প্রকৃতির এক অদ্ভুত সুন্দর সৃষ্টি ‘রিংটেইল লেমুর’। ডাগর ডাগর চোখ আর সাদা-কালোর ডোরাকাটা লম্বা লেজের এই প্রাণীটির আদি নিবাস আফ্রিকার দ্বীপ রাষ্ট্র মাদাগাস্কার। বাংলাদেশে এদের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ২০১৮ সালে দেশের দুটি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ অবৈধভাবে দুটি রিংটেইল লেমুরসহ ৮৬ জোড়া বন্যপ্রাণী আমদানি করার পর তা ধরা পড়ে। এরপর ঠাঁই হয়েছিল গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে। সেখানে গভীর মমতায় বন্দি খাঁচাতেই জন্ম নেয় দুটি ফুটফুটে ছানা। একটির মৃত্যুর পর তিন সদস্যের এক ছোট্ট সুখী পরিবার গড়ে উঠেছিল। কিন্তু মানুষের সীমাহীন লোভের বলি হয়ে চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল সেই পরিবার।
গত বছরের ২৩
মার্চ গভীর রাতে পার্কের
নিরাপত্তা বেষ্টনী কেটে চুরি করে
নিয়ে যাওয়া হয় তিনটি লেমুরকে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় একটি লেমুর উদ্ধার
হলেও, মা লেমুর ও
তার সন্তানকে সীমান্ত পার করে পাচার
করে দেওয়া হয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারতে। এই
নিষ্ঠুর বিরহ আর আন্তর্জাতিক
পাচার চক্রের অবিশ্বাস্য নেপথ্য কাহিনী উদঘাটন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
৪১
লাখ টাকার লোভে যেভাবে ভাঙল লেমুর পরিবার
অনুসন্ধানে
জানা যায়, এই চুরির
নেপথ্যে ছিল সাফারি পার্কেরই
ঘরের শত্রু বিভীষণ। আউটসোর্সিংয়ে কাজ করা নিপেল
মাহমুদ নামের এক কর্মচারীই ছিল
এই সর্বনাশা পরিকল্পনার মূল হোতা। নিপেল
পার্কের ভেতরে থাকা দুর্লভ ও
বিপন্ন বন্যপ্রাণীদের ছবি ও ভিডিও
ধারণ করত। এরপর ফেসবুকের
বিভিন্ন গোপন গ্রুপ ও
পেজে সেসব পোস্ট করে
দেশি-বিদেশি চোরাকারবারিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করত। লেমুরগুলোর ছবি
সে প্রথমে দেখায় প্রতিবেশী পাখি ব্যবসায়ী জুয়েল
মিয়াকে। জুয়েল আবার যোগাযোগ করে
আরেক ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন হৃদয়ের সাথে। হৃদয় এই চুরির
জাল ছড়াতে যুক্ত করে দেলোয়ার হোসেন
তাওসীফ ও পাখি আমদানিকারক
মোঃ সাব্বির হোসেন তপনকে।
২৩ মার্চ দিবাগত রাত থেকে ২৪ মার্চ ভোরের মধ্যে নিপেল ও তার সহযোগীরা সাফারি পার্কের খাঁচা কেটে তিনটি লেমুরকেই চুরি করে জুয়েলের বাড়িতে নিয়ে যায়। এর মধ্যে একটি লেমুর তারা জনৈক এক ব্যবসায়ীর কাছে ৫ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয়। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে হৃদয় পায় ১০ হাজার টাকা। বাকি দুটি—অর্থাৎ মা লেমুর ও তার সন্তানকে বিক্রি করার জন্য দেলোয়ার ও সাব্বির যোগাযোগ করে ভারতীয় চোরাকারবারিদের সাথে।
প্রতিটি লেমুরের দাম নির্ধারণ করা
হয় সাড়ে ১৩ লাখ
টাকা। ময়মনসিংহের ভালুকা এলাকায় ভারতীয় ক্রেতাদের গাড়িতে যখন কার্টনবন্দি করে
অবুঝ প্রাণী দুটিকে তুলে দেওয়া হচ্ছিল,
তখন নিপেলকে ৭০ হাজার টাকা
কমিশন গুনে দেয় জুয়েলের
আপন চাচা মজনু মিয়া।
মজনু চোরাই লেমুর দুটি প্যাকেট ও
হস্তান্তরের মূল কাজ তদারকি
করেছিল। কিন্তু ট্রানজিট ও সীমান্ত পার
হওয়ার পর ভারতীয় বাজারে
এই দুটি লেমুরের দাম
গিয়ে দাঁড়ায় ৪১ লাখ টাকায়!
গুজরাটের
ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানায় বন্দি মা-শিশু, উদ্ধারে ইন্টারপোলের চিঠি
সিআইডির
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এক মর্মস্পর্শী তথ্য।
পাচার হওয়া মা ও
শিশু লেমুরটি বর্তমানে ভারতের গুজরাটের একটি ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানায়
বন্দি রয়েছে বলে তীব্র সন্দেহ
করা হচ্ছে। নিজের চেনা পরিবেশ আর
একমাত্র সঙ্গীকে হারিয়ে খাঁচায় বন্দি প্রাণী দুটির করুণ আর্তি হয়তো
কেউ শুনছে না, কিন্তু বাংলাদেশ
পুলিশ তাদের ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা
চালাচ্ছে।
মামলার
তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ইন্সপেক্টর সুনীল কুমার দাস মুঠোফোনে জানান, "পাচার হওয়া লেমুর উদ্ধারে
আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সাহায্য চাওয়া হয়েছে। আর যে লেমুরটি
উদ্ধার করা হয়েছে তার
ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে টেস্টের জন্য
পাঠানো হয়েছে। টেস্ট রিপোর্ট পাওয়া গেলে পরবর্তী পদক্ষেপ
নেওয়া হবে।"
তিনি
আরও জানান, ইন্টারপোল থেকে পাচার হওয়া
লেমুর দুটির সুনির্দিষ্ট শনাক্তকরণ তথ্য চাওয়ায়, বাংলাদেশে
উদ্ধার হওয়া একমাত্র লেমুরটির
ডিএনএ পরীক্ষা করা হচ্ছে। কারণ,
ডিএনএ প্রোফাইল মিললেই প্রমাণ হবে যে গুজরাটে
থাকা লেমুর দুটি এই উদ্ধার
হওয়া লেমুরটিরই হারিয়ে যাওয়া মা ও সন্তান।
প্রয়োজনে তদন্তকারী দল ভারতে গিয়ে
তল্লাশি চালাবে এবং ইন্টারপোল তাদের
পূর্ণ সহায়তা দেবে বলে আশ্বস্ত
করেছে।
আড়ালে
গডফাদার, বিমানবন্দরেও নজরদারি
বন্যপ্রাণী
চুরির এই আন্তর্জাতিক চক্রটি
ঢাকাকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। ইন্সপেক্টর সুনীল কুমার দাস জানান, "আন্তর্জাতিক
বন্যপ্রাণী পাচারকারী চক্র শাহজালাল আন্তর্জাতিক
বিমানবন্দরকে পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার
করছে বলে সন্দেহ করা
হচ্ছে। এরপরও বিষয়টি আরও নিশ্চিত হওয়ার
জন্য সিআইডির পক্ষ থেকে বিমানবন্দরে
শুল্ক কর্মকর্তার (ডেপুটি কমিশনার) কাছে তথ্য জানার
জন্য লিখিত চিঠি দেওয়া হয়েছে।"
তদন্ত
কর্মকর্তাদের মতে, এই বন্যপ্রাণী
ও পাখি পাচারের পেছনে
একটি বিশাল সিন্ডিকেট জড়িত। সিআইডি যখন এই মামলার
গভীরে প্রবেশ করে, তখন দেশজুড়ে
প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০
বন্যপ্রাণী ও পাখি ব্যবসায়ীর
জড়িত থাকার চাঞ্চল্যকর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সিআইডির সাঁড়াশি
অভিযানের মুখে তাদের অনেকেই
এখন ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে
আত্মগোপনে চলে গেছে। এই
চক্রটি এর আগেও একাধিকবার
বিমানবন্দর ও স্থলবন্দর ব্যবহার
করে দেশের বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণী
বিদেশে পাচার করেছে।
সাতজন
গ্রেফতার, ফিনিক্সের মতো ফেরার অপেক্ষায় খাঁচার একমাত্র সঙ্গী
বিশ্বজুড়ে
বর্তমানে এই প্রজাতির রিংটেইল
লেমুর মাত্র ১২০ থেকে ১৩০টি
জীবিত আছে। আইইউসিএন-এর
লাল তালিকায় এটি অত্যন্ত বিপন্ন
প্রাণী। সাফারি পার্কের এজাহারে তিনটি লেমুরের আনুমানিক মূল্য মাত্র ৩ লাখ টাকা
দেখানো হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে
এর মূল্য আকাশচুম্বী।
গাজীপুর সাফারি পার্কের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের মাধ্যমে চুরির বিষয়টি প্রথম জানাজানি হওয়ার পর শ্রীপুর থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সিআইডি প্রধান কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরাসরি মনিটরিং ও পরিকল্পনায় তদন্ত শুরু হয়।
গত বছরের
৪ নভেম্বর ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের কলাইপাড়া এলাকা থেকে স্থানীয় পুলিশের
সহায়তায় মজনু মিয়াকে গ্রেফতারের
মাধ্যমে প্রথম সাফল্যের মুখ দেখে সিআইডি। এ পর্যন্ত এই মামলায় মোট
৭ জন সন্দেহভাজন পাচারকারীকে
গ্রেফতার করা হয়েছে। সিআইডির
বিশেষ টিম চুরির কাজে
ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেলও জব্দ
করেছে।
গ্রেফতার ৭ জনের মধ্যে মজনু
মিয়াসহ ৬ জনই আদালতে
ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে বন্যপ্রাণী বিক্রি
ও পাচারের দায় স্বীকার করে
১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তবে সিআইডি জানিয়েছে,
এই চক্রের মূল হোতা বা
'গডফাদার' এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে
রয়ে গেছে। তাকে গ্রেফতার করতে
পারলে এই আন্তর্জাতিক পাচার
সিন্ডিকেটের নেপথ্যের আরও বহু রোমহর্ষক
কাহিনী এবং অন্ধকার দিক
উন্মোচিত হবে।
আপাতত
গাজীপুরের খাঁচায় একা পড়ে থাকা
রিংটেইল লেমুরটি হয়তো তার চিরচেনা
সঙ্গীদের পথ চেয়ে দিন
গুনছে। অডিও রেকর্ড, ডিজিটাল
ফুটপ্রিন্ট আর ডিএনএ টেস্টের
রিপোর্ট হাতে পেলে ইন্টারপোলের
মাধ্যমে সীমান্ত জয় করে একদিন সঙ্গী আর তার ছানা
আবার স্বদেশে ফিরবে; এই মানবিক আশাতেই
দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে
সিআইডির অনুসন্ধানী দল।

শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬
প্রকৃতির এক অদ্ভুত সুন্দর সৃষ্টি ‘রিংটেইল লেমুর’। ডাগর ডাগর চোখ আর সাদা-কালোর ডোরাকাটা লম্বা লেজের এই প্রাণীটির আদি নিবাস আফ্রিকার দ্বীপ রাষ্ট্র মাদাগাস্কার। বাংলাদেশে এদের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ২০১৮ সালে দেশের দুটি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ অবৈধভাবে দুটি রিংটেইল লেমুরসহ ৮৬ জোড়া বন্যপ্রাণী আমদানি করার পর তা ধরা পড়ে। এরপর ঠাঁই হয়েছিল গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে। সেখানে গভীর মমতায় বন্দি খাঁচাতেই জন্ম নেয় দুটি ফুটফুটে ছানা। একটির মৃত্যুর পর তিন সদস্যের এক ছোট্ট সুখী পরিবার গড়ে উঠেছিল। কিন্তু মানুষের সীমাহীন লোভের বলি হয়ে চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল সেই পরিবার।
গত বছরের ২৩
মার্চ গভীর রাতে পার্কের
নিরাপত্তা বেষ্টনী কেটে চুরি করে
নিয়ে যাওয়া হয় তিনটি লেমুরকে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় একটি লেমুর উদ্ধার
হলেও, মা লেমুর ও
তার সন্তানকে সীমান্ত পার করে পাচার
করে দেওয়া হয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারতে। এই
নিষ্ঠুর বিরহ আর আন্তর্জাতিক
পাচার চক্রের অবিশ্বাস্য নেপথ্য কাহিনী উদঘাটন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
৪১
লাখ টাকার লোভে যেভাবে ভাঙল লেমুর পরিবার
অনুসন্ধানে
জানা যায়, এই চুরির
নেপথ্যে ছিল সাফারি পার্কেরই
ঘরের শত্রু বিভীষণ। আউটসোর্সিংয়ে কাজ করা নিপেল
মাহমুদ নামের এক কর্মচারীই ছিল
এই সর্বনাশা পরিকল্পনার মূল হোতা। নিপেল
পার্কের ভেতরে থাকা দুর্লভ ও
বিপন্ন বন্যপ্রাণীদের ছবি ও ভিডিও
ধারণ করত। এরপর ফেসবুকের
বিভিন্ন গোপন গ্রুপ ও
পেজে সেসব পোস্ট করে
দেশি-বিদেশি চোরাকারবারিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করত। লেমুরগুলোর ছবি
সে প্রথমে দেখায় প্রতিবেশী পাখি ব্যবসায়ী জুয়েল
মিয়াকে। জুয়েল আবার যোগাযোগ করে
আরেক ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন হৃদয়ের সাথে। হৃদয় এই চুরির
জাল ছড়াতে যুক্ত করে দেলোয়ার হোসেন
তাওসীফ ও পাখি আমদানিকারক
মোঃ সাব্বির হোসেন তপনকে।
২৩ মার্চ দিবাগত রাত থেকে ২৪ মার্চ ভোরের মধ্যে নিপেল ও তার সহযোগীরা সাফারি পার্কের খাঁচা কেটে তিনটি লেমুরকেই চুরি করে জুয়েলের বাড়িতে নিয়ে যায়। এর মধ্যে একটি লেমুর তারা জনৈক এক ব্যবসায়ীর কাছে ৫ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয়। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে হৃদয় পায় ১০ হাজার টাকা। বাকি দুটি—অর্থাৎ মা লেমুর ও তার সন্তানকে বিক্রি করার জন্য দেলোয়ার ও সাব্বির যোগাযোগ করে ভারতীয় চোরাকারবারিদের সাথে।
প্রতিটি লেমুরের দাম নির্ধারণ করা
হয় সাড়ে ১৩ লাখ
টাকা। ময়মনসিংহের ভালুকা এলাকায় ভারতীয় ক্রেতাদের গাড়িতে যখন কার্টনবন্দি করে
অবুঝ প্রাণী দুটিকে তুলে দেওয়া হচ্ছিল,
তখন নিপেলকে ৭০ হাজার টাকা
কমিশন গুনে দেয় জুয়েলের
আপন চাচা মজনু মিয়া।
মজনু চোরাই লেমুর দুটি প্যাকেট ও
হস্তান্তরের মূল কাজ তদারকি
করেছিল। কিন্তু ট্রানজিট ও সীমান্ত পার
হওয়ার পর ভারতীয় বাজারে
এই দুটি লেমুরের দাম
গিয়ে দাঁড়ায় ৪১ লাখ টাকায়!
গুজরাটের
ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানায় বন্দি মা-শিশু, উদ্ধারে ইন্টারপোলের চিঠি
সিআইডির
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এক মর্মস্পর্শী তথ্য।
পাচার হওয়া মা ও
শিশু লেমুরটি বর্তমানে ভারতের গুজরাটের একটি ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানায়
বন্দি রয়েছে বলে তীব্র সন্দেহ
করা হচ্ছে। নিজের চেনা পরিবেশ আর
একমাত্র সঙ্গীকে হারিয়ে খাঁচায় বন্দি প্রাণী দুটির করুণ আর্তি হয়তো
কেউ শুনছে না, কিন্তু বাংলাদেশ
পুলিশ তাদের ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা
চালাচ্ছে।
মামলার
তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ইন্সপেক্টর সুনীল কুমার দাস মুঠোফোনে জানান, "পাচার হওয়া লেমুর উদ্ধারে
আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সাহায্য চাওয়া হয়েছে। আর যে লেমুরটি
উদ্ধার করা হয়েছে তার
ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে টেস্টের জন্য
পাঠানো হয়েছে। টেস্ট রিপোর্ট পাওয়া গেলে পরবর্তী পদক্ষেপ
নেওয়া হবে।"
তিনি
আরও জানান, ইন্টারপোল থেকে পাচার হওয়া
লেমুর দুটির সুনির্দিষ্ট শনাক্তকরণ তথ্য চাওয়ায়, বাংলাদেশে
উদ্ধার হওয়া একমাত্র লেমুরটির
ডিএনএ পরীক্ষা করা হচ্ছে। কারণ,
ডিএনএ প্রোফাইল মিললেই প্রমাণ হবে যে গুজরাটে
থাকা লেমুর দুটি এই উদ্ধার
হওয়া লেমুরটিরই হারিয়ে যাওয়া মা ও সন্তান।
প্রয়োজনে তদন্তকারী দল ভারতে গিয়ে
তল্লাশি চালাবে এবং ইন্টারপোল তাদের
পূর্ণ সহায়তা দেবে বলে আশ্বস্ত
করেছে।
আড়ালে
গডফাদার, বিমানবন্দরেও নজরদারি
বন্যপ্রাণী
চুরির এই আন্তর্জাতিক চক্রটি
ঢাকাকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। ইন্সপেক্টর সুনীল কুমার দাস জানান, "আন্তর্জাতিক
বন্যপ্রাণী পাচারকারী চক্র শাহজালাল আন্তর্জাতিক
বিমানবন্দরকে পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার
করছে বলে সন্দেহ করা
হচ্ছে। এরপরও বিষয়টি আরও নিশ্চিত হওয়ার
জন্য সিআইডির পক্ষ থেকে বিমানবন্দরে
শুল্ক কর্মকর্তার (ডেপুটি কমিশনার) কাছে তথ্য জানার
জন্য লিখিত চিঠি দেওয়া হয়েছে।"
তদন্ত
কর্মকর্তাদের মতে, এই বন্যপ্রাণী
ও পাখি পাচারের পেছনে
একটি বিশাল সিন্ডিকেট জড়িত। সিআইডি যখন এই মামলার
গভীরে প্রবেশ করে, তখন দেশজুড়ে
প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০
বন্যপ্রাণী ও পাখি ব্যবসায়ীর
জড়িত থাকার চাঞ্চল্যকর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সিআইডির সাঁড়াশি
অভিযানের মুখে তাদের অনেকেই
এখন ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে
আত্মগোপনে চলে গেছে। এই
চক্রটি এর আগেও একাধিকবার
বিমানবন্দর ও স্থলবন্দর ব্যবহার
করে দেশের বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণী
বিদেশে পাচার করেছে।
সাতজন
গ্রেফতার, ফিনিক্সের মতো ফেরার অপেক্ষায় খাঁচার একমাত্র সঙ্গী
বিশ্বজুড়ে
বর্তমানে এই প্রজাতির রিংটেইল
লেমুর মাত্র ১২০ থেকে ১৩০টি
জীবিত আছে। আইইউসিএন-এর
লাল তালিকায় এটি অত্যন্ত বিপন্ন
প্রাণী। সাফারি পার্কের এজাহারে তিনটি লেমুরের আনুমানিক মূল্য মাত্র ৩ লাখ টাকা
দেখানো হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে
এর মূল্য আকাশচুম্বী।
গাজীপুর সাফারি পার্কের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের মাধ্যমে চুরির বিষয়টি প্রথম জানাজানি হওয়ার পর শ্রীপুর থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সিআইডি প্রধান কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরাসরি মনিটরিং ও পরিকল্পনায় তদন্ত শুরু হয়।
গত বছরের
৪ নভেম্বর ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের কলাইপাড়া এলাকা থেকে স্থানীয় পুলিশের
সহায়তায় মজনু মিয়াকে গ্রেফতারের
মাধ্যমে প্রথম সাফল্যের মুখ দেখে সিআইডি। এ পর্যন্ত এই মামলায় মোট
৭ জন সন্দেহভাজন পাচারকারীকে
গ্রেফতার করা হয়েছে। সিআইডির
বিশেষ টিম চুরির কাজে
ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেলও জব্দ
করেছে।
গ্রেফতার ৭ জনের মধ্যে মজনু
মিয়াসহ ৬ জনই আদালতে
ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে বন্যপ্রাণী বিক্রি
ও পাচারের দায় স্বীকার করে
১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তবে সিআইডি জানিয়েছে,
এই চক্রের মূল হোতা বা
'গডফাদার' এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে
রয়ে গেছে। তাকে গ্রেফতার করতে
পারলে এই আন্তর্জাতিক পাচার
সিন্ডিকেটের নেপথ্যের আরও বহু রোমহর্ষক
কাহিনী এবং অন্ধকার দিক
উন্মোচিত হবে।
আপাতত
গাজীপুরের খাঁচায় একা পড়ে থাকা
রিংটেইল লেমুরটি হয়তো তার চিরচেনা
সঙ্গীদের পথ চেয়ে দিন
গুনছে। অডিও রেকর্ড, ডিজিটাল
ফুটপ্রিন্ট আর ডিএনএ টেস্টের
রিপোর্ট হাতে পেলে ইন্টারপোলের
মাধ্যমে সীমান্ত জয় করে একদিন সঙ্গী আর তার ছানা
আবার স্বদেশে ফিরবে; এই মানবিক আশাতেই
দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে
সিআইডির অনুসন্ধানী দল।

আপনার মতামত লিখুন