সংবাদ

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবারে হামলা, মামলা নিতেই গেল ৬ দিন


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, রাজশাহী
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, রাজশাহী
প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০৯:৪৪ পিএম

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবারে হামলা, মামলা নিতেই গেল ৬ দিন
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর দুটি পরিবারের বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট। ছবি: সংবাদ

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর দুটি পরিবারের বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় ছয় দিন পর মামলা নিয়েছে পুলিশ। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রায় ৫৫ বছর আগে কেনা জমির দখল নিতে প্রতিপক্ষের লোকজন হামলা চালিয়ে তাদের বসতঘর ভাঙচুর ও মালামাল লুটপাট করেছে।

গত ১২ জুন উপজেলার ধোকড়াকুল গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সুশান্ত সরকারের মেয়ে সেলিনা সরকার (৩৩) বাদী হয়ে পুঠিয়া থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) অভিযোগটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়।

মামলায় ধোকড়াকুল দিয়ারপাড়া গ্রামের তৈয়ব আলী (৪৫), সাইফুল (৫০), মাসুদ (২২), কাউসার (২৪) ও কুদ্দুস (৪৫)-কে আসামি করা হয়েছে।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, সেলিনা সরকারের দাদার বাবা আকলু সরকার ১৯৭০ সালে একই গ্রামের সহর উদ্দিনের কাছ থেকে ধোকড়াকুল মৌজার ৩৭ শতাংশ জমি (আরএস খতিয়ান নং-১১৮৬, দাগ নং-৩১৭১ ও ৩১৫৭) ক্রয় করেন এবং দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে ভোগদখল করে আসছেন। বর্তমানে সেলিনা সরকার ও তার পরিবারের সদস্যরা ওই সম্পত্তির বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে জমি ভোগদখল করছেন।

তবে সম্প্রতি আসামিরা তাদের পূর্বপুরুষদের বিক্রি করা জমি নিজেদের দাবি করে বিরোধ সৃষ্টি করে আসছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এরই জেরে গত ১২ জুন বেলা ১১টার দিকে তারা সেলিনাদের দখলীয় জমিতে গিয়ে ঘরবাড়ি ভাঙচুর করেন।

মামলায় আরও বলা হয়েছে, হামলার সময় সেলিনার ঘরে থাকা জমি ইজারা বাবদ নগদ এক লাখ টাকা এবং প্রায় ৭০ হাজার টাকা মূল্যের আট আনি স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়। বাধা দিতে গেলে ভুক্তভোগীদের গালিগালাজ, মারধরের চেষ্টা এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। বর্তমানে তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, দুটি পরিবারের বসতঘরের প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। ঘরের টিনের চালা ও বেড়া ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি একটি নলকূপও ভেঙে ফেলা হয়েছে।

সেখানে উপস্থিত সেলিনার বাবা সুশান্ত সরকার বলেন, তার দাদা জমি কেনার পর খারিজ করতে গিয়ে জানতে পারেন ভুলবশত জমিটি সহর উদ্দিনের ভাই জফর উদ্দিনের নামে রেকর্ড হয়েছে। পরে রেকর্ড সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যেই গত বছরের অক্টোবরে প্রতিপক্ষের লোকজন তাদের জমি থেকে বাঁশ, পুকুরের মাছ ও গাছপালা কেটে নিয়ে যায়। ওই ঘটনায় তারা আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন এবং বর্তমানে মামলার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

তিনি বলেন, “আমরা বারবার বলেছি, উভয় পক্ষ কাগজপত্র নিয়ে বসি। যার জমি, সে বুঝে নেবে। কিন্তু তারা কখনো কাগজপত্র নিয়ে আসেনি। আলোচনায় না বসে জোর করে জমি দখলের চেষ্টা করছে।”

সুশান্ত সরকার আরও জানান, হামলার সময় তার ছেলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে এবং পরে থানায় গিয়ে অভিযোগ দিতে বলা হয়।

সুশান্তের স্ত্রী আরতি ধানওয়াড় বলেন, “আমার প্রতিবন্ধী মেয়েটা বাড়িতে একা ছিল। রান্না করা ভাতটুকুও সরানোর সুযোগ পায়নি।”

পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদুল ইসলাম বলেন, “বৃহস্পতিবার মামলাটি রেকর্ড করা হয়েছে।” ঘটনার ছয় দিন পর মামলা নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ওদের থানায় আসতে বলা হয়েছিল, কিন্তু তারা আসেনি। এখন মামলা নেওয়া হয়েছে। তাদের কাছে কী কাগজপত্র আছে, তা-ও আনতে বলা হয়েছে।”

এ বিষয়ে আসামিপক্ষের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রধান আসামি তৈয়ব আলীর মামা সাইদুর হাসান দাবি করেন, তিনি উভয় পক্ষকে কাগজপত্র নিয়ে আলোচনায় বসার অনুরোধ করেছেন।

তার ভাষ্য, “কাগজপত্র দেখে যার জমি, সে বুঝে নেবে। আমি কোনো হানাহানির সঙ্গে জড়িত নই। তবে আদিবাসী পরিবারগুলো আলোচনায় বসতে চায় না। তাদের কী কাগজপত্র আছে বা কার নামে খাজনা দেয়, সেটাও আমি জানি না।”

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬


ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবারে হামলা, মামলা নিতেই গেল ৬ দিন

প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুন ২০২৬

featured Image

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর দুটি পরিবারের বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় ছয় দিন পর মামলা নিয়েছে পুলিশ। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রায় ৫৫ বছর আগে কেনা জমির দখল নিতে প্রতিপক্ষের লোকজন হামলা চালিয়ে তাদের বসতঘর ভাঙচুর ও মালামাল লুটপাট করেছে।

গত ১২ জুন উপজেলার ধোকড়াকুল গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সুশান্ত সরকারের মেয়ে সেলিনা সরকার (৩৩) বাদী হয়ে পুঠিয়া থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) অভিযোগটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়।

মামলায় ধোকড়াকুল দিয়ারপাড়া গ্রামের তৈয়ব আলী (৪৫), সাইফুল (৫০), মাসুদ (২২), কাউসার (২৪) ও কুদ্দুস (৪৫)-কে আসামি করা হয়েছে।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, সেলিনা সরকারের দাদার বাবা আকলু সরকার ১৯৭০ সালে একই গ্রামের সহর উদ্দিনের কাছ থেকে ধোকড়াকুল মৌজার ৩৭ শতাংশ জমি (আরএস খতিয়ান নং-১১৮৬, দাগ নং-৩১৭১ ও ৩১৫৭) ক্রয় করেন এবং দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে ভোগদখল করে আসছেন। বর্তমানে সেলিনা সরকার ও তার পরিবারের সদস্যরা ওই সম্পত্তির বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে জমি ভোগদখল করছেন।

তবে সম্প্রতি আসামিরা তাদের পূর্বপুরুষদের বিক্রি করা জমি নিজেদের দাবি করে বিরোধ সৃষ্টি করে আসছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এরই জেরে গত ১২ জুন বেলা ১১টার দিকে তারা সেলিনাদের দখলীয় জমিতে গিয়ে ঘরবাড়ি ভাঙচুর করেন।

মামলায় আরও বলা হয়েছে, হামলার সময় সেলিনার ঘরে থাকা জমি ইজারা বাবদ নগদ এক লাখ টাকা এবং প্রায় ৭০ হাজার টাকা মূল্যের আট আনি স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়। বাধা দিতে গেলে ভুক্তভোগীদের গালিগালাজ, মারধরের চেষ্টা এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। বর্তমানে তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, দুটি পরিবারের বসতঘরের প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। ঘরের টিনের চালা ও বেড়া ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি একটি নলকূপও ভেঙে ফেলা হয়েছে।

সেখানে উপস্থিত সেলিনার বাবা সুশান্ত সরকার বলেন, তার দাদা জমি কেনার পর খারিজ করতে গিয়ে জানতে পারেন ভুলবশত জমিটি সহর উদ্দিনের ভাই জফর উদ্দিনের নামে রেকর্ড হয়েছে। পরে রেকর্ড সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যেই গত বছরের অক্টোবরে প্রতিপক্ষের লোকজন তাদের জমি থেকে বাঁশ, পুকুরের মাছ ও গাছপালা কেটে নিয়ে যায়। ওই ঘটনায় তারা আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন এবং বর্তমানে মামলার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

তিনি বলেন, “আমরা বারবার বলেছি, উভয় পক্ষ কাগজপত্র নিয়ে বসি। যার জমি, সে বুঝে নেবে। কিন্তু তারা কখনো কাগজপত্র নিয়ে আসেনি। আলোচনায় না বসে জোর করে জমি দখলের চেষ্টা করছে।”

সুশান্ত সরকার আরও জানান, হামলার সময় তার ছেলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে এবং পরে থানায় গিয়ে অভিযোগ দিতে বলা হয়।

সুশান্তের স্ত্রী আরতি ধানওয়াড় বলেন, “আমার প্রতিবন্ধী মেয়েটা বাড়িতে একা ছিল। রান্না করা ভাতটুকুও সরানোর সুযোগ পায়নি।”

পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদুল ইসলাম বলেন, “বৃহস্পতিবার মামলাটি রেকর্ড করা হয়েছে।” ঘটনার ছয় দিন পর মামলা নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ওদের থানায় আসতে বলা হয়েছিল, কিন্তু তারা আসেনি। এখন মামলা নেওয়া হয়েছে। তাদের কাছে কী কাগজপত্র আছে, তা-ও আনতে বলা হয়েছে।”

এ বিষয়ে আসামিপক্ষের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রধান আসামি তৈয়ব আলীর মামা সাইদুর হাসান দাবি করেন, তিনি উভয় পক্ষকে কাগজপত্র নিয়ে আলোচনায় বসার অনুরোধ করেছেন।

তার ভাষ্য, “কাগজপত্র দেখে যার জমি, সে বুঝে নেবে। আমি কোনো হানাহানির সঙ্গে জড়িত নই। তবে আদিবাসী পরিবারগুলো আলোচনায় বসতে চায় না। তাদের কী কাগজপত্র আছে বা কার নামে খাজনা দেয়, সেটাও আমি জানি না।”


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত