সংবাদ

‘তাজিয়া’ কী, কীভাবে এসেছে ঢাকায়


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম

‘তাজিয়া’ কী, কীভাবে এসেছে ঢাকায়
তাজিয়া।

‘তাজিয়া’ হলো কারবালার প্রান্তরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে শহীদ হওয়া মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন (রা.)-এর পবিত্র সমাধির একটি প্রতীকী বা কাল্পনিক প্রতিকৃতি। মূলত শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলমানরা মহররম মাসের প্রথম ১০ দিন কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনা স্মরণ ও শোক প্রকাশের অংশ হিসেবে কাঠ, বাঁশ, রঙিন কাগজ ও সোলা দিয়ে এই কাঠামোটি তৈরি করেন। পবিত্র আশুরার দিনে এটি নিয়ে শোক মিছিল বা তাজিয়া মিছিল বের করা হয়।

নামের উৎপত্তি

‘তাজিয়া’ শব্দটি আরবি ‘আজা’ ধাতু থেকে এসেছে। মূল অর্থ হলো শোক প্রকাশ করা, সমবেদনা জানানো বা সান্ত্বনা দেওয়া। কালক্রমে শিয়া ঐতিহ্যে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর সমাধিসৌধের (জারিহ) আদলে তৈরি কাঠামো এবং এর সঙ্গে জড়িত সামগ্রিক শোক অনুষ্ঠানকে ‘তাজিয়া’ নামে অভিহিত করা শুরু হয়।

তাজিয়ার ইতিহাস

তাজিয়া এবং তাজিয়া মিছিলের সূচনা ও ভারতীয় উপমহাদেশে এর বিস্তৃতির ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়।  ইতিহাসবিদদের মতে, মধ্য এশিয়ার শাসক আমির তৈমুর (তৈমুর লং) এই প্রথার সূচনা করেন। তিনি প্রতি বছর মহররমে কারবালায় ইমাম হুসাইনের মূল সমাধি জিয়ারত করতেন। কিন্তু ১৩৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ভারত অভিযানের সময় তিনি কারবালা যেতে না পেরে তীব্র অনুশোচনায় ভোগেন। তখন তার নির্দেশে শিল্পীরা কারবালার সমাধির একটি সোনা-রুপার প্রতিকৃতি তৈরি করেন, যা দেখে তিনি সান্ত্বনা পান। তৈমুরের পর তার বংশধর এবং অন্যান্য মুসলিম শাসকরা এই প্রথা ধরে রাখেন। পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য দামি ধাতুর পরিবর্তে বাঁশ, কাঠ ও কাগজ দিয়ে তাজিয়া বানানোর রেওয়াজ শুরু হয়।

ঢাকায় তাজিয়া

বাংলাদেশে ১৬৪২ সালে মীর মুরাদ নামক একজন শিয়া কর্মকর্তার হাত ধরে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী হোসেনী দালান ইমামবারা নির্মিত হয়। তখন থেকেই ঢাকায় রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে তাজিয়া মিছিলের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।

তাজিয়া কেবল একটি ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সমাজ ও শাসনব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে। উপমহাদেশে তাজিয়া তৈরি এবং তাজিয়া মিছিল কেবল শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বহু সুন্নি মুসলিম এবং অমুসলিম (বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ) এই মিছিলে মানত নিয়ে শরিক হতেন এবং তাজিয়া তৈরিতে সাহায্য করতেন। এটি একটি লোকজ উৎসবে পরিণত হয়।

মোগল আমল ও পরবর্তী সময়ে ঢাকার নবাবদের আমলে তাজিয়া মিছিলে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে অর্থায়ন করা হতো। নবাবরা নিজে হাতির পিঠে চড়ে মিছিলে অংশ নিতেন। ঢাকার কোতোয়ালি পুলিশ এবং নায়েব-নাজিমরা আইন-শৃঙ্খলার তদারকি করতেন, যা রাষ্ট্র ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনকে নির্দেশ করে।

প্রাচীনকালে সোনা, রুপা বা হাতির দাঁত দিয়ে তাজিয়া তৈরি হলেও এখন তা পরিবেশবান্ধব বাঁশ, সোলা, রঙিন কাগজ, জরি এবং আধুনিক আলোকসজ্জার মাধ্যমে তৈরি হয়। আগে তাজিয়াগুলো আকারে ছোট ও চারকোনা হতো। বর্তমানে ঢাকায় বহুতল বিশিষ্ট বিশালাকার এবং গম্বুজ আকৃতির আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর তাজিয়া দেখা যায়।

একসময় তাজিয়া মিছিলকে কেন্দ্র করে তলোয়ার খেলা, লাঠিখেলা ও শোকের গান (মার্সিয়া) গাওয়ার ব্যাপক প্রচলন ছিল। আধুনিক নাগরিক জীবনে নিরাপত্তার স্বার্থে তলোয়ার বা ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ বা সীমিত করা হয়েছে। তবে শোকের প্রতীক হিসেবে কালো পোশাক, খালি পা এবং কারবালার সেই বিষাদময় পরিবেশের আবেদন আজও অপরিবর্তিত রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬


‘তাজিয়া’ কী, কীভাবে এসেছে ঢাকায়

প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬

featured Image

‘তাজিয়া’ হলো কারবালার প্রান্তরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে শহীদ হওয়া মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন (রা.)-এর পবিত্র সমাধির একটি প্রতীকী বা কাল্পনিক প্রতিকৃতি। মূলত শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলমানরা মহররম মাসের প্রথম ১০ দিন কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনা স্মরণ ও শোক প্রকাশের অংশ হিসেবে কাঠ, বাঁশ, রঙিন কাগজ ও সোলা দিয়ে এই কাঠামোটি তৈরি করেন। পবিত্র আশুরার দিনে এটি নিয়ে শোক মিছিল বা তাজিয়া মিছিল বের করা হয়।

নামের উৎপত্তি

‘তাজিয়া’ শব্দটি আরবি ‘আজা’ ধাতু থেকে এসেছে। মূল অর্থ হলো শোক প্রকাশ করা, সমবেদনা জানানো বা সান্ত্বনা দেওয়া। কালক্রমে শিয়া ঐতিহ্যে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর সমাধিসৌধের (জারিহ) আদলে তৈরি কাঠামো এবং এর সঙ্গে জড়িত সামগ্রিক শোক অনুষ্ঠানকে ‘তাজিয়া’ নামে অভিহিত করা শুরু হয়।

তাজিয়ার ইতিহাস

তাজিয়া এবং তাজিয়া মিছিলের সূচনা ও ভারতীয় উপমহাদেশে এর বিস্তৃতির ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়।  ইতিহাসবিদদের মতে, মধ্য এশিয়ার শাসক আমির তৈমুর (তৈমুর লং) এই প্রথার সূচনা করেন। তিনি প্রতি বছর মহররমে কারবালায় ইমাম হুসাইনের মূল সমাধি জিয়ারত করতেন। কিন্তু ১৩৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ভারত অভিযানের সময় তিনি কারবালা যেতে না পেরে তীব্র অনুশোচনায় ভোগেন। তখন তার নির্দেশে শিল্পীরা কারবালার সমাধির একটি সোনা-রুপার প্রতিকৃতি তৈরি করেন, যা দেখে তিনি সান্ত্বনা পান। তৈমুরের পর তার বংশধর এবং অন্যান্য মুসলিম শাসকরা এই প্রথা ধরে রাখেন। পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য দামি ধাতুর পরিবর্তে বাঁশ, কাঠ ও কাগজ দিয়ে তাজিয়া বানানোর রেওয়াজ শুরু হয়।

ঢাকায় তাজিয়া

বাংলাদেশে ১৬৪২ সালে মীর মুরাদ নামক একজন শিয়া কর্মকর্তার হাত ধরে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী হোসেনী দালান ইমামবারা নির্মিত হয়। তখন থেকেই ঢাকায় রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে তাজিয়া মিছিলের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।

তাজিয়া কেবল একটি ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সমাজ ও শাসনব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে। উপমহাদেশে তাজিয়া তৈরি এবং তাজিয়া মিছিল কেবল শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বহু সুন্নি মুসলিম এবং অমুসলিম (বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ) এই মিছিলে মানত নিয়ে শরিক হতেন এবং তাজিয়া তৈরিতে সাহায্য করতেন। এটি একটি লোকজ উৎসবে পরিণত হয়।

মোগল আমল ও পরবর্তী সময়ে ঢাকার নবাবদের আমলে তাজিয়া মিছিলে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে অর্থায়ন করা হতো। নবাবরা নিজে হাতির পিঠে চড়ে মিছিলে অংশ নিতেন। ঢাকার কোতোয়ালি পুলিশ এবং নায়েব-নাজিমরা আইন-শৃঙ্খলার তদারকি করতেন, যা রাষ্ট্র ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনকে নির্দেশ করে।

প্রাচীনকালে সোনা, রুপা বা হাতির দাঁত দিয়ে তাজিয়া তৈরি হলেও এখন তা পরিবেশবান্ধব বাঁশ, সোলা, রঙিন কাগজ, জরি এবং আধুনিক আলোকসজ্জার মাধ্যমে তৈরি হয়। আগে তাজিয়াগুলো আকারে ছোট ও চারকোনা হতো। বর্তমানে ঢাকায় বহুতল বিশিষ্ট বিশালাকার এবং গম্বুজ আকৃতির আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর তাজিয়া দেখা যায়।

একসময় তাজিয়া মিছিলকে কেন্দ্র করে তলোয়ার খেলা, লাঠিখেলা ও শোকের গান (মার্সিয়া) গাওয়ার ব্যাপক প্রচলন ছিল। আধুনিক নাগরিক জীবনে নিরাপত্তার স্বার্থে তলোয়ার বা ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ বা সীমিত করা হয়েছে। তবে শোকের প্রতীক হিসেবে কালো পোশাক, খালি পা এবং কারবালার সেই বিষাদময় পরিবেশের আবেদন আজও অপরিবর্তিত রয়েছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত