বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় সংসদে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সরকারি দল, আর বিরোধী বেঞ্চে বসা জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। সংসদের আচরণ অদ্ভুত, হামে শিশু মারা যাচ্ছে, ধর্ষণের পর হত্যা হচ্ছে, আমেরিকার সঙ্গে বিতর্কিত চুক্তি হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে হাজার হাজার লোক বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা চলছে— অথচ সংসদে এসব নিয়ে আলোচনা নেই, আলোচনার প্রস্তাবও নেই। সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা মার্কিন চুক্তি নিয়ে কথা তুলতে চাইলে স্পিকার বলেন, নোটিশ দিতে। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয়ে আলোচনা করতে চাইলে ৩৪১ বিধিতে নোটিশ দিতে হয় এবং সেই নোটিশে ন্যূনতম ৫ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন লাগে। নোটিশ দেবে কী করে, রুমিন ফারহানা ব্যতীত নোটিশের পাশে দাঁড়ানোর মতো আর একজনও নেই। পাশে নেই গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি। কেন নেই ? কারণ অতি বিপ্লবীরা সরকারেরও অংশ।
এটা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের পুরনো রোগ। দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়া মানেই বিরোধী দলকে অকার্যকর করে দেয়া। বিরোধী দল অকার্যকর মানেই সংসদ অকার্যকর। সংসদ অকার্যকর মানেই স্বৈরতন্ত্রের জন্ম। জামায়াত ও এনসিপির কর্মকাণ্ড দেখলে কি মনে হয়, সংবিধান সংস্কার কমিশন স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিজমকে ইউনূসের জাদুঘরে পাঠিয়ে দিয়েছে ? ১৯৭৩ সন থেকে অদ্যাবধি একই মানসিকতায় সরকার ও সংসদ চলছে। আমেরিকার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি নিয়ে দেশে বিতর্ক আছে, চুক্তিতে আছে দেশের স্বার্থবিরোধী অনেক শর্ত। সংবিধানের ১৪৫ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গোপন চুক্তি না হলে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত সব চুক্তি সংসদে উপস্থাপন ও আলোচনা করার বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু অতীতের কোনো সরকার এই শর্ত মানেনি, বর্তমান সরকারও মানছে না। রুমিন ফারহানা সংসদে কথা বলতে চাইলেন। স্পিকার নিয়মের কথা বলে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির কবর দিয়ে দিলেন, নোটিশের পক্ষে কোন সাংসদ দাঁড়ালেন না। একই অবস্থা হাম রোগের ক্ষেত্রেও। শত শত শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে, মারা যাচ্ছে ধর্ষণের তীব্রতায়। রামিসা, আয়েশা, দীপু চন্দ্র দাস— নামগুলো কাগজে আসে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসে, কিন্তু সংসদে আসে না। কারণ সমঝোতা, বিএনপি সরকারকে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলে বিব্রত করতে চায় না জামায়াত এবং এনসিপি, তারা নামকাওয়াস্তে বিরোধী দল। এই পরিবেশ বাংলাদেশে নতুন নয়; ১৯৭৩ সনের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩ আসন পায়। ফলে প্রথম জাতীয় সংসদে কোন বিরোধী দলীয় নেতাই ছিলেন না। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর রাজনৈতিক দৃশ্যপটে সামরিক বাহিনীর অনুপ্রবেশ ঘটে। ১৯৭৯ সনের সংসদেও বিএনপির ছিল দুই তৃতীয়াংশ আসন। সামরিক আইন জারী থাকা অবস্থায় সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনটি ছিল বিতর্কিত।’ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কৌশল ছিল আওয়ামী লীগকে জব্দ করে দেশের রাজনীতির মূল স্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করা’- কথাটি কিন্তু আমার নয়, বিএনপির মওদুদ আহমদের।
১৯৮৬ সনে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি। পরের বছর সংসদ থেকে বিরোধী দলগুলোর সংসদ সদস্যরা একযোগে পদত্যাগ করলে মাত্র ১৭ মাসের মাথায় সংসদ বিলুপ্ত হয়ে যায়। ১৯৮৮ সনের চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ অধিকাংশ দল অংশগ্রহণ না করায় সংসদের বিরোধী দলের নেতা হয়েছিলেন আ স ম আব্দুর রব। সেই বিরোধী দল তখন ‘গৃহপালিত’ বিশেষণ পেয়েছিল। এই সংসদের মেয়াদ ছিল দুই বছর সাত মাস। ১৯৯১ সনে জেনারেল এরশাদের পতন পর্যন্ত সংসদে 'বিরোধী দলের' অস্তিত্বকে ‘গৃহপালিত বিরোধী দলের’ ইতিহাস বলা যায়। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সনের জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। কিন্তু সংসদে বিরোধী দলের কোন ভূমিকাই ছিল না, বিরোধী দল সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতো না, তাদের বেতন-ভাতাদির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে যতদিন যোগ দেওয়ার দরকার ছিল ততদিন যোগ দিয়েছে। এই অবস্থাকে স্বাগত জানিয়ে বিএনপির স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার বলেছিলেন, ‘বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সংসদে না থাকায় সংসদের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে চলছে’। বিরোধী দল না থাকলে সংসদ সুষ্ঠু চলে— এই ধারণাই স্বৈরতন্ত্র।
১৯৯৬ সনে দুইবার জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয়, প্রথমবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে অস্বীকার করায় অধিকাংশ রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করে। ১০ জন স্বতন্ত্র সদস্যকে নিয়ে ফ্রিডম পার্টি থেকে বিজয়ী বঙ্গবন্ধুর খুনি লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার আবদুর রশিদও সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। সংসদে বিরোধী দলীয় কোন নেতা ছিল না। সংসদের স্থায়ীত্ব ছিল মাত্র ১১ দিন। ২০১৪ সনের নির্বাচনে বিএনপি এবং জামায়াত অংশগ্রহণ না করায় জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সহযোগী হয়ে বিরোধী দলের বেঞ্চ দখল করে, সংসদে জাতীয় পার্টি একদিকে সরকারের মন্ত্রীসভায় ছিল, অন্যদিকে তারা বিরোধী দলের আসনেও বসেছিল। ২০১৮ সনের নির্বাচনে বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্ট পায় মাত্র ৭ আসন। ২০২৪ সনের নির্বাচন বিএনপি ও জামায়াত বয়কট করে, মাত্র ১১টি আসন পাওয়া জাতীয় পার্টিকে ঘোষণা করা হয় বিরোধী দল।
আজ আবার একই ছবি। বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ে বসে আছে। জামায়াত ও এনসিপি বিরোধী বেঞ্চে বসে সরকারি দলের মতো আচরণ করছে। বাস্তবে সংসদ হয়ে গেছে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুমোদনের মঞ্চ। ইউনূসের সংস্কার কমিশন শত শত পাতা লিখে সংসদকে কার্যকর করার উপায় বাতলে দিয়েছে। তারা এখন ডিউটিবিহীন গাড়ি নেবেন না, নেবেন আরও বেশি সুবিধা স¤^লিত সরকারি গাড়ি। মার্কিন চুক্তি, হামে শিশু মৃত্যু, ধর্ষণ আর ভারতের পুশইন নিয়ে আলোচনা করলে, সরকার কোন ইস্যুতে বিব্রত হলে আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবন ত্বরান্বিত হয়ে যাবে। সংসদে প্রতি মিনিটে খরচ হচ্ছে দুই লাখ ৭২ হাজার টাকা। সংসদ পরিচালনায় জনগণের বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়া সত্বেও সংসদকে জবাবদিহিমূলক করার সদিচ্ছা কোন সরকার দেখায়নি, অথচ সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলকে বলা হয় বিকল্প বা ছায়া সরকার।
বর্তমান সংসদে বিরোধী দলের ‘গৃহপালিত’ ভূমিকা অব্যাহত থাকলে বর্তমান সরকারেরও স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ ও ফ্যাসিস্ট মনোভাব দৃশ্যমান হতে পারে। একপাক্ষিক সংসদ প্রতিটি সরকারের জন্য বিপজ্জনক। সরকারের ওপর বিরোধী দলের চাপ না থাকলে সরকারের স্বেচ্ছাচারের পথ অবারিত থাকে, শাসক হয়ে ওঠে ফ্যাসিস্ট।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় সংসদে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সরকারি দল, আর বিরোধী বেঞ্চে বসা জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। সংসদের আচরণ অদ্ভুত, হামে শিশু মারা যাচ্ছে, ধর্ষণের পর হত্যা হচ্ছে, আমেরিকার সঙ্গে বিতর্কিত চুক্তি হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে হাজার হাজার লোক বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা চলছে— অথচ সংসদে এসব নিয়ে আলোচনা নেই, আলোচনার প্রস্তাবও নেই। সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা মার্কিন চুক্তি নিয়ে কথা তুলতে চাইলে স্পিকার বলেন, নোটিশ দিতে। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয়ে আলোচনা করতে চাইলে ৩৪১ বিধিতে নোটিশ দিতে হয় এবং সেই নোটিশে ন্যূনতম ৫ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন লাগে। নোটিশ দেবে কী করে, রুমিন ফারহানা ব্যতীত নোটিশের পাশে দাঁড়ানোর মতো আর একজনও নেই। পাশে নেই গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি। কেন নেই ? কারণ অতি বিপ্লবীরা সরকারেরও অংশ।
এটা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের পুরনো রোগ। দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়া মানেই বিরোধী দলকে অকার্যকর করে দেয়া। বিরোধী দল অকার্যকর মানেই সংসদ অকার্যকর। সংসদ অকার্যকর মানেই স্বৈরতন্ত্রের জন্ম। জামায়াত ও এনসিপির কর্মকাণ্ড দেখলে কি মনে হয়, সংবিধান সংস্কার কমিশন স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিজমকে ইউনূসের জাদুঘরে পাঠিয়ে দিয়েছে ? ১৯৭৩ সন থেকে অদ্যাবধি একই মানসিকতায় সরকার ও সংসদ চলছে। আমেরিকার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি নিয়ে দেশে বিতর্ক আছে, চুক্তিতে আছে দেশের স্বার্থবিরোধী অনেক শর্ত। সংবিধানের ১৪৫ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গোপন চুক্তি না হলে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত সব চুক্তি সংসদে উপস্থাপন ও আলোচনা করার বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু অতীতের কোনো সরকার এই শর্ত মানেনি, বর্তমান সরকারও মানছে না। রুমিন ফারহানা সংসদে কথা বলতে চাইলেন। স্পিকার নিয়মের কথা বলে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির কবর দিয়ে দিলেন, নোটিশের পক্ষে কোন সাংসদ দাঁড়ালেন না। একই অবস্থা হাম রোগের ক্ষেত্রেও। শত শত শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে, মারা যাচ্ছে ধর্ষণের তীব্রতায়। রামিসা, আয়েশা, দীপু চন্দ্র দাস— নামগুলো কাগজে আসে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসে, কিন্তু সংসদে আসে না। কারণ সমঝোতা, বিএনপি সরকারকে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলে বিব্রত করতে চায় না জামায়াত এবং এনসিপি, তারা নামকাওয়াস্তে বিরোধী দল। এই পরিবেশ বাংলাদেশে নতুন নয়; ১৯৭৩ সনের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩ আসন পায়। ফলে প্রথম জাতীয় সংসদে কোন বিরোধী দলীয় নেতাই ছিলেন না। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর রাজনৈতিক দৃশ্যপটে সামরিক বাহিনীর অনুপ্রবেশ ঘটে। ১৯৭৯ সনের সংসদেও বিএনপির ছিল দুই তৃতীয়াংশ আসন। সামরিক আইন জারী থাকা অবস্থায় সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনটি ছিল বিতর্কিত।’ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কৌশল ছিল আওয়ামী লীগকে জব্দ করে দেশের রাজনীতির মূল স্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করা’- কথাটি কিন্তু আমার নয়, বিএনপির মওদুদ আহমদের।
১৯৮৬ সনে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি। পরের বছর সংসদ থেকে বিরোধী দলগুলোর সংসদ সদস্যরা একযোগে পদত্যাগ করলে মাত্র ১৭ মাসের মাথায় সংসদ বিলুপ্ত হয়ে যায়। ১৯৮৮ সনের চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ অধিকাংশ দল অংশগ্রহণ না করায় সংসদের বিরোধী দলের নেতা হয়েছিলেন আ স ম আব্দুর রব। সেই বিরোধী দল তখন ‘গৃহপালিত’ বিশেষণ পেয়েছিল। এই সংসদের মেয়াদ ছিল দুই বছর সাত মাস। ১৯৯১ সনে জেনারেল এরশাদের পতন পর্যন্ত সংসদে 'বিরোধী দলের' অস্তিত্বকে ‘গৃহপালিত বিরোধী দলের’ ইতিহাস বলা যায়। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সনের জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। কিন্তু সংসদে বিরোধী দলের কোন ভূমিকাই ছিল না, বিরোধী দল সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতো না, তাদের বেতন-ভাতাদির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে যতদিন যোগ দেওয়ার দরকার ছিল ততদিন যোগ দিয়েছে। এই অবস্থাকে স্বাগত জানিয়ে বিএনপির স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার বলেছিলেন, ‘বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সংসদে না থাকায় সংসদের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে চলছে’। বিরোধী দল না থাকলে সংসদ সুষ্ঠু চলে— এই ধারণাই স্বৈরতন্ত্র।
১৯৯৬ সনে দুইবার জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয়, প্রথমবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে অস্বীকার করায় অধিকাংশ রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করে। ১০ জন স্বতন্ত্র সদস্যকে নিয়ে ফ্রিডম পার্টি থেকে বিজয়ী বঙ্গবন্ধুর খুনি লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার আবদুর রশিদও সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। সংসদে বিরোধী দলীয় কোন নেতা ছিল না। সংসদের স্থায়ীত্ব ছিল মাত্র ১১ দিন। ২০১৪ সনের নির্বাচনে বিএনপি এবং জামায়াত অংশগ্রহণ না করায় জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সহযোগী হয়ে বিরোধী দলের বেঞ্চ দখল করে, সংসদে জাতীয় পার্টি একদিকে সরকারের মন্ত্রীসভায় ছিল, অন্যদিকে তারা বিরোধী দলের আসনেও বসেছিল। ২০১৮ সনের নির্বাচনে বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্ট পায় মাত্র ৭ আসন। ২০২৪ সনের নির্বাচন বিএনপি ও জামায়াত বয়কট করে, মাত্র ১১টি আসন পাওয়া জাতীয় পার্টিকে ঘোষণা করা হয় বিরোধী দল।
আজ আবার একই ছবি। বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ে বসে আছে। জামায়াত ও এনসিপি বিরোধী বেঞ্চে বসে সরকারি দলের মতো আচরণ করছে। বাস্তবে সংসদ হয়ে গেছে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুমোদনের মঞ্চ। ইউনূসের সংস্কার কমিশন শত শত পাতা লিখে সংসদকে কার্যকর করার উপায় বাতলে দিয়েছে। তারা এখন ডিউটিবিহীন গাড়ি নেবেন না, নেবেন আরও বেশি সুবিধা স¤^লিত সরকারি গাড়ি। মার্কিন চুক্তি, হামে শিশু মৃত্যু, ধর্ষণ আর ভারতের পুশইন নিয়ে আলোচনা করলে, সরকার কোন ইস্যুতে বিব্রত হলে আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবন ত্বরান্বিত হয়ে যাবে। সংসদে প্রতি মিনিটে খরচ হচ্ছে দুই লাখ ৭২ হাজার টাকা। সংসদ পরিচালনায় জনগণের বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়া সত্বেও সংসদকে জবাবদিহিমূলক করার সদিচ্ছা কোন সরকার দেখায়নি, অথচ সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলকে বলা হয় বিকল্প বা ছায়া সরকার।
বর্তমান সংসদে বিরোধী দলের ‘গৃহপালিত’ ভূমিকা অব্যাহত থাকলে বর্তমান সরকারেরও স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ ও ফ্যাসিস্ট মনোভাব দৃশ্যমান হতে পারে। একপাক্ষিক সংসদ প্রতিটি সরকারের জন্য বিপজ্জনক। সরকারের ওপর বিরোধী দলের চাপ না থাকলে সরকারের স্বেচ্ছাচারের পথ অবারিত থাকে, শাসক হয়ে ওঠে ফ্যাসিস্ট।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

আপনার মতামত লিখুন