ইটের পর ইট, তার মাঝে পিচঢালা পথ; ক্লান্ত এই নাগরিক জ্যামিতির মাঝে প্রতিটি মানুষেরই মনে সুপ্ত ইচ্ছে থাকে একটা এক চিলতে সবুজ বারান্দার, একটা নিরাপদ আশ্রয়ের। যেখানে দিনশেষে ঘরে ফিরে একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়। কিন্তু এই তিলোত্তমা নগরী ঢাকায় মধ্যবিত্ত বা স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য একটি নিজস্ব ফ্ল্যাট কেনা যেন আকাশকুসুম কল্পনা। সেই কল্পনার ক্যানভাসে এবার বাস্তবতার রঙ তুলি নিয়ে হাজির হয়েছে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ।
রাজধানীর পল্লবী মেট্রোস্টেশনের ঠিক অদূরে, মিরপুর ৯ নম্বর সেকশনে ডানা মেলছে মধ্যবিত্তের স্বপ্নের আবাসন প্রকল্প—‘স্বপ্ন নগর ২য় পর্ব’। ১৫টি ১৪ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী ভবনের সারি যেন দূর থেকে জানান দিচ্ছে, এখানে মধ্যবিত্তের স্বপ্ন ডানা মেলতে শুরু করেছে। এই যেন এক নতুন ভোরের গল্প, যেখানে ঢাকা শহরের এক চিলতে আকাশ আর সবুজ চত্বরে বুক ভরে শ্বাস নেবে ১৫৬০টি পরিবার।
ধ্বংসস্তূপ আর দখলদারদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে উত্থান
এই বিশাল আবাসন গড়ে তোলা মোটেও সহজ ছিল না। এই প্রকল্প সফল করতে গিয়ে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের পদে পদে হতে হয়েছে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দীর্ঘদিন ধরে এই সরকারি জমিগুলো ছিল প্রভাবশালী অবৈধ দখলদার ও সিন্ডিকেটের কবলে। তবে মন্ত্রণালয়ের অনড় অবস্থান এবং জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কঠোর শুদ্ধি অভিযানের সামনে পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছে বছরের পর বছর ঘাপটি মেরে থাকা দালাল ও ফাইল আটকে রাখা সিন্ডিকেট চক্র।
গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, এই উচ্ছেদ ও শুদ্ধি অভিযান চালাতে গিয়ে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নানা হুমকি ও মিথ্যা অপপ্রচারের শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু কোনো কিছুই দমাতে পারেনি এই উন্নয়নযজ্ঞকে। সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রতিটি ফ্ল্যাট, যাতে কোনো মধ্যবিত্তের স্বপ্ন মাঝপথে ফিকে হয়ে না যায়।
১৬ ধরনের আধুনিক নাগরিক সুবিধা
১৫ একরেরও বেশি জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই স্বপ্নের চত্বরটি মূলত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মিনি টাউনশিপ। এখানে থাকছে ৯ তলা বিশিষ্ট সুবিশাল কমিউনিটি ভবন, নিজস্ব অভ্যন্তরীণ চওড়া রাস্তা এবং দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে। প্রতিটি ভবনে যাতায়াতের জন্য থাকছে আলাদা প্যাসেঞ্জার ও বেড লিফটের ব্যবস্থা। এছাড়া নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য রয়েছে ১০০ ও ১৫০ কেভির জেনারেটর এবং ১৫০ ও ৬৩০ কেভিএ সাব-স্টেশন।
পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রার জন্য স্থাপন করা হয়েছে সৌর বিদ্যুৎ প্যানেল, ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ তারের জন্য আরএমইউ, উন্নত অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা এবং সেন্ট্রিফিউগাল ও সাবমার্সিবল পাম্প। এছাড়াও থাকছে ইন্টারকম সুবিধা ও দৃষ্টিনন্দন প্রবেশদ্বার। পরিবেশ রক্ষায় ও পানি অপচয় রোধে নেওয়া হয়েছে যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যার মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) এবং ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ডব্লিউটিপি)।
কঠোর তদারকিতে প্রকৌশলীরা, ২০২৬-এর ডিসেম্বরেই পূর্ণতা পাবে স্বপ্ন
২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি যখন প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদিত হয়, তখন থেকেই একে ঘিরে ছিল ব্যাপক প্রত্যাশা। পরবর্তীতে সংশোধিত আকারে এই মেগা প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১১১৯৬৫ দশমিক ১৪ লাখ টাকা। কোনো প্রকার ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই প্রকল্পের চূড়ান্ত বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে চলতি বছরের ডিসেম্বর ২০২৬।
প্রকল্পটির মাঠ পর্যায়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের ঢাকা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হারিজুর রহমান জানান, তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজের মান নিয়ন্ত্রণ করছেন। প্রকল্প এলাকায় দায়িত্বরত মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, হারিজুর রহমান কাজের গুণগত মান ও নির্মাণ সামগ্রী তদারকি করতে নিয়মিত সাইট পরিদর্শন করেন এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। কাজের ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হচ্ছে না।
তিনটি ভিন্ন আকারে মধ্যবিত্তের সাধ ও সাধ্যের মেলবন্ধন
এই আবাসন প্রকল্পে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতার কথা বিবেচনা করে তিন ক্যাটাগরির ফ্ল্যাট তৈরি করা হয়েছে। ১৪ তলা বিশিষ্ট ৯টি ভবনে রয়েছে ১৫৪৫ বর্গফুটের ৯৩৬টি ফ্ল্যাট, যার প্রতিটির মূল্য ৭৮ দশমিক ৭২ লাখ টাকা। মাঝারি পরিবারের জন্য ১৪ তলা বিশিষ্ট ৪টি ভবনে রয়েছে ১৩৩৮ বর্গফুটের ৪১৬টি ফ্ল্যাট, যার মূল্য ৬৭ দশমিক ৯৯ লাখ টাকা। আর একদম সীমিত আয়ের মানুষদের জন্য তৈরি হয়েছে ১৪ তলা বিশিষ্ট ২টি ভবনের ৮৭৮ বর্গফুটের ২০৮টি ফ্ল্যাট, যার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৪৪ দশমিক ৭০ লাখ টাকা। ইতিমধ্যেই নির্মাণ কাজ শেষ হওয়া বেশ কয়েকটি ভবনের ফ্ল্যাট চাবি লটারির মাধ্যমে বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, বাকি ভবনগুলোর কাজও শেষ পর্যায়ে।
গাফিলতি করা ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি অ্যাকশন ও ব্ল্যাকলিস্টের প্রস্তুতি
কাজের গুণগত মান রক্ষা এবং নির্ধারিত সময়ে আবাসন বুঝিয়ে দিতে কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। এ বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, "পল্লবী মেট্রোস্টেশন থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে কালসি ও সিওএইচএস ফ্লাইওভার সংলগ্ন এই 'স্বপ্ন নগর-২' এলাকাটি আমরা একটি আদর্শ মডেল প্রকল্প হিসেবে গড়ে তুলছি। এখানে শিশুদের খেলার মাঠ থেকে শুরু করে গ্রিন স্পেস ও বয়স্কদের হাঁটার সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।"
তবে প্রকল্পের অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করা কয়েকজন ঠিকাদারের গাফিলতির কথাও তিনি অকপটে স্বীকার করেন। সাখাওয়াত হোসেন স্পষ্ট করে বলেন, "কয়েকটি ভবন নির্মাণে গাফিলতি করায় নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের বাদ দিয়ে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং তাদের কালো তালিকাভুক্ত (ব্ল্যাকলিস্ট) করার চিন্তাভাবনা চলছে।"
ফ্ল্যাট মালিকদের স্বস্তি, তবে মশা ও নিরাপত্তা নিয়ে কিছু উদ্বেগ
ইতিমধ্যেই যেসকল ভাগ্যবান মালিকরা ফ্ল্যাটের চাবি বুঝে পেয়ে বসবাস শুরু করেছেন, তাদের চোখে-মুখে এখন স্বস্তির আলো। তবে নতুন আবাসন এলাকা হওয়ায় কিছু প্রাথমিক সমস্যার কথাও জানিয়েছেন তারা। কয়েকজন ফ্ল্যাট মালিক বলেন, "শুরুতে এলাকাটিতে মশার উপদ্রব একটু বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, মশা দমনে আমরা ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের দ্রুত হস্তক্ষেপ ও সহযোগিতা কামনা করছি।"
এছাড়াও তারা মেট্রোস্টেশন থেকে আবাসন এলাকার সংযোগ সড়ক পর্যন্ত রাতে যাতায়াতের নিরাপত্তার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। মালিকদের দাবি, রাস্তার দুপাশে পর্যাপ্ত ল্যাম্পপোস্টের পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং পুলিশি পাহারা জোরদার করলে ১৫০০ পরিবারের নার ও শিশুরা নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে। যদিও নিকটস্থ ডিওএইচএস ও পল্লবী থানা পুলিশের নিয়মিত টহল দল এই এলাকায় নিরাপত্তা দিচ্ছে, তবুও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার হলে বাসিন্দারা মানসিকভাবে অনেক স্বস্তিতে থাকবেন।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে এই মডেল: আশাবাদী চেয়ারম্যান
প্রকল্পের সামগ্রিক সাফল্য এবং ভবিষ্যতের রূপরেখা নিয়ে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম মুঠোফোনে তার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি অত্যন্ত আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন, "মিরপুরে আমাদের 'স্বপ্ন নগর-১' প্রকল্পের কাজ আগেই সফলভাবে শেষ হয়েছে এবং সেখানে ফ্ল্যাট মালিকরা অত্যন্ত শান্তিতে ও নাগরিক সুবিধা ভোগ করে বসবাস করছেন। আমাদের দ্বিতীয় চেলেঞ্জিং প্রজেক্ট 'স্বপ্ন নগর-২'-এর নির্মাণ কাজও এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। অধিকাংশ ভবনের কাজ শেষ করে আমরা ফ্ল্যাটগুলো মালিকদের হাতে তুলে দিয়েছি। বাকি ভবনগুলোর চাবিও শিগগিরই বুঝিয়ে দেওয়া হবে।"
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম আরও যোগ করেন, "এই মডেল প্রকল্পটির সফল সমাপ্তির পর আমরা রাজধানীতে নতুন করে 'স্বপ্ন নগর-৩' ও 'স্বপ্ন নগর-৪' প্রকল্পের কাজ হাতে নিয়েছি। শুধু ঢাকাতেই নয়, দেশের আবাসন সংকট দূর করতে আমরা ৮টি বিভাগীয় শহর এবং দেশের বেশ কয়েকটি পুরাতন জেলা শহরেও মধ্যবিত্তের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণের বৃহৎ উদ্যোগ নিয়েছি। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের পুরো টিম অত্যন্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে দেশজুড়ে এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে।"
সব মিলিয়ে মিরপুরের 'স্বপ্ন নগর-২' কেবল একটি আবাসন প্রকল্প নয়, এটি এক টুকরো ছাদ খোঁজা হাজারো মধ্যবিত্তের স্বপ্নপূরণের জ্বলজ্যান্ত দলিল। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই যখন সব ভবনে আলো জ্বলবে, তখন এই ইট-পাথরের ঢাকা শহর পাবে এক নতুন দৃষ্টিনন্দন পরিবেশবান্ধব মডেল উপশহর।

সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুন ২০২৬
ইটের পর ইট, তার মাঝে পিচঢালা পথ; ক্লান্ত এই নাগরিক জ্যামিতির মাঝে প্রতিটি মানুষেরই মনে সুপ্ত ইচ্ছে থাকে একটা এক চিলতে সবুজ বারান্দার, একটা নিরাপদ আশ্রয়ের। যেখানে দিনশেষে ঘরে ফিরে একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়। কিন্তু এই তিলোত্তমা নগরী ঢাকায় মধ্যবিত্ত বা স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য একটি নিজস্ব ফ্ল্যাট কেনা যেন আকাশকুসুম কল্পনা। সেই কল্পনার ক্যানভাসে এবার বাস্তবতার রঙ তুলি নিয়ে হাজির হয়েছে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ।
রাজধানীর পল্লবী মেট্রোস্টেশনের ঠিক অদূরে, মিরপুর ৯ নম্বর সেকশনে ডানা মেলছে মধ্যবিত্তের স্বপ্নের আবাসন প্রকল্প—‘স্বপ্ন নগর ২য় পর্ব’। ১৫টি ১৪ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী ভবনের সারি যেন দূর থেকে জানান দিচ্ছে, এখানে মধ্যবিত্তের স্বপ্ন ডানা মেলতে শুরু করেছে। এই যেন এক নতুন ভোরের গল্প, যেখানে ঢাকা শহরের এক চিলতে আকাশ আর সবুজ চত্বরে বুক ভরে শ্বাস নেবে ১৫৬০টি পরিবার।
ধ্বংসস্তূপ আর দখলদারদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে উত্থান
এই বিশাল আবাসন গড়ে তোলা মোটেও সহজ ছিল না। এই প্রকল্প সফল করতে গিয়ে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের পদে পদে হতে হয়েছে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দীর্ঘদিন ধরে এই সরকারি জমিগুলো ছিল প্রভাবশালী অবৈধ দখলদার ও সিন্ডিকেটের কবলে। তবে মন্ত্রণালয়ের অনড় অবস্থান এবং জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কঠোর শুদ্ধি অভিযানের সামনে পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছে বছরের পর বছর ঘাপটি মেরে থাকা দালাল ও ফাইল আটকে রাখা সিন্ডিকেট চক্র।
গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, এই উচ্ছেদ ও শুদ্ধি অভিযান চালাতে গিয়ে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নানা হুমকি ও মিথ্যা অপপ্রচারের শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু কোনো কিছুই দমাতে পারেনি এই উন্নয়নযজ্ঞকে। সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রতিটি ফ্ল্যাট, যাতে কোনো মধ্যবিত্তের স্বপ্ন মাঝপথে ফিকে হয়ে না যায়।
১৬ ধরনের আধুনিক নাগরিক সুবিধা
১৫ একরেরও বেশি জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই স্বপ্নের চত্বরটি মূলত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মিনি টাউনশিপ। এখানে থাকছে ৯ তলা বিশিষ্ট সুবিশাল কমিউনিটি ভবন, নিজস্ব অভ্যন্তরীণ চওড়া রাস্তা এবং দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে। প্রতিটি ভবনে যাতায়াতের জন্য থাকছে আলাদা প্যাসেঞ্জার ও বেড লিফটের ব্যবস্থা। এছাড়া নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য রয়েছে ১০০ ও ১৫০ কেভির জেনারেটর এবং ১৫০ ও ৬৩০ কেভিএ সাব-স্টেশন।
পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রার জন্য স্থাপন করা হয়েছে সৌর বিদ্যুৎ প্যানেল, ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ তারের জন্য আরএমইউ, উন্নত অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা এবং সেন্ট্রিফিউগাল ও সাবমার্সিবল পাম্প। এছাড়াও থাকছে ইন্টারকম সুবিধা ও দৃষ্টিনন্দন প্রবেশদ্বার। পরিবেশ রক্ষায় ও পানি অপচয় রোধে নেওয়া হয়েছে যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যার মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) এবং ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ডব্লিউটিপি)।
কঠোর তদারকিতে প্রকৌশলীরা, ২০২৬-এর ডিসেম্বরেই পূর্ণতা পাবে স্বপ্ন
২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি যখন প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদিত হয়, তখন থেকেই একে ঘিরে ছিল ব্যাপক প্রত্যাশা। পরবর্তীতে সংশোধিত আকারে এই মেগা প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১১১৯৬৫ দশমিক ১৪ লাখ টাকা। কোনো প্রকার ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই প্রকল্পের চূড়ান্ত বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে চলতি বছরের ডিসেম্বর ২০২৬।
প্রকল্পটির মাঠ পর্যায়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের ঢাকা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হারিজুর রহমান জানান, তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজের মান নিয়ন্ত্রণ করছেন। প্রকল্প এলাকায় দায়িত্বরত মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, হারিজুর রহমান কাজের গুণগত মান ও নির্মাণ সামগ্রী তদারকি করতে নিয়মিত সাইট পরিদর্শন করেন এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। কাজের ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হচ্ছে না।
তিনটি ভিন্ন আকারে মধ্যবিত্তের সাধ ও সাধ্যের মেলবন্ধন
এই আবাসন প্রকল্পে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতার কথা বিবেচনা করে তিন ক্যাটাগরির ফ্ল্যাট তৈরি করা হয়েছে। ১৪ তলা বিশিষ্ট ৯টি ভবনে রয়েছে ১৫৪৫ বর্গফুটের ৯৩৬টি ফ্ল্যাট, যার প্রতিটির মূল্য ৭৮ দশমিক ৭২ লাখ টাকা। মাঝারি পরিবারের জন্য ১৪ তলা বিশিষ্ট ৪টি ভবনে রয়েছে ১৩৩৮ বর্গফুটের ৪১৬টি ফ্ল্যাট, যার মূল্য ৬৭ দশমিক ৯৯ লাখ টাকা। আর একদম সীমিত আয়ের মানুষদের জন্য তৈরি হয়েছে ১৪ তলা বিশিষ্ট ২টি ভবনের ৮৭৮ বর্গফুটের ২০৮টি ফ্ল্যাট, যার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৪৪ দশমিক ৭০ লাখ টাকা। ইতিমধ্যেই নির্মাণ কাজ শেষ হওয়া বেশ কয়েকটি ভবনের ফ্ল্যাট চাবি লটারির মাধ্যমে বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, বাকি ভবনগুলোর কাজও শেষ পর্যায়ে।
গাফিলতি করা ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি অ্যাকশন ও ব্ল্যাকলিস্টের প্রস্তুতি
কাজের গুণগত মান রক্ষা এবং নির্ধারিত সময়ে আবাসন বুঝিয়ে দিতে কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। এ বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, "পল্লবী মেট্রোস্টেশন থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে কালসি ও সিওএইচএস ফ্লাইওভার সংলগ্ন এই 'স্বপ্ন নগর-২' এলাকাটি আমরা একটি আদর্শ মডেল প্রকল্প হিসেবে গড়ে তুলছি। এখানে শিশুদের খেলার মাঠ থেকে শুরু করে গ্রিন স্পেস ও বয়স্কদের হাঁটার সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।"
তবে প্রকল্পের অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করা কয়েকজন ঠিকাদারের গাফিলতির কথাও তিনি অকপটে স্বীকার করেন। সাখাওয়াত হোসেন স্পষ্ট করে বলেন, "কয়েকটি ভবন নির্মাণে গাফিলতি করায় নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের বাদ দিয়ে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং তাদের কালো তালিকাভুক্ত (ব্ল্যাকলিস্ট) করার চিন্তাভাবনা চলছে।"
ফ্ল্যাট মালিকদের স্বস্তি, তবে মশা ও নিরাপত্তা নিয়ে কিছু উদ্বেগ
ইতিমধ্যেই যেসকল ভাগ্যবান মালিকরা ফ্ল্যাটের চাবি বুঝে পেয়ে বসবাস শুরু করেছেন, তাদের চোখে-মুখে এখন স্বস্তির আলো। তবে নতুন আবাসন এলাকা হওয়ায় কিছু প্রাথমিক সমস্যার কথাও জানিয়েছেন তারা। কয়েকজন ফ্ল্যাট মালিক বলেন, "শুরুতে এলাকাটিতে মশার উপদ্রব একটু বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, মশা দমনে আমরা ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের দ্রুত হস্তক্ষেপ ও সহযোগিতা কামনা করছি।"
এছাড়াও তারা মেট্রোস্টেশন থেকে আবাসন এলাকার সংযোগ সড়ক পর্যন্ত রাতে যাতায়াতের নিরাপত্তার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। মালিকদের দাবি, রাস্তার দুপাশে পর্যাপ্ত ল্যাম্পপোস্টের পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং পুলিশি পাহারা জোরদার করলে ১৫০০ পরিবারের নার ও শিশুরা নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে। যদিও নিকটস্থ ডিওএইচএস ও পল্লবী থানা পুলিশের নিয়মিত টহল দল এই এলাকায় নিরাপত্তা দিচ্ছে, তবুও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার হলে বাসিন্দারা মানসিকভাবে অনেক স্বস্তিতে থাকবেন।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে এই মডেল: আশাবাদী চেয়ারম্যান
প্রকল্পের সামগ্রিক সাফল্য এবং ভবিষ্যতের রূপরেখা নিয়ে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম মুঠোফোনে তার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি অত্যন্ত আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন, "মিরপুরে আমাদের 'স্বপ্ন নগর-১' প্রকল্পের কাজ আগেই সফলভাবে শেষ হয়েছে এবং সেখানে ফ্ল্যাট মালিকরা অত্যন্ত শান্তিতে ও নাগরিক সুবিধা ভোগ করে বসবাস করছেন। আমাদের দ্বিতীয় চেলেঞ্জিং প্রজেক্ট 'স্বপ্ন নগর-২'-এর নির্মাণ কাজও এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। অধিকাংশ ভবনের কাজ শেষ করে আমরা ফ্ল্যাটগুলো মালিকদের হাতে তুলে দিয়েছি। বাকি ভবনগুলোর চাবিও শিগগিরই বুঝিয়ে দেওয়া হবে।"
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম আরও যোগ করেন, "এই মডেল প্রকল্পটির সফল সমাপ্তির পর আমরা রাজধানীতে নতুন করে 'স্বপ্ন নগর-৩' ও 'স্বপ্ন নগর-৪' প্রকল্পের কাজ হাতে নিয়েছি। শুধু ঢাকাতেই নয়, দেশের আবাসন সংকট দূর করতে আমরা ৮টি বিভাগীয় শহর এবং দেশের বেশ কয়েকটি পুরাতন জেলা শহরেও মধ্যবিত্তের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণের বৃহৎ উদ্যোগ নিয়েছি। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের পুরো টিম অত্যন্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে দেশজুড়ে এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে।"
সব মিলিয়ে মিরপুরের 'স্বপ্ন নগর-২' কেবল একটি আবাসন প্রকল্প নয়, এটি এক টুকরো ছাদ খোঁজা হাজারো মধ্যবিত্তের স্বপ্নপূরণের জ্বলজ্যান্ত দলিল। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই যখন সব ভবনে আলো জ্বলবে, তখন এই ইট-পাথরের ঢাকা শহর পাবে এক নতুন দৃষ্টিনন্দন পরিবেশবান্ধব মডেল উপশহর।

আপনার মতামত লিখুন