সংবাদ

অস্তিত্ব সংকটে দেশের প্রাণ-প্রকৃতি: পরিবেশ রক্ষায় আইন সংস্কারের দাবি


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০৮:৪০ পিএম

অস্তিত্ব সংকটে দেশের প্রাণ-প্রকৃতি: পরিবেশ রক্ষায় আইন সংস্কারের দাবি

  • দেশে নদীর সংখ্যা ২,৪১০টি হলেও সরকারি হিসেবে তা ৪০৫টি
  • জিংক, ক্যালসিয়ামসহ মাটিতে অর্গানিক ম্যাটারের ঘাটতি থাকায় মানুষের শরীরেও ৭৯ শতাংশ পুষ্টির ঘাটতি

দেশে বিদ্যমান আইনে পরিবেশ বিপর্যয় রোধে সাধারণ নাগরিকের সরাসরি মামলা করার কোনো অধিকার নেই। ফলে প্রতিনিয়ত পরিবেশ ধ্বংস হলেও অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। তাই পরিবেশ রক্ষায় সাধারণ নাগরিকরা যাতে সরাসরি মামলা করতে পারেন, সে জন্য অবিলম্বে আইন সংস্কার ও যুগোপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন গবেষক, পরিবেশবিদ ও পরিকল্পনাবিদেরা।

শুক্রবার (১৯ জুন) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়। ‘অস্তিত্বের সংকটে প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ: উত্তরণের উপায় অনুসন্ধান’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ‘প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটি’।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, উন্নয়নের নামে গত ৫৫ বছরে দেশের প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশকে রীতিমতো ধ্বংস করা হয়েছে। বিচার বিভাগ, আমলা থেকে শুরু করে প্রভাবশালী মহলের একাংশ এই পরিবেশ হত্যার উৎসবে শামিল। পরিকল্পনাহীন এই উন্নয়ন দেশকে এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি পরিকল্পনাবিদ মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। আর কমিটির চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান দেশের নদী ও পরিবেশের চিত্র তুলে ধরেন।

লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, ৫৫ বছর পার হয়ে গেলেও দেশে এখনো নদীর সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করা যায়নি। এক হিসেবে দেশে নদীর সংখ্যা ২,৪১০টি হলেও সরকারি হিসেবে তা ৪০৫টি। আবার বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই সংখ্যা ১,৪১৫টি বলা হলেও তা এখনো গ্যাজেটভুক্ত হয়নি। বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ৫৫ বছর লেগে গেলো কেবল নদীর সংজ্ঞা নির্ধারণে, আর কত বছর লাগবে সংখ্যা নির্ধারণে?

সংবাদ সম্মেলনে মাটির পুষ্টি উপাদানের ঘাটতির চিত্র তুলে ধরেন প্রাকৃতিক কৃষির গবেষক দেলোয়ার হোসেন। তিনি জানান, দেশের ৫৬ শতাংশ মাটি এখন এসিটিক। মাটিতে জিংক ও অর্গানিক ম্যাটার নেই, ২৫ শতাংশ ক্যালসিয়ামের ঘাটতি রয়েছে। মাটিতে ঘাটতি থাকায় মানুষের শরীরেও ৭৯ শতাংশ পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। এমনকি গ্রামের বাজারে এখন প্রাণীদের ফার্মেসি বাড়ার অর্থ হলো মানুষের পাশাপাশি প্রাণীকূলের শরীরেও উপাদানের ঘাটতি স্পষ্ট।

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ডিন আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বায়ু ও শব্দদূষণে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশ। এর ফলে মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৬ বছর কমছে। যে মাত্রায় শব্দদূষণ হচ্ছে, তাতে নিকট ভবিষ্যতে পরবর্তী প্রজন্মের একটি বড় অংশ শ্রবণ প্রতিবন্ধী হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক ছায়েদুল হক জানান, ক্রমাগত বায়ু ও শব্দদূষণের ফলে দেশের শতভাগ মানুষ এখন পালস ও প্রেশারের রোগী। এর কারণে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, অনিদ্রা ও ইনসুলিন রেসিস্টেন্সের মতো রোগ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষক সবুর আহমেদ খাদ্যে ভারী ধাতুর (হেভি মেটাল) উপস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আশ্চর্যজনকভাবে আমরা বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে গিয়ে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে এখন আরও তিনটি নদীকে দূষিত করে ফেলেছি।’

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ আলী অভিযোগ করেন, উপকূলীয় নদীর পাশে অপরিকল্পিতভাবে পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন করে এবং সেগুলোর বর্জ্য ও রিফুয়েলিং নদীতে ফেলে ইলিশসহ বিভিন্ন মৎস্যসম্পদ ধ্বংস করা হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে তথ্য অধিকার আইনের বরাত দিয়ে জানানো হয়, দেশে বর্তমানে পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে ৭ হাজার ৮৯৭টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৯২টিরই কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। উদাহরণ হিসেবে জানানো হয়, ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলায় ২১টি ইটভাটার একটিরও বৈধ অনুমোদন নেই, অথচ বন্ধের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

নগর এলাকার জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ও শব্দদূষণ এবং গ্রামীণ এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া ও অতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার রোধে পরিবেশবিদরা সরকারের কাছে ৭টি সুনির্দিষ্ট দাবি জানান। 

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটির মুখপাত্র ইবনুল সাঈদ রানা। সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ইপিএফ চেয়ারম্যান ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান এবং বিজিএমইএ ফ্যাশন টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুল জলিল প্রমূখ।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬


অস্তিত্ব সংকটে দেশের প্রাণ-প্রকৃতি: পরিবেশ রক্ষায় আইন সংস্কারের দাবি

প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুন ২০২৬

featured Image

  • দেশে নদীর সংখ্যা ২,৪১০টি হলেও সরকারি হিসেবে তা ৪০৫টি
  • জিংক, ক্যালসিয়ামসহ মাটিতে অর্গানিক ম্যাটারের ঘাটতি থাকায় মানুষের শরীরেও ৭৯ শতাংশ পুষ্টির ঘাটতি

দেশে বিদ্যমান আইনে পরিবেশ বিপর্যয় রোধে সাধারণ নাগরিকের সরাসরি মামলা করার কোনো অধিকার নেই। ফলে প্রতিনিয়ত পরিবেশ ধ্বংস হলেও অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। তাই পরিবেশ রক্ষায় সাধারণ নাগরিকরা যাতে সরাসরি মামলা করতে পারেন, সে জন্য অবিলম্বে আইন সংস্কার ও যুগোপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন গবেষক, পরিবেশবিদ ও পরিকল্পনাবিদেরা।

শুক্রবার (১৯ জুন) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়। ‘অস্তিত্বের সংকটে প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ: উত্তরণের উপায় অনুসন্ধান’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ‘প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটি’।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, উন্নয়নের নামে গত ৫৫ বছরে দেশের প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশকে রীতিমতো ধ্বংস করা হয়েছে। বিচার বিভাগ, আমলা থেকে শুরু করে প্রভাবশালী মহলের একাংশ এই পরিবেশ হত্যার উৎসবে শামিল। পরিকল্পনাহীন এই উন্নয়ন দেশকে এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি পরিকল্পনাবিদ মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। আর কমিটির চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান দেশের নদী ও পরিবেশের চিত্র তুলে ধরেন।

লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, ৫৫ বছর পার হয়ে গেলেও দেশে এখনো নদীর সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করা যায়নি। এক হিসেবে দেশে নদীর সংখ্যা ২,৪১০টি হলেও সরকারি হিসেবে তা ৪০৫টি। আবার বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই সংখ্যা ১,৪১৫টি বলা হলেও তা এখনো গ্যাজেটভুক্ত হয়নি। বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ৫৫ বছর লেগে গেলো কেবল নদীর সংজ্ঞা নির্ধারণে, আর কত বছর লাগবে সংখ্যা নির্ধারণে?

সংবাদ সম্মেলনে মাটির পুষ্টি উপাদানের ঘাটতির চিত্র তুলে ধরেন প্রাকৃতিক কৃষির গবেষক দেলোয়ার হোসেন। তিনি জানান, দেশের ৫৬ শতাংশ মাটি এখন এসিটিক। মাটিতে জিংক ও অর্গানিক ম্যাটার নেই, ২৫ শতাংশ ক্যালসিয়ামের ঘাটতি রয়েছে। মাটিতে ঘাটতি থাকায় মানুষের শরীরেও ৭৯ শতাংশ পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। এমনকি গ্রামের বাজারে এখন প্রাণীদের ফার্মেসি বাড়ার অর্থ হলো মানুষের পাশাপাশি প্রাণীকূলের শরীরেও উপাদানের ঘাটতি স্পষ্ট।

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ডিন আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বায়ু ও শব্দদূষণে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশ। এর ফলে মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৬ বছর কমছে। যে মাত্রায় শব্দদূষণ হচ্ছে, তাতে নিকট ভবিষ্যতে পরবর্তী প্রজন্মের একটি বড় অংশ শ্রবণ প্রতিবন্ধী হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক ছায়েদুল হক জানান, ক্রমাগত বায়ু ও শব্দদূষণের ফলে দেশের শতভাগ মানুষ এখন পালস ও প্রেশারের রোগী। এর কারণে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, অনিদ্রা ও ইনসুলিন রেসিস্টেন্সের মতো রোগ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষক সবুর আহমেদ খাদ্যে ভারী ধাতুর (হেভি মেটাল) উপস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আশ্চর্যজনকভাবে আমরা বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে গিয়ে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে এখন আরও তিনটি নদীকে দূষিত করে ফেলেছি।’

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ আলী অভিযোগ করেন, উপকূলীয় নদীর পাশে অপরিকল্পিতভাবে পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন করে এবং সেগুলোর বর্জ্য ও রিফুয়েলিং নদীতে ফেলে ইলিশসহ বিভিন্ন মৎস্যসম্পদ ধ্বংস করা হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে তথ্য অধিকার আইনের বরাত দিয়ে জানানো হয়, দেশে বর্তমানে পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে ৭ হাজার ৮৯৭টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৯২টিরই কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। উদাহরণ হিসেবে জানানো হয়, ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলায় ২১টি ইটভাটার একটিরও বৈধ অনুমোদন নেই, অথচ বন্ধের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

নগর এলাকার জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ও শব্দদূষণ এবং গ্রামীণ এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া ও অতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার রোধে পরিবেশবিদরা সরকারের কাছে ৭টি সুনির্দিষ্ট দাবি জানান। 

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটির মুখপাত্র ইবনুল সাঈদ রানা। সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ইপিএফ চেয়ারম্যান ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান এবং বিজিএমইএ ফ্যাশন টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুল জলিল প্রমূখ।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত