পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি গলি আর মোগল স্থাপত্যের এক অনন্য মেলবন্ধন হলো হোসেনী দালান ইমামবারা। সাদা রঙের জাঁকজমকপূর্ণ এই ইমারতটি কেবল শিয়া সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় কেন্দ্র নয়, এটি ঢাকার সাড়ে চারশ বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মিশ্র সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। প্রতি বছর মহররমের শোহাদা-এ-কারবালার স্মরণে এই হোসেনী দালানকে কেন্দ্র করেই গমগম করে ওঠে পুরো ঢাকা শহর।
কখন, কীভাবে
হোসেনী দালানের নির্মাণকাল এবং এর পেছনের ইতিহাস মোগল সুবেদারির স্বর্ণযুগকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি মোগল সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে, ১৬৪২ সালে (হিজরি ১০৫২) নির্মিত হয়। মোগল রাজপুত্র ও বাংলার তৎকালীন সুবেদার শাহ সুজার প্রধান ইমারত পরিদর্শক (মীর-ই-বহর) সৈয়দ মীর মুরাদ এটি নির্মাণ করেন।
জনশ্রুতি আছে, মীর মুরাদ এক রাতে স্বপ্নে দেখেন হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) তাকে কারবালার শহীদদের স্মরণে একটি ‘তাযিয়াখানা’ বা শোকের স্থান নির্মাণের নির্দেশ দিচ্ছেন। এই স্বপ্ন দেখার পরদিনই তিনি এই ঐতিহাসিক ইমারতটি নির্মাণের কাজ শুরু করেন।
হোসেনী দালান কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি ঢাকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরাকীর্তি, যার নির্মাণশৈলীতে রয়েছে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধন। একটি বিশাল জলাশয় বা দীঘির উত্তর পাড়ে উঁচু বেদির ওপর এই মূল ভবনটি অবস্থিত। ভবনের দক্ষিণে রয়েছে একটি সুন্দর বাগান।
আদি ভবনটি খাঁটি মোগল রীতিতে তৈরি হলেও, পরবর্তীতে বিভিন্ন সংস্কারের ফলে এতে ব্রিটিশ ও ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে এর সামনের চারকোনা ও বৃত্তাকার স্তম্ভগুলো পশ্চিমা রীতির। ইমামবাড়ার ভেতরে দুটি বড় হলরুম বা হল রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো ‘শিরনি হল’ (যেখানে তবারক বিতরণ বা ধর্মীয় আচার হয়) এবং অন্যটি ‘খুতবা হল’। ভবনের ওপরে রয়েছে আকর্ষণীয় গম্বুজ এবং ছাদের চারকোণায় ছোট ছোট মিনার।
শত বছর ধরে হোসেনী দালান ঢাকা তথা বাংলার সমাজ ও রাজনীতিতে গভীর প্রভাব বিস্তার করে এসেছে। মোগল আমল থেকে শুরু করে ঢাকার নায়েব-নাজিম এবং পরবর্তীকালে ঢাকার নবাবরা (খাজা পরিবার) হোসেনী দালানের দেখভাল ও মহররমের অনুষ্ঠানের জন্য বিপুল অর্থ ও সম্পত্তি দান করতেন।
হোসেনী দালানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সামাজিক সম্প্রীতি। ঢাকায় শিয়া মুসলিমের সংখ্যা মুষ্টিমেয় হলেও, মহররমে সুন্নি মুসলিম এবং পুরান ঢাকার সনাতন (হিন্দু) ধর্মাবলম্বীরাও এই প্রাঙ্গণে সমবেত হতেন। হিন্দু দেওয়ানরা এই ইমামবাড়ার হিসাব-নিকাশ রাখতেন এবং সাধারণ মানুষ মানত নিয়ে আসতেন, যা এক অনন্য অসাম্প্রদায়িক সমাজ ব্যবস্থার প্রতীক।ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিহোসেনী দালানকে কেন্দ্র করে ঢাকায় একটি সম্পূর্ণ নতুন সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে, যা আজ পুরান ঢাকার অন্যতম ঐতিহ্য।
ইমামবাড়ার ভেতরে কারবালার যুদ্ধের প্রতীকী লাল ও সবুজ নিশান (পতাকা) এবং ইমাম হুসাইন (রা.)-এর প্রিয় ঘোড়া ‘দুলদুল’-এর প্রতিকৃতি রাখা থাকে, যা আশুরার দিনে বের করা হয়। মহররমের ১ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত হোসেনী দালানের ভেতরে উর্দু, ফারসি ও বাংলায় অত্যন্ত করুণ সুরে কারবালার শোকগাথা বা মার্সিয়া গাওয়া হয়, যা ঢাকার সংগীত ও লোকসংস্কৃতির একটি বড় অংশ।
আশুরার দিন হোসেনী দালানে তৈরি বিশেষ খিচুড়ি, যাকে স্থানীয়রা ‘তবারক’ বলেন, তা ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার মাঝে বিতরণ করা হয়। এর সঙ্গে জাফরানি শরবত বিতরণের ঐতিহ্যও বেশ পুরনো।
সময়ের চাকা ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে হোসেনী দালানের রূপ ও কাঠামোতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। ১৮৯৭ সালে ঢাকার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে হোসেনী দালানের মূল ভবনটি প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। পরবর্তীতে ঢাকার নবাব আহসানউল্লাহ তৎকালীন এক লাখ টাকা (যা সেই সময়ে বিশাল অংকের অর্থ ছিল) ব্যয় করে ভবনটি বর্তমান আধুনিক রূপে পুনর্নির্মাণ করেন।
বিবর্তনের ধারায় হোসেনী দালানের মূল আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এর ভেতরে থাকা বিশাল ও ঐতিহ্যবাহী ‘রুপার তাজিয়া’। এটি অত্যন্ত নিখুঁত কারুকাজে মোড়ানো রূপালী রঙের একটি স্থাপত্যিক মডেল, যা মহররমের মূল মিছিলে প্রদর্শন করা হয়।কালের নিয়মে এর চারপাশের মোগল ফাঁকা চত্বর কিছুটা সংকুচিত হলেও ২০১১ সালের দিকে ইরানি স্থপতি ও সরকারের যৌথ উদ্যোগে এর ভেতরের টাইলস, ক্যালিগ্রাফি ও ফোয়ারাগুলো সংস্কার করে পারস্য ও মোগল রূপ ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বর্তমান যুগে নিরাপত্তার কড়াকড়ি থাকলেও, প্রতি বছর মহররমের ১০ তারিখে এই হোসেনী দালান থেকেই আজিমপুর অভিমুখে বের হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল।

শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬
পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি গলি আর মোগল স্থাপত্যের এক অনন্য মেলবন্ধন হলো হোসেনী দালান ইমামবারা। সাদা রঙের জাঁকজমকপূর্ণ এই ইমারতটি কেবল শিয়া সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় কেন্দ্র নয়, এটি ঢাকার সাড়ে চারশ বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মিশ্র সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। প্রতি বছর মহররমের শোহাদা-এ-কারবালার স্মরণে এই হোসেনী দালানকে কেন্দ্র করেই গমগম করে ওঠে পুরো ঢাকা শহর।
কখন, কীভাবে
হোসেনী দালানের নির্মাণকাল এবং এর পেছনের ইতিহাস মোগল সুবেদারির স্বর্ণযুগকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি মোগল সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে, ১৬৪২ সালে (হিজরি ১০৫২) নির্মিত হয়। মোগল রাজপুত্র ও বাংলার তৎকালীন সুবেদার শাহ সুজার প্রধান ইমারত পরিদর্শক (মীর-ই-বহর) সৈয়দ মীর মুরাদ এটি নির্মাণ করেন।
জনশ্রুতি আছে, মীর মুরাদ এক রাতে স্বপ্নে দেখেন হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) তাকে কারবালার শহীদদের স্মরণে একটি ‘তাযিয়াখানা’ বা শোকের স্থান নির্মাণের নির্দেশ দিচ্ছেন। এই স্বপ্ন দেখার পরদিনই তিনি এই ঐতিহাসিক ইমারতটি নির্মাণের কাজ শুরু করেন।
হোসেনী দালান কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি ঢাকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরাকীর্তি, যার নির্মাণশৈলীতে রয়েছে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধন। একটি বিশাল জলাশয় বা দীঘির উত্তর পাড়ে উঁচু বেদির ওপর এই মূল ভবনটি অবস্থিত। ভবনের দক্ষিণে রয়েছে একটি সুন্দর বাগান।
আদি ভবনটি খাঁটি মোগল রীতিতে তৈরি হলেও, পরবর্তীতে বিভিন্ন সংস্কারের ফলে এতে ব্রিটিশ ও ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে এর সামনের চারকোনা ও বৃত্তাকার স্তম্ভগুলো পশ্চিমা রীতির। ইমামবাড়ার ভেতরে দুটি বড় হলরুম বা হল রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো ‘শিরনি হল’ (যেখানে তবারক বিতরণ বা ধর্মীয় আচার হয়) এবং অন্যটি ‘খুতবা হল’। ভবনের ওপরে রয়েছে আকর্ষণীয় গম্বুজ এবং ছাদের চারকোণায় ছোট ছোট মিনার।
শত বছর ধরে হোসেনী দালান ঢাকা তথা বাংলার সমাজ ও রাজনীতিতে গভীর প্রভাব বিস্তার করে এসেছে। মোগল আমল থেকে শুরু করে ঢাকার নায়েব-নাজিম এবং পরবর্তীকালে ঢাকার নবাবরা (খাজা পরিবার) হোসেনী দালানের দেখভাল ও মহররমের অনুষ্ঠানের জন্য বিপুল অর্থ ও সম্পত্তি দান করতেন।
হোসেনী দালানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সামাজিক সম্প্রীতি। ঢাকায় শিয়া মুসলিমের সংখ্যা মুষ্টিমেয় হলেও, মহররমে সুন্নি মুসলিম এবং পুরান ঢাকার সনাতন (হিন্দু) ধর্মাবলম্বীরাও এই প্রাঙ্গণে সমবেত হতেন। হিন্দু দেওয়ানরা এই ইমামবাড়ার হিসাব-নিকাশ রাখতেন এবং সাধারণ মানুষ মানত নিয়ে আসতেন, যা এক অনন্য অসাম্প্রদায়িক সমাজ ব্যবস্থার প্রতীক।ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিহোসেনী দালানকে কেন্দ্র করে ঢাকায় একটি সম্পূর্ণ নতুন সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে, যা আজ পুরান ঢাকার অন্যতম ঐতিহ্য।
ইমামবাড়ার ভেতরে কারবালার যুদ্ধের প্রতীকী লাল ও সবুজ নিশান (পতাকা) এবং ইমাম হুসাইন (রা.)-এর প্রিয় ঘোড়া ‘দুলদুল’-এর প্রতিকৃতি রাখা থাকে, যা আশুরার দিনে বের করা হয়। মহররমের ১ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত হোসেনী দালানের ভেতরে উর্দু, ফারসি ও বাংলায় অত্যন্ত করুণ সুরে কারবালার শোকগাথা বা মার্সিয়া গাওয়া হয়, যা ঢাকার সংগীত ও লোকসংস্কৃতির একটি বড় অংশ।
আশুরার দিন হোসেনী দালানে তৈরি বিশেষ খিচুড়ি, যাকে স্থানীয়রা ‘তবারক’ বলেন, তা ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার মাঝে বিতরণ করা হয়। এর সঙ্গে জাফরানি শরবত বিতরণের ঐতিহ্যও বেশ পুরনো।
সময়ের চাকা ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে হোসেনী দালানের রূপ ও কাঠামোতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। ১৮৯৭ সালে ঢাকার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে হোসেনী দালানের মূল ভবনটি প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। পরবর্তীতে ঢাকার নবাব আহসানউল্লাহ তৎকালীন এক লাখ টাকা (যা সেই সময়ে বিশাল অংকের অর্থ ছিল) ব্যয় করে ভবনটি বর্তমান আধুনিক রূপে পুনর্নির্মাণ করেন।
বিবর্তনের ধারায় হোসেনী দালানের মূল আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এর ভেতরে থাকা বিশাল ও ঐতিহ্যবাহী ‘রুপার তাজিয়া’। এটি অত্যন্ত নিখুঁত কারুকাজে মোড়ানো রূপালী রঙের একটি স্থাপত্যিক মডেল, যা মহররমের মূল মিছিলে প্রদর্শন করা হয়।কালের নিয়মে এর চারপাশের মোগল ফাঁকা চত্বর কিছুটা সংকুচিত হলেও ২০১১ সালের দিকে ইরানি স্থপতি ও সরকারের যৌথ উদ্যোগে এর ভেতরের টাইলস, ক্যালিগ্রাফি ও ফোয়ারাগুলো সংস্কার করে পারস্য ও মোগল রূপ ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বর্তমান যুগে নিরাপত্তার কড়াকড়ি থাকলেও, প্রতি বছর মহররমের ১০ তারিখে এই হোসেনী দালান থেকেই আজিমপুর অভিমুখে বের হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল।

আপনার মতামত লিখুন