ব্রিটিশ আমলে নির্মিত সিলেট-আখাউড়া রেলপথ একসময় ছিল পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র। পাহাড়, চা-বাগান আর সবুজ বনাঞ্চল পেরিয়ে চলা এই পথ এখনও দেশের গুরুত্বপূর্ণ যাত্রী ও পর্যটন রুট। কিন্তু শতবর্ষ পেরোনো এই লাইনের বর্তমান চিত্র যেন এক চলমান ঝুঁকির গল্প। জরাজীর্ণ রেললাইন, পুরোনো ইঞ্জিন, ঝুঁকিপূর্ণ সেতু, ট্রেন সংকট ও ঘনঘন যান্ত্রিক ত্রুটিতে প্রতিদিন দুর্ভোগ বাড়ছে। যাত্রীদের কাছে এই রুট এখন ‘আতঙ্কের যাত্রা’।
শুধু মার্চ ও এপ্রিল মাসেই একের পর এক দুর্ঘটনা পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক করেছে। গত ২৬ মার্চ ভৈরব বাজার জংশনে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়। চার দিন পর মৌলভীবাজারের ভানুগাছ-শমশেরনগর এলাকায় উপবন এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল হয় মাঝপথে। এরপর গত ১ এপ্রিল কুমিল্লায় উদয়ন এক্সপ্রেসের তিনটি বগি বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে চলে যায়। তার পরদিন ২ এপ্রিল হবিগঞ্জের মনতলায় তেলবাহী ট্রেনের পাঁচটি ওয়াগন লাইনচ্যুত হয়ে প্রায় ১৪ ঘণ্টা বন্ধ ছিল রেল যোগাযোগ।
১৮৯৮ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে আসাম ও চট্টগ্রামের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করতে নির্মিত হয় এই রেললাইন। সেই অবকাঠামোর বড় অংশ এখনও আধুনিকায়নের বাইরে। বিশেষ করে লাউয়াছড়া বনাঞ্চলসংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় পুরোনো ইঞ্জিনগুলো প্রায়ই বিকল হয়। রেল সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২৬১০ ও ২৯০২ নম্বরসহ বেশ কয়েকটি পুরোনো ইঞ্জিন এই রুটে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাহাড়ি ঢালে উঠতে গিয়ে এসব ইঞ্জিন মাঝপথে থেমে যায়, ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে ট্রেন।
বর্তমানে সিলেট-ঢাকা ও সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে প্রতিদিন ছয়টি আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে। প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার যাত্রী এই পথে যাতায়াত করেন। যাত্রীসংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি নিরাপদ অবকাঠামো বা আধুনিক সেবা।
টিকিট সংকট ও ট্রেনের স্বল্পতা যাত্রীদের নিত্যদিনের অভিযোগ। বিশেষ করে ছুটির দিন, ঈদ বা পর্যটন মৌসুমে এই সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। সিলেট-ময়মনসিংহ রুটে আন্তঃনগর ট্রেন চালুর দাবি বহু বছরের। বিগত সরকারের আমলেও আশ্বাস দিয়েছিলেন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা, কিন্তু আজ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী সড়কপথে ঘুরপথে দীর্ঘ সময় ব্যয় করে যাতায়াত করছেন।
এছাড়া এই রেলপথে অন্তত ১০টি সেতু ঝুঁকিপূর্ণ। নিরাপত্তায় এসব সেতুতে ট্রেনের গতি কমিয়ে চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রেললাইনের নাট-বল্টু ও ক্লিপ চুরির ঘটনা বাড়ছে। তীব্র গরমে লাইন বাঁকা হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) আহমেদ মাহবুব চৌধুরী বলেন, ঈদের পর থেকে ইঞ্জিন বিকলের সমস্যা বেড়েছে, কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান জানান, প্রয়োজনীয় ইঞ্জিনের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে উন্নতি হতে পারে বলে আশা করেন তিনি।
শতবর্ষী এই রেলপথ লাখো মানুষের দৈনন্দিন জীবন, অর্থনীতি ও পর্যটনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। কিন্তু বছরের পর বছর অবহেলা, ট্রেন সংকট ও আধুনিকায়নের অভাবে ভোগান্তি যেন স্থায়ী রূপ নিয়েছে। নিরাপদ, আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য রেলসেবার দাবি ভুক্তভোগী যাত্রীদের।

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬
ব্রিটিশ আমলে নির্মিত সিলেট-আখাউড়া রেলপথ একসময় ছিল পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র। পাহাড়, চা-বাগান আর সবুজ বনাঞ্চল পেরিয়ে চলা এই পথ এখনও দেশের গুরুত্বপূর্ণ যাত্রী ও পর্যটন রুট। কিন্তু শতবর্ষ পেরোনো এই লাইনের বর্তমান চিত্র যেন এক চলমান ঝুঁকির গল্প। জরাজীর্ণ রেললাইন, পুরোনো ইঞ্জিন, ঝুঁকিপূর্ণ সেতু, ট্রেন সংকট ও ঘনঘন যান্ত্রিক ত্রুটিতে প্রতিদিন দুর্ভোগ বাড়ছে। যাত্রীদের কাছে এই রুট এখন ‘আতঙ্কের যাত্রা’।
শুধু মার্চ ও এপ্রিল মাসেই একের পর এক দুর্ঘটনা পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক করেছে। গত ২৬ মার্চ ভৈরব বাজার জংশনে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়। চার দিন পর মৌলভীবাজারের ভানুগাছ-শমশেরনগর এলাকায় উপবন এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল হয় মাঝপথে। এরপর গত ১ এপ্রিল কুমিল্লায় উদয়ন এক্সপ্রেসের তিনটি বগি বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে চলে যায়। তার পরদিন ২ এপ্রিল হবিগঞ্জের মনতলায় তেলবাহী ট্রেনের পাঁচটি ওয়াগন লাইনচ্যুত হয়ে প্রায় ১৪ ঘণ্টা বন্ধ ছিল রেল যোগাযোগ।
১৮৯৮ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে আসাম ও চট্টগ্রামের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করতে নির্মিত হয় এই রেললাইন। সেই অবকাঠামোর বড় অংশ এখনও আধুনিকায়নের বাইরে। বিশেষ করে লাউয়াছড়া বনাঞ্চলসংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় পুরোনো ইঞ্জিনগুলো প্রায়ই বিকল হয়। রেল সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২৬১০ ও ২৯০২ নম্বরসহ বেশ কয়েকটি পুরোনো ইঞ্জিন এই রুটে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাহাড়ি ঢালে উঠতে গিয়ে এসব ইঞ্জিন মাঝপথে থেমে যায়, ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে ট্রেন।
বর্তমানে সিলেট-ঢাকা ও সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে প্রতিদিন ছয়টি আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে। প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার যাত্রী এই পথে যাতায়াত করেন। যাত্রীসংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি নিরাপদ অবকাঠামো বা আধুনিক সেবা।
টিকিট সংকট ও ট্রেনের স্বল্পতা যাত্রীদের নিত্যদিনের অভিযোগ। বিশেষ করে ছুটির দিন, ঈদ বা পর্যটন মৌসুমে এই সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। সিলেট-ময়মনসিংহ রুটে আন্তঃনগর ট্রেন চালুর দাবি বহু বছরের। বিগত সরকারের আমলেও আশ্বাস দিয়েছিলেন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা, কিন্তু আজ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী সড়কপথে ঘুরপথে দীর্ঘ সময় ব্যয় করে যাতায়াত করছেন।
এছাড়া এই রেলপথে অন্তত ১০টি সেতু ঝুঁকিপূর্ণ। নিরাপত্তায় এসব সেতুতে ট্রেনের গতি কমিয়ে চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রেললাইনের নাট-বল্টু ও ক্লিপ চুরির ঘটনা বাড়ছে। তীব্র গরমে লাইন বাঁকা হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) আহমেদ মাহবুব চৌধুরী বলেন, ঈদের পর থেকে ইঞ্জিন বিকলের সমস্যা বেড়েছে, কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান জানান, প্রয়োজনীয় ইঞ্জিনের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে উন্নতি হতে পারে বলে আশা করেন তিনি।
শতবর্ষী এই রেলপথ লাখো মানুষের দৈনন্দিন জীবন, অর্থনীতি ও পর্যটনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। কিন্তু বছরের পর বছর অবহেলা, ট্রেন সংকট ও আধুনিকায়নের অভাবে ভোগান্তি যেন স্থায়ী রূপ নিয়েছে। নিরাপদ, আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য রেলসেবার দাবি ভুক্তভোগী যাত্রীদের।

আপনার মতামত লিখুন