মেধাবীদের চোখের জল আর অযোগ্যদের পকেট ভর্তি টাকার বিনিময়ে একসময় দেশের শিক্ষাঙ্গনে যে অন্ধকার নেমে এসেছিল, তার জট এবার খুলতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় দেশের বেসরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষক নিয়োগে হওয়া পাহাড়সম অনিয়মের অভিযোগে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন।
সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা
সংস্থা সারা দেশের বিভিন্ন বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের সনদের সত্যতা নিশ্চিত
করতে এক মহাপরিকল্পনা নিয়ে তদন্তে নেমেছে। প্রতিটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই
তদন্ত কার্যক্রম বর্তমানে পুরোদমে চলছে বলে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে।
রাজধানীতেই মিলল জালিয়াতির প্রমাণ,
মে মাস থেকে চলছে চিরুনি অভিযান
তদন্তের প্রাথমিক ধাপে খোদ রাজধানী ঢাকাতেই গা শিউরে ওঠার মতো তথ্য মেলা শুরু হয়েছে। মে মাস থেকে থানাভিত্তিক শুরু হওয়া এই অভিযানে এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত শিক্ষকের নথিপত্র যাচাই করে অন্তত ১২ জন শিক্ষকের সরাসরি সনদ জালিয়াতি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ভয়াবহ অনিয়ম হাতেনাতে ধরেছে গোয়েন্দারা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কম্পিউটারের শিক্ষক নিজেই কম্পিউটারের ভুয়া সনদ তৈরি করে বছরের পর বছর চাকরি করে যাচ্ছেন!
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারসহ বিভিন্ন সময়ে
রাজধানীর বেসরকারি স্কুলগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাবে এই নিয়োগগুলো দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষকদের
বায়োডাটা ও সার্টিফিকেট খুঁজতে গিয়ে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এমন সব প্রভাব বিস্তারের
তথ্য পাচ্ছেন, যা দেখে মাঠপর্যায়ের সদস্যরাও চরম বিব্রত বোধ করছেন। ইতিমধ্যে সন্দেহভাজন
অভিযুক্ত শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করে অর্ধশত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের
প্রাথমিক রিপোর্ট উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়েছে।
পালাবদল ও চোরের মতো পালানোর গল্প
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে শেখ হাসিনা বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার পর এবং তার সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও এলাকাভিত্তিক নেতারা গা-ঢাকা দেওয়ার সাথে সাথেই বেসরকারি স্কুলগুলোর চিরচেনা চিত্র পাল্টে যায়। সেই সময় থমকে যায় জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া শিক্ষকদের দাপট। অনেক শিক্ষক আইনি জটিলতা এড়াতে তড়িঘড়ি করে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, অনেকেই আবার নিয়েছেন ‘স্বেচ্ছায় অবসর’। এমনকি অনেকেই ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে আজ পর্যন্ত আর কোনোদিন কর্মস্থলেই যোগ দেননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, "বেসরকারি স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে অস্বচ্ছতা, সনদ জালিয়াতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক পরিচয়—সব কিছুর ডাটা তৈরি করতে রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা থানা পর্যন্ত কার্যক্রম চলছে। প্রতিটি অনিয়মের তদন্ত শেষে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে রিপোর্ট পেশ করা হবে।"
তিনি
আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এদের সম্পর্কে দ্রুত খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা না নিলে পুরো শিক্ষা
ব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ হুমকিতে পড়বে।
শিক্ষার মান ফেরানোর তাগিদ ও বিশেষজ্ঞদের
কঠোর বার্তা
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে
সংশ্লিষ্ট একজন রাজনৈতিক নেতা বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গতকাল সন্ধ্যায়
বলেন, "বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ প্রাপ্তদের কারণে
লেখাপড়া, শিক্ষার পরিবেশ ও মান কমে যাচ্ছে। এখনই তদন্ত করে অযোগ্য ও সনদ জালিয়াতদের
বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে।"
এদিকে, জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। পুলিশের একজন অপরাধ বিশেষজ্ঞ (ডিআইজি) এই জঘন্য অপরাধের শাস্তির রূপরেখা টেনে বলেন, "যে সব বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকরা সনদ জালিয়াতি ও অনিয়মের মাধ্যমে চাকরি নিয়েছেন তাদের চিহ্নিত করে বেতন-ভাতা ফেরত নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে তাদের বিশদ তদন্ত শেষ করে দুর্নীতির মামলা করাও দরকার।"
তিনি আরও যোগ করেন, "বেসরকারি স্কুলের শিক্ষার মান উন্নত করতে হলে শিক্ষকদের রাজনীতিসহ
সকল কিছুর ঊর্ধ্বে থেকে ছাত্রদেরকে পড়াইতে হবে। দলীয় করণে শ্রেণীকক্ষে পাঠদানে সমস্যা
হয়, যার প্রভাব পড়ে পরীক্ষার ফলাফলের উপর। তাই নিরপেক্ষ ভাবে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক
নিয়োগ দিলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম বাড়বে।"

বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬
মেধাবীদের চোখের জল আর অযোগ্যদের পকেট ভর্তি টাকার বিনিময়ে একসময় দেশের শিক্ষাঙ্গনে যে অন্ধকার নেমে এসেছিল, তার জট এবার খুলতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় দেশের বেসরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষক নিয়োগে হওয়া পাহাড়সম অনিয়মের অভিযোগে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন।
সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা
সংস্থা সারা দেশের বিভিন্ন বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের সনদের সত্যতা নিশ্চিত
করতে এক মহাপরিকল্পনা নিয়ে তদন্তে নেমেছে। প্রতিটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই
তদন্ত কার্যক্রম বর্তমানে পুরোদমে চলছে বলে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে।
রাজধানীতেই মিলল জালিয়াতির প্রমাণ,
মে মাস থেকে চলছে চিরুনি অভিযান
তদন্তের প্রাথমিক ধাপে খোদ রাজধানী ঢাকাতেই গা শিউরে ওঠার মতো তথ্য মেলা শুরু হয়েছে। মে মাস থেকে থানাভিত্তিক শুরু হওয়া এই অভিযানে এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত শিক্ষকের নথিপত্র যাচাই করে অন্তত ১২ জন শিক্ষকের সরাসরি সনদ জালিয়াতি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ভয়াবহ অনিয়ম হাতেনাতে ধরেছে গোয়েন্দারা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কম্পিউটারের শিক্ষক নিজেই কম্পিউটারের ভুয়া সনদ তৈরি করে বছরের পর বছর চাকরি করে যাচ্ছেন!
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারসহ বিভিন্ন সময়ে
রাজধানীর বেসরকারি স্কুলগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাবে এই নিয়োগগুলো দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষকদের
বায়োডাটা ও সার্টিফিকেট খুঁজতে গিয়ে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এমন সব প্রভাব বিস্তারের
তথ্য পাচ্ছেন, যা দেখে মাঠপর্যায়ের সদস্যরাও চরম বিব্রত বোধ করছেন। ইতিমধ্যে সন্দেহভাজন
অভিযুক্ত শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করে অর্ধশত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের
প্রাথমিক রিপোর্ট উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়েছে।
পালাবদল ও চোরের মতো পালানোর গল্প
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে শেখ হাসিনা বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার পর এবং তার সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও এলাকাভিত্তিক নেতারা গা-ঢাকা দেওয়ার সাথে সাথেই বেসরকারি স্কুলগুলোর চিরচেনা চিত্র পাল্টে যায়। সেই সময় থমকে যায় জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া শিক্ষকদের দাপট। অনেক শিক্ষক আইনি জটিলতা এড়াতে তড়িঘড়ি করে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, অনেকেই আবার নিয়েছেন ‘স্বেচ্ছায় অবসর’। এমনকি অনেকেই ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে আজ পর্যন্ত আর কোনোদিন কর্মস্থলেই যোগ দেননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, "বেসরকারি স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে অস্বচ্ছতা, সনদ জালিয়াতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক পরিচয়—সব কিছুর ডাটা তৈরি করতে রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা থানা পর্যন্ত কার্যক্রম চলছে। প্রতিটি অনিয়মের তদন্ত শেষে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে রিপোর্ট পেশ করা হবে।"
তিনি
আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এদের সম্পর্কে দ্রুত খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা না নিলে পুরো শিক্ষা
ব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ হুমকিতে পড়বে।
শিক্ষার মান ফেরানোর তাগিদ ও বিশেষজ্ঞদের
কঠোর বার্তা
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে
সংশ্লিষ্ট একজন রাজনৈতিক নেতা বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গতকাল সন্ধ্যায়
বলেন, "বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ প্রাপ্তদের কারণে
লেখাপড়া, শিক্ষার পরিবেশ ও মান কমে যাচ্ছে। এখনই তদন্ত করে অযোগ্য ও সনদ জালিয়াতদের
বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে।"
এদিকে, জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। পুলিশের একজন অপরাধ বিশেষজ্ঞ (ডিআইজি) এই জঘন্য অপরাধের শাস্তির রূপরেখা টেনে বলেন, "যে সব বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকরা সনদ জালিয়াতি ও অনিয়মের মাধ্যমে চাকরি নিয়েছেন তাদের চিহ্নিত করে বেতন-ভাতা ফেরত নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে তাদের বিশদ তদন্ত শেষ করে দুর্নীতির মামলা করাও দরকার।"
তিনি আরও যোগ করেন, "বেসরকারি স্কুলের শিক্ষার মান উন্নত করতে হলে শিক্ষকদের রাজনীতিসহ
সকল কিছুর ঊর্ধ্বে থেকে ছাত্রদেরকে পড়াইতে হবে। দলীয় করণে শ্রেণীকক্ষে পাঠদানে সমস্যা
হয়, যার প্রভাব পড়ে পরীক্ষার ফলাফলের উপর। তাই নিরপেক্ষ ভাবে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক
নিয়োগ দিলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম বাড়বে।"

আপনার মতামত লিখুন