দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দৈনিক সংবাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল| গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সংবাদের ভূমিকা সংবাদকে এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে| সংবাদ এক ঐতিহ্য| সংবাদ এক প্রতিষ্ঠান| সংবাদ ছেড়ে এসেছি বহু বছর আগে তবু আজও সংবাদের সঙ্গে আত্মীয়তা অনুভব করি| কেন তা আমি জানি না| এখনও আমি সংবাদকে আমার নিজের প্রতিষ্ঠান বলেই মনে করি|
১৯৭৯ সালে দৈনিক সংবাদে পদ খালি হলে আমি সেখানে লিখিত পরীক্ষা দিই| পরীক্ষা ভাল হয়| আমি নিয়োগ পেয়ে ২১ জুলাই, ১৯৭৯ সংবাদের বার্তা বিভাগে যোগ দিই| আমি লিখিত পরীক্ষায় যে খবরটি অনুবাদ করেছিলাম পরদিনই তা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল|
শুরু থেকেই আমি রাতের শিফ&টে কাজ করতে সম্মত হয়েছিলাম| তখন কোনো পত্রিকায় মেয়েরা রাতের শিফটে কাজ করতো না| মেয়েরা তখন সাংবাদিকতায় ছিল না বললেই চলে| সব মিলে মাত্র ১৫ জন| আমি ছাড়া নিনিও রাতের শিফ&টে কাজ করতো| আর কেউ করতো না|
আমি সংবাদে যোগ দিই ১৯৭৯ সালে| সংবাদে তখন আমরা ৫ জন নারী| আমার আগে থেকেই সেখানে ছিলেন মাসুমা খানম, নাসিমুন্নাহার নিনি, আখতার জাহান মালিক, রওশন আরা জলি| আমার কাছাকাছি সময়েই নারী পাতার দায়িত্বে যোগ দেন শামীম আখতার (পরে চলচ্চিত্র পরিচালক)|
সংবাদ অফিস তখন ২৬৩, বংশাল রোডে| মানসী সিনেমার উল্টো দিকে| সংবাদের তখন খুব সুনাম ও মর্যাদা| প্রাচীনতম ˆদনিক| শুরুতে মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠিত হলেও ’৫২-র পরে এটি হাত বদল হয়| পরে এর মালিক হন আহমদুল কবির শুরু থেকেই এতে সাংবাদিকরা ছিলেন বামপন্থী| এখানে অনেকেই কমিউনিস্ট বা বাম ঘরানার| বাম আন্দোলনে যুক্ত বলে অনেকেই মাঝে মাঝে কারারুদ্ধ হতেন| কারাগার থেকে কখনও ছাড়া পেলে বেরিয়েই এরা চলে আসতেন সংবাদ অফিসেই|
সংবাদে সমাবেশ ঘটেছিল এক ঝাঁক জ্যোতিষ্কের| এদের মধ্যে ছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন, শহীদুল্লা কায়সার, জহুর হোসেন চৌধুরী, সন্তোষ গুপ্ত, বজলুর রহমান প্রমুখ| দীর্ঘদিন উপ-সম্পাদকীয় লিখেছেন উপরোক্তরা ছাড়াও আবু জাফর শামসুদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, কবি শামসুর রাহমান, বদরুদ্দিন হুসাইন প্রমুখ|
১৯৫১ সালের ১৭ মে দৈনিক সংবাদ প্রকাশিত হয়| সেকালে সংবাদই প্রথম পত্রিকা যেটি বাংলা নাম নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে| তার আগের পত্রিকা ছিল ইত্তেফাক, আজাদ, ইত্তেহাদ, মিল্লাত ইত্যাদি| সংবাদের মাস্টহেড করে দিয়েছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী কামরুল হাসান|
ওপরে যাদের কথা বললাম, তাদের মধ্যে রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন, শহীদুল্লা কায়সার, সন্তোষ গুপ্ত, বজলুর রহমান— ওঁদের কাছে অনেক স্নেহ পেয়েছি| তখনও অবশ্য আমি সংবাদে যোগ দিইনি| আর আমি যে সাংবাদিকতায় আসবো কোনোদিন তাও জানতাম না| তখন তো আমি আন্দোলন-সংগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম| তখন প্রায়ই গিয়েছি কখনও ছাত্র ইউনিয়ন, কখনও মহিলা পরিষদের প্রেস রিলিজ পৌঁছাতে| তারও আগে গিয়েছি খেলাঘরের সভায় যোগ দিতে| সংবাদে আমার দীর্ঘ কবিতাও প্রকাশিত হয়েছে| তখন সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত| তিনি সবসময় আমাদের উৎসাহিত করেছেন| ওঁর স্নেহ আমার কাছে খুবই মূল্যবান|
এখনে বলা দরকার, আবুল হাসনাত ১৯৬৫ সাল থেকেই সংবাদে সাংবাদিকতা করেছে| ওর সঙ্গে ছাত্র ইউনিয়ন করার সুবাদে পরিচয় তো ছিলই| ইতোমধ্যে ১৯৭৪ সালে আমাদের বিয়ে হয়েছে| হাসনাত তখনও সংবাদেই কর্মরত সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে| অবশেষে আমিও সংবাদে কাজ শুরু করলাম ১৯৭৯ সালের ২১ জুলাই| নিউজ ডেস্কে তখন ছিল তিনটি শিফ&ট| সকাল, দুপুর ও রাতের শিফ&ট| রাতের শিফ&ট ছিল ৬টা থেকে রাত ১২টা| ১৫ দিন করে ছিল এক একটি শিফ&ট| দুটি শিফ&ট পরই আমাকে রাতের শিফটে দেয়া হয়| সেই শুরু| সংবাদে ছিলাম ১৯৭৯ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত| ১৩ বছর| জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বহু বছর সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত দেশে কার্ফ্যু বা সান্ধ্য আইন জারি ছিল| বছরের পর বছর তখন কার্ফ্যুর মধ্যে রাতে আমাদের বাড়ি ফিরতে হতো| পুরো রাস্তা সুনসান| কেউ কোথাও নেই| আমরা কয়েকজন মাত্র অফিসের ভাড়া করা অটোরিক্সায় বাড়ি ফিরতাম| অনেক সময় মিলিটারি রাস্তায় থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতো| তখন তারা নারী সাংবাদিক দেখেনি| নারীরা যে সাংবাদিকতা করতে পারে বিশ্বাস করতে পারতো না| তাই অনেক সময় ভুলভাল জেরা করতো| অনেক ঝুঁকি নিয়ে আমরা তখন সংবাদে কাজ করেছি| তবে ঝুঁকি যেমন ছিল, তেমনি কাজটা চ্যালেঞ্জিং বলে থ্রিলও ছিল|
তখন সম্পাদক আহমদুল কবির, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক বজলুর রহমান, বার্তা সম্পাদক আবদুল আওয়াল খান| সন্তোষ গুপ্ত, তোহা খান প্রমুখ সম্পাদকীয় বিভাগে ছিল সহকারী সম্পাদক হিসবে| বার্তা বিভাগে শিফ&ট ইন চার্জ ছিলেন শহীদুল ইসলাম, মোজাম্মেল হোসেন মন্টু ও চপল বাশার| এখানেই আমার মূলধারার সংবাদপত্রের হাতেখড়ি| এপিএনে আমাদের কাছ ছিল বড় বড় নিবন্ধ অনুবাদ করা| মূলত ব্রেজনেভের বক্তৃতা ইত্যাদি অনুবাদ করা| সংবাদপত্রের কাজ আমি সংবাদেই শিখেছি| শিখেছি কাজ করতে করতে| সকলের সহযোগিতা পেয়েছি| আবার কখনও অসহযোগিতাও যে পাইনি তা বলবো না|
প্রতিকূলতাকে জয় করে করে এগিয়ে গিয়েছি| রাতের শিফ&ট ১২ টা পর্যন্ত হলেও প্রায়ই ১টা দেড়টা বেজে যেত| নিয়ম ছিল কাজ শেষ করা পর্যন্ত থাকতে হবে| প্রায়ই অধিক রাত পর্যন্ত থাকতে হতো| ’৭৯ সালেই ভারতের নির্বাচনের সময় আমরা রাত তিনটায় ফিরেছিলাম| ’৭৭-এ ইন্দিরা গান্ধী পরাজিত হবার পর ’৭৯-তে পুনরায় জয়ী হয়ে সংসদে ফিরেছিলেন| সেটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল|
এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর প্রথম দিকে ঢিলেঢালা হলেও পরে কঠিন সামরিক শাসন জারি হয়| সে সময় কার্ফ্যুর মধ্যে অফিস থেকে মাইক্রোবাসে পাঠিয়ে আমাদের আনা হয়| রাতের শিফ&ট ছিল| আমরা বিকাল ৬টায় অফিসে গিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত অফিসেই ছিলাম| মনে পড়ে, অফিস থেকে উল্টোদিকে চাঁদ মিয়ার হোটেলে আমাদের রাতের খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল|
একবার রাতে কাজ করছি| প্রচণ্ড ঝড় হলো| আমাদের কাজ শেষ করতে করতে ১টা দেড়টা হয়েছিল| ঝড়ের পর বিদ্যুত নেই| আমাদের সম্বল সেই ঝরঝরে বেবী ট্যাক্সি| রাস্তায় প্রচুর জল জমে গেছে| নওয়াবপুর দিয়ে গিয়ে গাড়ি আর যেতে পারলো না| গাড়ি ঘুরিয়ে টিপু সুলতান রোডে ঢুকলো| সেখানে হঠাৎ ছিনতাইকারীরা গাড়ি থামালো| আমরা ৫/৬ জন ছিলাম| দিল&ওয়ার, জি. এম ইয়াকুব ভাই ছিলেন| অন্যদের নাম মনে পড়ছে না| ওদের হতে বড় বড় চাপাতি| সবার হাতের ঘড়ি, টাকাপয়সা যা ছিল দিয়ে নিস্তার পাওয়া গেল| তারপর ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফেরা|
আমাদের সহকর্মীরা যারা লেট& নাইট ডিউটি সেরে শেষ রাতে বাড়ি ফিরতেন তাদেরকে প্রায়ই রাস্তার কুকুরের তাড়া খেতে হতো| মন্টুদার কাছে এসব গল্প শুনতাম| আমাদের অবশ্য কুকুরের তাড়া খেতে হয়নি|
২৫ মার্চের পর ২৭ মার্চ সংবাদ অফিস আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল| পাকিস্তানি আর্মি সংবাদ অফিসে আগুন দিয়েছিল| সংবাদ ভবনের সঙ্গে পুড়ে গিয়েছিলেন লেখক শহীদ সাবের| সংবাদ সব সময় গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা ও সমাজ প্রগতির পক্ষে ছিল তাই সংবাদের ওপর ওদের সব আক্রোশ| মুক্তিযুদ্ধের সাড়ে ৯ মাসে সংবাদ আর প্রকাশ হয়নি| বহু হুমকির মুখেও আহমদুল কবির সাহেব তখন পাকিস্তান সরকারের চাপে সংবাদ প্রকাশ করেননি|স্বাধীনতার পর সংবাদ আবার প্রকাশ করা হয়| তখন কোনো রকমে একটি টিনশেড তুলে কাজ শুরু করা হয়| আমি ঐ টিনশেডেই কাজে যোগ দিই| পাশে পুরানো দোতলার জায়গায় ভবন নির্মাণের কাজ চলছিল পরে নির্মীয়মান বহুতল ভবনের দোতলায় আমাদের আমাদের বার্তা বিভাগ ও সম্পাদকীয় বিভাগ স্থানান্তরিত হয়| পরে তিন তলাজুড়ে বড় লাইব্রেরি করা হয়| আহমদুল কবির সাহেবের অনেক সুন্দর সুন্দর পরিকল্পনা ছিল সংবাদকে ঘিরে; তার একটি হলো লাইব্রেরি| পরে অফিস স্থানান্তরের পরে স্থান সংকুলান না হওয়ায় লাইব্রেরিটি ক্রমে ছোট হয়ে যায়| ছোট হতে হতে একসময় বিলুপ্ত হয়ে যায়| এখন আর কিছু নেই| সংবাদের সকল কপি সুন্দর করে ফাইল করা ছিল|
সংবাদ তার বহুদিনের আবাস ২৬৩, বংশাল রোড ছেড়ে ৩৬, পুরানা পল্টনের দোতলায় স্থানান্তরিত হয়| নতুন ঝকঝকে এপার্টমেন্ট ফ্লোর| কবির সহেব আদেশ জারি করেছিলেন কেউ চা খেতে পারবে না| চা পড়ে দাগ লেগে দেয়াল, মেঝে নষ্ট হয়ে যাবে সেজন্য| চা খাওয়া অবশ্য চলতেই থাকলো| সেসব নিয়মের কড়াকড়ি আর ছিল না পরে, কারণ থাকা সম্ভব ছিল না| নিউজে কাজ করব আর চা খাবো না?
আরেকবার আহমদুল কবির সাহেব সংবাদে নোটিশ জারি করেছিলেন সংবাদে চাকরির ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে কেউ বিয়ে করতে পারবে না| কেউ কেই তাই বিয়ের ব্যাপারটা অফিসে গোপন রেখেছিল| নোটিশ দিয়ে বিয়ে কি আর বন্ধ রাখা যায়? মজার ঘটনা হিসাবে এগুলো উল্লেখ করলাম|
তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্পাদক হিসেবে আহমদুল কবিরের এবং সংবাদ পত্রিকার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ| বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ার আন্দোলনে আহমদুল কবির খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন| এ তো ইতিহাসের অংশ| এসব কথা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা উচিত|
এই আন্দোলনে ˆদনিক সংবাদ অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে| এই ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে অমোচনীয়| সংবাদের একজন কর্মী ছিলাম বলে তাই আজও গৌরব বোধ করি| আহমদুল কবির ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির কোষাধ্যক্ষ হিসাবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন| রাজনীতিতেও তিনি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও বাম ঘরানার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন| ১৯৬৪-র দাঙ্গার সময় তিনি তার ব্যবসায়িক অফিস ছেড়ে দিয়েছিলেন দাঙ্গা দমনে নিয়োজিতদের জন্য| অনেককে নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন| দাঙ্গার সময় তিনি রণেশ দাশগুপ্ত, সন্তোষ গুপ্ত প্রমুখ বাম নেতাদের সব সময়ই খোঁজখবর রেখেছেন ও প্রভূত সহযোগিতা করেছেন বলেই জেনেছি|
তিনি সংবাদকে একটা মর্যাদার জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছিলেন| কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার পরে সংবাদ সে জায়গাটা পরে আর ধরে রাখতে পরেনি|
সংবাদ আহমদুল কবির স্মরণে কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন করে না| তার স্মৃতিকে ধরে রাখার কোনো উদ্যোগ নেই| সেই সঙ্গে জহুর হোসেন চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার, রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন, সন্তোষ গুপ্ত, বজলুর রহমান তাদের স্মরণেও কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন করে না এও অত্যন্ত দুঃখজনক|
আমি সংবাদে ছিলাম সংবাদের সবচাইতে উজ্জ্বল সময়ে| সংবাদের সার্কুলেশন তখন ভাল ছিল| কাজেই আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল| সাংবাদিকদের বেতন নিয়মিত ছিল| সংবাদে সাংবাদিকতার একটা মান বজায় রাখার দিকে সব সময়ই নজর দেওয়া হতো|
সংবাদে সাংবাদিক ইউনিয়ন তখন মোটামুটি শক্তিশালীই ছিল| আমি দুটি বড় আন্দোলন দেখেছি ইউনিয়নের উদ্যোগে| একটি বংশালে থাকার সময়| আরেকটি পুরানা পল্টনে আসার পরে| বংশালে আন্দোলন হয়েছিল ৬০% ডি.এ’র দাবিতে| পুরানা পল্টনে আসার পরের আন্দোলনটা হয়েছিল নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পদোন্নতির দাবিতে অনিয়মতান্ত্রিক পদোন্নতি দানের বিরুদ্ধে| সেই সঙ্গে আরও কতগুলো ন্যায্য দাবিদাওয়া ছিল| বিশুদ্ধ খাবার পানির দাবিও তার মধ্যে ছিল| এদুটিই আমার দেখা সংবাদে বড় আন্দোলন|
এই সব আন্দেলনকে ঘিরে মালিকপক্ষের ও সংবাদকর্মীদের অনেক ক্ষুদ্রতাও দেখেছি| সংবাদ জীবনে যেমন অনেক ভাল কিছু দেখেছি, আবার কখনও কখনও অনেক ক্ষুদ্রতাও দেখেছি| আসলে এগুলো বোধহয় জীবনেরই অঙ্গ| এই আন্দোলনের পর সংবাদের ভেতরে গ্রুপিং এত বেশি হয়ে গেল যে, সেখানে থাকা আমার অসহ্য লাগছিল| আর রাতের ডিউটি করতে করতেও ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম| সব মিলিয়ে আমি একটু পরিবর্তন চাইছিলাম মরিয়াভাবে|
তখন সংবাদ ছাড়লাম| সংবাদ সম্পাদক তখন মিশু ভাই (আলতামাশ কবির)| তিনি অবশ্য আমাকে অনুরোধ করেছিলেন থেকে যাবার জন্য| বলেছিলেন, “আমি আপনার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছি না আপনি কাজ করুন|”
সংবাদ ছেড়ে ডানকান ব্রাদার্স বাংলাদেশ লিমিটেড ও পরে জনকণ্ঠে কাজ করেছি| প্রাণের টানে আবারও সংবাদে ফিরেছি| সংবাদ আমাকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে| এবারে কাজ করেছি সম্পাদকীয় বিভাগে সহকারী সম্পাদক এবং সম্পাদকীয় বিভাগের ইন চার্জ হিসাবে| সম্মানের সঙ্গে সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেছি| এখনও আমি নিজেকে সংবাদেরই একজন মনে করি|
সংবাদের সম্পাদকীয় পাতা ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ| বিশেষ করে সংবাদের সাহিত্য সাময়িকী বিভাগ ছিল অত্যন্ত রুচিশীল ও সমৃদ্ধ ও মানসম্পন্ন| আবুল হাসনাতের সুচারু সম্পাদনায় প্রতি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হতো চার পাতার সাহিত্য সাময়িকী| আর কোনো পত্রিকা সাহিত্যের জন্য চারটি পাতা বরাদ্দ করেনি| এত সমৃদ্ধ সাহিত্য পাতাও আর কেউ বের করে না| অনেকে শুধু বৃহস্পতিবারের সাহিত্য সাময়িকীর জন্য সংবাদ রাখতো| মানের ব্যাপারে আবুল হাসনাত এতটাই আপোসহীন ছিলেন যে, আবুল হাসনাতের হাত দিয়ে কোনো কবিতা, গল্প বা প্রবন্ধ প্রকাশিত হলে লেখকরা মনে করতো তারা এখন ভাল লেখক হিসাবে বিবেচিত হবেন| সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে আবুল হাসনাতও যেন এক মিথে পরিণত হন| বহু নামী লেখকের লেখা সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে| সংবাদ অনেক লেখক ˆতরিও করেছে| উৎসাহ দিয়ে, লেখা প্রকাশ করে আবুল হাসনাত লেখার জগতে অনেককে এগিয়ে দিয়েছেন|
মফস্বল সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনও সংবাদেরই সৃষ্টি| চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন তার কাজের মধ্য দিয়ে এক মিথে পরিণত হয়েছেন| আজও তার নাম গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয় এবং হতেই থাকবে|
সংবাদ একটি ঐতিহ্য, একটি প্রতিষ্ঠান| সংবাদকে বলা হয় সাংবাদিকতা শিক্ষার সূতিকাগার| বহু নামী দামী সাংবাদিক এখান থেকে কাজ শিখে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছেন| কৃতী হয়েছেন| সংবাদের ইতিহাস অবশ্যই লিপিবদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়া দরকার| সংবাদের ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায়| কারণ সংবাদ বাংলাদেশের ইতিহাসের অঙ্গ| [পুনর্মুদ্রণ]

শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুন ২০২৬
দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দৈনিক সংবাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল| গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সংবাদের ভূমিকা সংবাদকে এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে| সংবাদ এক ঐতিহ্য| সংবাদ এক প্রতিষ্ঠান| সংবাদ ছেড়ে এসেছি বহু বছর আগে তবু আজও সংবাদের সঙ্গে আত্মীয়তা অনুভব করি| কেন তা আমি জানি না| এখনও আমি সংবাদকে আমার নিজের প্রতিষ্ঠান বলেই মনে করি|
১৯৭৯ সালে দৈনিক সংবাদে পদ খালি হলে আমি সেখানে লিখিত পরীক্ষা দিই| পরীক্ষা ভাল হয়| আমি নিয়োগ পেয়ে ২১ জুলাই, ১৯৭৯ সংবাদের বার্তা বিভাগে যোগ দিই| আমি লিখিত পরীক্ষায় যে খবরটি অনুবাদ করেছিলাম পরদিনই তা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল|
শুরু থেকেই আমি রাতের শিফ&টে কাজ করতে সম্মত হয়েছিলাম| তখন কোনো পত্রিকায় মেয়েরা রাতের শিফটে কাজ করতো না| মেয়েরা তখন সাংবাদিকতায় ছিল না বললেই চলে| সব মিলে মাত্র ১৫ জন| আমি ছাড়া নিনিও রাতের শিফ&টে কাজ করতো| আর কেউ করতো না|
আমি সংবাদে যোগ দিই ১৯৭৯ সালে| সংবাদে তখন আমরা ৫ জন নারী| আমার আগে থেকেই সেখানে ছিলেন মাসুমা খানম, নাসিমুন্নাহার নিনি, আখতার জাহান মালিক, রওশন আরা জলি| আমার কাছাকাছি সময়েই নারী পাতার দায়িত্বে যোগ দেন শামীম আখতার (পরে চলচ্চিত্র পরিচালক)|
সংবাদ অফিস তখন ২৬৩, বংশাল রোডে| মানসী সিনেমার উল্টো দিকে| সংবাদের তখন খুব সুনাম ও মর্যাদা| প্রাচীনতম ˆদনিক| শুরুতে মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠিত হলেও ’৫২-র পরে এটি হাত বদল হয়| পরে এর মালিক হন আহমদুল কবির শুরু থেকেই এতে সাংবাদিকরা ছিলেন বামপন্থী| এখানে অনেকেই কমিউনিস্ট বা বাম ঘরানার| বাম আন্দোলনে যুক্ত বলে অনেকেই মাঝে মাঝে কারারুদ্ধ হতেন| কারাগার থেকে কখনও ছাড়া পেলে বেরিয়েই এরা চলে আসতেন সংবাদ অফিসেই|
সংবাদে সমাবেশ ঘটেছিল এক ঝাঁক জ্যোতিষ্কের| এদের মধ্যে ছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন, শহীদুল্লা কায়সার, জহুর হোসেন চৌধুরী, সন্তোষ গুপ্ত, বজলুর রহমান প্রমুখ| দীর্ঘদিন উপ-সম্পাদকীয় লিখেছেন উপরোক্তরা ছাড়াও আবু জাফর শামসুদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, কবি শামসুর রাহমান, বদরুদ্দিন হুসাইন প্রমুখ|
১৯৫১ সালের ১৭ মে দৈনিক সংবাদ প্রকাশিত হয়| সেকালে সংবাদই প্রথম পত্রিকা যেটি বাংলা নাম নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে| তার আগের পত্রিকা ছিল ইত্তেফাক, আজাদ, ইত্তেহাদ, মিল্লাত ইত্যাদি| সংবাদের মাস্টহেড করে দিয়েছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী কামরুল হাসান|
ওপরে যাদের কথা বললাম, তাদের মধ্যে রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন, শহীদুল্লা কায়সার, সন্তোষ গুপ্ত, বজলুর রহমান— ওঁদের কাছে অনেক স্নেহ পেয়েছি| তখনও অবশ্য আমি সংবাদে যোগ দিইনি| আর আমি যে সাংবাদিকতায় আসবো কোনোদিন তাও জানতাম না| তখন তো আমি আন্দোলন-সংগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম| তখন প্রায়ই গিয়েছি কখনও ছাত্র ইউনিয়ন, কখনও মহিলা পরিষদের প্রেস রিলিজ পৌঁছাতে| তারও আগে গিয়েছি খেলাঘরের সভায় যোগ দিতে| সংবাদে আমার দীর্ঘ কবিতাও প্রকাশিত হয়েছে| তখন সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত| তিনি সবসময় আমাদের উৎসাহিত করেছেন| ওঁর স্নেহ আমার কাছে খুবই মূল্যবান|
এখনে বলা দরকার, আবুল হাসনাত ১৯৬৫ সাল থেকেই সংবাদে সাংবাদিকতা করেছে| ওর সঙ্গে ছাত্র ইউনিয়ন করার সুবাদে পরিচয় তো ছিলই| ইতোমধ্যে ১৯৭৪ সালে আমাদের বিয়ে হয়েছে| হাসনাত তখনও সংবাদেই কর্মরত সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে| অবশেষে আমিও সংবাদে কাজ শুরু করলাম ১৯৭৯ সালের ২১ জুলাই| নিউজ ডেস্কে তখন ছিল তিনটি শিফ&ট| সকাল, দুপুর ও রাতের শিফ&ট| রাতের শিফ&ট ছিল ৬টা থেকে রাত ১২টা| ১৫ দিন করে ছিল এক একটি শিফ&ট| দুটি শিফ&ট পরই আমাকে রাতের শিফটে দেয়া হয়| সেই শুরু| সংবাদে ছিলাম ১৯৭৯ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত| ১৩ বছর| জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বহু বছর সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত দেশে কার্ফ্যু বা সান্ধ্য আইন জারি ছিল| বছরের পর বছর তখন কার্ফ্যুর মধ্যে রাতে আমাদের বাড়ি ফিরতে হতো| পুরো রাস্তা সুনসান| কেউ কোথাও নেই| আমরা কয়েকজন মাত্র অফিসের ভাড়া করা অটোরিক্সায় বাড়ি ফিরতাম| অনেক সময় মিলিটারি রাস্তায় থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতো| তখন তারা নারী সাংবাদিক দেখেনি| নারীরা যে সাংবাদিকতা করতে পারে বিশ্বাস করতে পারতো না| তাই অনেক সময় ভুলভাল জেরা করতো| অনেক ঝুঁকি নিয়ে আমরা তখন সংবাদে কাজ করেছি| তবে ঝুঁকি যেমন ছিল, তেমনি কাজটা চ্যালেঞ্জিং বলে থ্রিলও ছিল|
তখন সম্পাদক আহমদুল কবির, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক বজলুর রহমান, বার্তা সম্পাদক আবদুল আওয়াল খান| সন্তোষ গুপ্ত, তোহা খান প্রমুখ সম্পাদকীয় বিভাগে ছিল সহকারী সম্পাদক হিসবে| বার্তা বিভাগে শিফ&ট ইন চার্জ ছিলেন শহীদুল ইসলাম, মোজাম্মেল হোসেন মন্টু ও চপল বাশার| এখানেই আমার মূলধারার সংবাদপত্রের হাতেখড়ি| এপিএনে আমাদের কাছ ছিল বড় বড় নিবন্ধ অনুবাদ করা| মূলত ব্রেজনেভের বক্তৃতা ইত্যাদি অনুবাদ করা| সংবাদপত্রের কাজ আমি সংবাদেই শিখেছি| শিখেছি কাজ করতে করতে| সকলের সহযোগিতা পেয়েছি| আবার কখনও অসহযোগিতাও যে পাইনি তা বলবো না|
প্রতিকূলতাকে জয় করে করে এগিয়ে গিয়েছি| রাতের শিফ&ট ১২ টা পর্যন্ত হলেও প্রায়ই ১টা দেড়টা বেজে যেত| নিয়ম ছিল কাজ শেষ করা পর্যন্ত থাকতে হবে| প্রায়ই অধিক রাত পর্যন্ত থাকতে হতো| ’৭৯ সালেই ভারতের নির্বাচনের সময় আমরা রাত তিনটায় ফিরেছিলাম| ’৭৭-এ ইন্দিরা গান্ধী পরাজিত হবার পর ’৭৯-তে পুনরায় জয়ী হয়ে সংসদে ফিরেছিলেন| সেটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল|
এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর প্রথম দিকে ঢিলেঢালা হলেও পরে কঠিন সামরিক শাসন জারি হয়| সে সময় কার্ফ্যুর মধ্যে অফিস থেকে মাইক্রোবাসে পাঠিয়ে আমাদের আনা হয়| রাতের শিফ&ট ছিল| আমরা বিকাল ৬টায় অফিসে গিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত অফিসেই ছিলাম| মনে পড়ে, অফিস থেকে উল্টোদিকে চাঁদ মিয়ার হোটেলে আমাদের রাতের খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল|
একবার রাতে কাজ করছি| প্রচণ্ড ঝড় হলো| আমাদের কাজ শেষ করতে করতে ১টা দেড়টা হয়েছিল| ঝড়ের পর বিদ্যুত নেই| আমাদের সম্বল সেই ঝরঝরে বেবী ট্যাক্সি| রাস্তায় প্রচুর জল জমে গেছে| নওয়াবপুর দিয়ে গিয়ে গাড়ি আর যেতে পারলো না| গাড়ি ঘুরিয়ে টিপু সুলতান রোডে ঢুকলো| সেখানে হঠাৎ ছিনতাইকারীরা গাড়ি থামালো| আমরা ৫/৬ জন ছিলাম| দিল&ওয়ার, জি. এম ইয়াকুব ভাই ছিলেন| অন্যদের নাম মনে পড়ছে না| ওদের হতে বড় বড় চাপাতি| সবার হাতের ঘড়ি, টাকাপয়সা যা ছিল দিয়ে নিস্তার পাওয়া গেল| তারপর ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফেরা|
আমাদের সহকর্মীরা যারা লেট& নাইট ডিউটি সেরে শেষ রাতে বাড়ি ফিরতেন তাদেরকে প্রায়ই রাস্তার কুকুরের তাড়া খেতে হতো| মন্টুদার কাছে এসব গল্প শুনতাম| আমাদের অবশ্য কুকুরের তাড়া খেতে হয়নি|
২৫ মার্চের পর ২৭ মার্চ সংবাদ অফিস আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল| পাকিস্তানি আর্মি সংবাদ অফিসে আগুন দিয়েছিল| সংবাদ ভবনের সঙ্গে পুড়ে গিয়েছিলেন লেখক শহীদ সাবের| সংবাদ সব সময় গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা ও সমাজ প্রগতির পক্ষে ছিল তাই সংবাদের ওপর ওদের সব আক্রোশ| মুক্তিযুদ্ধের সাড়ে ৯ মাসে সংবাদ আর প্রকাশ হয়নি| বহু হুমকির মুখেও আহমদুল কবির সাহেব তখন পাকিস্তান সরকারের চাপে সংবাদ প্রকাশ করেননি|স্বাধীনতার পর সংবাদ আবার প্রকাশ করা হয়| তখন কোনো রকমে একটি টিনশেড তুলে কাজ শুরু করা হয়| আমি ঐ টিনশেডেই কাজে যোগ দিই| পাশে পুরানো দোতলার জায়গায় ভবন নির্মাণের কাজ চলছিল পরে নির্মীয়মান বহুতল ভবনের দোতলায় আমাদের আমাদের বার্তা বিভাগ ও সম্পাদকীয় বিভাগ স্থানান্তরিত হয়| পরে তিন তলাজুড়ে বড় লাইব্রেরি করা হয়| আহমদুল কবির সাহেবের অনেক সুন্দর সুন্দর পরিকল্পনা ছিল সংবাদকে ঘিরে; তার একটি হলো লাইব্রেরি| পরে অফিস স্থানান্তরের পরে স্থান সংকুলান না হওয়ায় লাইব্রেরিটি ক্রমে ছোট হয়ে যায়| ছোট হতে হতে একসময় বিলুপ্ত হয়ে যায়| এখন আর কিছু নেই| সংবাদের সকল কপি সুন্দর করে ফাইল করা ছিল|
সংবাদ তার বহুদিনের আবাস ২৬৩, বংশাল রোড ছেড়ে ৩৬, পুরানা পল্টনের দোতলায় স্থানান্তরিত হয়| নতুন ঝকঝকে এপার্টমেন্ট ফ্লোর| কবির সহেব আদেশ জারি করেছিলেন কেউ চা খেতে পারবে না| চা পড়ে দাগ লেগে দেয়াল, মেঝে নষ্ট হয়ে যাবে সেজন্য| চা খাওয়া অবশ্য চলতেই থাকলো| সেসব নিয়মের কড়াকড়ি আর ছিল না পরে, কারণ থাকা সম্ভব ছিল না| নিউজে কাজ করব আর চা খাবো না?
আরেকবার আহমদুল কবির সাহেব সংবাদে নোটিশ জারি করেছিলেন সংবাদে চাকরির ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে কেউ বিয়ে করতে পারবে না| কেউ কেই তাই বিয়ের ব্যাপারটা অফিসে গোপন রেখেছিল| নোটিশ দিয়ে বিয়ে কি আর বন্ধ রাখা যায়? মজার ঘটনা হিসাবে এগুলো উল্লেখ করলাম|
তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্পাদক হিসেবে আহমদুল কবিরের এবং সংবাদ পত্রিকার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ| বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ার আন্দোলনে আহমদুল কবির খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন| এ তো ইতিহাসের অংশ| এসব কথা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা উচিত|
এই আন্দোলনে ˆদনিক সংবাদ অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে| এই ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে অমোচনীয়| সংবাদের একজন কর্মী ছিলাম বলে তাই আজও গৌরব বোধ করি| আহমদুল কবির ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির কোষাধ্যক্ষ হিসাবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন| রাজনীতিতেও তিনি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও বাম ঘরানার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন| ১৯৬৪-র দাঙ্গার সময় তিনি তার ব্যবসায়িক অফিস ছেড়ে দিয়েছিলেন দাঙ্গা দমনে নিয়োজিতদের জন্য| অনেককে নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন| দাঙ্গার সময় তিনি রণেশ দাশগুপ্ত, সন্তোষ গুপ্ত প্রমুখ বাম নেতাদের সব সময়ই খোঁজখবর রেখেছেন ও প্রভূত সহযোগিতা করেছেন বলেই জেনেছি|
তিনি সংবাদকে একটা মর্যাদার জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছিলেন| কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার পরে সংবাদ সে জায়গাটা পরে আর ধরে রাখতে পরেনি|
সংবাদ আহমদুল কবির স্মরণে কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন করে না| তার স্মৃতিকে ধরে রাখার কোনো উদ্যোগ নেই| সেই সঙ্গে জহুর হোসেন চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার, রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন, সন্তোষ গুপ্ত, বজলুর রহমান তাদের স্মরণেও কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন করে না এও অত্যন্ত দুঃখজনক|
আমি সংবাদে ছিলাম সংবাদের সবচাইতে উজ্জ্বল সময়ে| সংবাদের সার্কুলেশন তখন ভাল ছিল| কাজেই আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল| সাংবাদিকদের বেতন নিয়মিত ছিল| সংবাদে সাংবাদিকতার একটা মান বজায় রাখার দিকে সব সময়ই নজর দেওয়া হতো|
সংবাদে সাংবাদিক ইউনিয়ন তখন মোটামুটি শক্তিশালীই ছিল| আমি দুটি বড় আন্দোলন দেখেছি ইউনিয়নের উদ্যোগে| একটি বংশালে থাকার সময়| আরেকটি পুরানা পল্টনে আসার পরে| বংশালে আন্দোলন হয়েছিল ৬০% ডি.এ’র দাবিতে| পুরানা পল্টনে আসার পরের আন্দোলনটা হয়েছিল নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পদোন্নতির দাবিতে অনিয়মতান্ত্রিক পদোন্নতি দানের বিরুদ্ধে| সেই সঙ্গে আরও কতগুলো ন্যায্য দাবিদাওয়া ছিল| বিশুদ্ধ খাবার পানির দাবিও তার মধ্যে ছিল| এদুটিই আমার দেখা সংবাদে বড় আন্দোলন|
এই সব আন্দেলনকে ঘিরে মালিকপক্ষের ও সংবাদকর্মীদের অনেক ক্ষুদ্রতাও দেখেছি| সংবাদ জীবনে যেমন অনেক ভাল কিছু দেখেছি, আবার কখনও কখনও অনেক ক্ষুদ্রতাও দেখেছি| আসলে এগুলো বোধহয় জীবনেরই অঙ্গ| এই আন্দোলনের পর সংবাদের ভেতরে গ্রুপিং এত বেশি হয়ে গেল যে, সেখানে থাকা আমার অসহ্য লাগছিল| আর রাতের ডিউটি করতে করতেও ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম| সব মিলিয়ে আমি একটু পরিবর্তন চাইছিলাম মরিয়াভাবে|
তখন সংবাদ ছাড়লাম| সংবাদ সম্পাদক তখন মিশু ভাই (আলতামাশ কবির)| তিনি অবশ্য আমাকে অনুরোধ করেছিলেন থেকে যাবার জন্য| বলেছিলেন, “আমি আপনার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছি না আপনি কাজ করুন|”
সংবাদ ছেড়ে ডানকান ব্রাদার্স বাংলাদেশ লিমিটেড ও পরে জনকণ্ঠে কাজ করেছি| প্রাণের টানে আবারও সংবাদে ফিরেছি| সংবাদ আমাকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে| এবারে কাজ করেছি সম্পাদকীয় বিভাগে সহকারী সম্পাদক এবং সম্পাদকীয় বিভাগের ইন চার্জ হিসাবে| সম্মানের সঙ্গে সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেছি| এখনও আমি নিজেকে সংবাদেরই একজন মনে করি|
সংবাদের সম্পাদকীয় পাতা ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ| বিশেষ করে সংবাদের সাহিত্য সাময়িকী বিভাগ ছিল অত্যন্ত রুচিশীল ও সমৃদ্ধ ও মানসম্পন্ন| আবুল হাসনাতের সুচারু সম্পাদনায় প্রতি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হতো চার পাতার সাহিত্য সাময়িকী| আর কোনো পত্রিকা সাহিত্যের জন্য চারটি পাতা বরাদ্দ করেনি| এত সমৃদ্ধ সাহিত্য পাতাও আর কেউ বের করে না| অনেকে শুধু বৃহস্পতিবারের সাহিত্য সাময়িকীর জন্য সংবাদ রাখতো| মানের ব্যাপারে আবুল হাসনাত এতটাই আপোসহীন ছিলেন যে, আবুল হাসনাতের হাত দিয়ে কোনো কবিতা, গল্প বা প্রবন্ধ প্রকাশিত হলে লেখকরা মনে করতো তারা এখন ভাল লেখক হিসাবে বিবেচিত হবেন| সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে আবুল হাসনাতও যেন এক মিথে পরিণত হন| বহু নামী লেখকের লেখা সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে| সংবাদ অনেক লেখক ˆতরিও করেছে| উৎসাহ দিয়ে, লেখা প্রকাশ করে আবুল হাসনাত লেখার জগতে অনেককে এগিয়ে দিয়েছেন|
মফস্বল সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনও সংবাদেরই সৃষ্টি| চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন তার কাজের মধ্য দিয়ে এক মিথে পরিণত হয়েছেন| আজও তার নাম গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয় এবং হতেই থাকবে|
সংবাদ একটি ঐতিহ্য, একটি প্রতিষ্ঠান| সংবাদকে বলা হয় সাংবাদিকতা শিক্ষার সূতিকাগার| বহু নামী দামী সাংবাদিক এখান থেকে কাজ শিখে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছেন| কৃতী হয়েছেন| সংবাদের ইতিহাস অবশ্যই লিপিবদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়া দরকার| সংবাদের ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায়| কারণ সংবাদ বাংলাদেশের ইতিহাসের অঙ্গ| [পুনর্মুদ্রণ]

আপনার মতামত লিখুন