সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা সত্ত্বেও জাতিসংঘে জলবায়ু প্রস্তাব পাস


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ১০:৩৭ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা সত্ত্বেও জাতিসংঘে জলবায়ু প্রস্তাব পাস

যুক্তরাষ্ট্রের চরম বিরোধিতা ও জোর কূটনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রগুলোর আইনি দায়বদ্ধতার একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাস হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) দেওয়া সাম্প্রতিক পরামর্শমূলক মতামতের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আনা এই প্রস্তাবটি ১৪১-৮ ভোটে বড় ব্যবধানে গৃহীত হয়।

​বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ কার্বন নিঃসরণকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ মোট ৮টি দেশ এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

​প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতুর উত্থাপিত এই প্রস্তাবে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বের সব রাষ্ট্রের সুস্পষ্ট আইনি দায়িত্ব রয়েছে।

​পক্ষে ভোট (১৪১টি দেশ): অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যসহ ১৪১টি দেশ।

​বিপক্ষে ভোট (৮টি দেশ): যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, রাশিয়া, ইসরাইল, ইরান, ইয়েমেন, লাইবেরিয়া ও বেলারুশ।

​ভোটদানে বিরত: ভারত, তুরস্ক, কাতার ও নাইজেরিয়াসহ কয়েকটি দেশ।

​এর আগে ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত ইউএনএফসিসিসি জলবায়ু আলোচনায় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়। এমনকি সৌদি আরব এই বিষয়টিকে চূড়ান্ত নথিতে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে তীব্র আপত্তি জানিয়ে এটিকে "লাল রেখা" (Red Line) হিসেবে উল্লেখ করেছিল।

​উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এক পরামর্শমূলক মতামতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে রাষ্ট্রগুলোর প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছিল। যদিও আইসিজের এই মতামত বাধ্যতামূলক নয়, তবে এটি বিশ্বজুড়ে চলমান বিভিন্ন জলবায়ু মামলায় গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

​ভোটের পর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন: ​"সাধারণ পরিষদের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইন, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং জলবায়ু সংকট থেকে মানুষকে রক্ষায় রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্বের একটি শক্তিশালী স্বীকৃতি।"

​অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস জলবায়ু চুক্তিসহ একাধিক পরিবেশবিষয়ক চুক্তি থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার এবং জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর পক্ষে কাজ করছে। জাতিসংঘে মার্কিন উপরাষ্ট্রদূত ট্যামি ব্রুস দাবি করেন, এই প্রস্তাবে জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে "অনুপযুক্ত রাজনৈতিক দাবি" করা হয়েছে, যার কোনো যৌক্তিকতা ওয়াশিংটন দেখছে না।

​এর আগে, ফেব্রুয়ারি মাসেই অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছিল যে, প্রস্তাবটি রুখে দিতে ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন দেশের ওপর তীব্র কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছিল।

​ভোটের আগে জাতিসংঘে ভানুয়াতুর রাষ্ট্রদূত ওদো তেভি বলেন, খরা, ফসলহানি ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বহু দ্বীপ ও উপকূলীয় অঞ্চল ইতোমধ্যে চরম হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়, এটি বর্তমানের বাস্তব নির্মম সত্য। ভানুয়াতুর জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী রালফ রেগেনভানু বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আইনের শাসনের প্রতি সবাইকে দায়বদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

​জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত ভয়াবহ:

​তুভালু: দেশটির গড় উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২ মিটার। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, ২১০০ সালের মধ্যে দেশটির বেশিরভাগ অংশ সাগরে তলিয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে দেশের এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ অস্ট্রেলিয়ার বিশেষ জলবায়ু অভিবাসন ভিসার জন্য আবেদন করেছেন।

​নাউরু: জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা এবং ভবিষ্যতে নাগরিকদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য তহবিল গঠনে নাউরু সরকার ধনী বিদেশিদের কাছে পাসপোর্ট বিক্রি করার মতো ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে।

​২০১৫ সালের ঐতিহাসিক প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নিয়ে "ওয়ান পয়েন্ট ফাইভ টু স্টে অ্যালাইভ" স্লোগানটি জনপ্রিয় হয়েছিল। তবে বিজ্ঞানীরা এখন প্রতিনিয়ত সতর্ক করছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই নিরাপদ সীমা অতিক্রম করে যাওয়ার ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬


যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা সত্ত্বেও জাতিসংঘে জলবায়ু প্রস্তাব পাস

প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬

featured Image

যুক্তরাষ্ট্রের চরম বিরোধিতা ও জোর কূটনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রগুলোর আইনি দায়বদ্ধতার একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাস হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) দেওয়া সাম্প্রতিক পরামর্শমূলক মতামতের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আনা এই প্রস্তাবটি ১৪১-৮ ভোটে বড় ব্যবধানে গৃহীত হয়।

​বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ কার্বন নিঃসরণকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ মোট ৮টি দেশ এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

​প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতুর উত্থাপিত এই প্রস্তাবে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বের সব রাষ্ট্রের সুস্পষ্ট আইনি দায়িত্ব রয়েছে।

​পক্ষে ভোট (১৪১টি দেশ): অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যসহ ১৪১টি দেশ।

​বিপক্ষে ভোট (৮টি দেশ): যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, রাশিয়া, ইসরাইল, ইরান, ইয়েমেন, লাইবেরিয়া ও বেলারুশ।

​ভোটদানে বিরত: ভারত, তুরস্ক, কাতার ও নাইজেরিয়াসহ কয়েকটি দেশ।

​এর আগে ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত ইউএনএফসিসিসি জলবায়ু আলোচনায় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়। এমনকি সৌদি আরব এই বিষয়টিকে চূড়ান্ত নথিতে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে তীব্র আপত্তি জানিয়ে এটিকে "লাল রেখা" (Red Line) হিসেবে উল্লেখ করেছিল।

​উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এক পরামর্শমূলক মতামতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে রাষ্ট্রগুলোর প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছিল। যদিও আইসিজের এই মতামত বাধ্যতামূলক নয়, তবে এটি বিশ্বজুড়ে চলমান বিভিন্ন জলবায়ু মামলায় গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

​ভোটের পর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন: ​"সাধারণ পরিষদের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইন, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং জলবায়ু সংকট থেকে মানুষকে রক্ষায় রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্বের একটি শক্তিশালী স্বীকৃতি।"

​অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস জলবায়ু চুক্তিসহ একাধিক পরিবেশবিষয়ক চুক্তি থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার এবং জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর পক্ষে কাজ করছে। জাতিসংঘে মার্কিন উপরাষ্ট্রদূত ট্যামি ব্রুস দাবি করেন, এই প্রস্তাবে জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে "অনুপযুক্ত রাজনৈতিক দাবি" করা হয়েছে, যার কোনো যৌক্তিকতা ওয়াশিংটন দেখছে না।

​এর আগে, ফেব্রুয়ারি মাসেই অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছিল যে, প্রস্তাবটি রুখে দিতে ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন দেশের ওপর তীব্র কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছিল।

​ভোটের আগে জাতিসংঘে ভানুয়াতুর রাষ্ট্রদূত ওদো তেভি বলেন, খরা, ফসলহানি ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বহু দ্বীপ ও উপকূলীয় অঞ্চল ইতোমধ্যে চরম হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়, এটি বর্তমানের বাস্তব নির্মম সত্য। ভানুয়াতুর জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী রালফ রেগেনভানু বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আইনের শাসনের প্রতি সবাইকে দায়বদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

​জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত ভয়াবহ:

​তুভালু: দেশটির গড় উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২ মিটার। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, ২১০০ সালের মধ্যে দেশটির বেশিরভাগ অংশ সাগরে তলিয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে দেশের এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ অস্ট্রেলিয়ার বিশেষ জলবায়ু অভিবাসন ভিসার জন্য আবেদন করেছেন।

​নাউরু: জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা এবং ভবিষ্যতে নাগরিকদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য তহবিল গঠনে নাউরু সরকার ধনী বিদেশিদের কাছে পাসপোর্ট বিক্রি করার মতো ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে।

​২০১৫ সালের ঐতিহাসিক প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নিয়ে "ওয়ান পয়েন্ট ফাইভ টু স্টে অ্যালাইভ" স্লোগানটি জনপ্রিয় হয়েছিল। তবে বিজ্ঞানীরা এখন প্রতিনিয়ত সতর্ক করছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই নিরাপদ সীমা অতিক্রম করে যাওয়ার ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত