ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশ ধরায় আইনি বাধা নেই। কিন্তু বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা। আর এই নিষেধাজ্ঞা সাধারণ জেলেদের জন্য চরম সংকটের হলেও প্রভাবশালী এক ইলিশ সিন্ডিকেটের কাছে তা যেন ‘আশীর্বাদ’। নদীর মাছের বৈধ পরিবহন ছাড়পত্র ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সাগরের নিষিদ্ধ ইলিশ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাচার করছে তারা। কাগজে নদীর বৈধতা আর সাগরের নিষিদ্ধ বাণিজ্য—এই কারসাজির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার ইলিশ পাচার হচ্ছে।
সেই চক্রের সুকৌশলী কারসাজির বড় প্রমাণ মিলেছে গত ১২ মে রাতে। ভোলা সদর উপজেলার পানপট্টি বাজারে তিনটি ট্রাকভর্তি প্রায় এক কোটি এক লাখ টাকা মূল্যের ইলিশ জব্দ করে কোস্টগার্ড ও প্রশাসন। ব্যবসায়ীরা তখন দাবি করেছিলেন, এগুলো নদীর মাছ। কিন্তু অভিযান শেষে চিত্র ভিন্ন। জব্দ করা মাছগুলো আসলে সাগরের ইলিশ।
এখানেই প্রশ্ন জাগছে। চরফ্যাশন ও ভোলা সদর মৎস্য দপ্তরের অবস্থান যেন পরস্পর বিপরীত। সদর উপজেলায় ওই মাছ ‘নিষিদ্ধ সাগরের ইলিশ’ হিসেবে জব্দ করা হলেও সেই একই চালানের অনুকূলে ছাড়পত্র দিয়েছিল চরফ্যাশন উপজেলা মৎস্য দপ্তর। মানে নদীর বৈধ ছাড়পত্র সাগরের মাছ পাচারের প্রধান হাতিয়ার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, নদীতে মাছ ধরা এখন উন্মুক্ত। পাচারকারী চক্রটি সেই সুযোগে মৎস্য দপ্তর থেকে নিয়মিত নদীর মাছ পরিবহনের ‘ছাড়পত্র’ সংগ্রহ করে রাখে। সামরাজ মৎস্যঘাটে নিষিদ্ধ সামুদ্রিক ইলিশ ট্রাকে তুলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানোর সময় এই কাগজটিই সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করে। পথিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আটকালেই নদীর মাছের বৈধ চালানের কাগজ দেখিয়ে পার পেয়ে যায়।
গত ১৪ মে দুপুরে সামরাজ মৎস্যঘাটে মৎস্য কর্মকর্তাদের অভিযান শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই আড়তদারদের মধ্যে শুরু হয় চাতুর্যের খেলা। সাগরের ইলিশ দ্রুত বরফের স্তূপের নিচে চাপা দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য, মৎস্য কর্মকর্তাদের নজর এড়িয়ে নদীর মাছ সাজিয়ে তোলা।
ঘাটের আড়তদাররা দাবি করেন, তাদের কোনো ট্রলার সাগরে যায়নি। কিন্তু নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জেলে স্বীকার করেন যে ১৩ দিন পর সাগর থেকে প্রায় ৮-১০ লাখ টাকার মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরেছেন। তবে প্রশাসনের ভয়ে আগের দিন ঘাটে ভেড়াননি।
স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, আইন প্রয়োগে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা ও শিথিলতা। মৎস্য কর্মকর্তা ঘাটে পৌঁছানোর আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। তাতে ইলিশবোঝাই সমুদ্রগামী ট্রলারগুলো দ্রুত ঘাট ছেড়ে নিরাপদ দূরত্বে নোঙর করে।
অভিযান শেষে চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু জানান, স্তূপকৃত ইলিশ দেখে নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন যে তা সাগরের নাকি নদীর। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন একমত পোষণ করে বলেন, চোখের দেখায় ইলিশের উৎস শনাক্ত করা অত্যন্ত জটিল। প্রশাসনের এই বক্তব্যের কারণেই কি সাগরের মাছ নদীর ছাড়পত্রে পাচার হচ্ছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
মৎস্য কর্মকর্তাদের ‘মাসোহারা’ দেওয়া নিয়ে অসাধু জেলেদের তোলা অভিযোগ অবশ্য সঠিক নয় বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র। তারা বলছেন, নিজেদের আইনবহির্ভূত কাজ ঢাকতে এবং প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি করতেই এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এত বড় অভিযানের পরেও সামরাজ মৎস্যঘাটে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি। এখনো প্রকাশ্যে, নিয়মিত সামুদ্রিক ইলিশ বিক্রি ও পাচার অব্যাহত। মাঠপর্যায়ে সাগরের ইলিশের এত সরব উপস্থিতি, অথচ প্রশাসনের ‘বোঝার উপায় নেই’- এমন বক্তব্য নজরদারি ব্যবস্থার বড় ফাঁকফোকরই তুলে ধরে।
স্থানীয়দের অভিমত, এই আইনি চোর-পুলিশ খেলায় প্রকৃত ও ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। লাভবান হচ্ছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। যা সরকারি নীতি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের এক বড় চ্যালেঞ্জ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে সামনে এনেছে।
উল্লেখ্য, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও মাছের প্রজনন বাড়াতে গত ১৫ এপ্রিল থেকে আগামী ১১ জুন পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কাগজের কারসাজিতে ইলিশ পাচার বন্ধ হচ্ছে না।

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬
ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশ ধরায় আইনি বাধা নেই। কিন্তু বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা। আর এই নিষেধাজ্ঞা সাধারণ জেলেদের জন্য চরম সংকটের হলেও প্রভাবশালী এক ইলিশ সিন্ডিকেটের কাছে তা যেন ‘আশীর্বাদ’। নদীর মাছের বৈধ পরিবহন ছাড়পত্র ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সাগরের নিষিদ্ধ ইলিশ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাচার করছে তারা। কাগজে নদীর বৈধতা আর সাগরের নিষিদ্ধ বাণিজ্য—এই কারসাজির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার ইলিশ পাচার হচ্ছে।
সেই চক্রের সুকৌশলী কারসাজির বড় প্রমাণ মিলেছে গত ১২ মে রাতে। ভোলা সদর উপজেলার পানপট্টি বাজারে তিনটি ট্রাকভর্তি প্রায় এক কোটি এক লাখ টাকা মূল্যের ইলিশ জব্দ করে কোস্টগার্ড ও প্রশাসন। ব্যবসায়ীরা তখন দাবি করেছিলেন, এগুলো নদীর মাছ। কিন্তু অভিযান শেষে চিত্র ভিন্ন। জব্দ করা মাছগুলো আসলে সাগরের ইলিশ।
এখানেই প্রশ্ন জাগছে। চরফ্যাশন ও ভোলা সদর মৎস্য দপ্তরের অবস্থান যেন পরস্পর বিপরীত। সদর উপজেলায় ওই মাছ ‘নিষিদ্ধ সাগরের ইলিশ’ হিসেবে জব্দ করা হলেও সেই একই চালানের অনুকূলে ছাড়পত্র দিয়েছিল চরফ্যাশন উপজেলা মৎস্য দপ্তর। মানে নদীর বৈধ ছাড়পত্র সাগরের মাছ পাচারের প্রধান হাতিয়ার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, নদীতে মাছ ধরা এখন উন্মুক্ত। পাচারকারী চক্রটি সেই সুযোগে মৎস্য দপ্তর থেকে নিয়মিত নদীর মাছ পরিবহনের ‘ছাড়পত্র’ সংগ্রহ করে রাখে। সামরাজ মৎস্যঘাটে নিষিদ্ধ সামুদ্রিক ইলিশ ট্রাকে তুলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানোর সময় এই কাগজটিই সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করে। পথিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আটকালেই নদীর মাছের বৈধ চালানের কাগজ দেখিয়ে পার পেয়ে যায়।
গত ১৪ মে দুপুরে সামরাজ মৎস্যঘাটে মৎস্য কর্মকর্তাদের অভিযান শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই আড়তদারদের মধ্যে শুরু হয় চাতুর্যের খেলা। সাগরের ইলিশ দ্রুত বরফের স্তূপের নিচে চাপা দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য, মৎস্য কর্মকর্তাদের নজর এড়িয়ে নদীর মাছ সাজিয়ে তোলা।
ঘাটের আড়তদাররা দাবি করেন, তাদের কোনো ট্রলার সাগরে যায়নি। কিন্তু নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জেলে স্বীকার করেন যে ১৩ দিন পর সাগর থেকে প্রায় ৮-১০ লাখ টাকার মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরেছেন। তবে প্রশাসনের ভয়ে আগের দিন ঘাটে ভেড়াননি।
স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, আইন প্রয়োগে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা ও শিথিলতা। মৎস্য কর্মকর্তা ঘাটে পৌঁছানোর আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। তাতে ইলিশবোঝাই সমুদ্রগামী ট্রলারগুলো দ্রুত ঘাট ছেড়ে নিরাপদ দূরত্বে নোঙর করে।
অভিযান শেষে চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু জানান, স্তূপকৃত ইলিশ দেখে নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন যে তা সাগরের নাকি নদীর। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন একমত পোষণ করে বলেন, চোখের দেখায় ইলিশের উৎস শনাক্ত করা অত্যন্ত জটিল। প্রশাসনের এই বক্তব্যের কারণেই কি সাগরের মাছ নদীর ছাড়পত্রে পাচার হচ্ছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
মৎস্য কর্মকর্তাদের ‘মাসোহারা’ দেওয়া নিয়ে অসাধু জেলেদের তোলা অভিযোগ অবশ্য সঠিক নয় বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র। তারা বলছেন, নিজেদের আইনবহির্ভূত কাজ ঢাকতে এবং প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি করতেই এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এত বড় অভিযানের পরেও সামরাজ মৎস্যঘাটে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি। এখনো প্রকাশ্যে, নিয়মিত সামুদ্রিক ইলিশ বিক্রি ও পাচার অব্যাহত। মাঠপর্যায়ে সাগরের ইলিশের এত সরব উপস্থিতি, অথচ প্রশাসনের ‘বোঝার উপায় নেই’- এমন বক্তব্য নজরদারি ব্যবস্থার বড় ফাঁকফোকরই তুলে ধরে।
স্থানীয়দের অভিমত, এই আইনি চোর-পুলিশ খেলায় প্রকৃত ও ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। লাভবান হচ্ছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। যা সরকারি নীতি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের এক বড় চ্যালেঞ্জ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে সামনে এনেছে।
উল্লেখ্য, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও মাছের প্রজনন বাড়াতে গত ১৫ এপ্রিল থেকে আগামী ১১ জুন পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কাগজের কারসাজিতে ইলিশ পাচার বন্ধ হচ্ছে না।

আপনার মতামত লিখুন