বর্ষা মৌসুম শুরু হলেও মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ঐতিহাসিক গাজীখালী নদী এখন পানিশূন্য। নদীর বুকে পানির বদলে কেবলই চোখে পড়ে মাইলের পর মাইল জুড়ে থাকা কচুরিপানার জট।
উপজেলার গোপালপুর এলাকা থেকে ধামরাইয়ের বারবারিয়া এলাকা পর্যন্ত নদীজুড়ে কচুরিপানার এমন জট সৃষ্টি হয়েছে যে, চেনার উপায় নেই এটি একসময়ের প্রবহমান নদী। ফলে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে নৌচলাচল।
অভিযোগ উঠেছে, দুই দফায় গাজীখালী নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে শুধু সাটুরিয়া অংশেই সরকারের প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয় করে খননকাজ করা হলেও তা কোনো কাজেই আসেনি।
স্থানীয়দের মতে, যথাযথ তদারকির অভাব ও দায়সারা খননের কারণে সরকারের এই বিপুল অর্থ কার্যত জাদুকরী উপায়ে 'জলে গেছে'।
সরেজমিনে গাজীখালী নদীর কয়েকটি পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে, নদীটি সাটুরিয়ার গোপালপুরে ধলেশ্বরী নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে ধামরাই হয়ে সিংগাইরে ধলেশ্বরী নদীতেই মিশেছে। একসময় এই গাজীখালী নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল ঐতিহ্যবাহী সাটুরিয়া বাজার। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বড় বড় নৌকা ও স্টিমারে করে শত শত ক্রেতা-বিক্রেতা এই নদী পথেই যাতায়াত করতেন।
ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় ২০২০-২০২১ অর্থবছরে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া, সদর, সিংগাইর ও ঢাকার ধামরাই সীমানা ঘেঁষে প্রবহমান ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীতে খননকাজ চালানো হয়। তিন উপজেলার এই খনন যজ্ঞে মোট ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাটুরিয়ার গোপালপুর থেকে প্রথম ১৫ কিলোমিটার এবং পরবর্তী অংশ মিলিয়ে সাটুরিয়া অংশেই প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু খননের বছরে সামান্য পানি এলেও, পরবর্তী সময়ে নদীর অবস্থা আগের চেয়েও শোচনীয় হয়ে পড়ে।
নদীর এমন দুরাবস্থায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সাটুরিয়ার হরগজ গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আব্দুল মজিদ বলেন, "আগে এই সময়টাতে সাটুরিয়া হাটে আসার একমাত্র মাধ্যম ছিল নৌকা। গ্রামের খালগুলো দিয়ে নৌকা নিয়ে গাজীখালী নদী হয়ে হাটে আসতাম। আর এখন খালে তো পানিই নাই, গাজীখালী নদীতেও জটের কারণে পানি দেখা যায় না।"
দড়গ্রাম এলাকার প্রবীণ জেলে জ্যোতিষ রাজবংশী (৬৫) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আগে নদীতে পানি আসতো, মাছ মারতাম। শত শত জেলে পরিবার এই নদী দিয়ে সংসার চালাতো। এখন পানিই আসে না। কয়েক বছর আগে নদী খননের নামে শুধু মাটি বিক্রি করে লাভবান হয়েছে প্রভাবশালীরা, নদীর নাব্যতা ফেরেনি।"
পানাইজুরির মো. গোলাম মোস্তফা (৭৫) স্মৃতিচারণ করে বলেন, "একসময় সাটুরিয়া বাজারের খাদ্য গুদামের সামনে পর্যন্ত ছিল গাজীখালী নদী। এখন ছোট হয়ে গেছে। খননের নামে ভুয়া প্রকল্পে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। আগে নদীতে ছিল শুধু পানি, আর এখন শুধু পানা।"
পুরো নদী জুড়ে কচুরিপানার জট লেগে থাকার পরও তা সরানোর কোনো প্রশাসনিক উদ্যোগ চোখে পড়েনি। অতিরিক্ত কচুরিপানা পচে নদীর অবশিষ্ট পানি নষ্ট হচ্ছে, ফলে মাছ মরে ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। নদীতে মাছ না থাকায় ঐতিহ্যগতভাবে টিকে থাকা স্থানীয় জেলে পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে।
গাজীখালী নদীর এই করুণ দশা এবং খননকাজের কার্যকারিতা নিয়ে জানতে চাইলে মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলেন, "আমি যোগদান করার আগে গাজীখালী নদী পুনঃখননের কাজ হয়েছে, তাই খনন বিষয়ে বিস্তারিত এই মুহূর্তে বলতে পারব না।"
কচুরিপানার জটে নৌপথ বন্ধ। ছবি: প্রতিনিধি
নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে এনে নৌপথ চালু এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে উৎসমুখ খনন ও কচুরিপানার জট অপসারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।

শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ জুন ২০২৬
বর্ষা মৌসুম শুরু হলেও মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ঐতিহাসিক গাজীখালী নদী এখন পানিশূন্য। নদীর বুকে পানির বদলে কেবলই চোখে পড়ে মাইলের পর মাইল জুড়ে থাকা কচুরিপানার জট।
উপজেলার গোপালপুর এলাকা থেকে ধামরাইয়ের বারবারিয়া এলাকা পর্যন্ত নদীজুড়ে কচুরিপানার এমন জট সৃষ্টি হয়েছে যে, চেনার উপায় নেই এটি একসময়ের প্রবহমান নদী। ফলে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে নৌচলাচল।
অভিযোগ উঠেছে, দুই দফায় গাজীখালী নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে শুধু সাটুরিয়া অংশেই সরকারের প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয় করে খননকাজ করা হলেও তা কোনো কাজেই আসেনি।
স্থানীয়দের মতে, যথাযথ তদারকির অভাব ও দায়সারা খননের কারণে সরকারের এই বিপুল অর্থ কার্যত জাদুকরী উপায়ে 'জলে গেছে'।
সরেজমিনে গাজীখালী নদীর কয়েকটি পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে, নদীটি সাটুরিয়ার গোপালপুরে ধলেশ্বরী নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে ধামরাই হয়ে সিংগাইরে ধলেশ্বরী নদীতেই মিশেছে। একসময় এই গাজীখালী নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল ঐতিহ্যবাহী সাটুরিয়া বাজার। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বড় বড় নৌকা ও স্টিমারে করে শত শত ক্রেতা-বিক্রেতা এই নদী পথেই যাতায়াত করতেন।
ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় ২০২০-২০২১ অর্থবছরে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া, সদর, সিংগাইর ও ঢাকার ধামরাই সীমানা ঘেঁষে প্রবহমান ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীতে খননকাজ চালানো হয়। তিন উপজেলার এই খনন যজ্ঞে মোট ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাটুরিয়ার গোপালপুর থেকে প্রথম ১৫ কিলোমিটার এবং পরবর্তী অংশ মিলিয়ে সাটুরিয়া অংশেই প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু খননের বছরে সামান্য পানি এলেও, পরবর্তী সময়ে নদীর অবস্থা আগের চেয়েও শোচনীয় হয়ে পড়ে।
নদীর এমন দুরাবস্থায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সাটুরিয়ার হরগজ গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আব্দুল মজিদ বলেন, "আগে এই সময়টাতে সাটুরিয়া হাটে আসার একমাত্র মাধ্যম ছিল নৌকা। গ্রামের খালগুলো দিয়ে নৌকা নিয়ে গাজীখালী নদী হয়ে হাটে আসতাম। আর এখন খালে তো পানিই নাই, গাজীখালী নদীতেও জটের কারণে পানি দেখা যায় না।"
দড়গ্রাম এলাকার প্রবীণ জেলে জ্যোতিষ রাজবংশী (৬৫) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আগে নদীতে পানি আসতো, মাছ মারতাম। শত শত জেলে পরিবার এই নদী দিয়ে সংসার চালাতো। এখন পানিই আসে না। কয়েক বছর আগে নদী খননের নামে শুধু মাটি বিক্রি করে লাভবান হয়েছে প্রভাবশালীরা, নদীর নাব্যতা ফেরেনি।"
পানাইজুরির মো. গোলাম মোস্তফা (৭৫) স্মৃতিচারণ করে বলেন, "একসময় সাটুরিয়া বাজারের খাদ্য গুদামের সামনে পর্যন্ত ছিল গাজীখালী নদী। এখন ছোট হয়ে গেছে। খননের নামে ভুয়া প্রকল্পে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। আগে নদীতে ছিল শুধু পানি, আর এখন শুধু পানা।"
পুরো নদী জুড়ে কচুরিপানার জট লেগে থাকার পরও তা সরানোর কোনো প্রশাসনিক উদ্যোগ চোখে পড়েনি। অতিরিক্ত কচুরিপানা পচে নদীর অবশিষ্ট পানি নষ্ট হচ্ছে, ফলে মাছ মরে ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। নদীতে মাছ না থাকায় ঐতিহ্যগতভাবে টিকে থাকা স্থানীয় জেলে পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে।
গাজীখালী নদীর এই করুণ দশা এবং খননকাজের কার্যকারিতা নিয়ে জানতে চাইলে মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলেন, "আমি যোগদান করার আগে গাজীখালী নদী পুনঃখননের কাজ হয়েছে, তাই খনন বিষয়ে বিস্তারিত এই মুহূর্তে বলতে পারব না।"
কচুরিপানার জটে নৌপথ বন্ধ। ছবি: প্রতিনিধি
নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে এনে নৌপথ চালু এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে উৎসমুখ খনন ও কচুরিপানার জট অপসারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।

আপনার মতামত লিখুন