রংপুরকে বলা হচ্ছে আলুর নতুন রাজধানী। গত কয়েক বছর ধরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আলু উৎপাদনের যে তালিকা করে তার চূড়ায় থাকে এই জেলা। এর আগে শীর্ষে থাকতো মুন্সীগঞ্জ। তখন তার ভাগ্যেই জুটেছিল আলুর রাজধানীর তকমা।
রংপুরে এবছর ১৬ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি আলু ফলেছে। এরমধ্যে আলু পঁচেছে অনেক। বীজ ˆতরির জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে কিছু। এরপরও মেরেকেটে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ মেট্রিক টন আলু উদ্বৃত্ত আছে বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি বিভাগ।
এখন বিক্রি না করে আগামী দিনে দুপয়সা লাভের মুখ দেখার আশায় অনেক কৃষক হিমাগারে আলু রাখেন। তবে তাদের আশার গুড়ে বালু ফেলেছে বাড়তি ভাড়া। রংপুরে হিমাগারে প্রতি বস্তা আলু রাখার ভাড়া ছিল ২৬০-২৮০ টাকা। এবার সেই ভাড়া হয়েছে ৪৫০ টাকা। কৃষকরা একে যৌক্তিক বলে মানতে পারছেন না। ভাড়া বাড়ানোর প্রতিবাদে তারা বিক্ষোভ করেছেন। গত বুধবার তারা রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করেছেন।
হিমাগারের দবাড়তি ভাড়া নিয়ে বগুড়ার আলুচাষিদেরও আপত্তি আছে। সেখানকার কৃষকদের একটি সংগঠন বলছে, তিন বছরে হিমাগার ভাড়া দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০২৩ সালে ৬৫ কেজির এক বস্তা আলুর সংরক্ষণ ভাড়া ছিল ২৮০ টাকা। ২০২৪ সালে সেটা বেড়ে হয় ৩০০ টাকা। আর ২০২৫ সালে হিমাগার মালিকরা ভাড়া নির্ধারণ করে ৫২০ টাকা। এই হিসাবে কেজিপ্রতি সংরক্ষণ ভাড়া হয় ৮ টাকা। যদিও সরকার কেজিপ্রতি ৬ টাকা ৭৫ পয়সা নির্ধারণ করেছে। বগুড়ার কৃষকদের দাবি, এই ভাড়া ৫ টাকায় নামিয়ে আনতে হবে।
কৃষকের হিসাব সহজ। আলু উৎপাদনে কেজিপ্রতি তার খরচ হয় ১৩ টাকা। তার ওপর আছে পরিবহন, শ্রমিক, বস্তা খরচ। আরও যোগ হয় হিমাগার ভাড়া। শেষে প্রতি কেজি আলুর খরচ প্রায় ২৫ টাকায় গিয়ে ঠেকে। কৃষকের আশঙ্কা, এত খরচের আলু বাজারে নিলে মুনাফার দেখা মিলবে না। উল্টো লোকসান গুণতে হবে। আলু এখন বিক্রি করলে লোকসান। গাঁটের আরও কড়ি খরচ করে হিমাগারে রেখে পরে বিক্রি করলেও লোকসান। হিমাগারের ভাড়া না কমালে কৃষকের তাই চলছে না।
হিমাগারের ভাড়া নিয়ে নাখোশ হয়েছে রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণের দাবিতে তারা দিন কয়েক হিমাগার থেকে আলু বেচাকেনা বন্ধও রেখেছিলেন।
হিমাগারের মালিকদের বিরুদ্ধে সাধারণ অভিযোগ হচ্ছে, নিজেদের পকেট ভারি করতে তারা ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়ায়। হিমাগার মালিকেরা অবশ্য এই অভিযোগ স্বীকার করেন না। তারা বলছেন, পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া সমন্বয় করা ছাড়া তাদের উপায় নেই। হিমাগার পরিচালনায় খরচ কম নয়। বিদ্যুৎ, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, জনবল, ঋণের সুদ, জ্বালানি খরচ, ভবন রক্ষণাবেক্ষণ সব মিলিয়ে হিমাগার একটি ব্যয়বহুল অবকাঠামো। দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির খরচ কয়েক দফায় বেড়েছে। অনেক হিমাগার মালিক দাবি করছেন, পরিচালন খরচ বেড়েছে বলেই তারা ভাড়া বাড়িয়েছেন।
হিমাগার মালিকদের ভাড়া বাড়ানোর প্রয়োজনকে অস্বীকার না করেও এই প্রশ্ন তোলা যায় যে, যে হারে তারা ভাড়া বাড়িয়েছেন সেটা যৌক্তিক কিনা। পরিচালন ব্যয় বাড়ার হার আর সংরক্ষণ ভাড়া বাড়ানোর হারের হিসাব কষা হলে অনেক প্রশ্নের উত্তরই মিলবে।
এই সংকট কেবল কৃষক ও হিমাগার মালিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে ভোক্তার স্বার্থও জড়িত। কৃষক যদি ধারাবাহিকভাবে লোকসান করেন, তাহলে ভবিষ্যতে আলু চাষে তাদের আগ্রহ কমে যেতে পারে। এতে উৎপাদন কমবে, বাজারে সরবরাহ কমবে। যার জের শেষ পর্যন্ত টানতে হবে ভোক্তাকে। আবার হিমাগারগুলো যদি আর্থিকভাবে টেকসই না হয়, তাহলে সংরক্ষণ সক্ষমতা কমবে। তখনও বাজারে অস্থিরতা ˆতরি হবে। কৃষক ও হিমাগার উভয়ই দেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কৃষকদের ক্ষোভকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। আবার হিমাগার মালিকদের ভাড়া বাড়ানোর দাবিকে অযৌক্তিক বলেও ধরে নেওয়া যায় না। কোনো একটি পক্ষকে দোষারোপ করে টেকসই সমাধান হবে না। কৃষকের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করতে হবে। হিমাগারের ব্যবসাকেও টেকসই করতে হবে। এক পক্ষকে উপেক্ষা করে অন্য পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হলে সাময়িকভাবে কেউ লাভবান হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো খাত।
সমাধান খুঁজতে হবে আলোচনায়। সিদ্ধান্ত টানতে হবে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে স্বচ্ছ ভাড়া কাঠামো ঠিক করতে হবে। উৎপাদনের ভিত্তি হচ্ছে কৃষক। আবার ফসল সংরক্ষণ করা ছাড়া আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা টিকতে পারে না। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে একটি ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা যায় কীভাবে সেই পথ খুঁজতে হবে। সরকার, কৃষক প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং হিমাগার মালিকরা আন্তরিক হলে সেই পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে না।
দেশে যে হারে উৎপাদন বেড়েছে সে হারে সংরক্ষণ সুবিধা গড়ে ওঠেনি। দীর্ঘমেয়াদে তাই শুধু ভাড়া কমানো বা বাড়ানোর প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। হিমাগার খাতের সামগ্রিক সংস্কার নিয়ে ভাবতে হবে।
[লেখক: সাংবাদিক]

শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ জুন ২০২৬
রংপুরকে বলা হচ্ছে আলুর নতুন রাজধানী। গত কয়েক বছর ধরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আলু উৎপাদনের যে তালিকা করে তার চূড়ায় থাকে এই জেলা। এর আগে শীর্ষে থাকতো মুন্সীগঞ্জ। তখন তার ভাগ্যেই জুটেছিল আলুর রাজধানীর তকমা।
রংপুরে এবছর ১৬ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি আলু ফলেছে। এরমধ্যে আলু পঁচেছে অনেক। বীজ ˆতরির জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে কিছু। এরপরও মেরেকেটে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ মেট্রিক টন আলু উদ্বৃত্ত আছে বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি বিভাগ।
এখন বিক্রি না করে আগামী দিনে দুপয়সা লাভের মুখ দেখার আশায় অনেক কৃষক হিমাগারে আলু রাখেন। তবে তাদের আশার গুড়ে বালু ফেলেছে বাড়তি ভাড়া। রংপুরে হিমাগারে প্রতি বস্তা আলু রাখার ভাড়া ছিল ২৬০-২৮০ টাকা। এবার সেই ভাড়া হয়েছে ৪৫০ টাকা। কৃষকরা একে যৌক্তিক বলে মানতে পারছেন না। ভাড়া বাড়ানোর প্রতিবাদে তারা বিক্ষোভ করেছেন। গত বুধবার তারা রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করেছেন।
হিমাগারের দবাড়তি ভাড়া নিয়ে বগুড়ার আলুচাষিদেরও আপত্তি আছে। সেখানকার কৃষকদের একটি সংগঠন বলছে, তিন বছরে হিমাগার ভাড়া দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০২৩ সালে ৬৫ কেজির এক বস্তা আলুর সংরক্ষণ ভাড়া ছিল ২৮০ টাকা। ২০২৪ সালে সেটা বেড়ে হয় ৩০০ টাকা। আর ২০২৫ সালে হিমাগার মালিকরা ভাড়া নির্ধারণ করে ৫২০ টাকা। এই হিসাবে কেজিপ্রতি সংরক্ষণ ভাড়া হয় ৮ টাকা। যদিও সরকার কেজিপ্রতি ৬ টাকা ৭৫ পয়সা নির্ধারণ করেছে। বগুড়ার কৃষকদের দাবি, এই ভাড়া ৫ টাকায় নামিয়ে আনতে হবে।
কৃষকের হিসাব সহজ। আলু উৎপাদনে কেজিপ্রতি তার খরচ হয় ১৩ টাকা। তার ওপর আছে পরিবহন, শ্রমিক, বস্তা খরচ। আরও যোগ হয় হিমাগার ভাড়া। শেষে প্রতি কেজি আলুর খরচ প্রায় ২৫ টাকায় গিয়ে ঠেকে। কৃষকের আশঙ্কা, এত খরচের আলু বাজারে নিলে মুনাফার দেখা মিলবে না। উল্টো লোকসান গুণতে হবে। আলু এখন বিক্রি করলে লোকসান। গাঁটের আরও কড়ি খরচ করে হিমাগারে রেখে পরে বিক্রি করলেও লোকসান। হিমাগারের ভাড়া না কমালে কৃষকের তাই চলছে না।
হিমাগারের ভাড়া নিয়ে নাখোশ হয়েছে রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণের দাবিতে তারা দিন কয়েক হিমাগার থেকে আলু বেচাকেনা বন্ধও রেখেছিলেন।
হিমাগারের মালিকদের বিরুদ্ধে সাধারণ অভিযোগ হচ্ছে, নিজেদের পকেট ভারি করতে তারা ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়ায়। হিমাগার মালিকেরা অবশ্য এই অভিযোগ স্বীকার করেন না। তারা বলছেন, পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া সমন্বয় করা ছাড়া তাদের উপায় নেই। হিমাগার পরিচালনায় খরচ কম নয়। বিদ্যুৎ, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, জনবল, ঋণের সুদ, জ্বালানি খরচ, ভবন রক্ষণাবেক্ষণ সব মিলিয়ে হিমাগার একটি ব্যয়বহুল অবকাঠামো। দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির খরচ কয়েক দফায় বেড়েছে। অনেক হিমাগার মালিক দাবি করছেন, পরিচালন খরচ বেড়েছে বলেই তারা ভাড়া বাড়িয়েছেন।
হিমাগার মালিকদের ভাড়া বাড়ানোর প্রয়োজনকে অস্বীকার না করেও এই প্রশ্ন তোলা যায় যে, যে হারে তারা ভাড়া বাড়িয়েছেন সেটা যৌক্তিক কিনা। পরিচালন ব্যয় বাড়ার হার আর সংরক্ষণ ভাড়া বাড়ানোর হারের হিসাব কষা হলে অনেক প্রশ্নের উত্তরই মিলবে।
এই সংকট কেবল কৃষক ও হিমাগার মালিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে ভোক্তার স্বার্থও জড়িত। কৃষক যদি ধারাবাহিকভাবে লোকসান করেন, তাহলে ভবিষ্যতে আলু চাষে তাদের আগ্রহ কমে যেতে পারে। এতে উৎপাদন কমবে, বাজারে সরবরাহ কমবে। যার জের শেষ পর্যন্ত টানতে হবে ভোক্তাকে। আবার হিমাগারগুলো যদি আর্থিকভাবে টেকসই না হয়, তাহলে সংরক্ষণ সক্ষমতা কমবে। তখনও বাজারে অস্থিরতা ˆতরি হবে। কৃষক ও হিমাগার উভয়ই দেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কৃষকদের ক্ষোভকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। আবার হিমাগার মালিকদের ভাড়া বাড়ানোর দাবিকে অযৌক্তিক বলেও ধরে নেওয়া যায় না। কোনো একটি পক্ষকে দোষারোপ করে টেকসই সমাধান হবে না। কৃষকের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করতে হবে। হিমাগারের ব্যবসাকেও টেকসই করতে হবে। এক পক্ষকে উপেক্ষা করে অন্য পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হলে সাময়িকভাবে কেউ লাভবান হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো খাত।
সমাধান খুঁজতে হবে আলোচনায়। সিদ্ধান্ত টানতে হবে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে স্বচ্ছ ভাড়া কাঠামো ঠিক করতে হবে। উৎপাদনের ভিত্তি হচ্ছে কৃষক। আবার ফসল সংরক্ষণ করা ছাড়া আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা টিকতে পারে না। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে একটি ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা যায় কীভাবে সেই পথ খুঁজতে হবে। সরকার, কৃষক প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং হিমাগার মালিকরা আন্তরিক হলে সেই পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে না।
দেশে যে হারে উৎপাদন বেড়েছে সে হারে সংরক্ষণ সুবিধা গড়ে ওঠেনি। দীর্ঘমেয়াদে তাই শুধু ভাড়া কমানো বা বাড়ানোর প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। হিমাগার খাতের সামগ্রিক সংস্কার নিয়ে ভাবতে হবে।
[লেখক: সাংবাদিক]

আপনার মতামত লিখুন