বাংলাদেশে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ দৈনিক ‘সংবাদ’ এবছর ১৭ মে ৭৬ বছরে পা রেখেছে| ‘সংবাদ’-এর এই ৭৬ বছরে পা দেয়া একটি গৌরবের প্রেক্ষাপট যেমন ˆতরি করেছে তেমনি প্রতিদিন ‘সংবাদ’ পাঠকদের সামনে বাংলাদেশকে তুলে ধরেছে| এ জন্য ৭৫ বছর পেরিয়ে ৭৬ বছরে পদার্পণ করা শুধু যারা পাঠক, যারা কর্মী এবং যারা ‘সংবাদ’-এর কর্ণধার, শুধু তাদের জন্যই নয়, দেশের সাংবাদিক সমাজ এবং অসাম্প্রদায়িক, উদার গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল মানুষ— সবার জন্যই একটি গৌরবের অধ্যায় ˆতরি করেছে|
সংবাদ পথচলা শুরুর মাত্র তিন বছর পর থেকেই ছিল অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চেতনার বাহক| যে কথাটি এক্ষেত্রে বলা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হলো, ‘সংবাদ’ ও তার কর্ণধাররা সংবাদপত্র প্রকাশের নতুন ধ্যান-ধারণাকে শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, তা ছড়িয়ে দিয়েছেন সর্বব্যাপী| ‘সংবাদ’-পরবর্তী সব সংবাদপত্র প্রকাশনাই একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত ছিল ‘সংবাদ’-এর পথ অনুসরণকারী| অনেকেই পরে নতুন চেতনা যুক্ত করে সংবাদপত্র প্রকাশ করতে সচেষ্ট হয়েছেন| কিন্তু তাদের অধিকাংশেরই শুরুর ভিত ˆতরি হয়েছিল ‘সংবাদ’-এর আদর্শকে ধারণ করেই|
‘সংবাদ’-এর সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়ের কর্ণধার ছিলেন আহমদুল কবির| তিনি ‘সংবাদ’কে পূর্ব পাকিস্তানের, পরে বাংলাদেশের অবহেলিত মানুষের মুখপত্রে পরিণত করেছিলেন| এক্ষেত্রে তার সবচেয়ে বড় পুঁজি ছিল উদার প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা ও আদর্শ| জমিদার পরিবার থেকে উঠে আসা এই কৃতি পুরুষ তাঁর মালিকানাধীন সংবাদপত্রকে রাজনৈতিক অধিকার বঞ্চিত, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে শোষিত গণমানুষের সংবাদপত্র হিসেবে দাঁড় করাতে যেভাবে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিকূলতাকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছেন তা একটি আদর্শ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে বাংলাদেশের সংবাদপত্র শিল্পে|
আমরা যখন সাধারণভাবে কোনো সভায় বা সেমিনারে সংবাদপত্র সম্পর্কে তাত্ত্বিক আলোচনা করি তখন প্রায়ই বলি সংবাদপত্র হচ্ছে সমাজের দর্পণ| আমাদের চারপাশে প্রতিদিন যা কিছু ঘটে তার প্রতিফলন দেখা যায় সংবাদপত্রে| সংবাদপত্রকে আবার সহজ ভাষায় বলি ‘খবরের কাগজ’ অর্থাৎ যেখানে শুধু খবর নিয়েই সব কর্মকাণ্ড| এ কথাকে বাস্তবে প্রমাণ করেছে দীর্ঘকাল ধরে এই বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রকাশিত সব সংবাদপত্রই| ˆদনিক ‘সংবাদ’ সেই শুরু থেকেই ছিল সত্যিকার অর্থেই সমাজের আয়না| ‘সংবাদ’-এর প্রতিটি পাতা চোখের সামনে মেলে ধরলে সমাজকে দেখা যেত, দেশের বহমান সময়ের একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যেত| দীর্ঘ পথ চলতে চলতে সংবাদ এখন বয়সের ৭৬ বছরে পা রাখছে, এখনো সংবাদ সমাজের আয়না হিসেবেই আছে| দেশ ও সমাজের নানা ইতিবাচক ও নেতিবাচক পরিবর্তনের নানা ঘটনার পরও ‘সংবাদ’ পাল্টায়নি, তার সেই ‘সমাজের আয়না’ চরিত্র এখনো ধরে রেখেছে| যাঁরা এখন সংবাদের কর্ণধার, আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার মানসিকতা তাদের নেই| সময়ে সময়ে তাঁরা সগর্বে সেই কথা জানিয়ে দিয়েছেন|
‘সংবাদ’ যে গৌরববোধ দীর্ঘ ৭৫ বছরের পথচলায় অর্জন করেছে তার মধ্য দিয়েই ‘সংবাদ’ এই সমাজে জীবন সংগ্রামে বিজয়ী এবং সংগ্রামরত মানুষের সংবাদপত্র হিসেবে যেমন, তেমনি সাংবাদিকতা পেশার একটি বস্তুনিষ্ঠ আদর্শিক চেতনা হিসেবেও সগর্বে উজ্জীবিত রেখেছে|
দীর্ঘ পথযাত্রায় ‘সংবাদ’ বাংলাদেশে সাংবাদিকতার পথ প্রদর্শক হিসেবেও অবদান রেখেছে বললে বেশি বলা হবে না| অনেক সাংবাদিককে পেমাগতভাবে ˆতরি করা, বস্তুনিষ্ঠ পেশাদারিত্বের দিক নির্দেশনা দেয়া— এটা ‘সংবাদ’-এর আজীবনের আদর্শ ছিল, এখনও আছে| ‘সংবাদ’ কর্তৃপক্ষ এই আদর্শ দেশকাল ও সময়ের প্রয়োজনে সচেতনভাবে গ্রহণ করেছিলেন|
বাংলাদেশে সংবাদপত্রকে অনেকেই বিত্তবৈভব অর্জনের পথ হিসেবে ব্যবহার করেছেন| এখনো করছেন বললে অত্যুক্তি হবে না| এক্ষেত্রে সংবাদের কর্ণধারদের ব্যতিক্রম হিসেবে উল্লেখ করা যায়| তারা কেউ সংবাদপত্রকে বাণিজ্য করার ইচ্ছায় কখনোই ব্যবহার করেননি| সাংবাদিকতার সঙ্গে, সংবাদপত্র শিল্পের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যকে গুলিয়ে ফেলেননি তাঁরা, গুলিয়ে ফেলতে চাননি কখনোই| এখানে বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, এখানেই ‘সংবাদ’ কর্তৃপক্ষের স্বকীয়তা, ভিন্নমাত্রা| আর এটা তারা লালন করে আসছেন নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়েও| দুঃসহ সময় পেরিয়েছেন, বিরূপ অবস্থা মোকাবেলা করেছেন, দুর্যোগ-দুর্বিপাকেও পড়েছেন, কিন্তু পথ থেকে সরে যাননি|
এই যে সংবাদ কর্তৃপক্ষের কর্মনিষ্ঠা, বস্তুনিষ্ঠ নীতি-আদর্শ তা সংবাদের জন্মলগ্নের কিছুদিন পর থেকেই চলে আসছে| এই আদর্শ সংবাদ প্রকাশনার প্রথম দিকে যেমন ছিল এখন সাড়ে সাত দশকের পথ পরিক্রমার পরও একই সত্য প্রতিভাত হয় ‘সংবাদ’ সম্পর্কে আলোচনার সময়| কালের যাত্রায় এই জনপদের সমাজ, রাজনীতি ও মানবিক চিন্তার আদর্শিক অবক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদের প্রচার-প্রসারে হয়তো কিছুটা হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটেছে, কিন্তু আদর্শের পথে অবিরাম চলার বাতিক পরিবর্তন হয়নি| আর এখানেই বস্তুনিষ্ঠ কাজের প্রতি ‘সংবাদ’-এর দায়িত্বশীলতার উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায়|
বাংলাভাষী অধ্যুষিত এই ভূখণ্ডে সংবাদপত্র প্রকাশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সংবাদপত্রের উদ্ভব হয়েছিল এই অঞ্চল থেকেই| কিন্তু এর বিকাশের ধারা সমৃদ্ধ হয়েছে বৃটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতায়| সেখানেই বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বিত্তবৈভব বিকাশের সঙ্গে সংবাদপত্রও তার অবয়ব এবং চরিত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল| সেই সময়ে এই অঞ্চলের, বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের মানুষের, বিদ্যার্জন থেকে শুরু করে রুটি-রুজির বড় ঠিকানা ছিল কলকাতা| সংবাদপত্র প্রকাশ ও বিকাশও সেখানেই শুরু হয়| বৃটিশদের বিতারণ এবং ভারত বিভক্তির পর কলকাতার জৌলুসে ভাটা পড়ে এবং নতুন দেশে নতুন আর্থ-সামাজিক পরিবেশ ˆতরি হয় পূর্ববঙ্গের ঢাকায়, সংবাদপত্র শিল্পও নতুন মাত্রা পায়| কলকাতার সমাজে যেভাবে এবং যে প্রয়োজনে সংবাদপত্র তার অবয়ব তৈরি করেছিল ঢাকায় তা পরিবর্তিত হয়ে গেলো বাস্তবতার ছোঁয়ায়| ভারত বিভক্তির পর কলকাতায় স্থিতিশীল সামাজিক অবস্থান সৃষ্টি হয়, সমান্তরাল ধারায় বিকশিত হয় সংবাদপত্রও|
কিন্তু ঢাকার বাস্তবতা ছিল ভিন্ন| এখানকার অধিকাংশ কর্মপ্রয়াসের শুরু বিভাগপূর্ব কলকাতায় হলেও পূর্ব পাকিস্তানে সেই সব কিছু কলকাতা থেকে অনেকটা ভিন্নভাবে পথচলা শুরু করে| সংবাদপত্রও তার ব্যতিক্রম ছিল না| দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান এবং তার এক অংশ বৃটিশ ভারতের পূর্ববঙ্গ ‘পূর্ব পাকিস্তান’ হিসেবে আবির্ভূত হয়| পূর্ববঙ্গ ‘পূর্ব পাকিস্তান’ হলেও সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ রাখেনি পাকিস্তানি বিজাতীয় শাসকরা| পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতে থাকে| তার প্রভাব পড়ে এখানকার রাজনীতিতে| রাজনীতি হয়ে ওঠে ‘এন্টি পাকিস্তানি’, পাকিস্তানি শাসন-শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদী রাজনীতি| কলকাতায় যে রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি ছিল ঢাকার পরিস্থিতি হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের| এটা ছিল নতুন বাস্তবতা| ফলে এখানে এনে কলকাতার সংবাদপত্র নতুন করে প্রকাশ এবং নতুন সংবাদপত্র প্রকাশ, বিকাশ— এসব কর্ম সম্পাদনের সময় এবং নতুন বাস্তবতার অধিবাসীসহ সকল শ্রেণির পাঠকদের কাছে আরো বেশি ও ভিন্ন মাত্রায় সমকালীন আর্থ-সামাজিক অবস্থা তুলে ধরার লক্ষ্যে সাংবাদিকতার আদর্শ ও নীতি ˆনতিকতা ˆতরির প্রয়োজন অনুভূত হয়| এই অনুভবের সূতিকাগার ছিল ‘সংবাদ’| ‘সংবাদ’ই প্রথম সাংবাদিকতার ভিন্ন রূপ তুলে ধরেছে পাঠকদের সামনে|
কলকাতাভিত্তিক সংবাদপত্র যেগুলো পরে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়েছিল তার মধ্যে ছিল বলা যায় আজাদ, মিল্লাত, ইত্তেহাদ-এর নাম| এসব সংবাদপত্রের আদর্শ ছিল অনেকটা ধর্মীয় চেতনাভিত্তিক| কলকাতায় পূর্ববঙ্গের বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে এসব সংবাদপত্র চরম জাগরণ সৃষ্টি করেছিল| অন্য কথায় বলা যায় বাঙালি পাঠক এবং ধর্মীয় চেতনায় অভিষিক্ত মানুষদের জাগিয়ে তুলতে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছে এই ধারার সংবাদপত্রগুলো| কিন্তু অসাম্প্রদায়িক ও উদার গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনা ও প্রগতিশীল মানসিকতা এই শ্রেণির সংবাদপত্রের মধ্যে ছিল বলা যায় না, থাকলেও তা ছিল ছোট্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ|
ঢাকায় নতুন সংবাদপত্র প্রকাশের সময় ‘সকল মানুষের জন্য’ সংবাদপত্রকে সাজানো ছিল তখনকার সামাজিক বাস্তবতা এবং চাহিদা| কিন্তু কলকাতা থেকে ঢাকায় আসা সংবাদপত্রে তার প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়নি| ফলে সে ধারা থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়োজন দেখা দেয়| আর কলকাতার বলয় থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়টি নিয়ে সংবাদপত্রের অনেক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব অনেক চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সফল হয়েছেন আহমদুল কবির| তার হাত ধরে ‘সংবাদ’ সেই কাজটি করতে পেরেছে| তিনি দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সংবাদপত্র প্রকাশ করেছেন|
‘সংবাদ’ দীর্ঘ দিন ধরেই খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠতা, অসাম্প্রদায়িকতা, গণতান্ত্রিক এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও মুক্ত চিন্তা-চেতনাকে ধারণ করে পথ চলেছে, ভবিষ্যতেও চলবে— সংবাদের ৭৬তম জন্মদিনে এই প্রত্যাশা আমাদের সবার|

বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুন ২০২৬
বাংলাদেশে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ দৈনিক ‘সংবাদ’ এবছর ১৭ মে ৭৬ বছরে পা রেখেছে| ‘সংবাদ’-এর এই ৭৬ বছরে পা দেয়া একটি গৌরবের প্রেক্ষাপট যেমন ˆতরি করেছে তেমনি প্রতিদিন ‘সংবাদ’ পাঠকদের সামনে বাংলাদেশকে তুলে ধরেছে| এ জন্য ৭৫ বছর পেরিয়ে ৭৬ বছরে পদার্পণ করা শুধু যারা পাঠক, যারা কর্মী এবং যারা ‘সংবাদ’-এর কর্ণধার, শুধু তাদের জন্যই নয়, দেশের সাংবাদিক সমাজ এবং অসাম্প্রদায়িক, উদার গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল মানুষ— সবার জন্যই একটি গৌরবের অধ্যায় ˆতরি করেছে|
সংবাদ পথচলা শুরুর মাত্র তিন বছর পর থেকেই ছিল অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চেতনার বাহক| যে কথাটি এক্ষেত্রে বলা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হলো, ‘সংবাদ’ ও তার কর্ণধাররা সংবাদপত্র প্রকাশের নতুন ধ্যান-ধারণাকে শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, তা ছড়িয়ে দিয়েছেন সর্বব্যাপী| ‘সংবাদ’-পরবর্তী সব সংবাদপত্র প্রকাশনাই একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত ছিল ‘সংবাদ’-এর পথ অনুসরণকারী| অনেকেই পরে নতুন চেতনা যুক্ত করে সংবাদপত্র প্রকাশ করতে সচেষ্ট হয়েছেন| কিন্তু তাদের অধিকাংশেরই শুরুর ভিত ˆতরি হয়েছিল ‘সংবাদ’-এর আদর্শকে ধারণ করেই|
‘সংবাদ’-এর সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়ের কর্ণধার ছিলেন আহমদুল কবির| তিনি ‘সংবাদ’কে পূর্ব পাকিস্তানের, পরে বাংলাদেশের অবহেলিত মানুষের মুখপত্রে পরিণত করেছিলেন| এক্ষেত্রে তার সবচেয়ে বড় পুঁজি ছিল উদার প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা ও আদর্শ| জমিদার পরিবার থেকে উঠে আসা এই কৃতি পুরুষ তাঁর মালিকানাধীন সংবাদপত্রকে রাজনৈতিক অধিকার বঞ্চিত, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে শোষিত গণমানুষের সংবাদপত্র হিসেবে দাঁড় করাতে যেভাবে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিকূলতাকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছেন তা একটি আদর্শ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে বাংলাদেশের সংবাদপত্র শিল্পে|
আমরা যখন সাধারণভাবে কোনো সভায় বা সেমিনারে সংবাদপত্র সম্পর্কে তাত্ত্বিক আলোচনা করি তখন প্রায়ই বলি সংবাদপত্র হচ্ছে সমাজের দর্পণ| আমাদের চারপাশে প্রতিদিন যা কিছু ঘটে তার প্রতিফলন দেখা যায় সংবাদপত্রে| সংবাদপত্রকে আবার সহজ ভাষায় বলি ‘খবরের কাগজ’ অর্থাৎ যেখানে শুধু খবর নিয়েই সব কর্মকাণ্ড| এ কথাকে বাস্তবে প্রমাণ করেছে দীর্ঘকাল ধরে এই বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রকাশিত সব সংবাদপত্রই| ˆদনিক ‘সংবাদ’ সেই শুরু থেকেই ছিল সত্যিকার অর্থেই সমাজের আয়না| ‘সংবাদ’-এর প্রতিটি পাতা চোখের সামনে মেলে ধরলে সমাজকে দেখা যেত, দেশের বহমান সময়ের একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যেত| দীর্ঘ পথ চলতে চলতে সংবাদ এখন বয়সের ৭৬ বছরে পা রাখছে, এখনো সংবাদ সমাজের আয়না হিসেবেই আছে| দেশ ও সমাজের নানা ইতিবাচক ও নেতিবাচক পরিবর্তনের নানা ঘটনার পরও ‘সংবাদ’ পাল্টায়নি, তার সেই ‘সমাজের আয়না’ চরিত্র এখনো ধরে রেখেছে| যাঁরা এখন সংবাদের কর্ণধার, আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার মানসিকতা তাদের নেই| সময়ে সময়ে তাঁরা সগর্বে সেই কথা জানিয়ে দিয়েছেন|
‘সংবাদ’ যে গৌরববোধ দীর্ঘ ৭৫ বছরের পথচলায় অর্জন করেছে তার মধ্য দিয়েই ‘সংবাদ’ এই সমাজে জীবন সংগ্রামে বিজয়ী এবং সংগ্রামরত মানুষের সংবাদপত্র হিসেবে যেমন, তেমনি সাংবাদিকতা পেশার একটি বস্তুনিষ্ঠ আদর্শিক চেতনা হিসেবেও সগর্বে উজ্জীবিত রেখেছে|
দীর্ঘ পথযাত্রায় ‘সংবাদ’ বাংলাদেশে সাংবাদিকতার পথ প্রদর্শক হিসেবেও অবদান রেখেছে বললে বেশি বলা হবে না| অনেক সাংবাদিককে পেমাগতভাবে ˆতরি করা, বস্তুনিষ্ঠ পেশাদারিত্বের দিক নির্দেশনা দেয়া— এটা ‘সংবাদ’-এর আজীবনের আদর্শ ছিল, এখনও আছে| ‘সংবাদ’ কর্তৃপক্ষ এই আদর্শ দেশকাল ও সময়ের প্রয়োজনে সচেতনভাবে গ্রহণ করেছিলেন|
বাংলাদেশে সংবাদপত্রকে অনেকেই বিত্তবৈভব অর্জনের পথ হিসেবে ব্যবহার করেছেন| এখনো করছেন বললে অত্যুক্তি হবে না| এক্ষেত্রে সংবাদের কর্ণধারদের ব্যতিক্রম হিসেবে উল্লেখ করা যায়| তারা কেউ সংবাদপত্রকে বাণিজ্য করার ইচ্ছায় কখনোই ব্যবহার করেননি| সাংবাদিকতার সঙ্গে, সংবাদপত্র শিল্পের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যকে গুলিয়ে ফেলেননি তাঁরা, গুলিয়ে ফেলতে চাননি কখনোই| এখানে বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, এখানেই ‘সংবাদ’ কর্তৃপক্ষের স্বকীয়তা, ভিন্নমাত্রা| আর এটা তারা লালন করে আসছেন নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়েও| দুঃসহ সময় পেরিয়েছেন, বিরূপ অবস্থা মোকাবেলা করেছেন, দুর্যোগ-দুর্বিপাকেও পড়েছেন, কিন্তু পথ থেকে সরে যাননি|
এই যে সংবাদ কর্তৃপক্ষের কর্মনিষ্ঠা, বস্তুনিষ্ঠ নীতি-আদর্শ তা সংবাদের জন্মলগ্নের কিছুদিন পর থেকেই চলে আসছে| এই আদর্শ সংবাদ প্রকাশনার প্রথম দিকে যেমন ছিল এখন সাড়ে সাত দশকের পথ পরিক্রমার পরও একই সত্য প্রতিভাত হয় ‘সংবাদ’ সম্পর্কে আলোচনার সময়| কালের যাত্রায় এই জনপদের সমাজ, রাজনীতি ও মানবিক চিন্তার আদর্শিক অবক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদের প্রচার-প্রসারে হয়তো কিছুটা হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটেছে, কিন্তু আদর্শের পথে অবিরাম চলার বাতিক পরিবর্তন হয়নি| আর এখানেই বস্তুনিষ্ঠ কাজের প্রতি ‘সংবাদ’-এর দায়িত্বশীলতার উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায়|
বাংলাভাষী অধ্যুষিত এই ভূখণ্ডে সংবাদপত্র প্রকাশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সংবাদপত্রের উদ্ভব হয়েছিল এই অঞ্চল থেকেই| কিন্তু এর বিকাশের ধারা সমৃদ্ধ হয়েছে বৃটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতায়| সেখানেই বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বিত্তবৈভব বিকাশের সঙ্গে সংবাদপত্রও তার অবয়ব এবং চরিত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল| সেই সময়ে এই অঞ্চলের, বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের মানুষের, বিদ্যার্জন থেকে শুরু করে রুটি-রুজির বড় ঠিকানা ছিল কলকাতা| সংবাদপত্র প্রকাশ ও বিকাশও সেখানেই শুরু হয়| বৃটিশদের বিতারণ এবং ভারত বিভক্তির পর কলকাতার জৌলুসে ভাটা পড়ে এবং নতুন দেশে নতুন আর্থ-সামাজিক পরিবেশ ˆতরি হয় পূর্ববঙ্গের ঢাকায়, সংবাদপত্র শিল্পও নতুন মাত্রা পায়| কলকাতার সমাজে যেভাবে এবং যে প্রয়োজনে সংবাদপত্র তার অবয়ব তৈরি করেছিল ঢাকায় তা পরিবর্তিত হয়ে গেলো বাস্তবতার ছোঁয়ায়| ভারত বিভক্তির পর কলকাতায় স্থিতিশীল সামাজিক অবস্থান সৃষ্টি হয়, সমান্তরাল ধারায় বিকশিত হয় সংবাদপত্রও|
কিন্তু ঢাকার বাস্তবতা ছিল ভিন্ন| এখানকার অধিকাংশ কর্মপ্রয়াসের শুরু বিভাগপূর্ব কলকাতায় হলেও পূর্ব পাকিস্তানে সেই সব কিছু কলকাতা থেকে অনেকটা ভিন্নভাবে পথচলা শুরু করে| সংবাদপত্রও তার ব্যতিক্রম ছিল না| দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান এবং তার এক অংশ বৃটিশ ভারতের পূর্ববঙ্গ ‘পূর্ব পাকিস্তান’ হিসেবে আবির্ভূত হয়| পূর্ববঙ্গ ‘পূর্ব পাকিস্তান’ হলেও সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ রাখেনি পাকিস্তানি বিজাতীয় শাসকরা| পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতে থাকে| তার প্রভাব পড়ে এখানকার রাজনীতিতে| রাজনীতি হয়ে ওঠে ‘এন্টি পাকিস্তানি’, পাকিস্তানি শাসন-শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদী রাজনীতি| কলকাতায় যে রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি ছিল ঢাকার পরিস্থিতি হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের| এটা ছিল নতুন বাস্তবতা| ফলে এখানে এনে কলকাতার সংবাদপত্র নতুন করে প্রকাশ এবং নতুন সংবাদপত্র প্রকাশ, বিকাশ— এসব কর্ম সম্পাদনের সময় এবং নতুন বাস্তবতার অধিবাসীসহ সকল শ্রেণির পাঠকদের কাছে আরো বেশি ও ভিন্ন মাত্রায় সমকালীন আর্থ-সামাজিক অবস্থা তুলে ধরার লক্ষ্যে সাংবাদিকতার আদর্শ ও নীতি ˆনতিকতা ˆতরির প্রয়োজন অনুভূত হয়| এই অনুভবের সূতিকাগার ছিল ‘সংবাদ’| ‘সংবাদ’ই প্রথম সাংবাদিকতার ভিন্ন রূপ তুলে ধরেছে পাঠকদের সামনে|
কলকাতাভিত্তিক সংবাদপত্র যেগুলো পরে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়েছিল তার মধ্যে ছিল বলা যায় আজাদ, মিল্লাত, ইত্তেহাদ-এর নাম| এসব সংবাদপত্রের আদর্শ ছিল অনেকটা ধর্মীয় চেতনাভিত্তিক| কলকাতায় পূর্ববঙ্গের বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে এসব সংবাদপত্র চরম জাগরণ সৃষ্টি করেছিল| অন্য কথায় বলা যায় বাঙালি পাঠক এবং ধর্মীয় চেতনায় অভিষিক্ত মানুষদের জাগিয়ে তুলতে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছে এই ধারার সংবাদপত্রগুলো| কিন্তু অসাম্প্রদায়িক ও উদার গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনা ও প্রগতিশীল মানসিকতা এই শ্রেণির সংবাদপত্রের মধ্যে ছিল বলা যায় না, থাকলেও তা ছিল ছোট্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ|
ঢাকায় নতুন সংবাদপত্র প্রকাশের সময় ‘সকল মানুষের জন্য’ সংবাদপত্রকে সাজানো ছিল তখনকার সামাজিক বাস্তবতা এবং চাহিদা| কিন্তু কলকাতা থেকে ঢাকায় আসা সংবাদপত্রে তার প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়নি| ফলে সে ধারা থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়োজন দেখা দেয়| আর কলকাতার বলয় থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়টি নিয়ে সংবাদপত্রের অনেক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব অনেক চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সফল হয়েছেন আহমদুল কবির| তার হাত ধরে ‘সংবাদ’ সেই কাজটি করতে পেরেছে| তিনি দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সংবাদপত্র প্রকাশ করেছেন|
‘সংবাদ’ দীর্ঘ দিন ধরেই খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠতা, অসাম্প্রদায়িকতা, গণতান্ত্রিক এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও মুক্ত চিন্তা-চেতনাকে ধারণ করে পথ চলেছে, ভবিষ্যতেও চলবে— সংবাদের ৭৬তম জন্মদিনে এই প্রত্যাশা আমাদের সবার|

আপনার মতামত লিখুন