সংবাদ

আবার আতঙ্কের নাম ‘জলাতঙ্ক’


বাকী বিল্লাহ
বাকী বিল্লাহ
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ১০:৫০ পিএম

আবার আতঙ্কের নাম ‘জলাতঙ্ক’

একটি কামড় কিংবা সামান্য একটু লালা; ব্যস, এতটুকুই যথেষ্ট একটি তাজা প্রাণকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে। চিকিৎসার আধুনিক যুগেও যে কয়েকটি রোগ মানুষের মনে আদিমতম আতঙ্ক তৈরি করে, তার নামজলাতঙ্ক এটি কেবল একটি রোগ নয়, যেন এক জীবন্ত মৃত্যুদূত।

বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ৫৯ হাজারেরও বেশি মানুষ এই জুনোটিক বা প্রাণিবাহিত রোগের কারণে করুণ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। অথচ একটু সচেতনতা আর সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ বাঁচিয়ে দিতে পারে হাজারো জীবন। সম্প্রতি রাজধানীর অদূরে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলায় জলাতঙ্ক আক্রান্ত গরু জবাই করে মাংস বিক্রির ঘটনা আমাদের স্বাস্থ্য সচেতনতার কঙ্কালসার রূপটিকেই আবারও চোখের সামনে উন্মোচন করেছে।

অদৃশ্য ভাইরাসের মরণকামড়: লক্ষণ পরিণতি

জলাতঙ্ক মূলত একটি মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ, যা স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়। সাধারণত আক্রান্ত কুকুর বা বিড়ালের কামড় অথবা আঁচড়ের মাধ্যমে এই রোগের জীবাণু মানবদেহে প্রবেশ করে। ভাইরাসটি শরীরে ঢোকার পর রক্তবাহিকার মাধ্যমে নয়, বরং স্নায়ুতন্ত্র বেয়ে সরাসরি মস্তিষ্কে গিয়ে হানা দেয় এবং সেখানে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে থাকে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে কামড়ের এক থেকে তিন মাসের মধ্যে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। লক্ষণ প্রকাশের পর রোগীর শরীরে তীব্র ছটফটানি, রোদ বাতাসের প্রতি চরম ভীতি এবং জল বা পানির প্রতি এক অবিশ্বাস্য আতঙ্ক (হাইড্রোফোবিয়া) তৈরি হয়। পানি পান করতে গেলেই রোগীর গলায় তীব্র খিঁচুনি ওঠে। একপর্যায়ে রোগী চরম অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং লক্ষণ দেখা দেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে অবধারিত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগেও এই রোগের লক্ষণ প্রকাশের পর রোগীকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব।

পাগলা কুকুরের আচরণ আমাদের তাৎক্ষণিক করণীয়

একটি কুকুর বা বিড়াল জলাতঙ্কে আক্রান্ত কি না, তা কিছু লক্ষণ দেখে সহজেই বোঝা যায়। আক্রান্ত প্রাণীর মুখ থেকে অনবরত অতিরিক্ত লালা ঝরতে থাকে। তারা অস্বাভাবিকভাবে উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং রোদ বা আলো ভয় পায়। অনেক সময় তারা অবাস্তব জড় বস্তু যেমন ইট, পাথর, কাঠ বা ময়লা কামড়াতে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো কুকুর বা বিড়াল কামড়ালে কিংবা আঁচড়ালে মুহূর্তও দেরি না করে আক্রান্ত স্থানটি কমপক্ষে ১৫ মিনিট কোনো নলকূপ বা ট্যাপের চলমান পানিতে কাপড় কাচার সাবান দিয়ে খুব ভালোভাবে ধুতে হবে। সাবানের ক্ষার এই ক্ষতিকর রেবিস ভাইরাসকে ধ্বংস করতে অত্যন্ত কার্যকর। এরপর অ্যালকোহল বা আয়োডিন সলিউশন দিয়ে ক্ষতস্থান জীবাণুমুক্ত করে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতাল বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে জলাতঙ্কের প্রতিষেধক ইনজেকশন নিতে হবে।

যদি কোনো ক্ষ্যাপা বা সন্দেহভাজন পশু কাউকে কামড়ায়, তবে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা কোনো সমাধান নয়। প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের গাইডলাইন অনুযায়ী, পশুটিকে একটি নিরাপদ স্থানে আটকে রেখে টানা ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং স্বাভাবিক খাবার পানি সরবরাহ করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, "এই ১৫ দিনের মধ্যে যদি পশুটি স্বাভাবিক থাকে তবে বুঝতে হবে তার শরীরে জলাতঙ্কের জীবাণু ছিল না। আর যদি এই সময়ের মধ্যে পশুটি মারা যায়, তবে দ্রুত নিকটস্থ ভেটেরিনারি হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করে জলাতঙ্ক পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।" রোগটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে পোষা এবং বেওয়ারিশ কুকুরকে নিয়মিত জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি।

আক্রান্ত গরুর মাংস জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি: বিজ্ঞান কী বলে?

সাটুরিয়ার ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মনে একটি বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে; জলাতঙ্ক আক্রান্ত গরুর মাংস খেলে কি মানুষও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে? ভেটেরিনারি বিজ্ঞানীদের মতে, রেবিস ভাইরাসের সর্বোচ্চ ঘনত্ব থাকে প্রাণীর মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ডের স্নায়ু, স্নায়ুতন্ত্রের অন্যান্য অংশ এবং লালাগ্রন্থিতে। সাধারণ মাংসপেশিতে ভাইরাসের উপস্থিতি অত্যন্ত সীমিত বা অনেক ক্ষেত্রে থাকেই না। যেহেতু এটি স্নায়ু ধরে চলাচল করে, তাই মাংস খাওয়ার মাধ্যমে জলাতঙ্ক সংক্রমণ তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও বাস্তবে অত্যন্ত বিরল। মানুষের পাকস্থলীতে থাকা শক্তিশালী হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড, যার পিএইচ সাধারণত . থেকে . পর্যন্ত হয়ে থাকে, তা এই ভাইরাসকে দ্রুত নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম। তাছাড়া রেবিস একটি এনভেলপযুক্ত ভাইরাস হওয়ায় এটি পরিবেশে খুব বেশি সময় টিকে থাকতে পারে না।

গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কিছু সময় রাখলে এবং ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় এই ভাইরাস দ্রুত ধ্বংস হয়ে যায়। বাঙালিরা সাধারণত যেভাবে ৭০ থেকে ১০০ ডিগ্রি বা তারও বেশি তাপমাত্রায় মাংস ফুটিয়ে রান্না করে, তাতে জীবিত রেবিস ভাইরাস টিকে থাকার সম্ভাবনা কার্যত শূন্যের কাছাকাছি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসেও রান্না করা মাংস খেয়ে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত নজির নেই।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, "ঝুঁকি একেবারেই নেই, তা বলা যাবে না। কেউ যদি কাঁচা মাংস বা আক্রান্ত প্রাণীর মস্তিষ্ক বা স্নায়বিক টিস্যু কাঁচা অবস্থায় খায়, কিংবা মাংস কাটার সময় যদি হাতে বা মুখে কোনো ক্ষত থাকে এবং সেই ক্ষতের সংস্পর্শে ভাইরাসের লালা বা টিস্যু লেগে যায়, তবে মানুষের আক্রান্ত হওয়ার তাত্ত্বিক ঝুঁকি প্রবল।" এমন পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ঝুঁকি মূল্যায়ন করে দ্রুত পোস্ট এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস (পিইপি) বা জলাতঙ্ক প্রতিরোধী জরুরি টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেন।

সাটুরিয়ার আতঙ্কিত সকাল এবং প্রশাসনের তৎপরতা

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বরাইদ ইউনিয়নের বড়পয়লা গ্রামে সম্প্রতি যে ঘটনাটি ঘটেছে, তা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক হুমকি। স্থানীয় রমজান বেপারী নামের এক ব্যক্তির গরু জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হলে সাটুরিয়া উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন খোকন হোসেন গরুটি পরীক্ষা করে জলাতঙ্ক নিশ্চিত করেন।

সাটুরিয়া উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন খোকন হোসেন ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘গরুটি জলাতঙ্কে আক্রান্ত জানার পর আমরা মালিককে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু তিনি সরকারি নিষেধাজ্ঞা স্বাস্থ্যঝুঁকি উপেক্ষা করে পরদিন সোমবার সকালে গরুটি জবাই করে মাত্র ৩০০ টাকা কেজি দরে স্থানীয় লোকজনের কাছে মাংস বিক্রি করে দেন।বাজারে কম দামে মাংস পেয়ে সাধারণ মানুষ হুমড়ি খেয়ে তা কেনে। পরবর্তীতে বিষয়টি জানাজানি হলে পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং রোগটির বিস্তার রোধ করতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। আক্রান্ত এলাকার চারপাশে দুই কিলোমিটার জুড়ে গবাদিপশুকে জরুরি ভিত্তিতেরিং ভ্যাক্সিনেশনবা সতর্কতামূলক টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়।

সাটুরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা তানজিলা ফেরদৌসী প্রসঙ্গে বলেন, ‘জলাতঙ্ক যেন ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সে জন্য রবিবার সকাল ৯টা থেকে আক্রান্ত এলাকার চারপাশের গবাদিপশুকে সতর্কতামূলক টিকা দেওয়া হচ্ছে। আজকের মধ্যেই এই কার্যক্রম শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

লোভ আর অসচেতনতার কারণে যারা এই মাংস কেটেছেন, প্রক্রিয়াজাত করেছেন কিংবা না বুঝে কিনেছেন, তারা এখন চরম মানসিক শারীরিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন। প্রশাসন জানিয়েছে, আইন অমান্য করে এবং জনস্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে যারা এই কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সাটুরিয়ার এই ঘটনা আমাদের চোখ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, সামান্য অসচেতনতা লোভ কীভাবে একটি পুরো জনপদকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে। জলাতঙ্ক প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিটি মানুষের সচেতনতাই হতে পারে আমাদের প্রধান হাতিয়ার।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


আবার আতঙ্কের নাম ‘জলাতঙ্ক’

প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুন ২০২৬

featured Image

একটি কামড় কিংবা সামান্য একটু লালা; ব্যস, এতটুকুই যথেষ্ট একটি তাজা প্রাণকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে। চিকিৎসার আধুনিক যুগেও যে কয়েকটি রোগ মানুষের মনে আদিমতম আতঙ্ক তৈরি করে, তার নামজলাতঙ্ক এটি কেবল একটি রোগ নয়, যেন এক জীবন্ত মৃত্যুদূত।

বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ৫৯ হাজারেরও বেশি মানুষ এই জুনোটিক বা প্রাণিবাহিত রোগের কারণে করুণ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। অথচ একটু সচেতনতা আর সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ বাঁচিয়ে দিতে পারে হাজারো জীবন। সম্প্রতি রাজধানীর অদূরে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলায় জলাতঙ্ক আক্রান্ত গরু জবাই করে মাংস বিক্রির ঘটনা আমাদের স্বাস্থ্য সচেতনতার কঙ্কালসার রূপটিকেই আবারও চোখের সামনে উন্মোচন করেছে।

অদৃশ্য ভাইরাসের মরণকামড়: লক্ষণ পরিণতি

জলাতঙ্ক মূলত একটি মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ, যা স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়। সাধারণত আক্রান্ত কুকুর বা বিড়ালের কামড় অথবা আঁচড়ের মাধ্যমে এই রোগের জীবাণু মানবদেহে প্রবেশ করে। ভাইরাসটি শরীরে ঢোকার পর রক্তবাহিকার মাধ্যমে নয়, বরং স্নায়ুতন্ত্র বেয়ে সরাসরি মস্তিষ্কে গিয়ে হানা দেয় এবং সেখানে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে থাকে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে কামড়ের এক থেকে তিন মাসের মধ্যে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। লক্ষণ প্রকাশের পর রোগীর শরীরে তীব্র ছটফটানি, রোদ বাতাসের প্রতি চরম ভীতি এবং জল বা পানির প্রতি এক অবিশ্বাস্য আতঙ্ক (হাইড্রোফোবিয়া) তৈরি হয়। পানি পান করতে গেলেই রোগীর গলায় তীব্র খিঁচুনি ওঠে। একপর্যায়ে রোগী চরম অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং লক্ষণ দেখা দেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে অবধারিত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগেও এই রোগের লক্ষণ প্রকাশের পর রোগীকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব।

পাগলা কুকুরের আচরণ আমাদের তাৎক্ষণিক করণীয়

একটি কুকুর বা বিড়াল জলাতঙ্কে আক্রান্ত কি না, তা কিছু লক্ষণ দেখে সহজেই বোঝা যায়। আক্রান্ত প্রাণীর মুখ থেকে অনবরত অতিরিক্ত লালা ঝরতে থাকে। তারা অস্বাভাবিকভাবে উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং রোদ বা আলো ভয় পায়। অনেক সময় তারা অবাস্তব জড় বস্তু যেমন ইট, পাথর, কাঠ বা ময়লা কামড়াতে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো কুকুর বা বিড়াল কামড়ালে কিংবা আঁচড়ালে মুহূর্তও দেরি না করে আক্রান্ত স্থানটি কমপক্ষে ১৫ মিনিট কোনো নলকূপ বা ট্যাপের চলমান পানিতে কাপড় কাচার সাবান দিয়ে খুব ভালোভাবে ধুতে হবে। সাবানের ক্ষার এই ক্ষতিকর রেবিস ভাইরাসকে ধ্বংস করতে অত্যন্ত কার্যকর। এরপর অ্যালকোহল বা আয়োডিন সলিউশন দিয়ে ক্ষতস্থান জীবাণুমুক্ত করে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতাল বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে জলাতঙ্কের প্রতিষেধক ইনজেকশন নিতে হবে।

যদি কোনো ক্ষ্যাপা বা সন্দেহভাজন পশু কাউকে কামড়ায়, তবে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা কোনো সমাধান নয়। প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের গাইডলাইন অনুযায়ী, পশুটিকে একটি নিরাপদ স্থানে আটকে রেখে টানা ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং স্বাভাবিক খাবার পানি সরবরাহ করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, "এই ১৫ দিনের মধ্যে যদি পশুটি স্বাভাবিক থাকে তবে বুঝতে হবে তার শরীরে জলাতঙ্কের জীবাণু ছিল না। আর যদি এই সময়ের মধ্যে পশুটি মারা যায়, তবে দ্রুত নিকটস্থ ভেটেরিনারি হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করে জলাতঙ্ক পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।" রোগটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে পোষা এবং বেওয়ারিশ কুকুরকে নিয়মিত জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি।

আক্রান্ত গরুর মাংস জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি: বিজ্ঞান কী বলে?

সাটুরিয়ার ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মনে একটি বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে; জলাতঙ্ক আক্রান্ত গরুর মাংস খেলে কি মানুষও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে? ভেটেরিনারি বিজ্ঞানীদের মতে, রেবিস ভাইরাসের সর্বোচ্চ ঘনত্ব থাকে প্রাণীর মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ডের স্নায়ু, স্নায়ুতন্ত্রের অন্যান্য অংশ এবং লালাগ্রন্থিতে। সাধারণ মাংসপেশিতে ভাইরাসের উপস্থিতি অত্যন্ত সীমিত বা অনেক ক্ষেত্রে থাকেই না। যেহেতু এটি স্নায়ু ধরে চলাচল করে, তাই মাংস খাওয়ার মাধ্যমে জলাতঙ্ক সংক্রমণ তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও বাস্তবে অত্যন্ত বিরল। মানুষের পাকস্থলীতে থাকা শক্তিশালী হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড, যার পিএইচ সাধারণত . থেকে . পর্যন্ত হয়ে থাকে, তা এই ভাইরাসকে দ্রুত নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম। তাছাড়া রেবিস একটি এনভেলপযুক্ত ভাইরাস হওয়ায় এটি পরিবেশে খুব বেশি সময় টিকে থাকতে পারে না।

গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কিছু সময় রাখলে এবং ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় এই ভাইরাস দ্রুত ধ্বংস হয়ে যায়। বাঙালিরা সাধারণত যেভাবে ৭০ থেকে ১০০ ডিগ্রি বা তারও বেশি তাপমাত্রায় মাংস ফুটিয়ে রান্না করে, তাতে জীবিত রেবিস ভাইরাস টিকে থাকার সম্ভাবনা কার্যত শূন্যের কাছাকাছি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসেও রান্না করা মাংস খেয়ে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত নজির নেই।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, "ঝুঁকি একেবারেই নেই, তা বলা যাবে না। কেউ যদি কাঁচা মাংস বা আক্রান্ত প্রাণীর মস্তিষ্ক বা স্নায়বিক টিস্যু কাঁচা অবস্থায় খায়, কিংবা মাংস কাটার সময় যদি হাতে বা মুখে কোনো ক্ষত থাকে এবং সেই ক্ষতের সংস্পর্শে ভাইরাসের লালা বা টিস্যু লেগে যায়, তবে মানুষের আক্রান্ত হওয়ার তাত্ত্বিক ঝুঁকি প্রবল।" এমন পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ঝুঁকি মূল্যায়ন করে দ্রুত পোস্ট এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস (পিইপি) বা জলাতঙ্ক প্রতিরোধী জরুরি টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেন।

সাটুরিয়ার আতঙ্কিত সকাল এবং প্রশাসনের তৎপরতা

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বরাইদ ইউনিয়নের বড়পয়লা গ্রামে সম্প্রতি যে ঘটনাটি ঘটেছে, তা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক হুমকি। স্থানীয় রমজান বেপারী নামের এক ব্যক্তির গরু জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হলে সাটুরিয়া উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন খোকন হোসেন গরুটি পরীক্ষা করে জলাতঙ্ক নিশ্চিত করেন।

সাটুরিয়া উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন খোকন হোসেন ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘গরুটি জলাতঙ্কে আক্রান্ত জানার পর আমরা মালিককে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু তিনি সরকারি নিষেধাজ্ঞা স্বাস্থ্যঝুঁকি উপেক্ষা করে পরদিন সোমবার সকালে গরুটি জবাই করে মাত্র ৩০০ টাকা কেজি দরে স্থানীয় লোকজনের কাছে মাংস বিক্রি করে দেন।বাজারে কম দামে মাংস পেয়ে সাধারণ মানুষ হুমড়ি খেয়ে তা কেনে। পরবর্তীতে বিষয়টি জানাজানি হলে পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং রোগটির বিস্তার রোধ করতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। আক্রান্ত এলাকার চারপাশে দুই কিলোমিটার জুড়ে গবাদিপশুকে জরুরি ভিত্তিতেরিং ভ্যাক্সিনেশনবা সতর্কতামূলক টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়।

সাটুরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা তানজিলা ফেরদৌসী প্রসঙ্গে বলেন, ‘জলাতঙ্ক যেন ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সে জন্য রবিবার সকাল ৯টা থেকে আক্রান্ত এলাকার চারপাশের গবাদিপশুকে সতর্কতামূলক টিকা দেওয়া হচ্ছে। আজকের মধ্যেই এই কার্যক্রম শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

লোভ আর অসচেতনতার কারণে যারা এই মাংস কেটেছেন, প্রক্রিয়াজাত করেছেন কিংবা না বুঝে কিনেছেন, তারা এখন চরম মানসিক শারীরিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন। প্রশাসন জানিয়েছে, আইন অমান্য করে এবং জনস্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে যারা এই কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সাটুরিয়ার এই ঘটনা আমাদের চোখ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, সামান্য অসচেতনতা লোভ কীভাবে একটি পুরো জনপদকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে। জলাতঙ্ক প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিটি মানুষের সচেতনতাই হতে পারে আমাদের প্রধান হাতিয়ার।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত