সংবাদ

স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বাধা কোথায়


জিয়াউদ্দীন আহমেদ
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০২:১১ পিএম

স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বাধা কোথায়
ছবি: সংগৃহীত

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘বিএনপির সাংবাদিক হইয়েন না, সাংবাদিক হোন একটু। এইখান থেকে মোটেই সরিয়েন না’। স্বাধীনতার পর ‘বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন’ই ছিল সাংবাদিকদের একমাত্র জাতীয় ইউনিয়ন। ’৯১ সনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরপরই ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায়, এক গ্রুপ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে, অন্য গ্রুপ আওয়ামী লীগ বিরোধী। দলীয় সরকার এদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। সরকার বদল হলে সরকারের মদতপুষ্ট গ্রুপ সুবিধা পায়, আরেক গ্রুপ কোণঠাসা হয়। সাংবাদিকদের দলীয় রাজনীতি ও সরকারের লেজুড়বৃত্তি করার অন্যতম প্রধান কারণ, এর মাধ্যমে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা যায়। আরও একটি কারণ আছে, অধিকাংশ পত্রিকার মালিক ব্যবসায়ী, তাদের অগাধ সম্পদ নিরাপদ রাখার জন্য সরকারের কাছে থাকার চেষ্টা করে, কারণ সরকার পরিশুদ্ধ নয়, অর্থ ও তোষামোদ তাদের দরকার। পত্রিকার মালিক পক্ষের পছন্দ অনুযায়ী লিখতে হলে সাংবাদিকদের কলমের স্বাধীনতা আর থাকে না। ব্রিটিশ দৈনিক টেলিগ্রাফ ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পলিটিকোর মালিক প্রতিষ্ঠান অ্যাক্সেল স্প্রিঞ্জারের প্রধান নির্বাহী ম্যাথিয়াস ডফনার সম্প্রতি বলেছেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক ইসরায়েলকে সমর্থন না করলে পদত্যাগ করা উচিত। 

মোহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই বর্তমান অর্থমন্ত্রীর মতো সরকারের ভুল-ভ্রান্তি তুলে ধরে দলীয় সরকারের রুদ্ধদ্বার পরিবেশ থেকে দেশকে মুক্ত করতে সাংবাদিকদের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু মেইনস্ট্রিম অনেক মিডিয়া এই সুযোগ গ্রহণ করেনি, অথচ ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট নতুন বন্দোবস্তের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতিই ছিল মিডিয়ার স্বাধীনতা। চতুর ব্যবস্থাপনায় মিডিয়াকে সেই স্বাধীনতা দেয়া হয়নি, তখন দেশে ˆতরি করা হয়েছিল এক শ্বাসরোধক দুর্বিষহ অবস্থা। মব সন্ত্রাসের ভয়ে মিডিয়া সত্য প্রকাশে সংযত হয়ে যায়। শিক্ষককে হাতুড়ি দিয়ে পেটানো, রগ কাটা, প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা, গাঁজা কেনার অভিযোগে প্রকাশ্যে যুবকদের পাছার ওপর সজোরে লাঠিপেটা করা, পতিতা নাম দিয়ে প্রকাশ্যে এবং পুলিশের সম্মুখে লাঠি দিয়ে নির্দয়ভাবে পেটানো, মাজার ভাঙার ঘটনা অনেক মিডিয়া সযত্নে এড়িয়ে যায়। সত্য জানার জন্য জনগণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর। 

সরকারকে তোষামোদ না করে তখন উপায় ছিল না, কারণ সাংবাদিকদেরও সংসার আছে, জীবনের মায়া আছে, জীবিকার প্রতি দরদ আছে। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকা অফিসে আগুন দেয়ার আগে এই দুই অফিসের সামনে গরুর ওপর উক্ত দুই পত্রিকার সম্পাদকের নাম লিখে জবাই করা হয়েছে। শত শত লোককে কুপিয়ে, পিটিয়ে জনসম্মুখে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, এর বিরুদ্ধে বর্তমান অর্থমন্ত্রী, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতারা একটি কথাও বলেননি। বলেননি বলেই ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সম্মুখে ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগকে পাথর ও কনক্রিট দিয়ে মাথা-শরীর থেঁতলে হত্যা করার সংবাদ কোন নামকরা মিডিয়ায় সঙ্গে সঙ্গে আসেনি, আসেনি শত শত বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডও। ফ্যাসিস্টদের পক্ষে যায় এমন সংবাদ পরিবেশন থেকে বিরত থাকতে মিডিয়াকে মব গ্রুপের পক্ষ থেকে বারবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে; এই নির্দেশ অমান্য করার হিম্মত তখন কারো ছিল না। তাই সরকারের অবারিত প্রশ্রয়ে সৃষ্ট মব সন্ত্রাস থেকে রেহাই পেতে মিডিয়া সত্য খবর লুকাতে বাধ্য হয়েছে। তবে মিডিয়ার এই সংযত আচরণ সব ক্ষেত্রে যে ভয়ে হয়েছে তা কিন্তু নয়, ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন মিডিয়ায় যে ক্যু হয় তাতে রাতারাতি অনেক পরিবর্তন আসে, মিডিয়া ব্যবস্থাপনায় নতুন নতুন মুখের আবির্ভাব ঘটে, মিডিয়া বিএনপি আর জামায়াত পন্থীদের দখলে চলে যায়। 

অবশ্য আগুন আর সন্ত্রাস থেকে বাঁচার জন্য মিডিয়ার মালিকেরাই অনেক ক্ষেত্রে সম্পাদক ও প্রতিবেদকদের বদলাতে বাধ্য হয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছেন, ৫ আগস্টে অভ্যুত্থানের পর বিএনপি ও জামায়াত প্রশাসনকে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছে। ভাগাভাগির এই প্রশাসনে তোষামোদ না চাইলেও হবে। এই অবস্থায় নীতিবান সাংবাদিক সরকার বিরোধী সত্য প্রকাশে দুইবার ভাববে, কারণ তারা দেখেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাংস্কৃতিক বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীকে বেয়াড়া প্রশ্ন করে তিন সাংবাদিক চাকুরি হারিয়েছেন। আবার তোষামোদ করলেও যে মুক্তি পাওয়া যায় তা কিন্তু নয়, আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে কলম ধরায় ৫ আগস্টের পর শতাধিক সাংবাদিক কারাগারে, ওদের মুক্তির জন্য কোন সাংবাদিক ইউনিয়ন রাস্তায় নামেনি। 

বাংলাদেশে সামরিক-বেসামরিক সব সরকারের আমলে কথিত বাক স্বাধীনতায় সরকারকে প্রশ্ন করতে আপত্তি করা হয় না, কিন্তু শর্ত একটি, প্রশ্নগুলো উত্তরদাতার মনঃপূত হওয়া চাই। শেখ হাসিনার পতনের মূল কারণ এখানেই। প্রশ্ন পর্বে সাংবাদিকরা যেভাবে শেখ হাসিনাকে হাস্যকর প্রশ্ন করতেন তাতে নির্বোধ লোকেরাও লজ্জা পেত। এটা তোষামোদও হতে পারে, আবার বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে জ্ঞানের অভাবও হতে পারে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী মোরারজি দেশাই ১৯৭৯ সনে সরকারি সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন, সাংবাদিকদের প্রশ্নের ধরন দেখে বিরক্ত হন ; তিনি ‘অবিবেচক’ বা ‘সিলি’ প্রশ্ন না করে বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো আলাদা, এগুলো মাঝে মাঝে আজগুবি খবর প্রচার করে থাকে। এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা আওয়ামী সরকারও করেছিল, কিন্তু পারেনি ; কারণ তখন এগুলোর পৃষ্ঠপোষক ছিল বিরোধী দল বিএনপি, জামায়াত। এখন বিএনপি বলছে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু পারবে বলে মনে হয় না, কারণ একই, আওয়ামী লীগ সমর্থকরা এখন ওই সকল নিউজ পোর্টালের পৃষ্ঠপোষক। পশ্চিমা জগতেও আজগুবি খবরের ছড়াছড়ি আছে। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ এনে অসংখ্য কাহিনী মিডিয়ায় গুরুত্ব সহকারে প্রচার হয়েছে। ট্রাম্পের উদ্ভট আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে মিডিয়া তাকে অপ্রকৃতস্থ ব্যক্তি হিসেবেও চিহ্নিত করেছে, তারপরও কিন্তু আমেরিকার ভোটার ট্রাম্পের পাগলামীকেই দ্বিতীয়বার ভোট দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পও মিডিয়ার ভুয়া খবরে অতিষ্ঠ হয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, এবিসি নিউজ, সিএনএন, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, টাইম ম্যাগাজিন এবং নিউজউইক-কে 'ফেইক নিউজ অ্যাওয়ার্ড’ দিয়ে পুরস্কৃত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, কিন্তু ট্রাম্প মিডিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন বলে শোনা যায়নি। সাংবাদিকদের অবাধ স্বাধীনতা আছে পশ্চিমা বিশ্বে। সেখানে সরকার প্রধানকে ব্যাঙ বা কুকুরের চেহারায় চিত্রায়ন করে মিডিয়ায় প্রকাশ করলেও প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির অপমান হয় না, মান যায় না, মিডিয়া বা লেখকের হাতে হাতকড়া লাগানো হয় না। 

বাংলাদেশ সরকার নিজেদের বিরুদ্ধে সমালোচনা পছন্দ করে না, পছন্দ করে তোষামোদ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশে জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় প্রায় দেড় বছর ধরে জেলে বন্দি ইসকনের সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী। এরপর বাংলাদেশে ভারতের পতাকা এবং ভারতে বাংলাদেশের পতাকার অবমাননা শুরু হয়। বাংলাদেশের পতাকার অবমাননা করায় ভারতে তিন যুবককে গ্রেপ্তার করা হলেও বাংলাদেশে কাউকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে শোনা যায়নি। আমেরিকায় পতাকার চেয়ে বাক স্বাধীনতার গুরুত্ব বেশি। আমেরিকায় নিজের অধীনে থাকা জাতীয় পতাকা জনসম্মুখে দুমড়েমুচড়ে ছিন্নভিন্ন করা হলেও রাষ্ট্র বিরোধী কাজ হিসেবে গণ্য করা হয় না। তাদের আদালত বলছে, এগুলো কোন অপরাধ নয়। আদালতের অভিমত হচ্ছে, নিজের মালিকানাধীন পতাকায় আগুন দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা নাগরিকের অধিকার, কিন্তু অন্যের পতাকা ছিনিয়ে এনে তাতে আগুন লাগালে তা হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পশ্চিমা জগতের লোকজন তাদের জাতীয় পতাকার ডিজাইনে বিকিনি, ব্রা, সুইমিং কস্টিউম বানিয়ে ব্যবহার করছে, তাতে কিন্তু তাদের দেশে জাতীয় পতাকার অবমাননা হচ্ছে না। 

বাক স্বাধীনতার সঙ্গে সত্যাসত্যের প্রশ্ন জড়িত, কিন্তু সরকারের জন্য গ্রহণযোগ্য সত্য প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। ভয় এবং স্বার্থ- এই দুইয়ের তাড়নায় সনাতনী তোষামোদের অভ্যাস অক্ষুণ্ন রেখেছেন বাংলাদেশের সাংবাদিকরা। রাজনৈতিক দলের নেতারা পরিশুদ্ধ না হলে শুদ্ধ রাজনীতি আসবে না, শুদ্ধ রাজনীতি না এলে মিডিয়া এবং সাংবাদিকদের লেজুড়বৃত্তিও বন্ধ হবে না। নেতা শুধু আমলা আর দলীয় কর্মীর কাছ থেকে নয়, সাংবাদিকদের কাছ থেকেও প্রশ্নহীন আনুগত্য প্রত্যাশা করেন। তাই সাংবাদিকতায় তোষামোদ থাকবে এবং সরকারের আশির্বাদপুষ্ট সাংবাদিকরা হবেন মেরুদণ্ডহীন। মেরুদণ্ড সোজা রেখে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে কাউকে কাউকে সব সরকারের আমলেই নিগৃহীত হতে হয়েছে। 

বর্তমান অর্থমন্ত্রী যা বলেছেন তা বিএনপি সরকারের নীতি হলে বিএনপি সরকার এবং জাতি উপকৃত হবে; কিন্তু সাংবাদিক মাত্রই জানে, সরকার ‘বাঘ আর সিংহের প্রশংসা করলেও পছন্দ করে গাধাকে’। 

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ২০ জুন ২০২৬


স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বাধা কোথায়

প্রকাশের তারিখ : ২০ জুন ২০২৬

featured Image

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘বিএনপির সাংবাদিক হইয়েন না, সাংবাদিক হোন একটু। এইখান থেকে মোটেই সরিয়েন না’। স্বাধীনতার পর ‘বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন’ই ছিল সাংবাদিকদের একমাত্র জাতীয় ইউনিয়ন। ’৯১ সনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরপরই ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায়, এক গ্রুপ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে, অন্য গ্রুপ আওয়ামী লীগ বিরোধী। দলীয় সরকার এদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। সরকার বদল হলে সরকারের মদতপুষ্ট গ্রুপ সুবিধা পায়, আরেক গ্রুপ কোণঠাসা হয়। সাংবাদিকদের দলীয় রাজনীতি ও সরকারের লেজুড়বৃত্তি করার অন্যতম প্রধান কারণ, এর মাধ্যমে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা যায়। আরও একটি কারণ আছে, অধিকাংশ পত্রিকার মালিক ব্যবসায়ী, তাদের অগাধ সম্পদ নিরাপদ রাখার জন্য সরকারের কাছে থাকার চেষ্টা করে, কারণ সরকার পরিশুদ্ধ নয়, অর্থ ও তোষামোদ তাদের দরকার। পত্রিকার মালিক পক্ষের পছন্দ অনুযায়ী লিখতে হলে সাংবাদিকদের কলমের স্বাধীনতা আর থাকে না। ব্রিটিশ দৈনিক টেলিগ্রাফ ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পলিটিকোর মালিক প্রতিষ্ঠান অ্যাক্সেল স্প্রিঞ্জারের প্রধান নির্বাহী ম্যাথিয়াস ডফনার সম্প্রতি বলেছেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক ইসরায়েলকে সমর্থন না করলে পদত্যাগ করা উচিত। 

মোহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই বর্তমান অর্থমন্ত্রীর মতো সরকারের ভুল-ভ্রান্তি তুলে ধরে দলীয় সরকারের রুদ্ধদ্বার পরিবেশ থেকে দেশকে মুক্ত করতে সাংবাদিকদের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু মেইনস্ট্রিম অনেক মিডিয়া এই সুযোগ গ্রহণ করেনি, অথচ ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট নতুন বন্দোবস্তের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতিই ছিল মিডিয়ার স্বাধীনতা। চতুর ব্যবস্থাপনায় মিডিয়াকে সেই স্বাধীনতা দেয়া হয়নি, তখন দেশে ˆতরি করা হয়েছিল এক শ্বাসরোধক দুর্বিষহ অবস্থা। মব সন্ত্রাসের ভয়ে মিডিয়া সত্য প্রকাশে সংযত হয়ে যায়। শিক্ষককে হাতুড়ি দিয়ে পেটানো, রগ কাটা, প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা, গাঁজা কেনার অভিযোগে প্রকাশ্যে যুবকদের পাছার ওপর সজোরে লাঠিপেটা করা, পতিতা নাম দিয়ে প্রকাশ্যে এবং পুলিশের সম্মুখে লাঠি দিয়ে নির্দয়ভাবে পেটানো, মাজার ভাঙার ঘটনা অনেক মিডিয়া সযত্নে এড়িয়ে যায়। সত্য জানার জন্য জনগণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর। 

সরকারকে তোষামোদ না করে তখন উপায় ছিল না, কারণ সাংবাদিকদেরও সংসার আছে, জীবনের মায়া আছে, জীবিকার প্রতি দরদ আছে। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকা অফিসে আগুন দেয়ার আগে এই দুই অফিসের সামনে গরুর ওপর উক্ত দুই পত্রিকার সম্পাদকের নাম লিখে জবাই করা হয়েছে। শত শত লোককে কুপিয়ে, পিটিয়ে জনসম্মুখে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, এর বিরুদ্ধে বর্তমান অর্থমন্ত্রী, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতারা একটি কথাও বলেননি। বলেননি বলেই ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সম্মুখে ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগকে পাথর ও কনক্রিট দিয়ে মাথা-শরীর থেঁতলে হত্যা করার সংবাদ কোন নামকরা মিডিয়ায় সঙ্গে সঙ্গে আসেনি, আসেনি শত শত বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডও। ফ্যাসিস্টদের পক্ষে যায় এমন সংবাদ পরিবেশন থেকে বিরত থাকতে মিডিয়াকে মব গ্রুপের পক্ষ থেকে বারবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে; এই নির্দেশ অমান্য করার হিম্মত তখন কারো ছিল না। তাই সরকারের অবারিত প্রশ্রয়ে সৃষ্ট মব সন্ত্রাস থেকে রেহাই পেতে মিডিয়া সত্য খবর লুকাতে বাধ্য হয়েছে। তবে মিডিয়ার এই সংযত আচরণ সব ক্ষেত্রে যে ভয়ে হয়েছে তা কিন্তু নয়, ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন মিডিয়ায় যে ক্যু হয় তাতে রাতারাতি অনেক পরিবর্তন আসে, মিডিয়া ব্যবস্থাপনায় নতুন নতুন মুখের আবির্ভাব ঘটে, মিডিয়া বিএনপি আর জামায়াত পন্থীদের দখলে চলে যায়। 

অবশ্য আগুন আর সন্ত্রাস থেকে বাঁচার জন্য মিডিয়ার মালিকেরাই অনেক ক্ষেত্রে সম্পাদক ও প্রতিবেদকদের বদলাতে বাধ্য হয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছেন, ৫ আগস্টে অভ্যুত্থানের পর বিএনপি ও জামায়াত প্রশাসনকে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছে। ভাগাভাগির এই প্রশাসনে তোষামোদ না চাইলেও হবে। এই অবস্থায় নীতিবান সাংবাদিক সরকার বিরোধী সত্য প্রকাশে দুইবার ভাববে, কারণ তারা দেখেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাংস্কৃতিক বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীকে বেয়াড়া প্রশ্ন করে তিন সাংবাদিক চাকুরি হারিয়েছেন। আবার তোষামোদ করলেও যে মুক্তি পাওয়া যায় তা কিন্তু নয়, আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে কলম ধরায় ৫ আগস্টের পর শতাধিক সাংবাদিক কারাগারে, ওদের মুক্তির জন্য কোন সাংবাদিক ইউনিয়ন রাস্তায় নামেনি। 

বাংলাদেশে সামরিক-বেসামরিক সব সরকারের আমলে কথিত বাক স্বাধীনতায় সরকারকে প্রশ্ন করতে আপত্তি করা হয় না, কিন্তু শর্ত একটি, প্রশ্নগুলো উত্তরদাতার মনঃপূত হওয়া চাই। শেখ হাসিনার পতনের মূল কারণ এখানেই। প্রশ্ন পর্বে সাংবাদিকরা যেভাবে শেখ হাসিনাকে হাস্যকর প্রশ্ন করতেন তাতে নির্বোধ লোকেরাও লজ্জা পেত। এটা তোষামোদও হতে পারে, আবার বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে জ্ঞানের অভাবও হতে পারে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী মোরারজি দেশাই ১৯৭৯ সনে সরকারি সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন, সাংবাদিকদের প্রশ্নের ধরন দেখে বিরক্ত হন ; তিনি ‘অবিবেচক’ বা ‘সিলি’ প্রশ্ন না করে বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো আলাদা, এগুলো মাঝে মাঝে আজগুবি খবর প্রচার করে থাকে। এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা আওয়ামী সরকারও করেছিল, কিন্তু পারেনি ; কারণ তখন এগুলোর পৃষ্ঠপোষক ছিল বিরোধী দল বিএনপি, জামায়াত। এখন বিএনপি বলছে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু পারবে বলে মনে হয় না, কারণ একই, আওয়ামী লীগ সমর্থকরা এখন ওই সকল নিউজ পোর্টালের পৃষ্ঠপোষক। পশ্চিমা জগতেও আজগুবি খবরের ছড়াছড়ি আছে। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ এনে অসংখ্য কাহিনী মিডিয়ায় গুরুত্ব সহকারে প্রচার হয়েছে। ট্রাম্পের উদ্ভট আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে মিডিয়া তাকে অপ্রকৃতস্থ ব্যক্তি হিসেবেও চিহ্নিত করেছে, তারপরও কিন্তু আমেরিকার ভোটার ট্রাম্পের পাগলামীকেই দ্বিতীয়বার ভোট দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পও মিডিয়ার ভুয়া খবরে অতিষ্ঠ হয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, এবিসি নিউজ, সিএনএন, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, টাইম ম্যাগাজিন এবং নিউজউইক-কে 'ফেইক নিউজ অ্যাওয়ার্ড’ দিয়ে পুরস্কৃত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, কিন্তু ট্রাম্প মিডিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন বলে শোনা যায়নি। সাংবাদিকদের অবাধ স্বাধীনতা আছে পশ্চিমা বিশ্বে। সেখানে সরকার প্রধানকে ব্যাঙ বা কুকুরের চেহারায় চিত্রায়ন করে মিডিয়ায় প্রকাশ করলেও প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির অপমান হয় না, মান যায় না, মিডিয়া বা লেখকের হাতে হাতকড়া লাগানো হয় না। 

বাংলাদেশ সরকার নিজেদের বিরুদ্ধে সমালোচনা পছন্দ করে না, পছন্দ করে তোষামোদ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশে জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় প্রায় দেড় বছর ধরে জেলে বন্দি ইসকনের সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী। এরপর বাংলাদেশে ভারতের পতাকা এবং ভারতে বাংলাদেশের পতাকার অবমাননা শুরু হয়। বাংলাদেশের পতাকার অবমাননা করায় ভারতে তিন যুবককে গ্রেপ্তার করা হলেও বাংলাদেশে কাউকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে শোনা যায়নি। আমেরিকায় পতাকার চেয়ে বাক স্বাধীনতার গুরুত্ব বেশি। আমেরিকায় নিজের অধীনে থাকা জাতীয় পতাকা জনসম্মুখে দুমড়েমুচড়ে ছিন্নভিন্ন করা হলেও রাষ্ট্র বিরোধী কাজ হিসেবে গণ্য করা হয় না। তাদের আদালত বলছে, এগুলো কোন অপরাধ নয়। আদালতের অভিমত হচ্ছে, নিজের মালিকানাধীন পতাকায় আগুন দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা নাগরিকের অধিকার, কিন্তু অন্যের পতাকা ছিনিয়ে এনে তাতে আগুন লাগালে তা হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পশ্চিমা জগতের লোকজন তাদের জাতীয় পতাকার ডিজাইনে বিকিনি, ব্রা, সুইমিং কস্টিউম বানিয়ে ব্যবহার করছে, তাতে কিন্তু তাদের দেশে জাতীয় পতাকার অবমাননা হচ্ছে না। 

বাক স্বাধীনতার সঙ্গে সত্যাসত্যের প্রশ্ন জড়িত, কিন্তু সরকারের জন্য গ্রহণযোগ্য সত্য প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। ভয় এবং স্বার্থ- এই দুইয়ের তাড়নায় সনাতনী তোষামোদের অভ্যাস অক্ষুণ্ন রেখেছেন বাংলাদেশের সাংবাদিকরা। রাজনৈতিক দলের নেতারা পরিশুদ্ধ না হলে শুদ্ধ রাজনীতি আসবে না, শুদ্ধ রাজনীতি না এলে মিডিয়া এবং সাংবাদিকদের লেজুড়বৃত্তিও বন্ধ হবে না। নেতা শুধু আমলা আর দলীয় কর্মীর কাছ থেকে নয়, সাংবাদিকদের কাছ থেকেও প্রশ্নহীন আনুগত্য প্রত্যাশা করেন। তাই সাংবাদিকতায় তোষামোদ থাকবে এবং সরকারের আশির্বাদপুষ্ট সাংবাদিকরা হবেন মেরুদণ্ডহীন। মেরুদণ্ড সোজা রেখে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে কাউকে কাউকে সব সরকারের আমলেই নিগৃহীত হতে হয়েছে। 

বর্তমান অর্থমন্ত্রী যা বলেছেন তা বিএনপি সরকারের নীতি হলে বিএনপি সরকার এবং জাতি উপকৃত হবে; কিন্তু সাংবাদিক মাত্রই জানে, সরকার ‘বাঘ আর সিংহের প্রশংসা করলেও পছন্দ করে গাধাকে’। 

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত