যাসিস্ট’ হয়ে উঠতে হলুদ সাংবাদিকরা সহযোগিতা করেছেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, "একটা মানুষ একা একা ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠে না। একটা সরকারকে ফ্যাসিস্ট করার ক্ষেত্রে অনেক সাংবাদিকের তখন ভূমিকা ছিল। যারা হলুদ সাংবাদিকতা করেন, যাদের কারণে আজকে এতগুলো মানুষের হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, আপনারা কি তাদের বিচার চাইবেন না?"

এদিকে প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালকে জানিয়েছে, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশ ঘিরে ঢাকাসহ দেশের চারটি স্থানে ৫৮ জন নিহত হওয়ার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত সংস্থা। এর মধ্যে ঢাকায় ৩২ জন, নারায়ণগঞ্জে ২০ জন, চট্টগ্রামে পাঁচজন এবং কুমিল্লায় একজন নিহতের পরিচয় ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে।

এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে আরও ছয়জন হেভিওয়েট আসামি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন- সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, বরখাস্তকৃত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহিদুল হক, পুলিশের সাবেক উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্যা নজরুল ইসলাম, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল এবং একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত