সংবাদ

কুষ্টিয়ায় ৬ জনকে হত্যা মামলায় ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০২:৪২ পিএম

কুষ্টিয়ায় ৬ জনকে হত্যা মামলায় ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড

জুলাই আন্দোলনের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের বিশেষ অনুমতিতে এই রায় ঘোষণার পুরো প্রক্রিয়াটি টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

এর আগে গত ২২ জুন উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক ও আইনি শুনানি শেষে রায়ের জন্য আজকের দিনটি (৩০ জুন) নির্ধারণ করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। আদালতে প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এবং আসামিপক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। ৩৯ পৃষ্ঠার মূল অভিযোগপত্রের সঙ্গে ১ হাজার ৬৭৯ পৃষ্ঠার নথিপত্র যুক্ত ছিল। আসামির অপরাধের পক্ষে ৩টি অডিও এবং ৬টি ভিডিও ডকুমেন্ট আদালতে পেশ করা হয়। এই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় একমাত্র আসামি ছিলেন হাসানুল হক ইনু।

জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মোট আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছিল, যার মধ্যে বলপ্রয়োগে উসকানি এবং যৌথ ষড়যন্ত্রের বিষয়গুলো প্রমাণিত হয়েছে। মূল অভিযোগের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই একটি বিদেশি গণমাধ্যমে এবং ২৭ জুলাই দেশীয় একটি টেলিভিশন চ্যানেলে উসকানিমূলক সাক্ষাৎকার দেন ইনু। সেখানে তিনি ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে 'বিএনপি-জামায়াত, সন্ত্রাসী, জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক' আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের উসকানি দেন এবং সরকারি দমন-পীড়নকে কৌশলে সমর্থন করেন।

১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ১৪ দলীয় জোটের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় দেশব্যাপী সেনা মোতায়েন, কারফিউ জারি এবং নিরীহ ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে 'দেখামাত্র গুলি' করার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইনু সরাসরি উসকানি, প্ররোচনা ও সহায়তা দেন। পরবর্তীতে ২৯ জুলাইয়ের সভায়ও তিনি এই হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

২০ জুলাই দুপুরে ইনু নিজ জেলা কুষ্টিয়ার তৎকালীন পুলিশ সুপারকে (এসপি) ফোন করে আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা তৈরি ও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশনার পর ৫ আগস্ট পর্যন্ত কুষ্টিয়ায় পুলিশ ও ১৪ দলের ক্যাডাররা আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়।

শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ।

অভিযোগে প্রমাণিত হয়েছে, আন্দোলন চলাকালীন ইনু সার্বক্ষণিকভাবে শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র (লেথাল উইপন) ব্যবহার, হেলিকপ্টার থেকে গুলি ও বোমা চালানো, জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব বাস্তবায়ন এবং নিরীহ ছাত্র-জনতাকে ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে হত্যা, আটক ও নির্যাতনের সব ধরনের যৌথ পরিকল্পনা ও উসকানিতে তিনি জড়িত ছিলেন। ৪ আগস্টেও তিনি শেখ হাসিনার নেওয়া একই ধরনের দমনমূলক সিদ্ধান্তকে অনুমোদন দেন।

মামলার বিবরণী অনুযায়ী, ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে কুষ্টিয়া শহরের সর্বস্তরের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তায় নেমে আসেন। সকাল ১০টার দিকে তারা হাসপাতাল মোড় হয়ে মজমপুরের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে শেখ হাসিনা, মাহবুবউল আলম হানিফ এবং হাসানুল হক ইনুর যৌথ পরিকল্পনা ও পূর্ব নির্দেশনার আলোকেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও জাসদের সশস্ত্র ক্যাডাররা পুলিশের ছত্রছায়ায় নিরস্ত্র মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়।

এরই ফলশ্রুতিতে দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে শহরের বক চত্বর, বার্মিজ গলি, আড়ং-এর সামনে, তুলাপট্টি এবং ফায়ার সার্ভিসের বিপরীত পাশের সড়কে গুলিবিদ্ধ হয়ে ওই ৬ জন নিরীহ মানুষ নিহত হন। একই সাথে রাইসুল হকসহ অসংখ্য আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হন। সব দিক বিবেচনা করে আদালত আজ আসামির বিরুদ্ধে ১০ বছরের কারাদণ্ডের এই রায় দিলেন।

 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬


কুষ্টিয়ায় ৬ জনকে হত্যা মামলায় ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড

প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুন ২০২৬

featured Image

জুলাই আন্দোলনের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের বিশেষ অনুমতিতে এই রায় ঘোষণার পুরো প্রক্রিয়াটি টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

এর আগে গত ২২ জুন উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক ও আইনি শুনানি শেষে রায়ের জন্য আজকের দিনটি (৩০ জুন) নির্ধারণ করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। আদালতে প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এবং আসামিপক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। ৩৯ পৃষ্ঠার মূল অভিযোগপত্রের সঙ্গে ১ হাজার ৬৭৯ পৃষ্ঠার নথিপত্র যুক্ত ছিল। আসামির অপরাধের পক্ষে ৩টি অডিও এবং ৬টি ভিডিও ডকুমেন্ট আদালতে পেশ করা হয়। এই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় একমাত্র আসামি ছিলেন হাসানুল হক ইনু।

জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মোট আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছিল, যার মধ্যে বলপ্রয়োগে উসকানি এবং যৌথ ষড়যন্ত্রের বিষয়গুলো প্রমাণিত হয়েছে। মূল অভিযোগের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই একটি বিদেশি গণমাধ্যমে এবং ২৭ জুলাই দেশীয় একটি টেলিভিশন চ্যানেলে উসকানিমূলক সাক্ষাৎকার দেন ইনু। সেখানে তিনি ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে 'বিএনপি-জামায়াত, সন্ত্রাসী, জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক' আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের উসকানি দেন এবং সরকারি দমন-পীড়নকে কৌশলে সমর্থন করেন।

১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ১৪ দলীয় জোটের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় দেশব্যাপী সেনা মোতায়েন, কারফিউ জারি এবং নিরীহ ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে 'দেখামাত্র গুলি' করার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইনু সরাসরি উসকানি, প্ররোচনা ও সহায়তা দেন। পরবর্তীতে ২৯ জুলাইয়ের সভায়ও তিনি এই হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

২০ জুলাই দুপুরে ইনু নিজ জেলা কুষ্টিয়ার তৎকালীন পুলিশ সুপারকে (এসপি) ফোন করে আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা তৈরি ও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশনার পর ৫ আগস্ট পর্যন্ত কুষ্টিয়ায় পুলিশ ও ১৪ দলের ক্যাডাররা আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়।

শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ।

অভিযোগে প্রমাণিত হয়েছে, আন্দোলন চলাকালীন ইনু সার্বক্ষণিকভাবে শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র (লেথাল উইপন) ব্যবহার, হেলিকপ্টার থেকে গুলি ও বোমা চালানো, জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব বাস্তবায়ন এবং নিরীহ ছাত্র-জনতাকে ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে হত্যা, আটক ও নির্যাতনের সব ধরনের যৌথ পরিকল্পনা ও উসকানিতে তিনি জড়িত ছিলেন। ৪ আগস্টেও তিনি শেখ হাসিনার নেওয়া একই ধরনের দমনমূলক সিদ্ধান্তকে অনুমোদন দেন।

মামলার বিবরণী অনুযায়ী, ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে কুষ্টিয়া শহরের সর্বস্তরের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তায় নেমে আসেন। সকাল ১০টার দিকে তারা হাসপাতাল মোড় হয়ে মজমপুরের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে শেখ হাসিনা, মাহবুবউল আলম হানিফ এবং হাসানুল হক ইনুর যৌথ পরিকল্পনা ও পূর্ব নির্দেশনার আলোকেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও জাসদের সশস্ত্র ক্যাডাররা পুলিশের ছত্রছায়ায় নিরস্ত্র মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়।

এরই ফলশ্রুতিতে দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে শহরের বক চত্বর, বার্মিজ গলি, আড়ং-এর সামনে, তুলাপট্টি এবং ফায়ার সার্ভিসের বিপরীত পাশের সড়কে গুলিবিদ্ধ হয়ে ওই ৬ জন নিরীহ মানুষ নিহত হন। একই সাথে রাইসুল হকসহ অসংখ্য আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হন। সব দিক বিবেচনা করে আদালত আজ আসামির বিরুদ্ধে ১০ বছরের কারাদণ্ডের এই রায় দিলেন।

 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত