রাজধানীর ব্যস্ততম সড়ক শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটের পাশের একটি অন্ধকার গলি। ঘড়িতে তখন সকাল সাড়ে ৭টা। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী রিকশাযোগে অফিসের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ পিছন থেকে চলন্ত রিকশায় লাফিয়ে ওঠে দুজন ছিনতাইকারী। শুরু হয় টানাটানি। ব্যাগ আর মোবাইল বাঁচাতে গিয়ে রিকশা থেকে ছিটকে পড়েন ওই কর্মচারী। মুহূর্তেই ভেঙে যায় তার একটি হাত, বুক ও পিঠ রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে একজন ছিনতাইকারীকে আটকে মোবাইলটি উদ্ধার করলেও ততক্ষণে ওই কর্মচারীর জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ কেড়ে নিয়েছে নরপশুরা। এখনো সেই ভাঙা হাত আর ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে কেবল চাকরি বাঁচানোর তাগিদে কোনোমতে অফিস করছেন তিনি।
রবিবার দুপুরে যখন এই প্রতিবেদকের সাথে তার কথা হয়, তখন তার চোখে-মুখে ছিল চরম এক আতঙ্ক। কেঁদে ফেলে তিনি প্রথম শর্ত জুড়লেন, "স্যার, দয়া করে আমার নাম লিখবেন না, ছবিও দেবেন না। ওদের একাধিক গ্রুপ আছে। জানতে পারলে রাস্তায় আটকে আমাকে মেরেই ফেলবে।" এই ভয়ার্ত আকুতি আজ পুরো ঢাকা শহরের সাধারণ মানুষের ভেতরের রূপ। ছিনতাইকারীদের ভয়ে মানুষ এতটাই কোণঠাসা যে, থানায় গিয়ে মামলা করার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলছে। তাদের আশঙ্কা, মামলা করলে রাস্তায় দল বেঁধে আবার হামলা করবে ওই অপরাধী চক্র।
ছেলের রক্ত শুকানোর আগেই মায়ের সর্বস্বান্ত হওয়ার গল্প
ছেলের এই নির্মম ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই যেন আরেকটি বজ্রপাত নেমে আসে ওই পরিবারে। সকাল ৯টার দিকে হাতিরপুলের ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের বাসার ঠিক সামনে তরকারি কিনতে নিচে নেমেছিলেন ওই কর্মচারীর বৃদ্ধা মা। হাতে সামান্য টাকা, গলায় ও কানে ছিল চিরচেনা কিছু স্বর্ণালংকার। ওত পেতে থাকা ছিনতাইকারীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বয়োবৃদ্ধ ওই নারীর কান, হাত ও গলা থেকে দুল, চুড়ি ও চেইন এক হ্যাঁচকায় ছিঁড়ে নিয়ে যায়। রক্তাক্ত ও স্তব্ধ হয়ে পড়া বৃদ্ধা নিজের ছেলের করুণ অবস্থা দেখে নিজেই বিব্রত বোধ করেন। কাউকে কিছু না বলে মুখ বুজে বাসায় ফিরে যান।
এখনো আতঙ্কে কাঁপছেন সেই মা। পুলিশকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে পরিবারের সদস্যরা বলছেন, "শেষ ভরসা আল্লাহ, তিনিই এর বিচার করবেন।" শুধু এই পরিবারই নয়, ওই এলাকার এক কানাডা প্রবাসীর মেয়ের গলার চেইনও একইভাবে দিনদুপুরে টেনে নিয়ে গেছে ছিনতাইকারীরা।
মোহাম্মদপুরে ফ্ল্যাট কিনেও পালাচ্ছে মানুষ, নারীদের ব্যাগেও ভয়
ছিনতাইকারীদের এই বেপরোয়া তাণ্ডব কেবল শাহবাগ বা হাতিরপুলেই সীমাবদ্ধ নেই। ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে মোহাম্মদপুরে ফ্ল্যাট কিনেছিলেন কয়েকজন চাকরিজীবী। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ছিনতাইকারীদের ভয়ে তারা এখন সেই ফ্ল্যাট ছেড়ে এলিফ্যান্ট রোড বা অফিসের কাছাকাছি কোনো নিরাপদ এলাকায় চলে আসার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। খোদ রাজধানীর বুকে ফ্ল্যাট কিনেও নিরাপত্তার অভাবে বাসা ছেড়ে দেওয়ার এই ঘটনা নগরবাসীকে এক চরম বার্তা দেয়। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, অনেক নারী এখন রাস্তায় বের হলে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টান ও দুর্ঘটনার ভয়ে ভ্যানিটি ব্যাগ বা কোনো প্রকার ব্যাগ ব্যবহার করতেই সাহস পাচ্ছেন না।
রক্তাক্ত হচ্ছে পুলিশ, ঝরছে সাধারণ মানুষের রক্ত
পুরো রাজধানীতে এখন ছিনতাইয়ের ঘটনা অহরহ ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কিংবা কখনো কখনো তাদের তোয়াক্কা না করেই চলছে এই তাণ্ডব। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে সম্প্রতি শেরেবাংলা নগর এলাকায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে দুই পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। শেরেবাংলা নগর থানার একজন এসআই তাদেরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েছেন।
অন্যদিকে, গত ১ জুন সোমবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুলের কাছে রিকশাযোগে যাওয়ার সময় অজ্ঞাত চার ছিনতাইকারী রিকশার গতিরোধ করে খন্দকার ইফতেখারুল ইসলাম নামের এক যাত্রীকে পিঠের বাম পাশে নির্মমভাবে ছুরিকাঘাত করে। তার কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ও একটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায় তারা। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিদিনই ঢাকার কোথাও না কোথাও এমন রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অসহায়ের মতো সংক্ষেপে বলেন, "মিটিংয়ে আছি, কিছু বলতে পারব না।" আবার অনেক কর্মকর্তা ফোন ধরতেও অস্বীকৃতি জানান। এই নীরবতা আর সাধারণ মানুষের বুকের ভেতরের কান্না যেন ঢাকাকে এক গভীর নিরাপত্তাহীনতার চাদরে ঢেকে দিচ্ছে। রাস্তা থেকে শুরু করে নিজের বাসাবাড়ির সদর দরজা; আজ কোথাও নিরাপদ নয় নগরবাসী।

সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুন ২০২৬
রাজধানীর ব্যস্ততম সড়ক শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটের পাশের একটি অন্ধকার গলি। ঘড়িতে তখন সকাল সাড়ে ৭টা। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী রিকশাযোগে অফিসের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ পিছন থেকে চলন্ত রিকশায় লাফিয়ে ওঠে দুজন ছিনতাইকারী। শুরু হয় টানাটানি। ব্যাগ আর মোবাইল বাঁচাতে গিয়ে রিকশা থেকে ছিটকে পড়েন ওই কর্মচারী। মুহূর্তেই ভেঙে যায় তার একটি হাত, বুক ও পিঠ রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে একজন ছিনতাইকারীকে আটকে মোবাইলটি উদ্ধার করলেও ততক্ষণে ওই কর্মচারীর জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ কেড়ে নিয়েছে নরপশুরা। এখনো সেই ভাঙা হাত আর ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে কেবল চাকরি বাঁচানোর তাগিদে কোনোমতে অফিস করছেন তিনি।
রবিবার দুপুরে যখন এই প্রতিবেদকের সাথে তার কথা হয়, তখন তার চোখে-মুখে ছিল চরম এক আতঙ্ক। কেঁদে ফেলে তিনি প্রথম শর্ত জুড়লেন, "স্যার, দয়া করে আমার নাম লিখবেন না, ছবিও দেবেন না। ওদের একাধিক গ্রুপ আছে। জানতে পারলে রাস্তায় আটকে আমাকে মেরেই ফেলবে।" এই ভয়ার্ত আকুতি আজ পুরো ঢাকা শহরের সাধারণ মানুষের ভেতরের রূপ। ছিনতাইকারীদের ভয়ে মানুষ এতটাই কোণঠাসা যে, থানায় গিয়ে মামলা করার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলছে। তাদের আশঙ্কা, মামলা করলে রাস্তায় দল বেঁধে আবার হামলা করবে ওই অপরাধী চক্র।
ছেলের রক্ত শুকানোর আগেই মায়ের সর্বস্বান্ত হওয়ার গল্প
ছেলের এই নির্মম ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই যেন আরেকটি বজ্রপাত নেমে আসে ওই পরিবারে। সকাল ৯টার দিকে হাতিরপুলের ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের বাসার ঠিক সামনে তরকারি কিনতে নিচে নেমেছিলেন ওই কর্মচারীর বৃদ্ধা মা। হাতে সামান্য টাকা, গলায় ও কানে ছিল চিরচেনা কিছু স্বর্ণালংকার। ওত পেতে থাকা ছিনতাইকারীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বয়োবৃদ্ধ ওই নারীর কান, হাত ও গলা থেকে দুল, চুড়ি ও চেইন এক হ্যাঁচকায় ছিঁড়ে নিয়ে যায়। রক্তাক্ত ও স্তব্ধ হয়ে পড়া বৃদ্ধা নিজের ছেলের করুণ অবস্থা দেখে নিজেই বিব্রত বোধ করেন। কাউকে কিছু না বলে মুখ বুজে বাসায় ফিরে যান।
এখনো আতঙ্কে কাঁপছেন সেই মা। পুলিশকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে পরিবারের সদস্যরা বলছেন, "শেষ ভরসা আল্লাহ, তিনিই এর বিচার করবেন।" শুধু এই পরিবারই নয়, ওই এলাকার এক কানাডা প্রবাসীর মেয়ের গলার চেইনও একইভাবে দিনদুপুরে টেনে নিয়ে গেছে ছিনতাইকারীরা।
মোহাম্মদপুরে ফ্ল্যাট কিনেও পালাচ্ছে মানুষ, নারীদের ব্যাগেও ভয়
ছিনতাইকারীদের এই বেপরোয়া তাণ্ডব কেবল শাহবাগ বা হাতিরপুলেই সীমাবদ্ধ নেই। ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে মোহাম্মদপুরে ফ্ল্যাট কিনেছিলেন কয়েকজন চাকরিজীবী। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ছিনতাইকারীদের ভয়ে তারা এখন সেই ফ্ল্যাট ছেড়ে এলিফ্যান্ট রোড বা অফিসের কাছাকাছি কোনো নিরাপদ এলাকায় চলে আসার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। খোদ রাজধানীর বুকে ফ্ল্যাট কিনেও নিরাপত্তার অভাবে বাসা ছেড়ে দেওয়ার এই ঘটনা নগরবাসীকে এক চরম বার্তা দেয়। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, অনেক নারী এখন রাস্তায় বের হলে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টান ও দুর্ঘটনার ভয়ে ভ্যানিটি ব্যাগ বা কোনো প্রকার ব্যাগ ব্যবহার করতেই সাহস পাচ্ছেন না।
রক্তাক্ত হচ্ছে পুলিশ, ঝরছে সাধারণ মানুষের রক্ত
পুরো রাজধানীতে এখন ছিনতাইয়ের ঘটনা অহরহ ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কিংবা কখনো কখনো তাদের তোয়াক্কা না করেই চলছে এই তাণ্ডব। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে সম্প্রতি শেরেবাংলা নগর এলাকায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে দুই পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। শেরেবাংলা নগর থানার একজন এসআই তাদেরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েছেন।
অন্যদিকে, গত ১ জুন সোমবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুলের কাছে রিকশাযোগে যাওয়ার সময় অজ্ঞাত চার ছিনতাইকারী রিকশার গতিরোধ করে খন্দকার ইফতেখারুল ইসলাম নামের এক যাত্রীকে পিঠের বাম পাশে নির্মমভাবে ছুরিকাঘাত করে। তার কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ও একটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায় তারা। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিদিনই ঢাকার কোথাও না কোথাও এমন রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অসহায়ের মতো সংক্ষেপে বলেন, "মিটিংয়ে আছি, কিছু বলতে পারব না।" আবার অনেক কর্মকর্তা ফোন ধরতেও অস্বীকৃতি জানান। এই নীরবতা আর সাধারণ মানুষের বুকের ভেতরের কান্না যেন ঢাকাকে এক গভীর নিরাপত্তাহীনতার চাদরে ঢেকে দিচ্ছে। রাস্তা থেকে শুরু করে নিজের বাসাবাড়ির সদর দরজা; আজ কোথাও নিরাপদ নয় নগরবাসী।

আপনার মতামত লিখুন