শনিবার, স্কুল ছুটি। ন’টার মধ্যে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে ফিটফাট রেডি- আব্বু’র সঙ্গে সংবাদে যাব। সাদা ফোক্সওয়াগন গাড়িতে চড়ে, সে-ই বংশালে। ২৬৩ নং বংশাল রোড। গাড়ি থেকে নেমে ছোট ‘উঠান’- কিছুটা শান বাঁধানো, কিছুটা নুড়ি-সুরকিতে ঢাকা। বর্ষার দিন হলে শ্যাওলায় আছাড় খাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। সিঁড়ি উঠে গেছে উপরে। সিঁড়ির নিচে হাতে টাইপ সেটিং হচ্ছে- কাঠের বাক্সে ছোট ছোট খোপে রাখা সিসার অক্ষরগুলো অদ্ভুত দক্ষতায় আর ক্ষীপ্রতায় লাইনে লাইনে বসিয়ে লেখা তৈরি করে যাচ্ছেন শ্মশ্রুমণ্ডিত এমদাদ সাহেব- আব্বু ডাকতেন ‘এই মৌলবী- এদিকে আস’- হেসে তাকাতেন। সিঁড়ি দিয়ে উঠে ল্যান্ডিংয়ে ছোট ঘরে ‘উদু’ বসে আছে, ছোটখাটো টাক মাথা মিষ্টি ওয়াদুদুল হক। তাকে আমরা, সংবাদ পরিবারের বাচ্চারা আদর করে ‘উদু’ বলে ডাকতাম। নামটা শহীদ সায়্যিদুল হাসান সাহেবের মেয়ে, প্রখ্যাত নাট্যশিল্পী শারমিন হাসানের (এখন হোসেন) দেয়া। ‘উদু’র কাছে বরাদ্দ ছিল চারটা মিষ্টি, একটি বা দুটি রসগোল্লা, পান্তুয়া, একটি সন্দেশ, মাঝে মাঝে সাথে নিমকি। এক বোতল স্প্রাইট। প্রায়ই সেগুলো নিয়ে চলে যেতাম বজলু চাচার ঘরে। বজলুর রহমান হয়তো গম্ভীরভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ততোধিক তাৎপর্যপূর্ণ লেখা লিখছেন। ঢুকতেই হেসে বলতেন, এসো। বসে পড়েই লেখাগুলো টেনে নিয়ে পড়তে শুরু করতাম- পাঁচ বছর বয়সে পড়তে শিখে ফেলার পর যা সামনে পেতাম তাই পড়তাম- এখনও পড়ি। মাঝে মাঝে বজলু চাচা বসিয়ে দিতেন হেডিং লিখতে- বলতেন সাব-এডিটর হওয়া প্র্যাক্টিস কর। প্রুফ রিডিংও করতাম। একদিন নতুন রিপোর্টারদের ইন্টারভিউ হবে। নিউজ উইক থেকে একটুখানি ইংরেজি ডিক্টেশন দেয়া হলো। আমাকে বসিয়ে দেয়া হলো তা চেক করতে। বেশিরভাগ প্রার্থীই “normalcy” শব্দটাকে লিখলেন “normal sea” বা “normal see”।
অদ্ভুত সব ব্যাপারে জোর আলোচনা হতো বজলু চাচার সঙ্গে। গভীর পর্যালোচনা হতো কোন মিষ্টিটা আগে খাওয়া হবে সেটা নিয়ে। যেটা বেশি ভানো লাগে না সেটা কম। একদিন বললেন, যেটা ভালো লাগে না, সেটা আগে খেলে মুখের রুচি নষ্ট হয়ে যেতে পারে, তখন পছন্দেরটাও আর ভালো লাগবে না। আবার পছন্দেরটা পরে খেলে মুখে স্বাদটা থেকে যাবে, মনও ভালো থাকবে। কিঞ্চিত ভোজনবিলাসী আমি- কোনটা আগে কোনটা পরে খাব- এই ডিলেমার সমাধান এখনও খুঁজে পাইনি। তার কমিউনিস্ট হওয়া নিয়ে ঠাট্টা করতাম, উত্তরে বলতেন ১৬ বছর বয়সের পরে যে কমিউনিস্ট হয় না, সে হৃদয়হীন, আর ৪০-এর পরে যে কমিউনিস্ট থাকে সে বোকা। একদিন নিয়ে গেলেন নৃত্যনাট্য শ্যামা দেখাতে। লায়লা হাসানের পাশে হিরোর রোলে যিনি নাচলেন, তার নাম মনে নেই- বজলু চাচা দেখেই বললেন- বজ্রশেল, বজ্রশেল, বজ্রসেন নয়।
এদিক-সেদিক ঘুরে ফিরে পৌঁছে যেতাম ফটোগ্রাফি সেকশনে, আলম ভাইয়ের কাছে। হাতে ধরে সাদা-কালো ছবি তোলা, ডেভেলপ করা, প্রিন্ট করা শিখিয়ে দিয়ে গেছেন তিনি। তারপর নেগেটিভ থেকে পজিটিভ করা, ছাপার জন্য তৈরি করা- সব। ছবি ডেভেলপ করার জন্য ডার্করুমে ঢুকে অল্প লাল আলোয় কেমিক্যালগুলো ট্রেতে ঢালা, তারপর সেই আলো বন্ধ করে নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ক্যামেরা থেকে ফিল্ম বের করে ডেভেলপারে দিয়ে অপেক্ষা করে থাকা। মাঝে মাঝে একটু বাতি জ্বেলে হাতের শ্যাডো দিয়ে বিভিন্ন ইফেক্ট দেয়া- নিজেকে বেশ অ্যালকেমিস্ট- অ্যালকেমিস্ট লাগত। আলম ভাই বারবার সাবধান করে দিতেন আন-এক্সপোজ্ড্ ফিল্মের বাক্স যেন না খুলি। তো এই পাগল একদিন সাঁকো নাড়িয়েই ফেলল- দেখিই না কী হয় করে একটা ফিল্ম রোলের ঢাকনা মুহূর্তের জন্য খুলে বন্ধ করে দিলাম। পরবর্তীতে পিতৃদেবের আদালতে সমন- বেশ কয়েক ফুট মহার্ঘ ফিল্ম নষ্ট করে ফেলার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত এবং যথাযথভাবে তিরষ্কৃত। এখনও আলম ভাইয়ের তোলা আমার ছবি আমার কাছে সযত্নে রাখা আছে।
আব্বুর ঘরের জানালা দিয়ে আশপাশের পুরনো বাড়ির ছাদ, আলশে, ইটের ফাঁকে বটগাছ- সব দেখা যেত। স্কুলের গ্রীষ্মের ছুটিতে প্রায় রোজই যেতাম সংবাদে। আব্বু একদিন ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তুই রোজ এতগুলো কলা খাস কেন? সেই প্রথম বুঝলাম, আমার খাতের খরচের হিসাব ভাউচার হয়ে- ‘বড় সাহেবের’ ঘরে চলে যাচ্ছে, আর তিনিও রোজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রতিটি ভাউচার দেখে নিচ্ছেন। আসলে কলা তো আর আমি খাইনি, আব্বুর ঘর থেকে পাশের বাড়ির ছাদে, আলশেতে যে বাঁদরগুলো ঘোরাঘুরি করত, তাদের ডেকে এনে খাওয়াতাম! যাই হোক, তখন থেকেই স্বল্পআয়ের পত্রিকায় ফাইনান্সিয়াল কন্ট্রোলের ব্যাপারটা মনে গেঁথে গেল।
পরে শুনেছিলাম আমার আসকারা পেয়ে বাঁদরগুলো বেশ উৎপাত আরম্ভ করেছিল। জানালা-টানালা খোলা পেলে দিব্যি সম্পাদক মহাশয়ের ঘরে ঢুকে টেবিল-চেয়ারে বসে অফিস করত- গোদাটা আব্বুর চেয়ারেই বসত। একবার তো নতুন গস্ মেশিনের বোতাম টিপে অন্ করে রোলারের ফাঁকে এক বাঁদরের লেজ আটকে হুলুস্থূল কাণ্ড।
সংবাদের প্রতি আব্বুর কমিটমেন্ট খুব কাছে থেকেই দেখেছি। ’৭৪-এ পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া, মার্শাল ল’র আমলে খোলা, সেন্সরশিপের চাপ, চোখ রাঙানি, ধমক চমক- কোনো কিছুকেই পাত্তা দিতেন না। দুর্দান্ত সাহস ছিল। সাম্প্রদায়িকতা সহ্য করতে পারতেন না। বহু প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও পঞ্চাশ বছরাধিক কাল সংবাদকে আগলে রেখেছেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে, অসুস্থ শরীরেও আমাকে জোর গলায় বলেছেন, I will never close Sangbad down.
দুপুর দেড়টার দিকে খোঁজ পড়ত মধ্যাহ্ন ভোজনের জন্য। আব্বুর বিরাট সেক্রেটেরিয়াট টেবিলের ওপর পুরনো খবর কাগজ বিছিয়ে বাড়ি থেকে আসা টিফিন ক্যারিয়ারের বাটিগুলো রাখা হতো। আব্বু ডাকতেন, সন্তোষ দা খেতে আসেন। সন্তোষ কাকা জিজ্ঞেস করতেন, কী আছে? বিফ থাকলে খাব, না হলে থাক। একবার প্রশ্ন করায় বলেছিলেন, বিফ বাড়িতে রান্না হয় না, তাই। সন্তোষ কাকা তখন সংবাদের চিঠিপত্র পাতাটা দেখতেন। বৃহস্পতিবার সম্পাদকীয় পাতায় কোনো উপসম্পাদকীয় থাকত না- শুধু চিঠি। অনেক দিন তার সঙ্গে বসে শত শত চিঠির স্তূপ থেকে চিঠি বেছে দিয়েছি, মতামতগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। বিরাট লম্বা তোহা চাচা। তোহা খান একদিন নিয়ে এলেন তার বই রূপসী সুন্দরবনের ঝকঝকে নতুন ছাপা কপি। এক নিশ্বাসে পড়ে ফেললাম গাজী কালু, বনবিবি, পচাব্দী গাজী, নবাবদি গাজীর গল্প। ঢোলা পাজামা পরতেন তোহা চাচা, তার এক পায়ের একটা খোলের মধ্যেই মনে হতো আমার মতো কয়েকজন নির্বিবাদে ঢুকে যেতে পারবে। ঋষি সদৃশ রণেশ কাকা- তাঁর করা ফয়েজ আহমদ ফয়েজের কবিতার অনুবাদ অনবদ্য- আজও পড়ি।
সংবাদ যখন পুরানা পল্টনে চলে এলো, তখন আর তত বেশি যাওয়া হতো না। বিদেশে লেখাপড়া করি, ছুটিতে দেশে এলে যাই। কথাশিল্পী শওকত ওসমান প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর, ধূমকেতুর মতো উদয় হয়ে হাঁক দিতেন- মাসি, কেমন আছ? এক পেয়ালি চা খাওয়াও তো। সাইয়্যিদ আতীকুল্লাহ্ ব্যাংক থেকে অবসর নিয়ে সংবাদে। বাংলাদেশের মুদ্রা এবং ব্যাংক নোটের Collector’s Set দিলেন একটা আমাকে। তার স্নেহময় সম্বোধন- ‘মা-জননী’ এখনও প্রতিধ্বনিত হয়- সংবাদের দেয়ালে দেয়ালে। সব্যসাচী সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে সাহিত্যে ভাষার ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করেছি, কৈশোরের দুরন্ত সাহস আর স্পর্ধা নিয়ে।
আবছাভাবে মনে পড়ে, স্বাধীনতার আগে, বছর চারেক বয়স হবে- শহীদুল্লা চাচা, শহীদ শহীদুল্লা কায়সার, ফোক্স ওয়াগন গাড়ি চালাতে শিখছেন। শুনেছি সারা ঢাকা শহর সেকেন্ড গিয়ারে- অতিক্রম করে গাড়ি চালাতে শিখে গিয়েছিলেন। আব্বুর সঙ্গে জহুর হোসেন চৌধুরীর বাড়িতে গিয়েছি। তার দরাজ গলা আর হাসির শব্দ মনে আছে। একটু একটু মনে পড়ে মীর মাহবুব আলীকে।
আজ মনে হয়, এত ছোট ছিলাম আর তারা সংবাদপত্র জগতের পথিকৃৎ, মহীরুহ। বিশাল মাপের সাহিত্যিক, সর্বোপরি বিশাল মনের মানুষ। কিন্তু কোনোদিন অবজ্ঞা করেননি, হেলাফেলা করেননি, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভাণ্ডার উজার করে দিয়েছেন। তাদের স্নেহ এবং প্রশ্রয়ে বেড়ে উঠে দেশ, সংবাদপত্র, সাহিত্য, রাজনীতি সবক্ষেত্রে সহজেই বিচরণ করতে শিখেছি। তাঁদের অসমবয়সী সাহচর্যের এ সৌভাগ্য অমূল্য।
লেখক: নিহাদ কবির; ব্যরিস্টার, সংবাদ-এর প্রয়াত প্রধান সম্পাদক আহমদুল কবিরের কন্যা
( লেখাটি ‘সংবাদ’-এর ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত লেখা থেকে পুনর্মুদ্রিত)

সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬
শনিবার, স্কুল ছুটি। ন’টার মধ্যে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে ফিটফাট রেডি- আব্বু’র সঙ্গে সংবাদে যাব। সাদা ফোক্সওয়াগন গাড়িতে চড়ে, সে-ই বংশালে। ২৬৩ নং বংশাল রোড। গাড়ি থেকে নেমে ছোট ‘উঠান’- কিছুটা শান বাঁধানো, কিছুটা নুড়ি-সুরকিতে ঢাকা। বর্ষার দিন হলে শ্যাওলায় আছাড় খাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। সিঁড়ি উঠে গেছে উপরে। সিঁড়ির নিচে হাতে টাইপ সেটিং হচ্ছে- কাঠের বাক্সে ছোট ছোট খোপে রাখা সিসার অক্ষরগুলো অদ্ভুত দক্ষতায় আর ক্ষীপ্রতায় লাইনে লাইনে বসিয়ে লেখা তৈরি করে যাচ্ছেন শ্মশ্রুমণ্ডিত এমদাদ সাহেব- আব্বু ডাকতেন ‘এই মৌলবী- এদিকে আস’- হেসে তাকাতেন। সিঁড়ি দিয়ে উঠে ল্যান্ডিংয়ে ছোট ঘরে ‘উদু’ বসে আছে, ছোটখাটো টাক মাথা মিষ্টি ওয়াদুদুল হক। তাকে আমরা, সংবাদ পরিবারের বাচ্চারা আদর করে ‘উদু’ বলে ডাকতাম। নামটা শহীদ সায়্যিদুল হাসান সাহেবের মেয়ে, প্রখ্যাত নাট্যশিল্পী শারমিন হাসানের (এখন হোসেন) দেয়া। ‘উদু’র কাছে বরাদ্দ ছিল চারটা মিষ্টি, একটি বা দুটি রসগোল্লা, পান্তুয়া, একটি সন্দেশ, মাঝে মাঝে সাথে নিমকি। এক বোতল স্প্রাইট। প্রায়ই সেগুলো নিয়ে চলে যেতাম বজলু চাচার ঘরে। বজলুর রহমান হয়তো গম্ভীরভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ততোধিক তাৎপর্যপূর্ণ লেখা লিখছেন। ঢুকতেই হেসে বলতেন, এসো। বসে পড়েই লেখাগুলো টেনে নিয়ে পড়তে শুরু করতাম- পাঁচ বছর বয়সে পড়তে শিখে ফেলার পর যা সামনে পেতাম তাই পড়তাম- এখনও পড়ি। মাঝে মাঝে বজলু চাচা বসিয়ে দিতেন হেডিং লিখতে- বলতেন সাব-এডিটর হওয়া প্র্যাক্টিস কর। প্রুফ রিডিংও করতাম। একদিন নতুন রিপোর্টারদের ইন্টারভিউ হবে। নিউজ উইক থেকে একটুখানি ইংরেজি ডিক্টেশন দেয়া হলো। আমাকে বসিয়ে দেয়া হলো তা চেক করতে। বেশিরভাগ প্রার্থীই “normalcy” শব্দটাকে লিখলেন “normal sea” বা “normal see”।
অদ্ভুত সব ব্যাপারে জোর আলোচনা হতো বজলু চাচার সঙ্গে। গভীর পর্যালোচনা হতো কোন মিষ্টিটা আগে খাওয়া হবে সেটা নিয়ে। যেটা বেশি ভানো লাগে না সেটা কম। একদিন বললেন, যেটা ভালো লাগে না, সেটা আগে খেলে মুখের রুচি নষ্ট হয়ে যেতে পারে, তখন পছন্দেরটাও আর ভালো লাগবে না। আবার পছন্দেরটা পরে খেলে মুখে স্বাদটা থেকে যাবে, মনও ভালো থাকবে। কিঞ্চিত ভোজনবিলাসী আমি- কোনটা আগে কোনটা পরে খাব- এই ডিলেমার সমাধান এখনও খুঁজে পাইনি। তার কমিউনিস্ট হওয়া নিয়ে ঠাট্টা করতাম, উত্তরে বলতেন ১৬ বছর বয়সের পরে যে কমিউনিস্ট হয় না, সে হৃদয়হীন, আর ৪০-এর পরে যে কমিউনিস্ট থাকে সে বোকা। একদিন নিয়ে গেলেন নৃত্যনাট্য শ্যামা দেখাতে। লায়লা হাসানের পাশে হিরোর রোলে যিনি নাচলেন, তার নাম মনে নেই- বজলু চাচা দেখেই বললেন- বজ্রশেল, বজ্রশেল, বজ্রসেন নয়।
এদিক-সেদিক ঘুরে ফিরে পৌঁছে যেতাম ফটোগ্রাফি সেকশনে, আলম ভাইয়ের কাছে। হাতে ধরে সাদা-কালো ছবি তোলা, ডেভেলপ করা, প্রিন্ট করা শিখিয়ে দিয়ে গেছেন তিনি। তারপর নেগেটিভ থেকে পজিটিভ করা, ছাপার জন্য তৈরি করা- সব। ছবি ডেভেলপ করার জন্য ডার্করুমে ঢুকে অল্প লাল আলোয় কেমিক্যালগুলো ট্রেতে ঢালা, তারপর সেই আলো বন্ধ করে নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ক্যামেরা থেকে ফিল্ম বের করে ডেভেলপারে দিয়ে অপেক্ষা করে থাকা। মাঝে মাঝে একটু বাতি জ্বেলে হাতের শ্যাডো দিয়ে বিভিন্ন ইফেক্ট দেয়া- নিজেকে বেশ অ্যালকেমিস্ট- অ্যালকেমিস্ট লাগত। আলম ভাই বারবার সাবধান করে দিতেন আন-এক্সপোজ্ড্ ফিল্মের বাক্স যেন না খুলি। তো এই পাগল একদিন সাঁকো নাড়িয়েই ফেলল- দেখিই না কী হয় করে একটা ফিল্ম রোলের ঢাকনা মুহূর্তের জন্য খুলে বন্ধ করে দিলাম। পরবর্তীতে পিতৃদেবের আদালতে সমন- বেশ কয়েক ফুট মহার্ঘ ফিল্ম নষ্ট করে ফেলার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত এবং যথাযথভাবে তিরষ্কৃত। এখনও আলম ভাইয়ের তোলা আমার ছবি আমার কাছে সযত্নে রাখা আছে।
আব্বুর ঘরের জানালা দিয়ে আশপাশের পুরনো বাড়ির ছাদ, আলশে, ইটের ফাঁকে বটগাছ- সব দেখা যেত। স্কুলের গ্রীষ্মের ছুটিতে প্রায় রোজই যেতাম সংবাদে। আব্বু একদিন ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তুই রোজ এতগুলো কলা খাস কেন? সেই প্রথম বুঝলাম, আমার খাতের খরচের হিসাব ভাউচার হয়ে- ‘বড় সাহেবের’ ঘরে চলে যাচ্ছে, আর তিনিও রোজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রতিটি ভাউচার দেখে নিচ্ছেন। আসলে কলা তো আর আমি খাইনি, আব্বুর ঘর থেকে পাশের বাড়ির ছাদে, আলশেতে যে বাঁদরগুলো ঘোরাঘুরি করত, তাদের ডেকে এনে খাওয়াতাম! যাই হোক, তখন থেকেই স্বল্পআয়ের পত্রিকায় ফাইনান্সিয়াল কন্ট্রোলের ব্যাপারটা মনে গেঁথে গেল।
পরে শুনেছিলাম আমার আসকারা পেয়ে বাঁদরগুলো বেশ উৎপাত আরম্ভ করেছিল। জানালা-টানালা খোলা পেলে দিব্যি সম্পাদক মহাশয়ের ঘরে ঢুকে টেবিল-চেয়ারে বসে অফিস করত- গোদাটা আব্বুর চেয়ারেই বসত। একবার তো নতুন গস্ মেশিনের বোতাম টিপে অন্ করে রোলারের ফাঁকে এক বাঁদরের লেজ আটকে হুলুস্থূল কাণ্ড।
সংবাদের প্রতি আব্বুর কমিটমেন্ট খুব কাছে থেকেই দেখেছি। ’৭৪-এ পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া, মার্শাল ল’র আমলে খোলা, সেন্সরশিপের চাপ, চোখ রাঙানি, ধমক চমক- কোনো কিছুকেই পাত্তা দিতেন না। দুর্দান্ত সাহস ছিল। সাম্প্রদায়িকতা সহ্য করতে পারতেন না। বহু প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও পঞ্চাশ বছরাধিক কাল সংবাদকে আগলে রেখেছেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে, অসুস্থ শরীরেও আমাকে জোর গলায় বলেছেন, I will never close Sangbad down.
দুপুর দেড়টার দিকে খোঁজ পড়ত মধ্যাহ্ন ভোজনের জন্য। আব্বুর বিরাট সেক্রেটেরিয়াট টেবিলের ওপর পুরনো খবর কাগজ বিছিয়ে বাড়ি থেকে আসা টিফিন ক্যারিয়ারের বাটিগুলো রাখা হতো। আব্বু ডাকতেন, সন্তোষ দা খেতে আসেন। সন্তোষ কাকা জিজ্ঞেস করতেন, কী আছে? বিফ থাকলে খাব, না হলে থাক। একবার প্রশ্ন করায় বলেছিলেন, বিফ বাড়িতে রান্না হয় না, তাই। সন্তোষ কাকা তখন সংবাদের চিঠিপত্র পাতাটা দেখতেন। বৃহস্পতিবার সম্পাদকীয় পাতায় কোনো উপসম্পাদকীয় থাকত না- শুধু চিঠি। অনেক দিন তার সঙ্গে বসে শত শত চিঠির স্তূপ থেকে চিঠি বেছে দিয়েছি, মতামতগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। বিরাট লম্বা তোহা চাচা। তোহা খান একদিন নিয়ে এলেন তার বই রূপসী সুন্দরবনের ঝকঝকে নতুন ছাপা কপি। এক নিশ্বাসে পড়ে ফেললাম গাজী কালু, বনবিবি, পচাব্দী গাজী, নবাবদি গাজীর গল্প। ঢোলা পাজামা পরতেন তোহা চাচা, তার এক পায়ের একটা খোলের মধ্যেই মনে হতো আমার মতো কয়েকজন নির্বিবাদে ঢুকে যেতে পারবে। ঋষি সদৃশ রণেশ কাকা- তাঁর করা ফয়েজ আহমদ ফয়েজের কবিতার অনুবাদ অনবদ্য- আজও পড়ি।
সংবাদ যখন পুরানা পল্টনে চলে এলো, তখন আর তত বেশি যাওয়া হতো না। বিদেশে লেখাপড়া করি, ছুটিতে দেশে এলে যাই। কথাশিল্পী শওকত ওসমান প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর, ধূমকেতুর মতো উদয় হয়ে হাঁক দিতেন- মাসি, কেমন আছ? এক পেয়ালি চা খাওয়াও তো। সাইয়্যিদ আতীকুল্লাহ্ ব্যাংক থেকে অবসর নিয়ে সংবাদে। বাংলাদেশের মুদ্রা এবং ব্যাংক নোটের Collector’s Set দিলেন একটা আমাকে। তার স্নেহময় সম্বোধন- ‘মা-জননী’ এখনও প্রতিধ্বনিত হয়- সংবাদের দেয়ালে দেয়ালে। সব্যসাচী সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে সাহিত্যে ভাষার ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করেছি, কৈশোরের দুরন্ত সাহস আর স্পর্ধা নিয়ে।
আবছাভাবে মনে পড়ে, স্বাধীনতার আগে, বছর চারেক বয়স হবে- শহীদুল্লা চাচা, শহীদ শহীদুল্লা কায়সার, ফোক্স ওয়াগন গাড়ি চালাতে শিখছেন। শুনেছি সারা ঢাকা শহর সেকেন্ড গিয়ারে- অতিক্রম করে গাড়ি চালাতে শিখে গিয়েছিলেন। আব্বুর সঙ্গে জহুর হোসেন চৌধুরীর বাড়িতে গিয়েছি। তার দরাজ গলা আর হাসির শব্দ মনে আছে। একটু একটু মনে পড়ে মীর মাহবুব আলীকে।
আজ মনে হয়, এত ছোট ছিলাম আর তারা সংবাদপত্র জগতের পথিকৃৎ, মহীরুহ। বিশাল মাপের সাহিত্যিক, সর্বোপরি বিশাল মনের মানুষ। কিন্তু কোনোদিন অবজ্ঞা করেননি, হেলাফেলা করেননি, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভাণ্ডার উজার করে দিয়েছেন। তাদের স্নেহ এবং প্রশ্রয়ে বেড়ে উঠে দেশ, সংবাদপত্র, সাহিত্য, রাজনীতি সবক্ষেত্রে সহজেই বিচরণ করতে শিখেছি। তাঁদের অসমবয়সী সাহচর্যের এ সৌভাগ্য অমূল্য।
লেখক: নিহাদ কবির; ব্যরিস্টার, সংবাদ-এর প্রয়াত প্রধান সম্পাদক আহমদুল কবিরের কন্যা
( লেখাটি ‘সংবাদ’-এর ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত লেখা থেকে পুনর্মুদ্রিত)

আপনার মতামত লিখুন