কয়েকদিন আগেও ব্রাজিল সাপোর্টার হাসানের মুখে ছিল পরাজয়ের দীর্ঘ ছায়া। ৬ জুলাই নরওয়ের কাছে ব্রাজিলের হারের পর যেন তার চোখের নিচে জমে উঠেছিল নির্ঘুম রাতের ক্লান্তি। প্রিয় দলের বিদায় মেনে নেওয়া কঠিন, তবু ফুটবলের বিশ্বকাপে সমর্থকের আবেগ তো এক দলের গণ্ডিতে আটকে থাকে না। নিজের দল ছিটকে গেলেও প্রতিপক্ষের হার দেখার একরাশ আশা তখনও বুকের ভেতর লালন করছিলেন তিনি।
মিশর-আর্জেন্টিনা ম্যাচের প্রথমার্ধ পর্যন্ত হলের কক্ষে বসেই খেলা দেখছিলেন হাসান। বিরতিতে স্কোরলাইন দেখে মনে হচ্ছিল, বহুদিন পর বুঝি হাসার সুযোগ এসেছে। আর্জেন্টিনার পরাজয়ের সম্ভাবনা তাকে আর ঘরে আটকে রাখতে পারেনি। সম্ভাব্য সেই উল্লাস শত শত মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিতে ছুটে গেলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ হবিবুর রহমান হল মাঠে, যেখানে জায়ান্ট স্ক্রিনের সামনে তখন জড়ো হচ্ছেন ফুটবলপ্রেমি শিক্ষার্থীরা।
মাঠে যাওয়ার সময় তার চোখেমুখে ছিল উচ্ছ্বাসের ঝিলিক। ঠোঁটের কোণে আত্মবিশ্বাসী হাসি, বন্ধুদের সঙ্গে খুনসুটি। কিন্তু ফুটবল যে শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত কোনো গল্পের শেষ লিখতে দেয় না।
মাঠে যে হাসি নিয়ে গিয়েছিলেন, হলে ফিরলেন তার ঠিক উল্টো অনুভূতি নিয়ে। মুখের হাসি হারিয়ে গেছে, চোখের 'জল আর নাকের পানি' যেন একাকার। শেষ মুহূর্তের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে আর্জেন্টিনা ৩-২ গোলে হারিয়ে দেয় মিশরকে। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে আনন্দ থেকে বিষাদে ডুবে যাওয়ার এই গল্পটি যেন শুধু হাসানের নয়, বিশ্বকাপের এই দিনগুলোতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থীর আবেগের প্রতিচ্ছবি।
হাসানের মুখের অভিব্যাক্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে হাসান জানান,"নিজের দলের দুঃখ ভুলতে অন্যের হার দেখতে গিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত নিজের দুঃখের সঙ্গে আরও একটা দুঃখ ফ্রি পেলাম! "
তবে হাসানের কাছে কষ্টের সংজ্ঞাটা ভিন্ন। কষ্টের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে হাসান জানান,"ব্রাজিলের সমর্থক হওয়ার সবচেয়ে বড় কষ্ট কী জানেন? নিজের দল হারার পরও শান্তি নেই, আর্জেন্টিনাও হারতে চায় না!"
অন্যদিকে জার্মানির বিদায়ের বাঁশি বাজতেই যেন বদলে গেল জাহিদের ফুটবল-পরিচয়। রাউন্ড অব ৩২–এ প্রিয় দলের স্বপ্ন থেমে যাওয়ার পরও থামেনি তার বিশ্বকাপ। বরং এক চিলতে হাসি আর খানিকটা আত্মবিদ্রুপকে সঙ্গী করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গায়ে জড়িয়ে নিলেন ফ্রান্সের জার্সি। ছবির ক্যাপশনে মাত্র তিনটি শব্দ "চলো, রং বদলাই..."
জাহিদ বলেন, "জার্মানি বিদায় নিয়েছে, আমি তো নিইনি। বিশ্বকাপ দেখতে হলে টিকে থাকা দলের জার্সিই পরতে হয়। ফুটবলে স্থায়ী কিছু নেই। চার বছরে একবার বিশ্বকাপ আসে, তাই আবেগও মাঝে মাঝে ট্রান্সফার উইন্ডো খোলে!"
বিশ্বকাপ এলেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যেন বদলে যায়। ক্লাসরুম, লাইব্রেরি কিংবা বিভাগের করিডরের পাশাপাশি আলোচনার সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে ওঠে ফুটবল। রাত যত গভীর হয়, ক্যাম্পাস ততই প্রাণ ফিরে পায়। মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয় যেন এক বিশাল স্টেডিয়াম, যেখানে হাজারো হৃদস্পন্দন একসঙ্গে ওঠানামা করে একটি বলের গতিপথে।
শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিটি ম্যাচই জায়ান্ট স্ক্রিনে দেখানোর ব্যবস্থা করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ( রাকসু)। ফলে খেলা শুরুর অনেক আগ থেকেই শহীদ হবিবুর রহমান হল মাঠ পরিণত হয় মানুষের মিলনমেলায়। হাতে পতাকা, গায়ে প্রিয় দলের জার্সি, এবং ছোট ছোট দল বেঁধে শিক্ষার্থীরা এসে ভিড় করেন। কেউ জায়গা দখল করেন, কেউ চায়ের কাপ হাতে শেষ মুহূর্তের বিশ্লেষণে মেতে ওঠেন, কেউ আবার ভবিষ্যদ্বাণী করেন কে জিতবে, কে বিদায় নেবে।
মাঠের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে ভার্চুয়াল জগতেও। খেলা শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই ফেসবুকের নিউজফিড ভরে যায় স্ট্যাটাস, মিম, ট্রল আর পরিসংখ্যানের লড়াইয়ে। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ব্যালন ডি'অর কিংবা মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাস। সবই হয়ে ওঠে যুক্তির হাতিয়ার। বন্ধুরা বন্ধুদের খোঁচা দেন, সিনিয়র-জুনিয়রেরা পাল্টাপাল্টি মন্তব্য করেন। ম্যাচ শেষে সেই একই পোস্টের নিচে আবার বদলে যায় ভাষা। কোথাও উল্লাস, কোথাও নীরবতা, কোথাও আত্মসমর্পণের ইমোজি।
এবারের বিশ্বকাপে ক্যাম্পাসজুড়ে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের। আকাশি-সাদা জার্সি যেন ক্যাম্পাসের অলিগলি দখল করে নিয়েছে। সেই আবেগেরই আরেকটি প্রকাশ দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে। ডিয়েগো ম্যারাডোনা আর লিওনেল মেসির গ্রাফিতি শুধু রঙের আঁচড় নয়, সমর্থকদের বিশ্বাস, ভালোবাসা আর স্বপ্নের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন, কেউ ভিডিও করেন, আবার কেউ নীরবে তাকিয়ে থাকেন প্রিয় কিংবদন্তিদের মুখের দিকে।
প্রিয় কিংবদন্তিদের গ্রাফিতির পাশে ছবি তুলছিলেন শোয়াইব আহমেদ। তিনি বলেন,"ক্যাম্পাসের দেয়ালে আঁকা মেসি আর ম্যারাডোনা আমাদের কাছে শুধু দুটি মুখ নয়। একজন আর্জেন্টিনার গৌরবময় ইতিহাস, আরেকজন সেই ইতিহাসের জীবন্ত উত্তরাধিকার। তাই এই দেয়ালের সামনে দাঁড়ালেই মনে হয়, আমরা শুধু ফুটবল নয়, একটা ঐতিহ্যেরও সমর্থক।"
রাত বাড়ে, বাঁশি বাজে, খেলা শুরু হয়। এক বিশাল পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকে হাজারো চোখ। আক্রমণ উঠলেই গর্জে ওঠে মাঠ, গোল হলে মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হয় উল্লাস। অচেনা মানুষও তখন একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। কেউ আনন্দে চিৎকার করেন, কেউ মোবাইলে ধারণ করেন জীবনের সবচেয়ে প্রিয় ফুটবল মুহূর্তগুলোর একটি।
কিন্তু ফুটবল শুধু হাসির গল্প লেখে না। শেষ বাঁশি বাজতেই একই মাঠে জন্ম নেয় ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতি। একদল বিজয়ের আনন্দে স্লোগান তোলে, অন্যদল নীরবে মাঠ ছাড়ে। কেউ বন্ধুর কাঁধে মাথা রাখেন, কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, আবার কারও চোখ ভিজে ওঠে অশ্রুতে। সেই কান্না শুধু একটি ম্যাচ হারার নয়। প্রিয় দল, প্রিয় স্বপ্ন আর চার বছরের অপেক্ষারও কান্না।
বিশ্বকাপের শেষ অধ্যায়ে এসে এখন সেমিফাইনালের অপেক্ষায় পুরো ক্যাম্পাস। মাত্র চারটি দল টিকে আছে লড়াইয়ে। কিন্তু জয়-পরাজলের হিসাবের বাইরেও এই বিশ্বকাপ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে উপহার দিয়েছে আরও বড় কিছু। একসঙ্গে হাসার উপলক্ষ, একসঙ্গে কাঁদার সাহস, বন্ধুত্বের নতুন গল্প এবং এমন কিছু স্মৃতি, যা হয়তো পরবর্তী বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত ক্যাম্পাসের চায়ের আড্ডায় বারবার ফিরে আসবে।
শেষ পর্যন্ত ফুটবল হয়তো শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে এটি এক টুকরো জীবন, একসঙ্গে বেঁচে থাকার আনন্দ, আর একই আকাশের নিচে হাজারো হৃদয়ের একসঙ্গে উল্লাস করার নাম।

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুলাই ২০২৬
কয়েকদিন আগেও ব্রাজিল সাপোর্টার হাসানের মুখে ছিল পরাজয়ের দীর্ঘ ছায়া। ৬ জুলাই নরওয়ের কাছে ব্রাজিলের হারের পর যেন তার চোখের নিচে জমে উঠেছিল নির্ঘুম রাতের ক্লান্তি। প্রিয় দলের বিদায় মেনে নেওয়া কঠিন, তবু ফুটবলের বিশ্বকাপে সমর্থকের আবেগ তো এক দলের গণ্ডিতে আটকে থাকে না। নিজের দল ছিটকে গেলেও প্রতিপক্ষের হার দেখার একরাশ আশা তখনও বুকের ভেতর লালন করছিলেন তিনি।
মিশর-আর্জেন্টিনা ম্যাচের প্রথমার্ধ পর্যন্ত হলের কক্ষে বসেই খেলা দেখছিলেন হাসান। বিরতিতে স্কোরলাইন দেখে মনে হচ্ছিল, বহুদিন পর বুঝি হাসার সুযোগ এসেছে। আর্জেন্টিনার পরাজয়ের সম্ভাবনা তাকে আর ঘরে আটকে রাখতে পারেনি। সম্ভাব্য সেই উল্লাস শত শত মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিতে ছুটে গেলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ হবিবুর রহমান হল মাঠে, যেখানে জায়ান্ট স্ক্রিনের সামনে তখন জড়ো হচ্ছেন ফুটবলপ্রেমি শিক্ষার্থীরা।
মাঠে যাওয়ার সময় তার চোখেমুখে ছিল উচ্ছ্বাসের ঝিলিক। ঠোঁটের কোণে আত্মবিশ্বাসী হাসি, বন্ধুদের সঙ্গে খুনসুটি। কিন্তু ফুটবল যে শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত কোনো গল্পের শেষ লিখতে দেয় না।
মাঠে যে হাসি নিয়ে গিয়েছিলেন, হলে ফিরলেন তার ঠিক উল্টো অনুভূতি নিয়ে। মুখের হাসি হারিয়ে গেছে, চোখের 'জল আর নাকের পানি' যেন একাকার। শেষ মুহূর্তের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে আর্জেন্টিনা ৩-২ গোলে হারিয়ে দেয় মিশরকে। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে আনন্দ থেকে বিষাদে ডুবে যাওয়ার এই গল্পটি যেন শুধু হাসানের নয়, বিশ্বকাপের এই দিনগুলোতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থীর আবেগের প্রতিচ্ছবি।
হাসানের মুখের অভিব্যাক্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে হাসান জানান,"নিজের দলের দুঃখ ভুলতে অন্যের হার দেখতে গিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত নিজের দুঃখের সঙ্গে আরও একটা দুঃখ ফ্রি পেলাম! "
তবে হাসানের কাছে কষ্টের সংজ্ঞাটা ভিন্ন। কষ্টের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে হাসান জানান,"ব্রাজিলের সমর্থক হওয়ার সবচেয়ে বড় কষ্ট কী জানেন? নিজের দল হারার পরও শান্তি নেই, আর্জেন্টিনাও হারতে চায় না!"
অন্যদিকে জার্মানির বিদায়ের বাঁশি বাজতেই যেন বদলে গেল জাহিদের ফুটবল-পরিচয়। রাউন্ড অব ৩২–এ প্রিয় দলের স্বপ্ন থেমে যাওয়ার পরও থামেনি তার বিশ্বকাপ। বরং এক চিলতে হাসি আর খানিকটা আত্মবিদ্রুপকে সঙ্গী করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গায়ে জড়িয়ে নিলেন ফ্রান্সের জার্সি। ছবির ক্যাপশনে মাত্র তিনটি শব্দ "চলো, রং বদলাই..."
জাহিদ বলেন, "জার্মানি বিদায় নিয়েছে, আমি তো নিইনি। বিশ্বকাপ দেখতে হলে টিকে থাকা দলের জার্সিই পরতে হয়। ফুটবলে স্থায়ী কিছু নেই। চার বছরে একবার বিশ্বকাপ আসে, তাই আবেগও মাঝে মাঝে ট্রান্সফার উইন্ডো খোলে!"
বিশ্বকাপ এলেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যেন বদলে যায়। ক্লাসরুম, লাইব্রেরি কিংবা বিভাগের করিডরের পাশাপাশি আলোচনার সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে ওঠে ফুটবল। রাত যত গভীর হয়, ক্যাম্পাস ততই প্রাণ ফিরে পায়। মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয় যেন এক বিশাল স্টেডিয়াম, যেখানে হাজারো হৃদস্পন্দন একসঙ্গে ওঠানামা করে একটি বলের গতিপথে।
শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিটি ম্যাচই জায়ান্ট স্ক্রিনে দেখানোর ব্যবস্থা করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ( রাকসু)। ফলে খেলা শুরুর অনেক আগ থেকেই শহীদ হবিবুর রহমান হল মাঠ পরিণত হয় মানুষের মিলনমেলায়। হাতে পতাকা, গায়ে প্রিয় দলের জার্সি, এবং ছোট ছোট দল বেঁধে শিক্ষার্থীরা এসে ভিড় করেন। কেউ জায়গা দখল করেন, কেউ চায়ের কাপ হাতে শেষ মুহূর্তের বিশ্লেষণে মেতে ওঠেন, কেউ আবার ভবিষ্যদ্বাণী করেন কে জিতবে, কে বিদায় নেবে।
মাঠের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে ভার্চুয়াল জগতেও। খেলা শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই ফেসবুকের নিউজফিড ভরে যায় স্ট্যাটাস, মিম, ট্রল আর পরিসংখ্যানের লড়াইয়ে। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ব্যালন ডি'অর কিংবা মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাস। সবই হয়ে ওঠে যুক্তির হাতিয়ার। বন্ধুরা বন্ধুদের খোঁচা দেন, সিনিয়র-জুনিয়রেরা পাল্টাপাল্টি মন্তব্য করেন। ম্যাচ শেষে সেই একই পোস্টের নিচে আবার বদলে যায় ভাষা। কোথাও উল্লাস, কোথাও নীরবতা, কোথাও আত্মসমর্পণের ইমোজি।
এবারের বিশ্বকাপে ক্যাম্পাসজুড়ে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের। আকাশি-সাদা জার্সি যেন ক্যাম্পাসের অলিগলি দখল করে নিয়েছে। সেই আবেগেরই আরেকটি প্রকাশ দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে। ডিয়েগো ম্যারাডোনা আর লিওনেল মেসির গ্রাফিতি শুধু রঙের আঁচড় নয়, সমর্থকদের বিশ্বাস, ভালোবাসা আর স্বপ্নের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন, কেউ ভিডিও করেন, আবার কেউ নীরবে তাকিয়ে থাকেন প্রিয় কিংবদন্তিদের মুখের দিকে।
প্রিয় কিংবদন্তিদের গ্রাফিতির পাশে ছবি তুলছিলেন শোয়াইব আহমেদ। তিনি বলেন,"ক্যাম্পাসের দেয়ালে আঁকা মেসি আর ম্যারাডোনা আমাদের কাছে শুধু দুটি মুখ নয়। একজন আর্জেন্টিনার গৌরবময় ইতিহাস, আরেকজন সেই ইতিহাসের জীবন্ত উত্তরাধিকার। তাই এই দেয়ালের সামনে দাঁড়ালেই মনে হয়, আমরা শুধু ফুটবল নয়, একটা ঐতিহ্যেরও সমর্থক।"
রাত বাড়ে, বাঁশি বাজে, খেলা শুরু হয়। এক বিশাল পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকে হাজারো চোখ। আক্রমণ উঠলেই গর্জে ওঠে মাঠ, গোল হলে মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হয় উল্লাস। অচেনা মানুষও তখন একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। কেউ আনন্দে চিৎকার করেন, কেউ মোবাইলে ধারণ করেন জীবনের সবচেয়ে প্রিয় ফুটবল মুহূর্তগুলোর একটি।
কিন্তু ফুটবল শুধু হাসির গল্প লেখে না। শেষ বাঁশি বাজতেই একই মাঠে জন্ম নেয় ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতি। একদল বিজয়ের আনন্দে স্লোগান তোলে, অন্যদল নীরবে মাঠ ছাড়ে। কেউ বন্ধুর কাঁধে মাথা রাখেন, কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, আবার কারও চোখ ভিজে ওঠে অশ্রুতে। সেই কান্না শুধু একটি ম্যাচ হারার নয়। প্রিয় দল, প্রিয় স্বপ্ন আর চার বছরের অপেক্ষারও কান্না।
বিশ্বকাপের শেষ অধ্যায়ে এসে এখন সেমিফাইনালের অপেক্ষায় পুরো ক্যাম্পাস। মাত্র চারটি দল টিকে আছে লড়াইয়ে। কিন্তু জয়-পরাজলের হিসাবের বাইরেও এই বিশ্বকাপ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে উপহার দিয়েছে আরও বড় কিছু। একসঙ্গে হাসার উপলক্ষ, একসঙ্গে কাঁদার সাহস, বন্ধুত্বের নতুন গল্প এবং এমন কিছু স্মৃতি, যা হয়তো পরবর্তী বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত ক্যাম্পাসের চায়ের আড্ডায় বারবার ফিরে আসবে।
শেষ পর্যন্ত ফুটবল হয়তো শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে এটি এক টুকরো জীবন, একসঙ্গে বেঁচে থাকার আনন্দ, আর একই আকাশের নিচে হাজারো হৃদয়ের একসঙ্গে উল্লাস করার নাম।

আপনার মতামত লিখুন