সংবাদ

আর্কাইভ দেখুন

ভূরাজনীতি ও ভর্তুকির ফাঁদে বিশ্ব অর্থনীতি

ভূরাজনীতি ও ভর্তুকির ফাঁদে বিশ্ব অর্থনীতি

আইএমএফ সম্মেলনে বড় উদ্বেগে জ্বালানি খাতমূল্যস্ফীতি হলো দরিদ্রদের ওপর চাপানো এক ধরনের ট্যাক্স: আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভাআমাদের আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই: আইএমএফসি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আল-জাদানভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সর্বজনীন জ্বালানি ভর্তুকির ‘ভুল নীতি’ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন ২০২৬-এ সংস্থার নীতিপ্রণেতারা বিশ্ব অর্থনীতি রক্ষায় অবিলম্বে জ্বালানি খাতের সংস্কার এবং রাজস্ব বাফার (সরকারের জমিয়ে রাখা অতিরিক্ত আর্থিক তহবিল) পুনর্গঠনের তাগিদ দিয়েছেন।সম্মেলনের মূল অধিবেশনে আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান অবস্থাকে একটি দোদুল্যমান পরিস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতি বর্তমানে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী শক্তির টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে তৈরি হওয়া নেতিবাচক জ্বালানি সরবরাহ ধাক্কা এবং অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) থেকে আসা ইতিবাচক চাহিদার সম্ভাবনা।জর্জিয়েভা সতর্ক করে বলেন, এই জ্বালানি সংকটের প্রভাব আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ছে। পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই নীতিপ্রণেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ফাটল আরও বড় হওয়ার আগেই নিজেদের আর্থিক ঘরের জরুরি সংস্কার করুন।এদিকে সম্মেলনে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি নিয়ে সবচেয়ে কড়া বার্তা দিয়েছে আইএমএফের ফিসকাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগ। বিভাগের প্রধান রদ্রিগো ভালদেস এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করে বলেন, জনগণকে সুরক্ষা দেওয়া আর জ্বালানির দাম কৃত্রিমভাবে ধরে রাখা এক কথা নয়। তিনি জানান, বিশ্বব্যাপী সংকটের মধ্যেও ঢালাও ভর্তুকি দেওয়ার কারণে ২০২৬ সালে দেশগুলোর জিডিপির প্রায় এক থেকে দেড় শতাংশ পর্যন্ত অপচয় হতে পারে।আইএমএফ কর্মকর্তাদের যৌথ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, একের পর এক বৈশ্বিক ধাক্কার কারণে দেশগুলোর আর্থিক সক্ষমতা এবং জ্বালানি বাফার (জরুরি পরিস্থিতির জন্য আগাম মজুত) প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। জ্বালানি ও খাদ্যের মতো মৌলিক খাতের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর স্থায়ী চাপ তৈরি করছে, যা বিশ্বজুড়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।এই পরিস্থিতিতে সংকট কাটাতে আইএমএফ সব দেশের সরকারকে সর্বজনীন জ্বালানি ভর্তুকি এবং কৃত্রিমভাবে মূল্য নিয়ন্ত্রণের পথ থেকে সরে আসার পরামর্শ দিয়েছে। এর পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময়সীমাবদ্ধ এবং শুধুমাত্র নিম্নআয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক  আর্থিক পদক্ষেপ বা সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।এক নজরে সম্মেলনব্যাংককের ঐতিহ্যবাহী কুইন সিরিকিট ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে (কিউএসএনসিসি) গত ১২ অক্টোবর শুরু হয় ‘আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপ’ বার্ষিক সম্মেলন। ৭ দিনব্যাপী এই মেগা ইভেন্ট রোববার (১৮ অক্টোবর) শেষ হবে। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই অর্থনৈতিক হাবে বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় এই আয়োজনটি ফিরে এলো।সপ্তাহব্যাপী এই সম্মেলনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ১৯১টি সদস্য দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, বেসরকারি খাতের নির্বাহী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা অংশ নেন। এতে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সাত দিনে বিশ্ব অর্থনীতি, আর্থিক স্থিতিশীলতা, দারিদ্র্য বিমোচন, ভূরাজনীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (অও) মতো উদীয়মান প্রযুক্তি নিয়ে একাধিক উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সেশন ও সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।সম্মেলনের শুরুতে আইএমএফের পক্ষ থেকে বিশ্ব অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি (ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক-ডব্লিউইও) এবং বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন  (গ্লোবাল ফাইনেন্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট) প্রকাশ করা হয়। বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস নিয়ে প্রথম দুদিন (১৪-১৫ অক্টোবর) মুখর ছিল প্রেস ব্রিফিং কক্ষগুলো।সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বেসরকারি পুঁজি গঠন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর্মসংস্থান তৈরির ওপর জোর দিয়ে বিশেষ ফ্ল্যাগশিপ ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। ১৫ অক্টোবর ডেভেলপমেন্ট কমিটির মিনিস্টেরিয়াল লাঞ্চ ও গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সভা অনুষ্ঠিত হয়। একই সাথে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীদের নিয়ে বিশেষ ব্রেকফাস্ট বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।১৬ অক্টোবর সম্মেলনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ইভেন্টগুলোর একটি ছিল আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ারশের বিশেষ দ্বিপক্ষীয় আলোচনা বা ‘ফায়ারসাইড চ্যাট’। এছাড়া এই দিনই বার্ষিক সম্মেলনের মূল প্লেনারি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিশ্ব অর্থনীতির মূল ঝুঁকিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হয়।সমাপনী বার্তাশনিবার (১৭ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক মুদ্রা ও আর্থিক কমিটির (আইএমএফসি) প্লেনারি অধিবেশন শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সমাপনী এই সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এবং আইএমএফসি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আল-জাদান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। তারা বিশ্ব অর্থনীতি রক্ষায় ভূরাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা ও আর্থিক সংস্কারের চূড়ান্ত বার্তা দেন। সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “বিশ্বের সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতি পছন্দ করে না। মূল্যস্ফীতি হলো দরিদ্রদের ওপর চাপানো এক ধরনের ট্যাক্স।”তিনি সতর্ক করেন, একদিকে এআই প্রযুক্তির কারণে প্রবৃদ্ধির আশা তৈরি হলেও অন্যপিঠে উচ্চ ঋণ ও জ্বালানি সংকটের কারণে উন্নত ও অনুন্নত দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বড় হওয়ার স্পষ্ট ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।আইএমএফসি চেয়ারম্যান ও সৌদির অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদান বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে বলেন, “বৈশ্বিক অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখালেও আমাদের আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই”।তিনি জানান, চলমান যুদ্ধ ও সংঘাতগুলোর কারণে বৈশ্বিক নৌপথ ও বাণিজ্য রুট বিঘ্নিত হচ্ছে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি সদস্য দেশগুলোকে অবিলম্বে ‘রাজস্ব বাফার’ বা নিজস্ব আর্থিক সঞ্চয় পুনর্গঠনের জোরালো তাগিদ দেন।র‌বিবার (১৮ অক্টোবর) প্রতিনিধি দলের আনুষ্ঠানিক বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হবে ৭ দিনের এই আয়োজন।


কালি মুছবে, রবি থাকবে

কালি মুছবে, রবি থাকবে

শিল্পকলা একাডেমির সামনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন দশজন বাঙালি মনীষীর মুখ এঁকেছে—নজরুল, লালন, জয়নুল আবেদিন, এস এম সুলতান, জহির রায়হান, শাহ আবদুল করিম, হুমায়ূন ফরীদি, রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর ও সত্যজিৎ রায়। সেই দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি লেপনের অভিযোগে পুলিশ তিনজনকে আটক করেছে। তাদের মধ্যে একজন রাষ্ট্রসংলাপ ফোরামের সভাপতি আ ন ম আয়াস। ৫ আগস্টের পর থেকে তার নেতৃত্বে প্রকাশ্যে মারধর, পুলিশের সামনে অন্যদের হেনস্তা করার পরও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রশ্রয় পেতে পেতে তিনি ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে উঠেছেন, এখন সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের সিদ্ধান্তকেও চ্যালেঞ্জ করছেন। ছবি পছন্দ না হলে প্রতিবাদ সভা করা যেত, নিজের পছন্দের ছবি পাশে আঁকা যেত, কিন্তু অন্যের আঁকা ছবির মুখে কালি দেওয়ার অধিকার তাদের ছিল না।রবীন্দ্রনাথের প্রতি এই আক্রোশ কেন? প্রচলিত অভিযোগগুলো পুরোনো—তিনি হিন্দু, তিনি ভারতের লোক, তিনি প্রজাপীড়ক জমিদার, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করেছেন, তার গান কেন জাতীয় সংগীত হবে, তার লেখায় মুসলমান প্রসঙ্গ কম কেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। খ্যাতি বাড়লে অভিযোগও বাড়ে। কিন্তু অভিযোগের মীমাংসা হয় যুক্তির লড়াইয়ে, কালির আক্রোশে নয়। বিদ্বান বলে খ্যাত কিছু ব্যক্তিও তার বিরুদ্ধে আবোলতাবোল বকে যাচ্ছেন। কারণ, আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সনদ আর জ্ঞান এক জিনিস নয়। জ্ঞানতাপস আরজ আলী মাতুব্বর বলেছিলেন, জ্ঞানের সনদ থাকে না। তাই একজন রিকশাচালক যখন নিজ উদ্যোগে সেই কালি মুছে দেন, তখন বোঝা যায়—প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নয়, জ্ঞান ও বোধই আসল। সনদধারী পণ্ডিতদেরও রিকশাচালকের কাছে শেখার আছে। কিন্তু শিখবেন না, শিখলে তাদের শেখা ইতিহাস মিথ্যা হয়ে যাবে।অনেকে জানেন না, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু অর্থে হিন্দু ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম। ব্রাহ্ম মানে ব্রাহ্মণ নয়, একেশ্বরবাদী। আর হিন্দু হলেই বা অপরাধ কী? হিন্দুধর্ম পৃথিবীর প্রাচীন ধর্মগুলোর একটি। প্রকৃতপক্ষে আসল বিরোধ ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক। ১৯৪৭ সাল থেকে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক কখনো স্বাভাবিক হয়নি। একাত্তরে ভারতের সহযোগিতা যাদের পরাজয় নিশ্চিত করেছে, তারা সেই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে এখনো ভারতবিদ্বেষ উসকে দেন। রবীন্দ্রনাথকে সামনে পেয়ে সেই বিদ্বেষ মেটানো হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, পৃথিবীর সব প্রভাবশালী প্রতিবেশীই প্রভাব বিস্তার করে। আমেরিকা কিউবাকে ৬৬ বছর ধরে অবরোধ করে রেখেছে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক ধরে নিয়ে গেছে। রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করেছে। চীন কাশ্মীরের কিয়দংশ ও তিব্বত দখল করে রেখেছে। অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে বলীয়ান ভারতেরও আঞ্চলিক প্রভাব যদি থাকে, তার প্রতিবাদ রাজনৈতিকভাবে করতে হবে, কবির ছবিতে কালি দিয়ে নয়।জমিদার হিসেবে রবীন্দ্রনাথ কেমন ছিলেন, তার রেকর্ড আছে। শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসরের প্রজাপীড়নের কোনো নজির কেউ দেখাতে পারেননি। বরং তিনি জমিদারির প্রথম ভাষণে বলেছিলেন, ‘সাহাদের হাত থেকে শেখদের বাঁচাতে হবে।’ শিলাইদহে মহর্ষি দাতব্য চিকিৎসালয়, পতিসরে বড় হাসপাতাল, ১৯১০ সালে ট্রাক্টর, পানির পাম্প ও সার নিয়ে আদর্শ কৃষিক্ষেত্র গড়ে তোলা, তাতিদের শান্তিনিকেতনে পাঠিয়ে বয়নশিল্প শেখানো—এসব তারই উদ্যোগ। ১৯০৫ সালে নওগাঁর পতিসরে তিনি ভারতবর্ষের প্রথম জামানতবিহীন কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার করে ব্যাংকের মূলধন জোগাড় করেছিলেন। নোবেল পুরস্কারের এক লাখ ১৬ হাজার টাকার মধ্যে ৭৫ হাজার টাকা সেই ব্যাংককে দিয়েছিলেন, যা আর ফেরত পাননি। কারণ, কৃষকেরা ঋণ নিয়ে আর পরিশোধ করেননি। তারপরও ব্যাংকটি কুড়ি বছর চলেছিল।লালনকে আমরা চিনি অনেকটাই রবীন্দ্রনাথ পরিবারের কারণে। লালনের যে ছবিটি আমরা দেখি, তা কুষ্টিয়ার শিলাইদহে নৌকায় বসে এঁকেছিলেন রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। লালনের গানের প্রথম সংগ্রাহক ও সংকলকও রবীন্দ্রনাথ। ১৯০৫ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় লালনের কুড়িটি গান তিনিই পরিমার্জন করে প্রকাশ করেন। শুধু লালন নন, লালনের ভাবশিষ্য ডাকপিয়ন গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাব তারে’ গানটি দিয়েও তিনি ‘প্রবাসী’র হারমোনি বিভাগ শুরু করেন। এই সূত্রেই কলকাতার বিদগ্ধ সমাজে লালন ও গগন পরিচিত হন। আজ যাঁরা লালন ও রবীন্দ্রনাথকে মুখোমুখি দাঁড় করান, তাদের আরও বেশি ইতিহাসচর্চা করা দরকার।দুটি বড় মিথ—জাতীয় সংগীত ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ‘আমার সোনার বাংলা’ তিনি লিখেছিলেন ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বেদনা থেকে, এ কথা সত্য। বাংলা যদি ভাগ না হতো, তাহলে শেরেবাংলার লাহোর প্রস্তাব মোতাবেক গোটা বাংলা, ত্রিপুরা ও আসাম নিয়ে ১৯৪৭ সালেই আলাদা আরেকটি মুসলিম দেশ হতে পারত। তাই দেশ ভাগ হলে ব্যথা লাগবেই। আমাদের জাতীয় সংগীতের সুর তিনি নিয়েছিলেন গগন হরকরার সুর থেকে, তবে লুকিয়ে নয়। নিজেই লিখে গেছেন—‘ওই বাউলের গানের সুরের মাধুর্যে বিমোহিত হয়ে আমি বাংলাদেশকে মাতৃরূপে গণ্য করে এই গান লিখেছি।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধিতার অভিযোগটি আরও বেশি দুর্বল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করার লক্ষ্যে কলকাতার গড়ের মাঠে আয়োজিত সভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্ব করার কথা বলা হয়। কিন্তু ড. আকবর আলী খানসহ গবেষকেরা দেখিয়েছেন, ওই সময়ে তিনি কুষ্টিয়ায় ছিলেন। এ ছাড়া কোনো সংবাদপত্রে রবীন্দ্রনাথের ওই সভায় উপস্থিতির খবর নেই, অথচ তিনি তখন এত বিখ্যাত যে তার সভায় যোগদান পত্রিকার প্রধান খবর হওয়ার কথা। বিরোধিতা করলে প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সংবর্ধনা দিতে ডাকত না, তিনিও আসতেন না। অথবা ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডক্টর অব লিটারেচার উপাধিও প্রদান করত না।সবচেয়ে হতাশাজনক ছিল কালি লেপনকারী নারীর বক্তব্য। তিনি বলছিলেন, রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছেন, ভারত করেছে ‘অগ্রাসন’। অথচ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু ১৯৪১ সালে, বাংলাদেশের জন্ম ১৯৭১ সালে। মৃত মানুষ বিরোধিতা করেন কীভাবে? তিনি ‘আগ্রাসন’ শব্দটিও উচ্চারণ করছিলেন ‘অগ্রাসন’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলছিলেন ‘বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি’। পাকিস্তান আমলেও তাকে বেতার ও পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু পারেনি। কারণ, তার অবস্থান ইট-পাথরে গাঁথা নয়, মানুষের মনোজগতে প্রোথিত। দেয়ালের ছবিতে কালি লাগে, কিন্তু মনের ভেতরের রবিকে কালি দিয়ে ঢাকা যায় না।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]


শিশুর প্রথম বিদ্যালয় পরিবার

শিশুর প্রথম বিদ্যালয় পরিবার

একটি শিশু মায়ের মুখে শুনল, “সব সময় সত্য কথা বলবে।” কিছুক্ষণ পর বাবার ফোন বেজে উঠল। ওপাশের মানুষটি বাবাকে চাইলে বাবা সন্তানকে বললেন, “বলবে, বাবা বাসায় নেই।” শিশুটি কোনো প্রশ্ন করল না। কিন্তু সে একটি শিক্ষা পেল। অন্যদিকে, আরেকটি পরিবারে বাবা ভুল করে কারও কাছ থেকে বেশি টাকা নিয়ে ফেললেন। ভুল বুঝতে পেরে সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা ফেরত দিলেন। এখানেও কোনো বক্তৃতা হলো না। কিন্তু শিশুটি সততার একটি বাস্তব রূপ দেখল। এই দুই দৃশ্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে শিশুর শিক্ষার এক গভীর সত্য। আমরা সন্তানকে যা বলি, তার চেয়ে সে আমাদের দেখে যা শেখে, তার প্রভাব অনেক বেশি স্থায়ী হতে পারে।এই কারণেই ঘরের ভেতরে সেরা গবেষণাগার। গবেষণাগার শুধু যন্ত্রপাতি দিয়ে সাজানো কোনো কক্ষ নয়। যেখানে পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা, ভুল, সংশোধন ও ফলাফলের মধ্য দিয়ে শেখা হয়, সেটিও এক ধরনের গবেষণাগার। শিশুর ঘর ঠিক তেমনই একটি জায়গা। সেখানে প্রতিদিন তার ভাষা, আচরণ, চিন্তা, মূল্যবোধ ও সম্পর্কের ধারণা তৈরি হচ্ছে। বাবা-মায়ের কথাবার্তা, পারস্পরিক সম্পর্ক, অন্যের সঙ্গে আচরণ, ভুলের প্রতি প্রতিক্রিয়া এবং দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত শিশুর জন্য নীরব পাঠ হয়ে উঠছে।শিশু জন্মের পর প্রথমে বই পড়ে না, কোনো নৈতিকতার বক্তৃতাও শোনে না। সে মানুষ দেখে। সে দেখে বাবা রাগলে কী করেন, মা বিপদে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানান, কেউ ভুল করলে পরিবার কীভাবে আচরণ করে, অতিথিকে কীভাবে গ্রহণ করা হয়, দুর্বল অবস্থানের মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা হয়। এই পর্যবেক্ষণ থেকেই ধীরে ধীরে তার আচরণের কাঠামো তৈরি হয়। তাই শিশুর চরিত্র গঠনের সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষা অনেক সময় কথায় নয়, পরিবেশে।আমরা সন্তানকে বলি, “বড়দের সম্মান করবে।” কিন্তু সে যদি দেখে পরিবারের বড়রা একে অন্যের সঙ্গে অসম্মানজনক ভাষায় কথা বলছেন, তাহলে কথার চেয়ে দৃশ্যটাই তার কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। আমরা বলি, “সব মানুষকে সম্মান করতে হবে।” অথচ বাড়ির সহায়ক কর্মী বা কোনো সেবাদানকারী মানুষের সঙ্গে যদি অবজ্ঞার আচরণ করা হয়, তাহলে শিশুর কাছে সমতার ধারণা দুর্বল হয়ে যায়। আবার বাবা যদি দোকানদারের দেওয়া বাড়তি টাকা ফিরিয়ে দেন, মা যদি অসুস্থ প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ান কিংবা পরিবারের কেউ নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান, তাহলে শিশুর সামনে মূল্যবোধের একটি জীবন্ত উদাহরণ তৈরি হয়।এখানেই পরিবারের অদৃশ্য শিক্ষাক্রমের গুরুত্ব। বিদ্যালয়ে কোন শ্রেণিতে কোন বিষয় পড়ানো হবে, তার একটি নির্ধারিত কাঠামো থাকে। পরিবারের শিক্ষাক্রমের কোনো বই নেই, কিন্তু তার প্রভাব সর্বত্র। বাবা-মায়ের পারস্পরিক আচরণ থেকে শিশু সম্পর্কের ভাষা শেখে। মতের অমিল কীভাবে সামলানো হয়, তা থেকে বিরোধ সমাধানের কৌশল শেখে। কেউ ভুল করলে তাকে অপমান করা হয়, নাকি সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়, তা থেকে নিজের ভুলের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। এমনকি রাস্তায় নিয়ম মানা, লাইনে দাঁড়ানো, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা কিংবা অপ্রয়োজনীয় অপচয় না করাও তার নাগরিক ও সামাজিক শিক্ষার অংশ হয়ে ওঠে।একটি শিশুর হাতে জীবনের প্রথম বড় শিক্ষা আসে খুব সাধারণ ঘটনা থেকে। ধরুন, সে অসাবধানতাবশত একটি গ্লাস ভেঙে ফেলেছে। বাবা যদি রেগে গিয়ে বলেন, “তুমি কোনো কাজই ঠিকমতো করতে পারো না”, তাহলে শিশুটি হয়তো শিখবে, ভুল করলে সত্য গোপন করতে হয়। কিন্তু বাবা যদি বলেন, “গ্লাস ভেঙেছে, এটা ঠিক হয়নি। তবে তুমি সত্যি বলেছ। এখন আমরা পরিষ্কার করি এবং পরেরবার কীভাবে সাবধান হওয়া যায়, দেখি”, তাহলে একই ঘটনা দায়িত্ববোধের শিক্ষায় পরিণত হয়। শিশুকে ভুলহীন মানুষ বানানো সম্ভব নয়; কিন্তু ভুল হলে সত্য বলা, দায়িত্ব নেওয়া এবং সংশোধন করার অভ্যাস শেখানো সম্ভব।শিক্ষার এই সুযোগ শুধু ভুলের মুহূর্তেই আসে না। দৈনন্দিন জীবনও শেখার অসংখ্য উপকরণ বহন করে। বাজারে গিয়ে পণ্যের দাম তুলনা করা থেকে গণিত ও অর্থের মূল্য শেখানো যায়। পরিবারের খরচের ছোটখাটো পরিকল্পনায় সন্তানকে যুক্ত করলে দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। রান্নার সময় খাবারের পরিবর্তন নিয়ে কথা বললে বিজ্ঞান জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়। গাছের পরিচর্যা থেকে পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি হতে পারে। পরিবারের কোনো ছোট সিদ্ধান্তে সন্তানের মতামত জানতে চাইলে সে যুক্তি দিয়ে নিজের কথা বলতে এবং অন্যের মত শুনতে শেখে।এভাবে শিক্ষা বইয়ের পাতা থেকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়। আর এই সংযোগ তৈরি করার সবচেয়ে স্বাভাবিক জায়গা হলো পরিবার।তবে বর্তমান সময়ে ঘরের শিক্ষার সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো পর্দানির্ভর জীবন। বাবা মুঠোফোনে, মা মুঠোফোনে, সন্তানও মুঠোফোনে। তারপর অভিযোগ ওঠে, “বাচ্চা বই পড়ে না।” শিশুকে বই পড়তে বলার আগে তাকে বই পড়ার পরিবেশ দিতে হবে। পরিবারের বড়রা যদি নিয়মিত বই পড়েন, সপ্তাহে কিছু সময় সবাই মিলে পড়া নিয়ে আলোচনা করেন, তাহলে বই শিশুর কাছে উপদেশের বিষয় না হয়ে পারিবারিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠবে। একইভাবে সন্তানকে মুঠোফোন ব্যবহারে সংযম শেখাতে হলে বড়দের নিজেদের আচরণেও সেই সংযম দেখাতে হবে।পরিবারে মতের অমিলও শিশুর জন্য শিক্ষার সুযোগ। বাবা ও মায়ের মধ্যে মতভেদ হতেই পারে। কিন্তু সেই মতভেদ যদি অপমান ও চিৎকারে পরিণত হয়, শিশু শিখবে, বিরোধ মানেই সংঘাত। আর যদি যুক্তি, শ্রবণ ও সমঝোতার মাধ্যমে তা সমাধান হয়, তাহলে সে বুঝবে, ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক এবং মতের অমিলের মধ্যেও সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা করা যায়। একইভাবে বাবা যদি সন্তানের কাছে নিজের ভুল স্বীকার করেন, তাহলে তিনি ছোট হন না। বরং সন্তান শেখে, ভুল স্বীকার করার জন্য বয়স বা অবস্থান কোনো বাধা নয়।এ ক্ষেত্রে অভিভাবকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে ভালো মানুষ হওয়ার উপদেশ দেওয়া সহজ, কিন্তু নিজের আচরণকে সেই শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা কঠিন। অথচ শিশুর সামনে নিখুঁত হওয়ার অভিনয়ও প্রয়োজন নেই। বরং নিজের ভুল স্বীকার করা, প্রয়োজনে ক্ষমা চাওয়া, কথা রাখার চেষ্টা করা এবং অন্যের প্রতি সম্মান দেখানোই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষা।আমরা সন্তানের ফলাফল নিয়ে অনেক উদ্বিগ্ন থাকি। পরীক্ষায় কত নম্বর পেল, কোন বিষয়ে দুর্বল, কোথায় ভর্তি হবে, ভবিষ্যতে কী করবে—এসব নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন প্রায়ই বাদ পড়ে যায়। সে কি ব্যর্থ হলে আবার চেষ্টা করতে পারে? নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে? অন্যের কথা শুনতে পারে? দুর্বল কাউকে সাহায্য করতে পারে? নিজের সুবিধার বাইরে অন্যের প্রয়োজন বুঝতে পারে? এসব দক্ষতা ও মূল্যবোধ শুধু পাঠ্যবই থেকে আসে না। এগুলোর ভিত্তি তৈরি হয় পরিবারে।এ কারণেই বিদ্যালয় ও পরিবারের মধ্যে একটি সেতু প্রয়োজন। শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে সহযোগিতা, সততা, দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতার কথা বলবেন, আর পরিবারে তার বাস্তব অনুশীলনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। বিদ্যালয় শিশুকে দায়িত্বশীল হতে শেখালে ঘরেও তাকে বয়স অনুযায়ী দায়িত্ব দিতে হবে। বিদ্যালয় অন্যের মতামতকে সম্মান করতে শেখালে পরিবারেও তার কথা মন দিয়ে শুনতে হবে। শিক্ষা তখনই গভীর হয়, যখন শ্রেণিকক্ষের মূল্যবোধ জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়।আমরা সন্তানের জন্য ভালো বিদ্যালয় চাই, দক্ষ শিক্ষক চাই, উন্নত বই চাই, প্রযুক্তি চাই। এসব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার সঙ্গে একটি সুস্থ পারিবারিক পরিবেশও প্রয়োজন। কারণ শিশু প্রতিদিন শুধু পাঠ্যবই পড়ে না, সে তার চারপাশের মানুষকেও পড়ে। আমাদের আচরণ, ভাষা, সম্পর্ক ও সিদ্ধান্ত তার কাছে প্রতিদিনের বাস্তব পাঠ।তাই সন্তানকে বদলানোর আগে ঘরের পরিবেশের দিকে তাকানো দরকার। তাকে সত্যবাদী হওয়ার কথা বলার আগে আমরা সত্য বলছি কি না, তাকে সম্মান শেখানোর আগে আমরা অন্যকে সম্মান করছি কি না, তাকে দায়িত্বশীল হতে বলার আগে আমরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করছি কি না—সেই প্রশ্নগুলো নিজেদের কাছেই করতে হবে।ঘরকে তাই শুধু খাওয়া, ঘুম, বিশ্রাম ও বিনোদনের জায়গা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে পারে প্রশ্ন করার জায়গা, বই পড়ার জায়গা, আলোচনা করার জায়গা, ভুল থেকে শেখার জায়গা এবং মূল্যবোধ চর্চার জায়গা। বিদ্যালয়ের গবেষণাগারে শিশু বিজ্ঞান পরীক্ষা করে, কিন্তু ঘরের গবেষণাগারে সে জীবন পরীক্ষা করে।এই পরীক্ষার উপকরণ আমরা প্রতিদিন তার সামনে রাখছি—আমাদের কথায়, কাজে, আচরণে, সম্পর্কের ধরনে। আমরা তাকে যে পৃথিবী দেখাই, সে সেই পৃথিবী থেকেই নিজের পৃথিবী বানাতে শেখে।তাই শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ার কাজ শুধু বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়। তার শুরু হয় ঘরে। বাবা-মায়ের প্রতিদিনের আচরণ, পরিবারের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং ছোট ছোট সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই তৈরি হয় তার নৈতিক বোধের ভিত।শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সহজ। আমরা সন্তানকে কেমন মানুষ হিসেবে দেখতে চাই, তার আগে কি আমরা তার সামনে সেই মানুষটির একটি জীবন্ত উদাহরণ হতে পারছি?কারণ শিশুর প্রথম বিদ্যালয় তার ঘর, প্রথম শিক্ষক তার পরিবার এবং সবচেয়ে শক্তিশালী পাঠ্যপুস্তক তার বাবা-মায়ের প্রতিদিনের আচরণ।ঘরের ভেতরে যে গবেষণাগার প্রতিদিন চলছে, সেখানে শুধু একটি শিশুর ভবিষ্যৎ তৈরি হচ্ছে না। তৈরি হচ্ছে আগামী দিনের সমাজের চরিত্রও।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়, ময়মনসিংহ]


আবাসিকে গ্যাসের নিরাপদ ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে হবে

আবাসিকে গ্যাসের নিরাপদ ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে হবে

নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে দগ্ধ চারজনের সবাই মারা গেছেন। একটি দুর্ঘটনায় চারটি প্রাণ ঝরে যাওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্য সতর্কবার্তা। গ্যাস ব্যবহারে সামান্য অবহেলাও যে কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, এ ঘটনা তার প্রমাণ।গত ৯ অক্টোবর রাতে কাঁচপুরের সোনাপুর উত্তরপাড়ায় একটি আবাসিক ভবনের কক্ষে বিস্ফোরণ ঘটে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, গ্যাসের চাপ বাড়াতে স্থাপন করা কম্প্রেসার লাইনে লিকেজ থেকে বিস্ফোরণটি ঘটে। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্ত করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। গ্যাসের চাপ কম থাকলে অনেকে অবৈধভাবে কম্প্রেসার ব্যবহার করেন। এতে পাইপ ও সংযোগের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ফলে গ্যাস বেরিয়ে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থা বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি জরুরি।বাসাবাড়িতে গ্যাসের পাইপ, চুলা, ভালভ ও সংযোগ নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার। পুরোনো বা ত্রুটিপূর্ণ সরঞ্জাম দ্রুত বদলানো গেলে অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতে পারে। গ্যাসের গন্ধ পেলে ব্যাবহারকারীদেরকে আগুন জ্বালানো, বৈদ্যুতিক সুইচ চালু বা বন্ধ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এজন্য আবাসিকে গ্যাসের ব্যবহারকারীদের সচেতন করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে আমরা আশা করতে চাই।তবে শুধু বাসিন্দাদের সচেতন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাকে নিয়মিত তদারকি করতে হবে। অবৈধ কম্প্রেসার ব্যবহার বন্ধে অভিযান চালাতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগ শনাক্ত করে দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্ঘটনার পর তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।


স্বীকৃতির অপেক্ষায় আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধারা

স্বীকৃতির অপেক্ষায় আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধারা

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সুপারিশে ২০১০ থেকে এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৭৬ জনের গেজেট/লাল মুক্তিবার্তা/ভারতীয় তালিকা বাতিল করা হয়েছে এবং আগস্ট ২০২৪ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত সারা দেশে তদন্ত ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ৪৮১ জন অমুক্তিযোদ্ধার গেজেট বাতিল করা হয়েছে। এই মুহূর্তে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা তো ২ লাখ ৩ হাজার সামথিং, এরকম আরকি।’ অপরদিকে, ৭ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অমুক্তিযোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ এবং ১৯৭১ সালের শহীদ ও বীরাঙ্গনাদের তালিকা নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটাতে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে।... যারা দরখাস্ত দিয়েছেন, চুলচেরা যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে সততা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যদি সত্যিকারে কেউ বাদ পড়েন, তাদেরই নেওয়া হবে, যতজন দরখাস্ত করুন না কেন। তাতে অসুবিধা নেই, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের তালিকায় আসবেন তারাই, যারা সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা এবং চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ে যারা থাকবেন। এবং এটা হবে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহভাবে।’ এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় নেওয়া হবে প্রামাণ্য দলিল, সরকারি ও সামরিক নথি, মুক্তিযুদ্ধকালীন রেকর্ড, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য ও গবেষণালব্ধ উপাত্ত। মুক্তিযোদ্ধা নির্ধারণে মন্ত্রণালয়ের আয়োজন অনুযায়ী, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে কমিটি গঠন করা হবে, দল গঠন করে তদন্ত চালানো হবে, এরপর সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। সবকিছু নিবিড়ভাবে তদন্ত ও পর্যায়ক্রমে যাচাই-বাছাইয়ের পরই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হবেন।আমরা দেখেছি, ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নির্মাণাধীন ভাস্কর্যের মাথায় দড়ি দিয়ে জুতার মালা ঝুলিয়ে অবমাননা করার ঘটনা। জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা পরিয়ে প্রকাশ্যে জনসমক্ষে অসম্মানিত করা হয়েছে। তাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই সমাহিত হতে হয়েছে। সত্যিই রণাঙ্গনের এই আশিতিপর নারী-পুরুষেরা জীবনের সায়াহ্নে এসে অত্যন্ত হতাশ ও সংক্ষুব্ধ। আমি ব্যক্তিগতভাবে কয়েকজন আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাকে জানি ও চিনি, যারা আজও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। কখনো রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, কখনো স্থান পরিবর্তনের কারণে, আবার কখনো সনদ হারিয়ে যাওয়া বা পুড়ে যাওয়ার কারণে তারা নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের নিয়ে কয়েকটি কলাম লিখেছি, কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছি; কিন্তু আদৌ কোনো অগ্রগতি হয়নি। বাংলার মাটিকে শত্রুমুক্ত করতে যেসব আদিবাসী তরুণ নিজেদের তীর-ধনুক ও অকুতোভয় বুক নিয়ে হানাদার বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি। জাতীয় পর্যায়ে বারবার তালিকা সংশোধন, যাচাই-বাছাই ও পরিমার্জন করা হলেও প্রান্তিক আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধারা উপেক্ষিতই রয়ে গেছেন। এটি কেবল অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয় নয়, বরং গৌরবগাথার ইতিহাসে স্বীকৃতিহীন একটি অধ্যায়।উপেক্ষিত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে বর্তমান সময়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু জরুরি ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক বলে মনে করি—ক. সাধারণ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে আদিবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে—যেমন রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, সিলেট, ময়মনসিংহ ও পার্বত্য চট্টগ্রামে—বিশেষ কর্মীদল গঠন করে সরেজমিনে প্রকৃত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করতে হবে।খ. যেহেতু অনেক আদিবাসীর কাছে লিখিত নথিপত্র নেই, সেহেতু সহযোদ্ধা ও স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের মৌখিক সাক্ষ্য বা ‘মৌখিক ইতিহাস’কে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচনা করে তালিকা সংশোধনের জন্য বিশেষ নিয়ম তৈরি করতে হবে।গ. আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ও পদবি তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির সঠিক বানান অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে।ঘ. মাঠপর্যায়ের গবেষণার মাধ্যমে অসংখ্য উপেক্ষিত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধার নাম ও বীরত্বগাথা যেসব গবেষকের বইয়ে লিপিবদ্ধ হয়েছে, সেগুলোকে তথ্যসূত্র হিসেবে নিয়ে তালিকা প্রণয়ন করতে হবে। এসব নির্ভরযোগ্য গবেষণাগ্রন্থকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রামাণ্য গ্রন্থ বা উৎস হিসেবে গ্রহণ করে বাদ পড়া বীরযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।ঙ. যেসব আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা ইতোমধ্যে মারা গেছেন, তাদের মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি প্রদান করা আবশ্যক। একই সঙ্গে তাদের উত্তরসূরিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে।বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের অর্জন নয়। এটি ছিল সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত আত্মত্যাগের ফসল। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, কোল, কোডা, কোড়া, রাজোয়াড়, তুরী, গারো, হাজংসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাদের অংশগ্রহণের ধরন, সংখ্যা ও ব্যক্তিগত ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন। কারণ, সব অঞ্চলের তথ্য সমানভাবে সংরক্ষিত হয়নি এবং অনেকের অবদানের লিখিত দলিলও সীমিত।একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আমরা কতটা প্রগতিশীল ও ন্যায়পরায়ণ, তা নির্ভর করে আদিবাসী, প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অবদানকে কতটা সম্মান জানাতে পারছি, তার ওপর। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসীদের রক্ত আর মূলধারার বাঙালিদের রক্ত একই স্রোতে মিশে গিয়েছিল। সেই রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় কোনো ধরনের বৈষম্য বা অবহেলা কাম্য হতে পারে না। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সংশোধনের চলমান ও ভবিষ্যৎ প্রক্রিয়ায় আদিবাসীদের উপেক্ষিত বীরত্বকে পূর্ণাঙ্গভাবে ধারণ করতে হবে। যতক্ষণ না সমতল ও পাহাড়ের শেষ প্রান্তিক আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা তার প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাচ্ছেন, ততক্ষণ আমাদের স্বাধীনতা ও বিজয়ের ইতিহাস অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। এই ঐতিহাসিক ঋণ পরিশোধের সময় এখনই।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কলামিস্ট]


বালু লুট বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিন

বালু লুট বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিন

সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার চেলা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তোলার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ নিয়ে প্রশাসনের অভিযান ও মামলা হলেও বালু তোলা বন্ধ হচ্ছে না। উল্টো অভিযোগ উঠেছে, অবৈধ বালু তোলার প্রতিবাদকারীদেরই মামলায় আসামি করা হচ্ছে। প্রভাবশালী চক্রের হোতারা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চেলা নদীর সোনাপুর ও পূর্ব সোনাপুর এলাকায় একটি প্রভাবশালী চক্র নদীর পাড় কেটে বালু তুলছে। এ কাজে প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তরের করা একটি মামলায় ৩৭ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে। স্থানীয়দের দাবি, তাদের মধ্যে শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ বাসিন্দারাও রয়েছেন, যাদের অনেকেই বালু তোলার বিরোধিতা করেছেন।অবৈধ বালু তোলা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। নদীর পাড় কেটে বালু তোলা হলে ভাঙন বাড়তে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বসতভিটা, কৃষিজমি ও স্থানীয় জনপদ। তাই এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। তবে অভিযান চালিয়ে কয়েকজন শ্রমিককে আটক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এর পেছনে থাকা অর্থদাতা, ব্যবসায়ী ও নিয়ন্ত্রকদেরও শনাক্ত করতে হবে।অভিযানের খবর আগেই অপরাধীদের কাছে পৌঁছে যাওয়ার অভিযোগও খতিয়ে দেখা দরকার। বালু মজুতের স্থানগুলোতে অভিযান চালিয়ে অবৈধ বালুর উৎস ও সরবরাহব্যবস্থা শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে মামলায় আসামি করার ক্ষেত্রে যথাযথ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে হয়রানি করা যেমন অনুচিত, তেমনি প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী বলাও সমর্থনযোগ্য নয়।