সংবাদ

মাছের খামারে বিষের থাবা: নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মিঠা পানির মাছ


বাকী বিল্লাহ
বাকী বিল্লাহ
প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১০:২১ পিএম

মাছের খামারে বিষের থাবা: নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মিঠা পানির মাছ

  • মাছ চাষে অযৌক্তিক অ্যাণ্টিবায়োটিক ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ
  • সংক্রমণের হার শিং ও মাগুরে শতকরা ৬১%, গুলশা ও পাবদায় ৪২%, তেলাপিয়ায় ৩৮%, পাঙ্গাসে ৩৬%, কার্পে ১৮%
  • সব মাছ রোগমুক্ত রাখতে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের উদ্যোগ

নদীর দেশ, রূপালী ইলিশ আর মিঠা পানির মাছের স্বর্গভূমি আমাদের এই বাংলাদেশ। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ শব্দবন্ধটি শুধু একটি প্রবাদ নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের অংশ, গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন। কিন্তু সেই স্বপ্নের মিঠা পানির মাছ চাষে এখন যেন এক নীরব মড়কের অন্ধকার ছায়া।

একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা, অন্যদিকে রোগবালাইয়ের হাত থেকে মাছ বাঁচাতে খামারিদের অজ্ঞতা আর অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার—সব মিলিয়ে আমাদের রূপালী ফসল এখন এক বড় সংকটের মুখে। তবে এই অন্ধকারের মাঝে এক টুকরো আশার আলো নিয়ে হাজির হয়েছেন দেশের বিজ্ঞানীরা। মিঠা পানির মাছের মড়ক ঠেকাতে এবার দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হচ্ছে মাছের বিশেষ ভ্যাকসিন।

অ্যান্টিবায়োটিকের মরণকামড়: থালায় রাখা মাছেই লুকিয়ে আছে মানব সভ্যতার বড় ঝুঁকি

মাছ দ্রুত বড় করতে কিংবা সামান্য রোগবালাই থেকে বাঁচাতে অনেক অসাধু ও অসচেতন খামারি গবাদি পশুর জন্য ব্যবহৃত কড়া অ্যান্টিবায়োটিক মাছের খামারে প্রয়োগ করছেন। বিশেষজ্ঞ ছাড়াই, কোনো সঠিক রোগ নির্ণয় না করে এই ‘অ্যাকুয়া ড্রাগস’ ব্যবহারের ফলে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ ‘অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্স’ বা এএমআর।

এর সোজা অর্থ হলো, যে অ্যান্টিবায়োটিক মাছের শরীরে যাচ্ছে, সেই মাছ খাওয়ার মাধ্যমে তা চলে আসছে মানুষের শরীরে। ফলে একসময় সাধারণ অসুখেও মানুষের শরীরে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করবে না। বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, বিশ্বব্যাপী অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের এই ভয়াবহ সমস্যা যদি আমরা এখনই সমাধান করতে না পারি, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীতে প্রায় ১০ মিলিয়ন অর্থাৎ ১ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। আর এতে বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষতি হতে পারে প্রায় ৬৬ ট্রিলিয়ন ডলার।

পুকুরেই মরছে ৮০ থেকে ১০০% মাছ: লোকসানের আবর্তে নিঃস্ব খামারি

একটা সময় ছিল যখন পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, শিং, মাগুর বা কৈ মাছকে ভাবা হতো অত্যন্ত শক্তপোক্ত ও রোগপ্রতিরোধী। কিন্তু প্রকৃতির নির্মম খেয়ালে আজ পরিস্থিতি বদলে গেছে। নতুন নতুন ভাইরাসের স্ট্রেইন ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে পুকুরে রোগ ছড়ানোর মাত্র ৫ থেকে ১২ দিনের মধ্যে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত মাছ মারা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) তথ্য অনুযায়ী, মাছের রোগের কারণে আমাদের খামারিরা তাদের মোট আয়ের প্রায় ১৪ দশমিক ০৫ শতাংশ হারাচ্ছেন। খামারগুলোতে সংক্রমণের হার দেখলে শিউরে উঠতে হয়; শিং ও মাগুর মাছে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি—৬১ শতাংশ! এছাড়া গুলশা ও পাবদা ৪২ শতাংশ, তেলাপিয়া ৩৮ শতাংশ, পাঙ্গাস ৩৬ শতাংশ এবং কার্প জাতীয় মাছে ১৮ শতাংশ সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে। এই বিশাল লোকসানের ধাক্কা সামলাতে না পেরে অনেক খামারি আজ নিঃস্ব হওয়ার পথে।

ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প: ১৯৩০-এর ইতিহাস ও বাংলাদেশের নতুন স্বপ্ন

মাছের রোগ প্রতিরোধের ইতিহাস কিন্তু নতুন নয়। ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে বিশ্বে বাণিজ্যিক ভ্যাকসিনের ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৩০ সালে স্যামন মাছের হ্যাচারিতে এবং ১৯৩৮ সালে কার্প মাছে প্রথম ভ্যাকসিন ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই ইতিহাসকে বুকে ধারণ করে এবার বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) শুরু করেছে ‘মিঠা পানির মাছের মড়ক প্রতিরোধে ভ্যাকসিন উদ্ভাবন’ প্রকল্প। সম্প্রতি এই প্রকল্পের ইনসেপশন ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের মূল লক্ষ্য হলো, দেশীয় বাণিজ্যিক মাছ যেমন—পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, গুলশা, টেংরা, পাবদা, শিং ও মাগুর মাছের মড়কের কারণ সুনির্দিষ্টভাবে ল্যাবরেটরিতে ডিএনএ ও মলিকুলার পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা। এরপর সেই ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর দেশীয় ভ্যাকসিন বা টিকা তৈরি করা। এই প্রযুক্তি সফল হলে মাছের অকাল মৃত্যু যেমন ঠেকানো যাবে, তেমনি মাছ হবে সম্পূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত ও নিরাপদ।

পানিই আসল নিয়ামক: সমন্বিত লড়াইয়ের ডাক নীতি নির্ধারকদের

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এই বিশেষ কর্মশালায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষি মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, “দেশে মৎস্য খাতে বিপুল সম্ভাবনা ও সুযোগ রয়েছে। এই খাতের উন্নয়নে গবেষণা ও উদ্ভাবনের কোনো বিকল্প নেই। গবেষণার মাধ্যমে অবদান রাখতে হবে। সরকার তাদের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হিসাবে সম্মানিত করবেন।”

তিনি আরও যোগ করেন, “পানির গুণগত মান মাছ চাষের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। পানিকে মাছের উপযোগী করে তুলতে পারলে মাছের রোগবালাই অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। এই লক্ষ্যে বিজ্ঞানী ও মৎস্য কর্মকর্তাদের সমন্বিত ভাবে কাজ করতে হবে। দেশের প্রাকৃতিক মাছের অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহারসহ বিভিন্ন পরিবেশগত কারণে প্রাকৃতিক জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশীয় মাছের প্রজাতি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে গবেষণা, সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।”

একই অনুষ্ঠানে বিশেষ গুরুত্বারোপ করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, “মানুষের দৈনিক খাদ্য তালিকায় থাকা মিঠা পানির মাছকে রোগমুক্ত ও টেকসই ভাবে সংরক্ষণের লক্ষ্যে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও মড়ক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর গবেষণা পরিচালনার কোন বিকল্প নেই। আর মাছ চাষে অযৌক্তিক ও অনিয়ন্ত্রিত ভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।”

নিরাপদ মাছের এক নতুন সকালের অপেক্ষায় বাংলাদেশ

বিজ্ঞানীদের এই নতুন লড়াই কেবল মাছের উৎপাদন বাড়ানোর লড়াই নয়, এটি মূলত মানুষের জীবন বাঁচানোর লড়াই। ল্যাবরেটরির টেস্টটিউব থেকে যখন চূড়ান্ত ভ্যাকসিনটি মাঠপর্যায়ে খামারিদের হাতে পৌঁছাবে, সেদিন সত্যি সত্যি বদলে যাবে বাংলাদেশের মৎস্য খাতের চেহারা। সেদিন এদেশের প্রতিটি মানুষ কোনো রকম বিষের ভয় ছাড়াই তৃপ্তিসহকারে পাতে তুলে নিতে পারবে রূপালী মাছ, আর খামারিদের মুখে ফুটবে এক চিলতে বিজয়ের হাসি। সেই নিরাপদ, অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত সোনালী সকালের অপেক্ষায় এখন পুরো বাংলাদেশ।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ২০ জুন ২০২৬


মাছের খামারে বিষের থাবা: নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মিঠা পানির মাছ

প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুন ২০২৬

featured Image

  • মাছ চাষে অযৌক্তিক অ্যাণ্টিবায়োটিক ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ
  • সংক্রমণের হার শিং ও মাগুরে শতকরা ৬১%, গুলশা ও পাবদায় ৪২%, তেলাপিয়ায় ৩৮%, পাঙ্গাসে ৩৬%, কার্পে ১৮%
  • সব মাছ রোগমুক্ত রাখতে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের উদ্যোগ

নদীর দেশ, রূপালী ইলিশ আর মিঠা পানির মাছের স্বর্গভূমি আমাদের এই বাংলাদেশ। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ শব্দবন্ধটি শুধু একটি প্রবাদ নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের অংশ, গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন। কিন্তু সেই স্বপ্নের মিঠা পানির মাছ চাষে এখন যেন এক নীরব মড়কের অন্ধকার ছায়া।

একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা, অন্যদিকে রোগবালাইয়ের হাত থেকে মাছ বাঁচাতে খামারিদের অজ্ঞতা আর অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার—সব মিলিয়ে আমাদের রূপালী ফসল এখন এক বড় সংকটের মুখে। তবে এই অন্ধকারের মাঝে এক টুকরো আশার আলো নিয়ে হাজির হয়েছেন দেশের বিজ্ঞানীরা। মিঠা পানির মাছের মড়ক ঠেকাতে এবার দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হচ্ছে মাছের বিশেষ ভ্যাকসিন।

অ্যান্টিবায়োটিকের মরণকামড়: থালায় রাখা মাছেই লুকিয়ে আছে মানব সভ্যতার বড় ঝুঁকি

মাছ দ্রুত বড় করতে কিংবা সামান্য রোগবালাই থেকে বাঁচাতে অনেক অসাধু ও অসচেতন খামারি গবাদি পশুর জন্য ব্যবহৃত কড়া অ্যান্টিবায়োটিক মাছের খামারে প্রয়োগ করছেন। বিশেষজ্ঞ ছাড়াই, কোনো সঠিক রোগ নির্ণয় না করে এই ‘অ্যাকুয়া ড্রাগস’ ব্যবহারের ফলে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ ‘অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্স’ বা এএমআর।

এর সোজা অর্থ হলো, যে অ্যান্টিবায়োটিক মাছের শরীরে যাচ্ছে, সেই মাছ খাওয়ার মাধ্যমে তা চলে আসছে মানুষের শরীরে। ফলে একসময় সাধারণ অসুখেও মানুষের শরীরে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করবে না। বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, বিশ্বব্যাপী অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের এই ভয়াবহ সমস্যা যদি আমরা এখনই সমাধান করতে না পারি, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীতে প্রায় ১০ মিলিয়ন অর্থাৎ ১ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। আর এতে বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষতি হতে পারে প্রায় ৬৬ ট্রিলিয়ন ডলার।

পুকুরেই মরছে ৮০ থেকে ১০০% মাছ: লোকসানের আবর্তে নিঃস্ব খামারি

একটা সময় ছিল যখন পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, শিং, মাগুর বা কৈ মাছকে ভাবা হতো অত্যন্ত শক্তপোক্ত ও রোগপ্রতিরোধী। কিন্তু প্রকৃতির নির্মম খেয়ালে আজ পরিস্থিতি বদলে গেছে। নতুন নতুন ভাইরাসের স্ট্রেইন ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে পুকুরে রোগ ছড়ানোর মাত্র ৫ থেকে ১২ দিনের মধ্যে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত মাছ মারা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) তথ্য অনুযায়ী, মাছের রোগের কারণে আমাদের খামারিরা তাদের মোট আয়ের প্রায় ১৪ দশমিক ০৫ শতাংশ হারাচ্ছেন। খামারগুলোতে সংক্রমণের হার দেখলে শিউরে উঠতে হয়; শিং ও মাগুর মাছে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি—৬১ শতাংশ! এছাড়া গুলশা ও পাবদা ৪২ শতাংশ, তেলাপিয়া ৩৮ শতাংশ, পাঙ্গাস ৩৬ শতাংশ এবং কার্প জাতীয় মাছে ১৮ শতাংশ সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে। এই বিশাল লোকসানের ধাক্কা সামলাতে না পেরে অনেক খামারি আজ নিঃস্ব হওয়ার পথে।

ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প: ১৯৩০-এর ইতিহাস ও বাংলাদেশের নতুন স্বপ্ন

মাছের রোগ প্রতিরোধের ইতিহাস কিন্তু নতুন নয়। ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে বিশ্বে বাণিজ্যিক ভ্যাকসিনের ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৩০ সালে স্যামন মাছের হ্যাচারিতে এবং ১৯৩৮ সালে কার্প মাছে প্রথম ভ্যাকসিন ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই ইতিহাসকে বুকে ধারণ করে এবার বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) শুরু করেছে ‘মিঠা পানির মাছের মড়ক প্রতিরোধে ভ্যাকসিন উদ্ভাবন’ প্রকল্প। সম্প্রতি এই প্রকল্পের ইনসেপশন ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের মূল লক্ষ্য হলো, দেশীয় বাণিজ্যিক মাছ যেমন—পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, গুলশা, টেংরা, পাবদা, শিং ও মাগুর মাছের মড়কের কারণ সুনির্দিষ্টভাবে ল্যাবরেটরিতে ডিএনএ ও মলিকুলার পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা। এরপর সেই ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর দেশীয় ভ্যাকসিন বা টিকা তৈরি করা। এই প্রযুক্তি সফল হলে মাছের অকাল মৃত্যু যেমন ঠেকানো যাবে, তেমনি মাছ হবে সম্পূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত ও নিরাপদ।

পানিই আসল নিয়ামক: সমন্বিত লড়াইয়ের ডাক নীতি নির্ধারকদের

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এই বিশেষ কর্মশালায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষি মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, “দেশে মৎস্য খাতে বিপুল সম্ভাবনা ও সুযোগ রয়েছে। এই খাতের উন্নয়নে গবেষণা ও উদ্ভাবনের কোনো বিকল্প নেই। গবেষণার মাধ্যমে অবদান রাখতে হবে। সরকার তাদের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হিসাবে সম্মানিত করবেন।”

তিনি আরও যোগ করেন, “পানির গুণগত মান মাছ চাষের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। পানিকে মাছের উপযোগী করে তুলতে পারলে মাছের রোগবালাই অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। এই লক্ষ্যে বিজ্ঞানী ও মৎস্য কর্মকর্তাদের সমন্বিত ভাবে কাজ করতে হবে। দেশের প্রাকৃতিক মাছের অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহারসহ বিভিন্ন পরিবেশগত কারণে প্রাকৃতিক জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশীয় মাছের প্রজাতি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে গবেষণা, সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।”

একই অনুষ্ঠানে বিশেষ গুরুত্বারোপ করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, “মানুষের দৈনিক খাদ্য তালিকায় থাকা মিঠা পানির মাছকে রোগমুক্ত ও টেকসই ভাবে সংরক্ষণের লক্ষ্যে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও মড়ক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর গবেষণা পরিচালনার কোন বিকল্প নেই। আর মাছ চাষে অযৌক্তিক ও অনিয়ন্ত্রিত ভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।”

নিরাপদ মাছের এক নতুন সকালের অপেক্ষায় বাংলাদেশ

বিজ্ঞানীদের এই নতুন লড়াই কেবল মাছের উৎপাদন বাড়ানোর লড়াই নয়, এটি মূলত মানুষের জীবন বাঁচানোর লড়াই। ল্যাবরেটরির টেস্টটিউব থেকে যখন চূড়ান্ত ভ্যাকসিনটি মাঠপর্যায়ে খামারিদের হাতে পৌঁছাবে, সেদিন সত্যি সত্যি বদলে যাবে বাংলাদেশের মৎস্য খাতের চেহারা। সেদিন এদেশের প্রতিটি মানুষ কোনো রকম বিষের ভয় ছাড়াই তৃপ্তিসহকারে পাতে তুলে নিতে পারবে রূপালী মাছ, আর খামারিদের মুখে ফুটবে এক চিলতে বিজয়ের হাসি। সেই নিরাপদ, অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত সোনালী সকালের অপেক্ষায় এখন পুরো বাংলাদেশ।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত