সংস্কৃতি মানুষের চিন্তাধারা, আচার-আচরণ ও বিশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন| এই প্রতিফলন ঐতিহ্য ও যুগচেতনার উৎস-উ™ূ¢ত| এ-কারণেই সংস্কৃতির স্বরূপ অন্বেষণ করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই ঐতিহ্যের ধারা ও যুগচেতনার বিকাশের রূপরেখা অন্বেষণ করতে হয়| কারণ, সংস্কৃতি শুধু ব্যক্তির নিজস্ব চিন্তাধারা, আচার-আচরণ ও বিশ্বাসেরই প্রতিফলন নয়, সংস্কৃতি দেশীয় এবং জাতীয় মনেরও অভিব্যক্তি|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত ছিলেন উনিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি ও নাট্যকার| হিন্দু কলেজে পড়াশোনা করার সময় মধুসূদন প্রথম কাব্যচর্চা শুরু করেন| তাঁকে বাংলার নবজাগরণ সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব মনে করা হয়| ঐতিহ্যের অনুবর্তন অগ্রাহ্য করে তিনি কাব্যে নতুন রীতি প্রবর্তন করেন| বাংলা ভাষায় তিনিই অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও চতুর্দশপদী বা সনেটের প্রবর্তক|
ইউরোপীয় শিক্ষা ও ভাবধারায় ছিলেন মধুসূদন উজ্জীবিত, ইউরোপীয় কাব্য-সম্পদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও আকর্ষণ ছিল দুর্নিবার| যে রকম মানস-প্রবণতা ও মানসিক পরিপক্বতা নিয়ে মধুসূদন জন্মেছিলেন তাতে করে তাঁর পক্ষে ইউরোপীয় বিষয়-বস্তু ও উপাদান নিয়ে একটি মহাকাব্যে সংরচন এমন কোনো কঠিন ব্যাপার ছিল না; বিদেশি ভাষায় কাব্যসৃষ্টির ক্ষেত্রে তিনি কিছুটা ব্যর্থ কসরতও করেছিলেন; কিন্তু মধুসূদনের ঐতিহ্য এবং ইতিহাস-প্রবণতা— যা তাঁর ধমনীতে প্রবাহিত ও স্পন্দিত ছিল, অচিরেই তাঁকে এমন উপলব্ধিতে সজাগ করে তুলল যে, জাতীয় ও দেশীয় সংস্কৃতির ধারাকে আশ্রয় করে না নিলে মন ও প্রাণের মুক্তি সম্ভব নয়| কবিমনের স্বাভাবিক প্রবণতাও এই সত্যের প্রতিই অঙ্গুলি নির্দেশে করে| এমন ধারা আত্মস্থতা ফিরে পাওয়ার ফলেই মধুসূদনের পক্ষে আধুনিক বাংলা কাব্যের উৎসারণের পথ প্রশস্ত করা সম্ভব হয়েছে| অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায়— “দেশের ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা না করে কোনো দেশের কবি মহাকবির আখ্যা লাভ করেনি| এমন যে অত্যুগ্র মধুসূদন তাঁকেও শেষ পর্যন্ত হোমার, ভার্জিল, দান্তে, মিল্টনকে ছেড়ে বাল্মীকির শরণাপন্ন হতে হয়েছে|”
সাহিত্যের বিবর্তন প্রধানত ভাষা-নির্ভর, কারণ ভাষার প্রকাশ ক্ষমতাকে বাহন করেই নতুন সাহিত্যরীতির মুক্তি ঘটে এবং এ কারণেই সাহিত্যের ইতিহাসে যে যুগবদলের চিহ্ন স্পষ্টরূপ লাভ করে তাতে ভাষা পরিবর্তনের লক্ষণটি সুপ্রকট হয়ে ওঠে| চর্যাপদের ভাষা থেকে শুরু করে আধুনিক কবিতার ভাষার ধারাবাহিক পর্যালোচনায় এ-সত্যটি স্পষ্ট চেহারায় উদ্ভাসিত হয়| চর্যার ‘সান্ধ্যভাষা’কে আশ্রয় করে সিদ্ধাচার্যদের জটিল মনোভাব ও কবি-কল্পনা বিকাশ লাভ করেছিল, এক্ষেত্রেও ভাবের জটিলতা ও বক্তব্য প্রকাশের অপেক্ষাকৃত অসারল্য ভাষার রূপরীতিকে পরিবর্তিত করেছে; কারণ কাব্যস্রষ্টা ভাষার রীতি মেনে চলেন বটে, কিন্তু ভাষার নির্দেশকে সর্বগ্রাহ্য মনে করেন না, এ কারণেই স্রষ্টার প্রকাশের বাহনরূপেই ভাষার অস্তিত্ব ও প্রসার|
শক্তিমান কাব্যস্রষ্টা তাঁর ভাব প্রকাশের সময়ে নিজস্ব মনোভঙ্গীর আলোকে ভাষাকে নতুন পথে পরিচালিত করেন এবং তখনই মাত্র পুরাতন ভাষা নতুন অবয়ব লাভ করে এবং নতুন ভাবধারার বাহন হয়| ফলে ভাষার মুক্তি ঘটে| বাংলা কাব্যধারায় চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্য ও মধ্যযুগের পুঁথি-সাহিত্য থেকে শুরু করে অতি আধুনিক কবিতার ভাষাভঙ্গীতেও এই মুক্তির ইতিহাসই স্পষ্ট হয়ে আছে, যদিও রবীন্দ্রনাথের ভাষায়: “সাহিত্যের প্রাকধারা বয় ভাষার নাড়ীতে, তাকে নাড়া দিলে মূল রচনার হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়| এ-রকম সাহিত্যে বিষয়বস্তুটা নিশ্চেষ্ট হয়ে পড়ে, যদি, তার সজীবতা না থাকে|
বাংলা কাব্যে মধুসূদন যে আধুনিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করলেন তাতে কবিতার ভাষারই যে পরিবর্তন সূচিত হলো তাই নয়, সাহিত্যের প্রাণেও নতুন স্পন্দনের সূচনা হলো| মধুসূদন পাশ্চাত্যের শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন, এবং এ শিক্ষা তাঁর শিল্পীসত্তায় এক বৈপ্লবিক চেতনার সঞ্চার করেছিল| এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মধুসূদন বাংলা কাব্যে শুধু নতুন ভাষারীতিরই প্রবর্তন করেননি, মৌলিক চিন্তারীতিকেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন| এই চিন্তায় বাঙালি হিন্দুর জাতীয় মানসকে পাশ্চাত্যের কাব্যরীতির অগ্রসর শাখার খাতে প্রবাহিত করার উদ্যমই লক্ষ্য করা গিয়েছে|
ভাব ও ভাষার দিক দিয়ে মধুসূদন পূর্ববর্তী কাব্যধারাকে অতিক্রম করে নতুন পথের অšে^ষী হয়েছিলেন, প্রকাশের বৈশিষ্ট্য তাঁর সেই অন্বেষাকে সাফল্যও দিয়েছে; কিন্তু এ সত্ত্বেও মধুসূদন বিষয়বস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাংলা কাব্যের প্রতিষ্ঠিত ধারা ও সুপ্রাচীন ঐতিহ্যকে অস্বকার করেননি| সুধীন্দ্রনাথ দত্ত টি. এস. এলিয়টের বরাত দিয়ে বলেন, “ব্যক্তিগত মনীষায় জাতীয় মানস ফুটিয়ে তোলাই কবিজীবনের পরম সার্থকতা| কিন্তু আপন কালের স্বধর্ম তুললেই, সে-সমন্বয় সহজ হয় না, উক্ত সঙ্গমের দিকে এগোতে চাইলে নিজের অভিজ্ঞতাকে, তথা জাতিগত চৈতন্যকে, প্রতীকরূপে দেখা দরকার” [‘অর্কেস্ট্রা’ কাব্যগ্রন্থের ভূমিকা|
ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যের আলোকে মধুসূদন ‘ব্যক্তিগত মনীষায় জাতীয় মানস ফুটিয়ে তোলাই কাম্য’ মনে করেছিলেন এবং এ কারণেই আপন কালের স্বধর্ম ভুললেই সে সমন্বয় সহজ হয় না— এই প্রখর চেতনায় জাগ্রত ছিলেন| মধুসূদন পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষায় আকৃষ্ট হয়ে স্বধর্মচ্যুত হয়েছিলেন, এর পেছনে যে প্রাচীন ধর্মের বন্ধন থেকে নাড়িছেঁড়া মুক্তির আকর্ষণই প্রবল ছিল তা-ই নয়, ব্যক্তিগত মনীষার বিকাশের শ্রেষ্ঠতম পথ অবলম্বনের একটি ক্ষীণ ইচ্ছাও তাঁর চেতনায় লুকিয়েছিল| ব্যক্তি-স্বাতন্ত্রের প্রখর তাড়নায় তিনি পাশ্চাত্যের শিক্ষারীতি ও জীবন-ধর্মের প্রতি প্রলুব্ধ হয়েছিলেন, এ-প্রলোভন তাঁর ব্যক্তিগত-জীবনে দুঃখের পশরা বয়ে এনেছিল বটে, কিন্তু বাংলা কাব্যের বিবর্তনে এর অবদান বিশিষ্টরূপেই চিহ্নিত|
পাশ্চাত্য শিক্ষার ফলে মধুসূদনের কাব্যরুচি তীক্ষ্ণ ও মার্জিত হয়েছিল, এবং এই মার্জিত রুচির অনুপ্রেরণায় তিনি প্রচলিত কাব্য-ধারার গতি বদলে ব্রতী হয়েছিলেন; কিন্তু লক্ষ্য করার বিষয় এই যে, মধুসূদন নতুন কাব্যরীতির প্রবর্তনের ক্ষেত্রেও বাংলা কাব্যের স্বধর্মের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করেননি| বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন ও ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-র সৃষ্টি মধুসূদনের ˆবপ্লবিক কাব্যকৃতির নিদর্শন; এই নতুন ছন্দরীতির প্রবর্তনায় মধুসূদন পাশ্চাত্যের কাব্যধারার দ্বারস্থ হয়েছেন, কিন্তু এ-সত্ত্বেও তিনি বাংলা কাব্যের ঐতিহ্য বিস্মৃত হননি, প্রচলিত পয়ারের একঘেঁয়েমির বেড়া ভেঙেই এই ˆবপ্লবিক ধারার সূচনা করেছেন| সাধারণ পয়ারের পুনরাবৃত্তির প্রতি মধুসূদন বীতশ্রদ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু বাংলা-কাব্যের গীতিপ্রবণতার প্রতি তাঁর অশ্রদ্ধা ছিল না| তাঁর নিজের কাব্যকৃতিতেও এই গীতিভঙ্গীর সুস্পষ্ট স্বাক্ষর রয়েছে|
বিহারীলালের আবির্ভাবের আগেই মধুসূদন বাংলা কাব্যে মহাকাব্যের সূচনা করেছিলেন| এই ধারায় প্রত্যয়ী হয়ে এগিয়ে এলেন হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন ও কায়কোবাদ প্রমুখ| মহাকাব্য রচনায় এ-তিনের শক্তি মধুসূদনের তুলনীয় সমুন্নতি লাভ করেনি, এবং এর কারণও নানাবিধ| বাংলা কাব্যে মহাকাব্যধারার সীমাবদ্ধতার পর্যালোচনায় তা লক্ষণীয়| বিহারীলালে এসে বাংলা গীতিকাব্য এক নতুন মোড় নিল, নতুন এই জন্যে যে গীতিকবিতার সুস্পষ্ট লক্ষণ মধুসূদন, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র ও কায়কোবাদে বিধৃত হয়ে থাকলেও বিহারীলালের কাব্যে যে সে-লক্ষণ কিছুটা স্বাতন্ত্র্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছে-কাব্যের উৎকর্ষ বিচারের অপেক্ষা না রেখেও এ মন্তব্য করা চলে| মধুসূদনের ‘ব্রজাঙ্গনা কাব্যে’ গীতিধর্মিতার যে লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে তাতে প্রাচীন ঐতিহ্যের যত বেশি ছাপ আছে, মনোধর্মিতার তত প্রকাশ নেই| বিহারীলাল হৃদয়ের আকুলতাকে প্রকাশ করার জন্যে প্রকৃতি-আশ্রয়ী হয়েছেন; এবং এতে করে তাঁর একটি রোমান্টিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে| কিন্তু এ-সত্ত্বেও ˆবষ্ণব গীতি কবিতায় যে সূক্ষ্ম ও তীক্ষ্ণ বেদনাবোধ উৎসারিত হয়েছে, বিহারীলালে তার সুপ্রকাশ ঘটেনি| বিহারীলাল পারিপার্শ্বিক দৃশ্যময় জগতকে কাব্যের উপজীব্য করেছেন, দূরলোকের সৌন্দর্যেও মোহিত হয়েছেন, কিন্তু তাঁর কাব্যে সে-মুগ্ধদৃষ্টির সৌন্দর্যরূপ প্রকাশিত হয়নি| বেদনা প্রকাশের ক্ষেত্রে বিহারীলালে যতটা তীক্ষ্ণতা না আছে, তার চেয়ে আছে আবেগের সরল উৎসারণ| ভাষার যে লিপিকুশলতা অপ্রকাশ সৌন্দর্য ও বেদনাকে ইশারায় ব্যক্ত করে, বিহারীলালে তার নির্দশন খুবই কম, বরং প্রকাশের বেদনায় ভাবানুভূতি এত বেশি আলোড়িত হয়েছে যে তা সুসংহতির অপেক্ষা না রেখেই আত্মপ্রকাশ করেছে| জনৈক সমালোচকের ভাষায় বলা চলে— “সারদা-মঙ্গলে” বিহারীলাল বিশ্বব্যাপিনী সৌন্দর্যলক্ষ্মীর উপাসনা করেছেন, ‘নিসর্গ-সন্দর্শন’ নামক কাব্যে প্রকৃতি চিত্র এঁকেছেন, ‘সাধের আসনে’ স্থলে স্থলে আপন রোমান্টিক আকাংখার সংবাদ দিয়েছেন, কিন্তু তাঁর কাব্যলোকে সেই অনাস্বাদিত-পূর্ব দীপ্তির স্পর্শ লাগেনি, যা— ঘবাবৎ ধিং ড়হ ষধহফ ড়ৎ ংবধ| যেখানে তিনি রোমান্টিক আকাঙ্ক্ষার কথা লিখেছেন, সেখানে তাঁর রচনা সংবাদের মতোই সাধারণ এবং বিস্মরণ-যোগ্য|
চর্যাগীতি কিংবা তারও আগে থেকে যে ধারা প্রবাহিত ছিল, মধুসূদনে এসে তা-ই নতুন রূপ ও অর্থ পরিগ্রহ করেছে ‘ব্রজাঙ্গন কাব্য’ এই পরিচয়েই উজ্জ্বল| ব্রজাঙ্গনা কাব্যের প্রথম সর্গে ‘বিরহ-পর্যায়ে যে-সব গীতি কবিতা রয়েছে তাতে মধুসূদনের ব্যক্তিসত্তার যে হাহাকার ধ্বণিত হয়েছে তার সাথে ˆবষ্ণব গীতি-কবিতার সমধর্মিতার অনুসন্ধান কষ্টকর নয়| ভাবের দিক থেকে গীতি-প্রবণতা এ-কাব্যের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে| সূক্ষ্ম অনুভূতির সহজ সরল প্রকাশ-মাধুর্যে অনুপম সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে| মধুসূদন-রচিত মহাকাব্যে ভাষায় যে দুরূহতা ও ভাবপরিচর্যার দুর্জেয় জটিলতা রয়েছে, ‘ব্রজাঙ্গনা কাব্যে’ তার কোন লক্ষণই নেই, বরং এ-ক্ষেত্রে মধুসূদন স্বাভাবিক কবিসত্তার বিকাশকেই স্বীকার করে নিয়েছেন, পুরানো রীতির একঘেয়েমি পরিহার করার জন্যে জটিলতর পথের অšে^ষী হননি| ‘ব্রজাঙ্গনা কাব্যে’ কেবলমাত্র একটি গীতি-প্রবণ কবিসত্তার সাক্ষাৎই ঘটে না, সৌন্দর্য-পিপাসু ব্যক্তি-হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষার পরিচয়ও মেলে| সৌন্দর্য-বর্ণনার কুশলতার মধ্যেই এই ব্যক্তি-সত্তার পরিচয় দীপ্ত| রবীন্দ্রনাথে এসে এই সৌন্দর্য-পিপাসাই প্রকৃতিকে আশ্রয় করে আরো সূক্ষ্ম ও সংহত রূপ নিয়েছে|
মধুসূদন ‘রামায়ণ’ কাহিনীর প্রচলিত ধারা অনুসরণ করেননি, ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র পরিকল্পনায় যেমন তিনি নিজের প্রেরণা ও ইচ্ছাশক্তিকেই প্রশ্রয় দিয়েছেন, তেমনি কাব্যের চরিত্রাঙ্কনেও নতুনত্বের পরিচয় স্পষ্ট করেছেন| এ কারণেই সামগ্রিকভাবে ‘মেঘনাদবধ’র বিস্তারের মধ্যে নানা স্বর্গে বৈচিত্র্য অনুধাবন করা যায়| এ কথা অবশ্যই স্বীকার্য যে, মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ যে বর্ণনা ও উপমাবাহুল্য রয়েছে, অনেকক্ষেত্রেই তা মূল বক্তব্য ও ঘটনাসংস্থানকে ভারাক্রান্ত করেছে এবং এ কারণে কাব্যপাঠে ক্লান্তির অনুভূতি মনকে প্রায়শঃই পীড়িত করে| কিন্তু এ সত্ত্বেও মধুসূদনের কাব্যে সংস্কৃত শব্দের সার্থক প্রয়োগ এবং প্রচলিত উপমা-উৎপ্রেক্ষার নিগড় ভাঙবার একটা বলিষ্ঠ প্রচেষ্টাই এ কাব্যকে ‘কৃত্তিবাসী রামায়ণের’ পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেয়নি; ‘রামায়ণ কাহিনী’-র কাব্যসমুন্নতির এক উচ্চশিখরে পৌছে গেছে|
কৃত্তিবাসী রামায়ণে ঘটনার বিবৃতি আছে, সহজ-সারল্যের প্রকাশ মহিমারও কমতি নেই; কিন্তু অভাব রয়েছে কাব্যসৌন্দর্য ও বলিষ্ঠ প্রকাশভঙ্গীর| নিছক বর্ণনা-কুশলতা মহাকাব্যের প্রাণকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে না, যদিও সৌন্দর্যবিলাসী পাঠকের মনকে পরিতৃপ্তি দেয়| মধুসূদন তাঁর কাব্যে প্রচুর উপমা সৃষ্টি করেছেন, স্থানে স্থানে তা বাহুল্য বলেও মনে হয়, কিন্তু এ-সত্ত্বেও তাঁর উদ্ভাবনীশক্তির ফলে কোনো ক্ষেত্রেই তা পুনরাবৃত্তি বলে মনে হয় না, যদিও অতিরেক দোষের সন্ধান সুদুর্লভ নয়| কাব্যের সর্বত্র মধুসূদনের ব্যক্তিত্বটি মাথা উঁচিয়ে আছে এবং এ কারণেই প্রাচীন ঐতিহ্যের উপাদানকে আত্মসাৎ করে মধুসূদন যে নতুন কাব্য-রীতির নির্মাণ করেছেন তা এত বেশি স্বকীয় উজ্জ্বলতায় ভাস্বর হতে পেরেছে| নতুন নতুন চিত্রকল্প রচনা, উপমা-সৃষ্টি এবং যমক ও অন্ত্যানুপ্রাসের প্রয়োগে মধুসূদন ভারতচন্দ্রের দ্বারস্থ হয়েছেন, কিন্তু সর্বত্রই মধুসূদনের শাণিত ব্যক্তিত্বের সুপ্রকাশ ঘটেছে| মার্জিত রুচির সমন্বয় ঘটলে পুরানো রীতির নব ব্যবহারও যে নতুন অর্থে-ব্যঞ্জনা লাভ করতে পারে এবং শব্দচয়নের দক্ষতা কাব্যকে সমুন্নত করে তোলে তার প্রকৃষ্ট পরিচয়ও মধুসূদনের কাব্য|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত কাব্য-ভাষাকে সংস্কৃত-সন্নিকটবর্তী করার পক্ষপাতী ছিলেন এবং প্রয়োগক্ষেত্রে তিনি তার নজিরও প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন| মধুসূদন-প্রবর্তিত সংস্কৃতের এই ক্ষীণধারা আধুনিককালে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এবং বিষ্ণু দে’র কবিতায় মাঝে মাঝে উচ্ছলিত হতে চেয়েছে| অথচ আশ্চর্যের বিষয় এই যে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত মধুসূদনের প্রচেষ্টাকে লক্ষ্য করে এও বলতে দ্বিধা করেন নি যে, তিনি বাংলা ভাষাকে ভালবাসতেন বটে, কিন্তু তার প্রকৃতি বুঝতেন না; তাই তিনি বঙ্গভারতীর সেবকমাত্র, তার ত্রাণকর্তা নন| বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘সাহিত্যচর্চা’ গ্রন্থে মাইকেলের আলোচনা-প্রসঙ্গে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের এই উক্তিকে ‘বিচক্ষণ’ মন্তব্য বলে মত প্রকাশ করেছেন|
বস্তুতঃ রবীন্দ্রনাথই হচ্ছেন ‘বঙ্গভারতী’র ত্রাণকর্তা এবং সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায় ‘বাংলা সাহিত্যের সিদ্ধিদাতা গণেশ|’ রবীন্দ্রনাথের হাতে এসেই যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য তার বিশেষ মর্যাদার আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ নেই| রবীন্দ্রনাথের সাধনায় বাংলা কাব্যের রূপরূপান্তরই শুধু ঘটেনি, বাংলা ভাষাও কৃত্রিমতার খোলস ছেড়ে অনেকখানি স্বাভাবিকতার সহজ পথ অবলম্বন করেছে|

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুন ২০২৬
সংস্কৃতি মানুষের চিন্তাধারা, আচার-আচরণ ও বিশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন| এই প্রতিফলন ঐতিহ্য ও যুগচেতনার উৎস-উ™ূ¢ত| এ-কারণেই সংস্কৃতির স্বরূপ অন্বেষণ করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই ঐতিহ্যের ধারা ও যুগচেতনার বিকাশের রূপরেখা অন্বেষণ করতে হয়| কারণ, সংস্কৃতি শুধু ব্যক্তির নিজস্ব চিন্তাধারা, আচার-আচরণ ও বিশ্বাসেরই প্রতিফলন নয়, সংস্কৃতি দেশীয় এবং জাতীয় মনেরও অভিব্যক্তি|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত ছিলেন উনিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি ও নাট্যকার| হিন্দু কলেজে পড়াশোনা করার সময় মধুসূদন প্রথম কাব্যচর্চা শুরু করেন| তাঁকে বাংলার নবজাগরণ সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব মনে করা হয়| ঐতিহ্যের অনুবর্তন অগ্রাহ্য করে তিনি কাব্যে নতুন রীতি প্রবর্তন করেন| বাংলা ভাষায় তিনিই অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও চতুর্দশপদী বা সনেটের প্রবর্তক|
ইউরোপীয় শিক্ষা ও ভাবধারায় ছিলেন মধুসূদন উজ্জীবিত, ইউরোপীয় কাব্য-সম্পদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও আকর্ষণ ছিল দুর্নিবার| যে রকম মানস-প্রবণতা ও মানসিক পরিপক্বতা নিয়ে মধুসূদন জন্মেছিলেন তাতে করে তাঁর পক্ষে ইউরোপীয় বিষয়-বস্তু ও উপাদান নিয়ে একটি মহাকাব্যে সংরচন এমন কোনো কঠিন ব্যাপার ছিল না; বিদেশি ভাষায় কাব্যসৃষ্টির ক্ষেত্রে তিনি কিছুটা ব্যর্থ কসরতও করেছিলেন; কিন্তু মধুসূদনের ঐতিহ্য এবং ইতিহাস-প্রবণতা— যা তাঁর ধমনীতে প্রবাহিত ও স্পন্দিত ছিল, অচিরেই তাঁকে এমন উপলব্ধিতে সজাগ করে তুলল যে, জাতীয় ও দেশীয় সংস্কৃতির ধারাকে আশ্রয় করে না নিলে মন ও প্রাণের মুক্তি সম্ভব নয়| কবিমনের স্বাভাবিক প্রবণতাও এই সত্যের প্রতিই অঙ্গুলি নির্দেশে করে| এমন ধারা আত্মস্থতা ফিরে পাওয়ার ফলেই মধুসূদনের পক্ষে আধুনিক বাংলা কাব্যের উৎসারণের পথ প্রশস্ত করা সম্ভব হয়েছে| অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায়— “দেশের ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা না করে কোনো দেশের কবি মহাকবির আখ্যা লাভ করেনি| এমন যে অত্যুগ্র মধুসূদন তাঁকেও শেষ পর্যন্ত হোমার, ভার্জিল, দান্তে, মিল্টনকে ছেড়ে বাল্মীকির শরণাপন্ন হতে হয়েছে|”
সাহিত্যের বিবর্তন প্রধানত ভাষা-নির্ভর, কারণ ভাষার প্রকাশ ক্ষমতাকে বাহন করেই নতুন সাহিত্যরীতির মুক্তি ঘটে এবং এ কারণেই সাহিত্যের ইতিহাসে যে যুগবদলের চিহ্ন স্পষ্টরূপ লাভ করে তাতে ভাষা পরিবর্তনের লক্ষণটি সুপ্রকট হয়ে ওঠে| চর্যাপদের ভাষা থেকে শুরু করে আধুনিক কবিতার ভাষার ধারাবাহিক পর্যালোচনায় এ-সত্যটি স্পষ্ট চেহারায় উদ্ভাসিত হয়| চর্যার ‘সান্ধ্যভাষা’কে আশ্রয় করে সিদ্ধাচার্যদের জটিল মনোভাব ও কবি-কল্পনা বিকাশ লাভ করেছিল, এক্ষেত্রেও ভাবের জটিলতা ও বক্তব্য প্রকাশের অপেক্ষাকৃত অসারল্য ভাষার রূপরীতিকে পরিবর্তিত করেছে; কারণ কাব্যস্রষ্টা ভাষার রীতি মেনে চলেন বটে, কিন্তু ভাষার নির্দেশকে সর্বগ্রাহ্য মনে করেন না, এ কারণেই স্রষ্টার প্রকাশের বাহনরূপেই ভাষার অস্তিত্ব ও প্রসার|
শক্তিমান কাব্যস্রষ্টা তাঁর ভাব প্রকাশের সময়ে নিজস্ব মনোভঙ্গীর আলোকে ভাষাকে নতুন পথে পরিচালিত করেন এবং তখনই মাত্র পুরাতন ভাষা নতুন অবয়ব লাভ করে এবং নতুন ভাবধারার বাহন হয়| ফলে ভাষার মুক্তি ঘটে| বাংলা কাব্যধারায় চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্য ও মধ্যযুগের পুঁথি-সাহিত্য থেকে শুরু করে অতি আধুনিক কবিতার ভাষাভঙ্গীতেও এই মুক্তির ইতিহাসই স্পষ্ট হয়ে আছে, যদিও রবীন্দ্রনাথের ভাষায়: “সাহিত্যের প্রাকধারা বয় ভাষার নাড়ীতে, তাকে নাড়া দিলে মূল রচনার হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়| এ-রকম সাহিত্যে বিষয়বস্তুটা নিশ্চেষ্ট হয়ে পড়ে, যদি, তার সজীবতা না থাকে|
বাংলা কাব্যে মধুসূদন যে আধুনিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করলেন তাতে কবিতার ভাষারই যে পরিবর্তন সূচিত হলো তাই নয়, সাহিত্যের প্রাণেও নতুন স্পন্দনের সূচনা হলো| মধুসূদন পাশ্চাত্যের শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন, এবং এ শিক্ষা তাঁর শিল্পীসত্তায় এক বৈপ্লবিক চেতনার সঞ্চার করেছিল| এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মধুসূদন বাংলা কাব্যে শুধু নতুন ভাষারীতিরই প্রবর্তন করেননি, মৌলিক চিন্তারীতিকেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন| এই চিন্তায় বাঙালি হিন্দুর জাতীয় মানসকে পাশ্চাত্যের কাব্যরীতির অগ্রসর শাখার খাতে প্রবাহিত করার উদ্যমই লক্ষ্য করা গিয়েছে|
ভাব ও ভাষার দিক দিয়ে মধুসূদন পূর্ববর্তী কাব্যধারাকে অতিক্রম করে নতুন পথের অšে^ষী হয়েছিলেন, প্রকাশের বৈশিষ্ট্য তাঁর সেই অন্বেষাকে সাফল্যও দিয়েছে; কিন্তু এ সত্ত্বেও মধুসূদন বিষয়বস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাংলা কাব্যের প্রতিষ্ঠিত ধারা ও সুপ্রাচীন ঐতিহ্যকে অস্বকার করেননি| সুধীন্দ্রনাথ দত্ত টি. এস. এলিয়টের বরাত দিয়ে বলেন, “ব্যক্তিগত মনীষায় জাতীয় মানস ফুটিয়ে তোলাই কবিজীবনের পরম সার্থকতা| কিন্তু আপন কালের স্বধর্ম তুললেই, সে-সমন্বয় সহজ হয় না, উক্ত সঙ্গমের দিকে এগোতে চাইলে নিজের অভিজ্ঞতাকে, তথা জাতিগত চৈতন্যকে, প্রতীকরূপে দেখা দরকার” [‘অর্কেস্ট্রা’ কাব্যগ্রন্থের ভূমিকা|
ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যের আলোকে মধুসূদন ‘ব্যক্তিগত মনীষায় জাতীয় মানস ফুটিয়ে তোলাই কাম্য’ মনে করেছিলেন এবং এ কারণেই আপন কালের স্বধর্ম ভুললেই সে সমন্বয় সহজ হয় না— এই প্রখর চেতনায় জাগ্রত ছিলেন| মধুসূদন পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষায় আকৃষ্ট হয়ে স্বধর্মচ্যুত হয়েছিলেন, এর পেছনে যে প্রাচীন ধর্মের বন্ধন থেকে নাড়িছেঁড়া মুক্তির আকর্ষণই প্রবল ছিল তা-ই নয়, ব্যক্তিগত মনীষার বিকাশের শ্রেষ্ঠতম পথ অবলম্বনের একটি ক্ষীণ ইচ্ছাও তাঁর চেতনায় লুকিয়েছিল| ব্যক্তি-স্বাতন্ত্রের প্রখর তাড়নায় তিনি পাশ্চাত্যের শিক্ষারীতি ও জীবন-ধর্মের প্রতি প্রলুব্ধ হয়েছিলেন, এ-প্রলোভন তাঁর ব্যক্তিগত-জীবনে দুঃখের পশরা বয়ে এনেছিল বটে, কিন্তু বাংলা কাব্যের বিবর্তনে এর অবদান বিশিষ্টরূপেই চিহ্নিত|
পাশ্চাত্য শিক্ষার ফলে মধুসূদনের কাব্যরুচি তীক্ষ্ণ ও মার্জিত হয়েছিল, এবং এই মার্জিত রুচির অনুপ্রেরণায় তিনি প্রচলিত কাব্য-ধারার গতি বদলে ব্রতী হয়েছিলেন; কিন্তু লক্ষ্য করার বিষয় এই যে, মধুসূদন নতুন কাব্যরীতির প্রবর্তনের ক্ষেত্রেও বাংলা কাব্যের স্বধর্মের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করেননি| বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন ও ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-র সৃষ্টি মধুসূদনের ˆবপ্লবিক কাব্যকৃতির নিদর্শন; এই নতুন ছন্দরীতির প্রবর্তনায় মধুসূদন পাশ্চাত্যের কাব্যধারার দ্বারস্থ হয়েছেন, কিন্তু এ-সত্ত্বেও তিনি বাংলা কাব্যের ঐতিহ্য বিস্মৃত হননি, প্রচলিত পয়ারের একঘেঁয়েমির বেড়া ভেঙেই এই ˆবপ্লবিক ধারার সূচনা করেছেন| সাধারণ পয়ারের পুনরাবৃত্তির প্রতি মধুসূদন বীতশ্রদ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু বাংলা-কাব্যের গীতিপ্রবণতার প্রতি তাঁর অশ্রদ্ধা ছিল না| তাঁর নিজের কাব্যকৃতিতেও এই গীতিভঙ্গীর সুস্পষ্ট স্বাক্ষর রয়েছে|
বিহারীলালের আবির্ভাবের আগেই মধুসূদন বাংলা কাব্যে মহাকাব্যের সূচনা করেছিলেন| এই ধারায় প্রত্যয়ী হয়ে এগিয়ে এলেন হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন ও কায়কোবাদ প্রমুখ| মহাকাব্য রচনায় এ-তিনের শক্তি মধুসূদনের তুলনীয় সমুন্নতি লাভ করেনি, এবং এর কারণও নানাবিধ| বাংলা কাব্যে মহাকাব্যধারার সীমাবদ্ধতার পর্যালোচনায় তা লক্ষণীয়| বিহারীলালে এসে বাংলা গীতিকাব্য এক নতুন মোড় নিল, নতুন এই জন্যে যে গীতিকবিতার সুস্পষ্ট লক্ষণ মধুসূদন, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র ও কায়কোবাদে বিধৃত হয়ে থাকলেও বিহারীলালের কাব্যে যে সে-লক্ষণ কিছুটা স্বাতন্ত্র্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছে-কাব্যের উৎকর্ষ বিচারের অপেক্ষা না রেখেও এ মন্তব্য করা চলে| মধুসূদনের ‘ব্রজাঙ্গনা কাব্যে’ গীতিধর্মিতার যে লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে তাতে প্রাচীন ঐতিহ্যের যত বেশি ছাপ আছে, মনোধর্মিতার তত প্রকাশ নেই| বিহারীলাল হৃদয়ের আকুলতাকে প্রকাশ করার জন্যে প্রকৃতি-আশ্রয়ী হয়েছেন; এবং এতে করে তাঁর একটি রোমান্টিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে| কিন্তু এ-সত্ত্বেও ˆবষ্ণব গীতি কবিতায় যে সূক্ষ্ম ও তীক্ষ্ণ বেদনাবোধ উৎসারিত হয়েছে, বিহারীলালে তার সুপ্রকাশ ঘটেনি| বিহারীলাল পারিপার্শ্বিক দৃশ্যময় জগতকে কাব্যের উপজীব্য করেছেন, দূরলোকের সৌন্দর্যেও মোহিত হয়েছেন, কিন্তু তাঁর কাব্যে সে-মুগ্ধদৃষ্টির সৌন্দর্যরূপ প্রকাশিত হয়নি| বেদনা প্রকাশের ক্ষেত্রে বিহারীলালে যতটা তীক্ষ্ণতা না আছে, তার চেয়ে আছে আবেগের সরল উৎসারণ| ভাষার যে লিপিকুশলতা অপ্রকাশ সৌন্দর্য ও বেদনাকে ইশারায় ব্যক্ত করে, বিহারীলালে তার নির্দশন খুবই কম, বরং প্রকাশের বেদনায় ভাবানুভূতি এত বেশি আলোড়িত হয়েছে যে তা সুসংহতির অপেক্ষা না রেখেই আত্মপ্রকাশ করেছে| জনৈক সমালোচকের ভাষায় বলা চলে— “সারদা-মঙ্গলে” বিহারীলাল বিশ্বব্যাপিনী সৌন্দর্যলক্ষ্মীর উপাসনা করেছেন, ‘নিসর্গ-সন্দর্শন’ নামক কাব্যে প্রকৃতি চিত্র এঁকেছেন, ‘সাধের আসনে’ স্থলে স্থলে আপন রোমান্টিক আকাংখার সংবাদ দিয়েছেন, কিন্তু তাঁর কাব্যলোকে সেই অনাস্বাদিত-পূর্ব দীপ্তির স্পর্শ লাগেনি, যা— ঘবাবৎ ধিং ড়হ ষধহফ ড়ৎ ংবধ| যেখানে তিনি রোমান্টিক আকাঙ্ক্ষার কথা লিখেছেন, সেখানে তাঁর রচনা সংবাদের মতোই সাধারণ এবং বিস্মরণ-যোগ্য|
চর্যাগীতি কিংবা তারও আগে থেকে যে ধারা প্রবাহিত ছিল, মধুসূদনে এসে তা-ই নতুন রূপ ও অর্থ পরিগ্রহ করেছে ‘ব্রজাঙ্গন কাব্য’ এই পরিচয়েই উজ্জ্বল| ব্রজাঙ্গনা কাব্যের প্রথম সর্গে ‘বিরহ-পর্যায়ে যে-সব গীতি কবিতা রয়েছে তাতে মধুসূদনের ব্যক্তিসত্তার যে হাহাকার ধ্বণিত হয়েছে তার সাথে ˆবষ্ণব গীতি-কবিতার সমধর্মিতার অনুসন্ধান কষ্টকর নয়| ভাবের দিক থেকে গীতি-প্রবণতা এ-কাব্যের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে| সূক্ষ্ম অনুভূতির সহজ সরল প্রকাশ-মাধুর্যে অনুপম সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে| মধুসূদন-রচিত মহাকাব্যে ভাষায় যে দুরূহতা ও ভাবপরিচর্যার দুর্জেয় জটিলতা রয়েছে, ‘ব্রজাঙ্গনা কাব্যে’ তার কোন লক্ষণই নেই, বরং এ-ক্ষেত্রে মধুসূদন স্বাভাবিক কবিসত্তার বিকাশকেই স্বীকার করে নিয়েছেন, পুরানো রীতির একঘেয়েমি পরিহার করার জন্যে জটিলতর পথের অšে^ষী হননি| ‘ব্রজাঙ্গনা কাব্যে’ কেবলমাত্র একটি গীতি-প্রবণ কবিসত্তার সাক্ষাৎই ঘটে না, সৌন্দর্য-পিপাসু ব্যক্তি-হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষার পরিচয়ও মেলে| সৌন্দর্য-বর্ণনার কুশলতার মধ্যেই এই ব্যক্তি-সত্তার পরিচয় দীপ্ত| রবীন্দ্রনাথে এসে এই সৌন্দর্য-পিপাসাই প্রকৃতিকে আশ্রয় করে আরো সূক্ষ্ম ও সংহত রূপ নিয়েছে|
মধুসূদন ‘রামায়ণ’ কাহিনীর প্রচলিত ধারা অনুসরণ করেননি, ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র পরিকল্পনায় যেমন তিনি নিজের প্রেরণা ও ইচ্ছাশক্তিকেই প্রশ্রয় দিয়েছেন, তেমনি কাব্যের চরিত্রাঙ্কনেও নতুনত্বের পরিচয় স্পষ্ট করেছেন| এ কারণেই সামগ্রিকভাবে ‘মেঘনাদবধ’র বিস্তারের মধ্যে নানা স্বর্গে বৈচিত্র্য অনুধাবন করা যায়| এ কথা অবশ্যই স্বীকার্য যে, মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ যে বর্ণনা ও উপমাবাহুল্য রয়েছে, অনেকক্ষেত্রেই তা মূল বক্তব্য ও ঘটনাসংস্থানকে ভারাক্রান্ত করেছে এবং এ কারণে কাব্যপাঠে ক্লান্তির অনুভূতি মনকে প্রায়শঃই পীড়িত করে| কিন্তু এ সত্ত্বেও মধুসূদনের কাব্যে সংস্কৃত শব্দের সার্থক প্রয়োগ এবং প্রচলিত উপমা-উৎপ্রেক্ষার নিগড় ভাঙবার একটা বলিষ্ঠ প্রচেষ্টাই এ কাব্যকে ‘কৃত্তিবাসী রামায়ণের’ পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেয়নি; ‘রামায়ণ কাহিনী’-র কাব্যসমুন্নতির এক উচ্চশিখরে পৌছে গেছে|
কৃত্তিবাসী রামায়ণে ঘটনার বিবৃতি আছে, সহজ-সারল্যের প্রকাশ মহিমারও কমতি নেই; কিন্তু অভাব রয়েছে কাব্যসৌন্দর্য ও বলিষ্ঠ প্রকাশভঙ্গীর| নিছক বর্ণনা-কুশলতা মহাকাব্যের প্রাণকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে না, যদিও সৌন্দর্যবিলাসী পাঠকের মনকে পরিতৃপ্তি দেয়| মধুসূদন তাঁর কাব্যে প্রচুর উপমা সৃষ্টি করেছেন, স্থানে স্থানে তা বাহুল্য বলেও মনে হয়, কিন্তু এ-সত্ত্বেও তাঁর উদ্ভাবনীশক্তির ফলে কোনো ক্ষেত্রেই তা পুনরাবৃত্তি বলে মনে হয় না, যদিও অতিরেক দোষের সন্ধান সুদুর্লভ নয়| কাব্যের সর্বত্র মধুসূদনের ব্যক্তিত্বটি মাথা উঁচিয়ে আছে এবং এ কারণেই প্রাচীন ঐতিহ্যের উপাদানকে আত্মসাৎ করে মধুসূদন যে নতুন কাব্য-রীতির নির্মাণ করেছেন তা এত বেশি স্বকীয় উজ্জ্বলতায় ভাস্বর হতে পেরেছে| নতুন নতুন চিত্রকল্প রচনা, উপমা-সৃষ্টি এবং যমক ও অন্ত্যানুপ্রাসের প্রয়োগে মধুসূদন ভারতচন্দ্রের দ্বারস্থ হয়েছেন, কিন্তু সর্বত্রই মধুসূদনের শাণিত ব্যক্তিত্বের সুপ্রকাশ ঘটেছে| মার্জিত রুচির সমন্বয় ঘটলে পুরানো রীতির নব ব্যবহারও যে নতুন অর্থে-ব্যঞ্জনা লাভ করতে পারে এবং শব্দচয়নের দক্ষতা কাব্যকে সমুন্নত করে তোলে তার প্রকৃষ্ট পরিচয়ও মধুসূদনের কাব্য|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত কাব্য-ভাষাকে সংস্কৃত-সন্নিকটবর্তী করার পক্ষপাতী ছিলেন এবং প্রয়োগক্ষেত্রে তিনি তার নজিরও প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন| মধুসূদন-প্রবর্তিত সংস্কৃতের এই ক্ষীণধারা আধুনিককালে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এবং বিষ্ণু দে’র কবিতায় মাঝে মাঝে উচ্ছলিত হতে চেয়েছে| অথচ আশ্চর্যের বিষয় এই যে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত মধুসূদনের প্রচেষ্টাকে লক্ষ্য করে এও বলতে দ্বিধা করেন নি যে, তিনি বাংলা ভাষাকে ভালবাসতেন বটে, কিন্তু তার প্রকৃতি বুঝতেন না; তাই তিনি বঙ্গভারতীর সেবকমাত্র, তার ত্রাণকর্তা নন| বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘সাহিত্যচর্চা’ গ্রন্থে মাইকেলের আলোচনা-প্রসঙ্গে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের এই উক্তিকে ‘বিচক্ষণ’ মন্তব্য বলে মত প্রকাশ করেছেন|
বস্তুতঃ রবীন্দ্রনাথই হচ্ছেন ‘বঙ্গভারতী’র ত্রাণকর্তা এবং সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায় ‘বাংলা সাহিত্যের সিদ্ধিদাতা গণেশ|’ রবীন্দ্রনাথের হাতে এসেই যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য তার বিশেষ মর্যাদার আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ নেই| রবীন্দ্রনাথের সাধনায় বাংলা কাব্যের রূপরূপান্তরই শুধু ঘটেনি, বাংলা ভাষাও কৃত্রিমতার খোলস ছেড়ে অনেকখানি স্বাভাবিকতার সহজ পথ অবলম্বন করেছে|

আপনার মতামত লিখুন