সংবাদ

৪ হাজার বছর আগেই ছিল ঢাকার চেয়ে উন্নত ‘স্মার্ট সিটি’!


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম

৪ হাজার বছর আগেই ছিল ঢাকার চেয়ে উন্নত ‘স্মার্ট সিটি’!
ডিজিটাল তুলিতে সিন্ধু সভ্যতার স্মার্ট সিটি।

ভাবা যায়, আজ থেকে ৪ হাজার বছর আগেও ছিল স্মার্ট সিটি! আধুনিক মেগাসিটিকেও টেক্কা দেওয়ার মতো সব উপকরণই ছিল সেখানে।আজকের ঢাকা, টোকিও কিংবা নিউ ইয়র্কের অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ নিয়ে যতটা মাথাব্যথা করি, হাজার বছর আগের সেই স্মার্ট নিয়ে মানুষ ততটা ভাবতেনই না। কারণ হাজার হাজার বছর আগেই তারা গড়ে তুলেছিলেন নিখুঁত নগর পরিকল্পনা। যাকে আজকের ভাষায় আমরা বলছি ‘স্মার্ট সিটি’।

হ্যাঁ, সত্যিই হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো, লোথাল- এসব প্রাচীন নগরী কেবল খননকার্যের স্তূপ নয়; বরং সেগুলো পৃথিবীর প্রথম পরিকল্পিত নগরায়ণের অনন্য দৃষ্টান্ত। যেখানে ছিল চওড়া সড়ক, বহুতল বাড়ি, পয়ঃনিষ্কাশনের চমৎকার ব্যবস্থা। তাও আবার ঢাকা দেওয়া ড্রেনেজ সিস্টেম। এমন পরিকল্পনা আজকের অনেক আধুনিক নগরীতেও নেই।

ভাগাড়ে ছিল না আবর্জনা: মহেঞ্জোদারো খনন করে প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রথম যে বিষয়টি দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন, তা হলো সড়কের গ্রিড প্যাটার্ন। উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিমে সোজা রাস্তা, পরস্পরকে লম্বভাবে ছেদ করেছে। রাস্তাগুলো ছিল অত্যন্ত চওড়া। যেখানে আজকের লরি বা ট্রাকও অনায়াসে চলতে পারতো। এ ছাড়া রাস্তার ধারে স্থাপিত ছিল আচ্ছাদিত নর্দমা। প্রতি বাড়ি থেকে আবর্জনা ও বর্জ্য এই নর্দমার মাধ্যমে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে যেত। এই ব্যবস্থা আজকের ঢাকার চেয়ে কয়েকগুণ উন্নত ছিল। বর্ষাকালে আমরা যেখানে ড্রেনের পানিতে হাঁটু পর্যন্ত ডুবে থাকি, সেখানে ৪ হাজার বছর আগে সিন্ধুর মানুষেরা শুকনো পায়ে হাঁটতেন।

 পরিকল্পিত নগরীর ধারণা চিত্র

বিশ্বের প্রথম ঢাকনা দেওয়া ড্রেনেজ সিস্টেম: বিশেষজ্ঞদের মতে, সিন্ধু সভ্যতার ড্রেনেজ ব্যবস্থা ছিল বিশ্বের প্রথম ঢাকনা দেওয়া নিষ্কাশন ব্যবস্থা। পোড়ামাটির তৈরি পাইপ ও ইটের নর্দমা, তার ওপর ঢাকনা। প্রতি বাড়ি থেকে এই নর্দমার সঙ্গে সংযোগ দেওয়া থাকতো। এমনকি গোসল ও রান্নাঘরের পানি বেরিয়ে যাওয়ার জন্য আলাদা ব্যবস্থা ছিল। প্রতিটি বাড়িতে ছিল ওয়েল রুম ও বাথরুম- যার সুযোগ আজও গ্রামীণ বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ পান না।

বহুতল বাড়ি, কারুকাজ: সিন্ধু সভ্যতার নগরগুলোতে পোড়া ইটের ব্যবহার ছিল ব্যাপক। প্রতিটি ইট ছিল অভিন্ন মাপের- যা প্রমাণ করে কেন্দ্রীয়ভাবে নকশা তৈরি হতো। আবিষ্কৃত ধ্বংসাবশেষে মিলেছে দ্বিতল, তৃতীয়তল ও অনুমিতভাবে চারতলা পর্যন্ত ভবনের চিহ্ন। এসব বাড়িতে ছিল প্রশস্ত উঠান, কূপ, ওয়েলরুম ও রান্নাঘর। গরিব-ধনীর ভেদ ছিল বাড়ির আকারে। তবে নির্মাণশৈলিতে নয়। অর্থাৎ, সবাই পেতেন সমান নাগরিক সুবিধা।

স্মার্টসিটির আজকের রূপ

যুদ্ধাস্ত্র বিহীন রাজপ্রাসাদ: সিন্ধু সভ্যতা নিয়ে সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো- এখনো পর্যন্ত কোনো রাজপ্রাসাদ বা মন্দিরের সন্ধান মেলেনি। এমনকি যুদ্ধাস্ত্র বলতে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। কয়েকটি তীরচিহ্ন বা ছুরির মতো নিদর্শন পাওয়া গেলেও সেগুলো প্রতিরক্ষামূলক। অর্থাৎ, এই সভ্যতার মানুষ হয়তো কোনো রাজা বা সম্রাট ছাড়াই চলতো। বুদ্ধিজীবীদের একাংশ মনে করেন, তারা পরিচালিত হতেন একটি অভিজাত কাউন্সিল বা ব্যবসায়ী নেতাদের মাধ্যমে। এত সুশৃঙ্খল একটি সমাজ- যেখানে অপরাধের প্রমাণ নেই, যুদ্ধের চিহ্ন নেই, সেনাবাহিনী নেই- সেটি কল্পনার বাইরে।

বিশ্বের প্রথম বন্দরনগরী: আধুনিক বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর গড়ে ওঠার অনেক আগেই গুজরাটের লোথালে গড়ে উঠেছিল বিশ্বের প্রথম বন্দরনগরী। প্রত্নতাত্ত্বিকরা সেখানে একটি বিশাল ডকইয়ার্ড আবিষ্কার করেছেন। এই ডকইয়ার্ডে জোয়ারের সময় নৌকা আসতো। আবার ভাটার সময় পানি চলে যেত। সেখানে ছিল শস্য সংরক্ষণের বিশাল ভাঁড়ারঘর। অর্থাৎ, সিন্ধুরা ছিল সামুদ্রিক বাণিজ্যে পারদর্শী। মেসোপটেমিয়া (বর্তমান ইরাক) পর্যন্ত তাদের বাণিজ্য বিস্তৃত ছিল বলে প্রমাণ মিলেছে।

খননে বেরিয়ে আসা নগরীর চিত্র

স্মার্টনেসের রহস্য: গবেষকরা বলেন, সিন্ধু সভ্যতার স্মার্টনেসের রহস্য হলো- দূরদর্শিতা ও গণজীবনের প্রতি যত্ন। প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে প্রশাসন বদ্ধমূল ছিল। প্রাচীন পৃথিবীর অন্য সব সভ্যতা যেখানে রাজপ্রাসাদ বা মন্দিরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল, সেখানে সিন্ধু সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল জনগণ। আমরা আজ যতই স্মার্ট সিটি নিয়ে স্বপ্ন দেখি, সিন্ধুরা তা হাজার বছর আগেই বাস্তবায়ন করেছিল।

খ্রিষ্টপূর্ব ১৯০০ সালের দিকে রহস্যজনক কারণে সেই স্মার্ট সিটির সভ্যতা বিলীন হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নদী প্রবাহের পরিবর্তন, খরা কিংবা বন্যার মতো আরও অনেক কারণে সভ্যতা বিলীন হয়ে গেছে।তারপরও আমরা যখন ঢাকা নগরীর ড্রেনের দুর্গন্ধে নাক ঢাকি, ইট-পাথরের শোভা ও সুশৃঙ্খল সড়কের জন্য ই-মেইল করি নগরপরিকল্পনাবিদদের কাছে তখন তারা ফিরে তাকান সিন্ধু সভ্যতার সেই স্মার্ট সিটির বিস্ময়কর পরিকল্পনার দিকে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬


৪ হাজার বছর আগেই ছিল ঢাকার চেয়ে উন্নত ‘স্মার্ট সিটি’!

প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬

featured Image

ভাবা যায়, আজ থেকে ৪ হাজার বছর আগেও ছিল স্মার্ট সিটি! আধুনিক মেগাসিটিকেও টেক্কা দেওয়ার মতো সব উপকরণই ছিল সেখানে।আজকের ঢাকা, টোকিও কিংবা নিউ ইয়র্কের অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ নিয়ে যতটা মাথাব্যথা করি, হাজার বছর আগের সেই স্মার্ট নিয়ে মানুষ ততটা ভাবতেনই না। কারণ হাজার হাজার বছর আগেই তারা গড়ে তুলেছিলেন নিখুঁত নগর পরিকল্পনা। যাকে আজকের ভাষায় আমরা বলছি ‘স্মার্ট সিটি’।

হ্যাঁ, সত্যিই হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো, লোথাল- এসব প্রাচীন নগরী কেবল খননকার্যের স্তূপ নয়; বরং সেগুলো পৃথিবীর প্রথম পরিকল্পিত নগরায়ণের অনন্য দৃষ্টান্ত। যেখানে ছিল চওড়া সড়ক, বহুতল বাড়ি, পয়ঃনিষ্কাশনের চমৎকার ব্যবস্থা। তাও আবার ঢাকা দেওয়া ড্রেনেজ সিস্টেম। এমন পরিকল্পনা আজকের অনেক আধুনিক নগরীতেও নেই।

ভাগাড়ে ছিল না আবর্জনা: মহেঞ্জোদারো খনন করে প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রথম যে বিষয়টি দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন, তা হলো সড়কের গ্রিড প্যাটার্ন। উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিমে সোজা রাস্তা, পরস্পরকে লম্বভাবে ছেদ করেছে। রাস্তাগুলো ছিল অত্যন্ত চওড়া। যেখানে আজকের লরি বা ট্রাকও অনায়াসে চলতে পারতো। এ ছাড়া রাস্তার ধারে স্থাপিত ছিল আচ্ছাদিত নর্দমা। প্রতি বাড়ি থেকে আবর্জনা ও বর্জ্য এই নর্দমার মাধ্যমে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে যেত। এই ব্যবস্থা আজকের ঢাকার চেয়ে কয়েকগুণ উন্নত ছিল। বর্ষাকালে আমরা যেখানে ড্রেনের পানিতে হাঁটু পর্যন্ত ডুবে থাকি, সেখানে ৪ হাজার বছর আগে সিন্ধুর মানুষেরা শুকনো পায়ে হাঁটতেন।

 পরিকল্পিত নগরীর ধারণা চিত্র

বিশ্বের প্রথম ঢাকনা দেওয়া ড্রেনেজ সিস্টেম: বিশেষজ্ঞদের মতে, সিন্ধু সভ্যতার ড্রেনেজ ব্যবস্থা ছিল বিশ্বের প্রথম ঢাকনা দেওয়া নিষ্কাশন ব্যবস্থা। পোড়ামাটির তৈরি পাইপ ও ইটের নর্দমা, তার ওপর ঢাকনা। প্রতি বাড়ি থেকে এই নর্দমার সঙ্গে সংযোগ দেওয়া থাকতো। এমনকি গোসল ও রান্নাঘরের পানি বেরিয়ে যাওয়ার জন্য আলাদা ব্যবস্থা ছিল। প্রতিটি বাড়িতে ছিল ওয়েল রুম ও বাথরুম- যার সুযোগ আজও গ্রামীণ বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ পান না।

বহুতল বাড়ি, কারুকাজ: সিন্ধু সভ্যতার নগরগুলোতে পোড়া ইটের ব্যবহার ছিল ব্যাপক। প্রতিটি ইট ছিল অভিন্ন মাপের- যা প্রমাণ করে কেন্দ্রীয়ভাবে নকশা তৈরি হতো। আবিষ্কৃত ধ্বংসাবশেষে মিলেছে দ্বিতল, তৃতীয়তল ও অনুমিতভাবে চারতলা পর্যন্ত ভবনের চিহ্ন। এসব বাড়িতে ছিল প্রশস্ত উঠান, কূপ, ওয়েলরুম ও রান্নাঘর। গরিব-ধনীর ভেদ ছিল বাড়ির আকারে। তবে নির্মাণশৈলিতে নয়। অর্থাৎ, সবাই পেতেন সমান নাগরিক সুবিধা।

স্মার্টসিটির আজকের রূপ

যুদ্ধাস্ত্র বিহীন রাজপ্রাসাদ: সিন্ধু সভ্যতা নিয়ে সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো- এখনো পর্যন্ত কোনো রাজপ্রাসাদ বা মন্দিরের সন্ধান মেলেনি। এমনকি যুদ্ধাস্ত্র বলতে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। কয়েকটি তীরচিহ্ন বা ছুরির মতো নিদর্শন পাওয়া গেলেও সেগুলো প্রতিরক্ষামূলক। অর্থাৎ, এই সভ্যতার মানুষ হয়তো কোনো রাজা বা সম্রাট ছাড়াই চলতো। বুদ্ধিজীবীদের একাংশ মনে করেন, তারা পরিচালিত হতেন একটি অভিজাত কাউন্সিল বা ব্যবসায়ী নেতাদের মাধ্যমে। এত সুশৃঙ্খল একটি সমাজ- যেখানে অপরাধের প্রমাণ নেই, যুদ্ধের চিহ্ন নেই, সেনাবাহিনী নেই- সেটি কল্পনার বাইরে।

বিশ্বের প্রথম বন্দরনগরী: আধুনিক বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর গড়ে ওঠার অনেক আগেই গুজরাটের লোথালে গড়ে উঠেছিল বিশ্বের প্রথম বন্দরনগরী। প্রত্নতাত্ত্বিকরা সেখানে একটি বিশাল ডকইয়ার্ড আবিষ্কার করেছেন। এই ডকইয়ার্ডে জোয়ারের সময় নৌকা আসতো। আবার ভাটার সময় পানি চলে যেত। সেখানে ছিল শস্য সংরক্ষণের বিশাল ভাঁড়ারঘর। অর্থাৎ, সিন্ধুরা ছিল সামুদ্রিক বাণিজ্যে পারদর্শী। মেসোপটেমিয়া (বর্তমান ইরাক) পর্যন্ত তাদের বাণিজ্য বিস্তৃত ছিল বলে প্রমাণ মিলেছে।

খননে বেরিয়ে আসা নগরীর চিত্র

স্মার্টনেসের রহস্য: গবেষকরা বলেন, সিন্ধু সভ্যতার স্মার্টনেসের রহস্য হলো- দূরদর্শিতা ও গণজীবনের প্রতি যত্ন। প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে প্রশাসন বদ্ধমূল ছিল। প্রাচীন পৃথিবীর অন্য সব সভ্যতা যেখানে রাজপ্রাসাদ বা মন্দিরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল, সেখানে সিন্ধু সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল জনগণ। আমরা আজ যতই স্মার্ট সিটি নিয়ে স্বপ্ন দেখি, সিন্ধুরা তা হাজার বছর আগেই বাস্তবায়ন করেছিল।

খ্রিষ্টপূর্ব ১৯০০ সালের দিকে রহস্যজনক কারণে সেই স্মার্ট সিটির সভ্যতা বিলীন হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নদী প্রবাহের পরিবর্তন, খরা কিংবা বন্যার মতো আরও অনেক কারণে সভ্যতা বিলীন হয়ে গেছে।তারপরও আমরা যখন ঢাকা নগরীর ড্রেনের দুর্গন্ধে নাক ঢাকি, ইট-পাথরের শোভা ও সুশৃঙ্খল সড়কের জন্য ই-মেইল করি নগরপরিকল্পনাবিদদের কাছে তখন তারা ফিরে তাকান সিন্ধু সভ্যতার সেই স্মার্ট সিটির বিস্ময়কর পরিকল্পনার দিকে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত