সংবাদ

৭৬ বছরে সংবাদ / প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা ২০২৬

সাম্যবাদের সংগ্রামের দিশারি ‘সংবাদ’


মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম

সাম্যবাদের সংগ্রামের দিশারি ‘সংবাদ’
শিল্পী : কামরুল হাসান

‘সাম্যবাদের’ জন্য সংগ্রামে, প্রগতির জন্য লড়াইয়ে— ‘সংবাদ’-কে আমি পেয়েছি আমার অনন্য সহযাত্রী হিসেবে| ‘সংবাদ’ ছিল আমার ঘনিষ্ঠ আপনজন— আমার কমরেডতুল্য| ‘সংবাদকে’ ঘিরে আমার অনুভবের সূচনা ঠিক এমনটিই ছিল| ৭ দশক আগের সে কথা| জয়তু ‘সংবাদ’! 

‘সংবাদ’-এর যখন আবির্ভাব ঘটেছিল তখন ছিল পাকিস্তান আমল| পাকিস্তানি শাসকদের তল্পিবাহক সংবাদপত্রের অভাব এদেশে ছিলো না| পত্রিকাগুলো বাঙালির জীবন-সংগ্রামের দাবির চাইতে পাকিস্তানের কর্তা ও প্রতিষ্ঠানের ‘বার্তাবাহক’ হিসেবে কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতো| পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে এমন দুঃসাহস খুম কম সংবাদপত্রই দেখাতে পারতো| মুসলিম লীগের সমর্থক ও মুখপত্র হিসেবে ‘সংবাদ’-এর শুরুটি সেভাবে ঘটেছিল| কিন্তু ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের পরে পরেই ‘সংবাদ’-এর সেই পরিচয় ১৮০ ডিগ্রি বদলে গিয়েছিল| ‘সংবাদ’ ঘুরে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই প্রতিকূল অবস্থার বিপরীতে| পাকিস্তানের গণবিরোধী নীতি ও কাজকর্মের বিরুদ্ধে সেদিন দৃঢ়তা নিয়ে সোচ্চার হয়েছিল ‘সংবাদ’| 

এরপর থেকেই ‘সংবাদ’ হয়ে ওঠে জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক অনন্য হাতিয়ার| সংবাদের জনপ্রিয়তা নতুন মাত্রা অর্জন করে| পাকিস্তানি শাসকদের জাতিগত শোষণ-বঞ্চনা, সাম্রাজ্যবাদকে তোষণ, সাম্প্রদায়িকতা লালন, গণতন্ত্রহীনতা-দমন-পীড়ন প্রভৃতির বিরুদ্ধে সমগ্র বাঙালির ঐক্যই ছিলো ‘সংবাদ’-এর মূল মন্ত্র| এজন্য, ‘বাঙালি জাতির রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ক্রমবিকাশকে’ আমজনতার কাছে পৌঁছে দিতে ‘সংবাদ’ সব সময়ই চেষ্টা করেছে| চেষ্টা করেছে সাম্রাজ্যবাদ-সাম্প্রদায়িকতা-শোষণ-বৈষম্য-অনাচার-দূরাচারের বিরুদ্ধে গণ-সচেতনতা জাগিয়ে তুলতে| সে কারণে ‘সাংবাদ’কে শুধু একটি সংবাদপত্র হিসেবে দেখলে অসম্পূর্ণতা থেকে যাবে| তাকে দেখা উচিত ইতিহাসের দীর্ঘ এক প্রগতিশীল আন্দোলনের পটভূমি রচনা করার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে| 

যে কারণে সেদিন বাঙালি জাতির সংগ্রামকে তার প্রগতিশীল র‌্যাডিকাল উপাদান থেকে বিভাজিত করা যায়নি, ঠিক তেমনি সেদিন আটকানো যায়নি ‘সংবাদ’কেও| আর যায়নি বলেই এই ভূখণ্ডের মানুষের মতোই জয়ী হয়েছে ‘সংবাদ’-এর মিশন| ‘সংবাদের’ মাথায় উঠেছে জয়ের মুকুট| এই জয়ের মুকুট নিয়েই ‘সংবাদ’ পা দিল এবার গৌরবের চুয়াত্তর বছরে| অভিনন্দন| জয়তু সংবাদ! 

পাকিস্তান আমলে ‘সংবাদ’ই ছিল একমাত্র পত্রিকা যার নাম ছিল বাংলায়| অন্য সব বাংলা সংবাদপত্রের নাম ছিল উর্দু বা ফার্সিতে| এটা একটা নির্দেশক| ভাষা আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহে ‘সংবাদ’ যে পরিপূর্ণভাবে প্রবাহিত হয়েছিল এটি তার ¯^াক্ষর ও প্রমাণ|  

আমাদের রাজনৈতিক জীবনের সূচনাকালে ‘সংবাদ’কে আমরা পেয়েছি সাম্যবাদের জন্য সংগ্রামের ঘনিষ্ঠ সহযাত্রী হিসেবেই| সে দিনগুলোর কথাই আজ বেশি মনে পড়ছে| সে সময়ের ভূমিকাই ‘সংবাদ’কে তার অনন্য ˆবশিষ্ট্যে ভূষিত করেছে| পাকিস্তান আমলে বাম রাজনীতিতে যখন আমাদের প্রথম হাতেখড়ি হয়, তখন ছাত্র ইউনিয়ন অথবা গোপন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব থেকে আমাদেরকে অনেক কিছুই করতে বলা হতো| তার মধ্যে নিয়মিত ‘দৈনিক সংবাদ’ পাঠের কথাও ছিল| বাজারে তখন আরও অনেকগুলো ইংরেজি-বাংলা পত্রিকা থাকলেও ‘সংবাদ’ পাঠ করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমাদের বলা হতো— এই পত্রিকাটি পাঠ করলে যে কোনো স্থানীয় ও বৈদেশিক চলমান ঘটনাবলির প্রগতিশীল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পাওয়া যায়| পার্টির আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণমূলক অনেক লেখাও বেনামে ‘সংবাদ’-এর পাতায় ছাপা হতো| তাই ‘সংবাদ’ পাঠ করা রাজনীতি জানা-বোঝার জন্য অত্যাবশ্যক| ফলে আমাদের সময়কালের অন্যান্য বামপন্থী ও দেশপ্রেমিক-গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্টদের মতো আমার রাজনৈতিক জীবনে গোড়া থেকেই ‘সংবাদ’ পত্রিকার সঙ্গে ছিল নিবিড় যূথবদ্ধতা| পিছন ফিরে তাকালে ‘সংবাদ’ নিয়ে স্মৃতির অগলিত সমাহার দেখতে পাই| 

‘সংবাদ’ শুধু নিছক একটি ‘সংবাদপত্র’-ই ছিল না| ‘সংবাদ’ হয়ে উঠেছিল এদেশের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্রও| ‘সংবাদ’-এর আলো-বাতাস পেয়ে দেশের অনেক প্রগতিশীল লেখক ˆতরি হয়েছে| প্রবীন অনেকের স্নেহ-প্রশ্রয়ে বিকশিত হয়েছে নবীনের পত্র-পল্লব| রাজনৈতিক আন্দোলনেও ‘সংবাদ’-এর অফিস নানাভাবে ব্যবহৃত হয়েছে| আন্ডারগ্রাউন্ড কমিউনিস্ট পার্টির অনেক নেতা-কর্মীই জেল থেকে বের হয়ে তৎক্ষণাৎ অন্য কোথাও ঠাঁই না মিললেও, ‘সংবাদ’-এর দ্বার তারা সবসময় খোলা পেয়েছে| অনেক রাজনৈতিক ঘটনার জন্ম হয়েছে এই অফিসে বসেই| অন্যত্র কোনো জায়গায় গোপনে একসাথে মিলিত হতে অসুবিধা থাকলে রাজনৈতিক যোগাযোগের একটা উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচিত ও ব্যবহৃত হতো ‘সংবাদ’ অফিস| যেমন কিনা, উদাহরণ হিসেবে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়| ষাট-এর দশকের শুরুতে আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে একযোগে আন্দোলন করার জন্য গোপন কমিউনিস্ট পার্টির আত্মগোপনে থাকা নেতৃবৃন্দের সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গোপন ˆবঠকের ব্যবস্থা করার কাজে যারা লিয়াজোঁ করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ‘সংবাদ’-এর একজন কর্মকর্তা| 

একটি গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রাদায়িক সরকারবিরোধী প্রগতিশীল বাম ধারার পত্রিকা হিসেবে ভূমিকা পালন করার পাশাপাশি নানা ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতার অপ্রকাশ্য কেন্দ্র হয়ে ওঠার কারণে ‘সংবাদ’ হয়ে ওঠে শত্রুদের বিশেষত মুসলিম লীগের আক্রমণের এক ন¤^র টার্গেট| এদের ক্যাডাররা মাঝে মাঝেই ‘সংবাদ’ অফিসে আক্রমণ করত| মনে আছে, সে সময় আমরা কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতা-কর্মীরা রাত জেগে ‘সংবাদ’ অফিস পাহারা দিতাম| কিন্তু ‘সংবাদ’-এর বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষের চরম আঘাত নেমে এসেছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম প্রহরেই| ‘সংবাদ’-এর বংশালের প্রেসে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল| সেখানেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছিলেন প্রখ্যাত কবি-গল্পকার শহীদ সাবের| 

‘সংবাদ’-এর ঐতিহাসিক ভূমিকাকে বুঝতে হলে পুঁজিবাদী সমাজে সংবাদপত্রের স্বাভাবিক চরিত্রের প্রেক্ষাপটে ‘সংবাদের’ ভিন্নতর অনন্যতাকে বুঝতে হবে| শতাব্দিকালেরও বেশি সময় আগে প্রখ্যাত আমেরিকান চিন্তাবিদ উপটন সিনক্লেয়ার লিখেছিলেন— Politics, Journalism, and Big Business work hand in hand for the hoodwinking of the public and the plundering of labour.’ [Upton Sinclair / The Brass Check, (1919)]

[“জনগণকে বিভ্রান্ত করতে এবং শ্রমিকদের শোষণ করতে রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও বৃহৎ পুঁজি হাত ধরাধরি করে চলে”| উপটন সিনক্লেয়ার/দি ব্রাস চেক (১৯১৯)]

বিশিষ্ট মার্কিন বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি তাঁর ‘ক্লাস ওয়ারফেয়ার’ (১৯৯৬) গ্রন্থে অ্যালেক্স কেরির ‘চেঞ্জিং পাবলিক ওপিনিয়ন : দ্য কর্পোরেট অফেন্সিভ’ শীর্ষক রচনাটিতে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন : ‘বিংশ শতাব্দীতে গণতন্ত্র সম্পর্কে প্রধান তিনটি ঘটনা হলো সার্বজনীন ভোটাধিকার, বৃহৎ কর্পোরেশনের উদ্ভব এবং কর্পোরেট প্রোপাগাণ্ডা’ | এবং, নোয়াম চমস্কির মতে, ‘কর্পোরেট প্রোপাগাণ্ডার উদ্ভব ও বিকাশ গণতন্ত্রকে খর্ব করে... এটি সৃষ্টি করা হয়েছে ‘জনসাধারণের মনোজগৎকে নিয়ন্ত্রিত’ করার প্রয়োজনে| কারণ, তারা উপলব্ধি করেছে যে জনসাধারণের মনোজগৎ শিল্পপতিদের সামনে সবচেয়ে বড় বিপত্তির কারণ হয়ে দেখা দেবে এবং তারা বুঝে গেছে, গণতন্ত্র হলো যদৃচ্ছ বেসরকারি শাসন ক্ষমতার কাছে বিপজ্জনক|”

এছাড়াও, নোয়াম চমস্কি ১৯৯৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর ‘প্রোপাগাণ্ডা অ্যান্ড কন্ট্রোল অব দ্য পাবলিক মাইন্ড’ শীর্ষক এক বেতার ভাষণে বলেছেন : ‘এর লক্ষ্য হলো জনগণের ভূমিকার গুরুত্ব হ্রাস করা| তাঁদের জীবনকে বদলে দিতে পারে এমন সামাজিক ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্র থেকে জনগণকে সরিয়ে নিয়ে আসা এবং তাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে একে অপরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া|’

‘সংবাদ’ এদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে ওঠা মতাদর্শের হাতিয়ার| ‘সংবাদ’ সাম্যবাদের জন্য সংগ্রামের দিশারি| এই পরিচয়েই ‘সংবাদ’কে চিনেছিলাম, জেনেছিলাম| জানি, আজকের যুগে সংবাদপত্র মানেই শঙ্খ ঘোষের সেই বিখ্যাত কবিতার ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’| যে পরিচয়ে ও চেহারায় একসময় ‘সংবাদকে’ চিনেছিলাম-জেনেছিলাম, তা হুবহু তেমনটি আজ নেই| বদলে গেছে অনেক কিছু| তা সত্ত্বেও, একথা নির্দ্বিধায় বলবো— প্রথম পরিচয়ে যে ‘সংবাদ’-কে জেনেছিলাম, আপন করে নিয়েছিলাম, সেটাই গেঁথে আছে মনের গভীরে| যতোই বদলে যাক না কেন, তারপরেও ‘সংবাদ’... ‘সংবাদ’ই| আমাদের ভালোলাগা, ভালবাসার আধার| স্মৃতি জাগানিয়া ‘সমুজ্জ্বল সুবাতাস’| জয় হোক ‘সংবাদের’| [পুনর্মুদ্রণ]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬


সাম্যবাদের সংগ্রামের দিশারি ‘সংবাদ’

প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুন ২০২৬

featured Image

‘সাম্যবাদের’ জন্য সংগ্রামে, প্রগতির জন্য লড়াইয়ে— ‘সংবাদ’-কে আমি পেয়েছি আমার অনন্য সহযাত্রী হিসেবে| ‘সংবাদ’ ছিল আমার ঘনিষ্ঠ আপনজন— আমার কমরেডতুল্য| ‘সংবাদকে’ ঘিরে আমার অনুভবের সূচনা ঠিক এমনটিই ছিল| ৭ দশক আগের সে কথা| জয়তু ‘সংবাদ’! 

‘সংবাদ’-এর যখন আবির্ভাব ঘটেছিল তখন ছিল পাকিস্তান আমল| পাকিস্তানি শাসকদের তল্পিবাহক সংবাদপত্রের অভাব এদেশে ছিলো না| পত্রিকাগুলো বাঙালির জীবন-সংগ্রামের দাবির চাইতে পাকিস্তানের কর্তা ও প্রতিষ্ঠানের ‘বার্তাবাহক’ হিসেবে কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতো| পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে এমন দুঃসাহস খুম কম সংবাদপত্রই দেখাতে পারতো| মুসলিম লীগের সমর্থক ও মুখপত্র হিসেবে ‘সংবাদ’-এর শুরুটি সেভাবে ঘটেছিল| কিন্তু ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের পরে পরেই ‘সংবাদ’-এর সেই পরিচয় ১৮০ ডিগ্রি বদলে গিয়েছিল| ‘সংবাদ’ ঘুরে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই প্রতিকূল অবস্থার বিপরীতে| পাকিস্তানের গণবিরোধী নীতি ও কাজকর্মের বিরুদ্ধে সেদিন দৃঢ়তা নিয়ে সোচ্চার হয়েছিল ‘সংবাদ’| 

এরপর থেকেই ‘সংবাদ’ হয়ে ওঠে জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক অনন্য হাতিয়ার| সংবাদের জনপ্রিয়তা নতুন মাত্রা অর্জন করে| পাকিস্তানি শাসকদের জাতিগত শোষণ-বঞ্চনা, সাম্রাজ্যবাদকে তোষণ, সাম্প্রদায়িকতা লালন, গণতন্ত্রহীনতা-দমন-পীড়ন প্রভৃতির বিরুদ্ধে সমগ্র বাঙালির ঐক্যই ছিলো ‘সংবাদ’-এর মূল মন্ত্র| এজন্য, ‘বাঙালি জাতির রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ক্রমবিকাশকে’ আমজনতার কাছে পৌঁছে দিতে ‘সংবাদ’ সব সময়ই চেষ্টা করেছে| চেষ্টা করেছে সাম্রাজ্যবাদ-সাম্প্রদায়িকতা-শোষণ-বৈষম্য-অনাচার-দূরাচারের বিরুদ্ধে গণ-সচেতনতা জাগিয়ে তুলতে| সে কারণে ‘সাংবাদ’কে শুধু একটি সংবাদপত্র হিসেবে দেখলে অসম্পূর্ণতা থেকে যাবে| তাকে দেখা উচিত ইতিহাসের দীর্ঘ এক প্রগতিশীল আন্দোলনের পটভূমি রচনা করার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে| 

যে কারণে সেদিন বাঙালি জাতির সংগ্রামকে তার প্রগতিশীল র‌্যাডিকাল উপাদান থেকে বিভাজিত করা যায়নি, ঠিক তেমনি সেদিন আটকানো যায়নি ‘সংবাদ’কেও| আর যায়নি বলেই এই ভূখণ্ডের মানুষের মতোই জয়ী হয়েছে ‘সংবাদ’-এর মিশন| ‘সংবাদের’ মাথায় উঠেছে জয়ের মুকুট| এই জয়ের মুকুট নিয়েই ‘সংবাদ’ পা দিল এবার গৌরবের চুয়াত্তর বছরে| অভিনন্দন| জয়তু সংবাদ! 

পাকিস্তান আমলে ‘সংবাদ’ই ছিল একমাত্র পত্রিকা যার নাম ছিল বাংলায়| অন্য সব বাংলা সংবাদপত্রের নাম ছিল উর্দু বা ফার্সিতে| এটা একটা নির্দেশক| ভাষা আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহে ‘সংবাদ’ যে পরিপূর্ণভাবে প্রবাহিত হয়েছিল এটি তার ¯^াক্ষর ও প্রমাণ|  

আমাদের রাজনৈতিক জীবনের সূচনাকালে ‘সংবাদ’কে আমরা পেয়েছি সাম্যবাদের জন্য সংগ্রামের ঘনিষ্ঠ সহযাত্রী হিসেবেই| সে দিনগুলোর কথাই আজ বেশি মনে পড়ছে| সে সময়ের ভূমিকাই ‘সংবাদ’কে তার অনন্য ˆবশিষ্ট্যে ভূষিত করেছে| পাকিস্তান আমলে বাম রাজনীতিতে যখন আমাদের প্রথম হাতেখড়ি হয়, তখন ছাত্র ইউনিয়ন অথবা গোপন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব থেকে আমাদেরকে অনেক কিছুই করতে বলা হতো| তার মধ্যে নিয়মিত ‘দৈনিক সংবাদ’ পাঠের কথাও ছিল| বাজারে তখন আরও অনেকগুলো ইংরেজি-বাংলা পত্রিকা থাকলেও ‘সংবাদ’ পাঠ করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমাদের বলা হতো— এই পত্রিকাটি পাঠ করলে যে কোনো স্থানীয় ও বৈদেশিক চলমান ঘটনাবলির প্রগতিশীল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পাওয়া যায়| পার্টির আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণমূলক অনেক লেখাও বেনামে ‘সংবাদ’-এর পাতায় ছাপা হতো| তাই ‘সংবাদ’ পাঠ করা রাজনীতি জানা-বোঝার জন্য অত্যাবশ্যক| ফলে আমাদের সময়কালের অন্যান্য বামপন্থী ও দেশপ্রেমিক-গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্টদের মতো আমার রাজনৈতিক জীবনে গোড়া থেকেই ‘সংবাদ’ পত্রিকার সঙ্গে ছিল নিবিড় যূথবদ্ধতা| পিছন ফিরে তাকালে ‘সংবাদ’ নিয়ে স্মৃতির অগলিত সমাহার দেখতে পাই| 

‘সংবাদ’ শুধু নিছক একটি ‘সংবাদপত্র’-ই ছিল না| ‘সংবাদ’ হয়ে উঠেছিল এদেশের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্রও| ‘সংবাদ’-এর আলো-বাতাস পেয়ে দেশের অনেক প্রগতিশীল লেখক ˆতরি হয়েছে| প্রবীন অনেকের স্নেহ-প্রশ্রয়ে বিকশিত হয়েছে নবীনের পত্র-পল্লব| রাজনৈতিক আন্দোলনেও ‘সংবাদ’-এর অফিস নানাভাবে ব্যবহৃত হয়েছে| আন্ডারগ্রাউন্ড কমিউনিস্ট পার্টির অনেক নেতা-কর্মীই জেল থেকে বের হয়ে তৎক্ষণাৎ অন্য কোথাও ঠাঁই না মিললেও, ‘সংবাদ’-এর দ্বার তারা সবসময় খোলা পেয়েছে| অনেক রাজনৈতিক ঘটনার জন্ম হয়েছে এই অফিসে বসেই| অন্যত্র কোনো জায়গায় গোপনে একসাথে মিলিত হতে অসুবিধা থাকলে রাজনৈতিক যোগাযোগের একটা উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচিত ও ব্যবহৃত হতো ‘সংবাদ’ অফিস| যেমন কিনা, উদাহরণ হিসেবে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়| ষাট-এর দশকের শুরুতে আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে একযোগে আন্দোলন করার জন্য গোপন কমিউনিস্ট পার্টির আত্মগোপনে থাকা নেতৃবৃন্দের সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গোপন ˆবঠকের ব্যবস্থা করার কাজে যারা লিয়াজোঁ করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ‘সংবাদ’-এর একজন কর্মকর্তা| 

একটি গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রাদায়িক সরকারবিরোধী প্রগতিশীল বাম ধারার পত্রিকা হিসেবে ভূমিকা পালন করার পাশাপাশি নানা ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতার অপ্রকাশ্য কেন্দ্র হয়ে ওঠার কারণে ‘সংবাদ’ হয়ে ওঠে শত্রুদের বিশেষত মুসলিম লীগের আক্রমণের এক ন¤^র টার্গেট| এদের ক্যাডাররা মাঝে মাঝেই ‘সংবাদ’ অফিসে আক্রমণ করত| মনে আছে, সে সময় আমরা কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতা-কর্মীরা রাত জেগে ‘সংবাদ’ অফিস পাহারা দিতাম| কিন্তু ‘সংবাদ’-এর বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষের চরম আঘাত নেমে এসেছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম প্রহরেই| ‘সংবাদ’-এর বংশালের প্রেসে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল| সেখানেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছিলেন প্রখ্যাত কবি-গল্পকার শহীদ সাবের| 

‘সংবাদ’-এর ঐতিহাসিক ভূমিকাকে বুঝতে হলে পুঁজিবাদী সমাজে সংবাদপত্রের স্বাভাবিক চরিত্রের প্রেক্ষাপটে ‘সংবাদের’ ভিন্নতর অনন্যতাকে বুঝতে হবে| শতাব্দিকালেরও বেশি সময় আগে প্রখ্যাত আমেরিকান চিন্তাবিদ উপটন সিনক্লেয়ার লিখেছিলেন— Politics, Journalism, and Big Business work hand in hand for the hoodwinking of the public and the plundering of labour.’ [Upton Sinclair / The Brass Check, (1919)]

[“জনগণকে বিভ্রান্ত করতে এবং শ্রমিকদের শোষণ করতে রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও বৃহৎ পুঁজি হাত ধরাধরি করে চলে”| উপটন সিনক্লেয়ার/দি ব্রাস চেক (১৯১৯)]

বিশিষ্ট মার্কিন বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি তাঁর ‘ক্লাস ওয়ারফেয়ার’ (১৯৯৬) গ্রন্থে অ্যালেক্স কেরির ‘চেঞ্জিং পাবলিক ওপিনিয়ন : দ্য কর্পোরেট অফেন্সিভ’ শীর্ষক রচনাটিতে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন : ‘বিংশ শতাব্দীতে গণতন্ত্র সম্পর্কে প্রধান তিনটি ঘটনা হলো সার্বজনীন ভোটাধিকার, বৃহৎ কর্পোরেশনের উদ্ভব এবং কর্পোরেট প্রোপাগাণ্ডা’ | এবং, নোয়াম চমস্কির মতে, ‘কর্পোরেট প্রোপাগাণ্ডার উদ্ভব ও বিকাশ গণতন্ত্রকে খর্ব করে... এটি সৃষ্টি করা হয়েছে ‘জনসাধারণের মনোজগৎকে নিয়ন্ত্রিত’ করার প্রয়োজনে| কারণ, তারা উপলব্ধি করেছে যে জনসাধারণের মনোজগৎ শিল্পপতিদের সামনে সবচেয়ে বড় বিপত্তির কারণ হয়ে দেখা দেবে এবং তারা বুঝে গেছে, গণতন্ত্র হলো যদৃচ্ছ বেসরকারি শাসন ক্ষমতার কাছে বিপজ্জনক|”

এছাড়াও, নোয়াম চমস্কি ১৯৯৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর ‘প্রোপাগাণ্ডা অ্যান্ড কন্ট্রোল অব দ্য পাবলিক মাইন্ড’ শীর্ষক এক বেতার ভাষণে বলেছেন : ‘এর লক্ষ্য হলো জনগণের ভূমিকার গুরুত্ব হ্রাস করা| তাঁদের জীবনকে বদলে দিতে পারে এমন সামাজিক ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্র থেকে জনগণকে সরিয়ে নিয়ে আসা এবং তাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে একে অপরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া|’

‘সংবাদ’ এদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে ওঠা মতাদর্শের হাতিয়ার| ‘সংবাদ’ সাম্যবাদের জন্য সংগ্রামের দিশারি| এই পরিচয়েই ‘সংবাদ’কে চিনেছিলাম, জেনেছিলাম| জানি, আজকের যুগে সংবাদপত্র মানেই শঙ্খ ঘোষের সেই বিখ্যাত কবিতার ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’| যে পরিচয়ে ও চেহারায় একসময় ‘সংবাদকে’ চিনেছিলাম-জেনেছিলাম, তা হুবহু তেমনটি আজ নেই| বদলে গেছে অনেক কিছু| তা সত্ত্বেও, একথা নির্দ্বিধায় বলবো— প্রথম পরিচয়ে যে ‘সংবাদ’-কে জেনেছিলাম, আপন করে নিয়েছিলাম, সেটাই গেঁথে আছে মনের গভীরে| যতোই বদলে যাক না কেন, তারপরেও ‘সংবাদ’... ‘সংবাদ’ই| আমাদের ভালোলাগা, ভালবাসার আধার| স্মৃতি জাগানিয়া ‘সমুজ্জ্বল সুবাতাস’| জয় হোক ‘সংবাদের’| [পুনর্মুদ্রণ]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত