একসময় হাওরে মিলত ১৪০ থেকে ১৫০ প্রজাতির দেশি মাছ, এখন তা নেমে এসেছে ৬০-৭০টিতে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে প্রতিবছর ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ হলেও মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না—এমন অভিযোগের মধ্যেই সুনামগঞ্জে গঠিত হলো ‘হাওর মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন পরিষদ’।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সন্ধ্যা ৮টায় সুনামগঞ্জ শহরের শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাঠাগারে এক মতবিনিময় সভায় এই কমিটি গঠন করা হয়। সভায় বাংলাদেশের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে ‘হাওর বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠন এবং ফসল রক্ষা বাঁধের নামে অনিয়ম-লুটপাট বন্ধের দাবি জানানো হয়।
সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সুনামগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা রেখে নুরুল হক আফিন্দীকে সভাপতি ও এ কে কুদরত পাশাকে সাধারণ সম্পাদক করে ৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়।
বক্তারা বলেন, মাছ-বালু-ধানই সুনামগঞ্জের প্রাণ, কিন্তু আজ তা গভীর সংকটে। কৃষি, পানিসম্পদ, মৎস্য, পরিবেশ, স্থানীয় সরকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও নৌপরিবহনসহ একাধিক মন্ত্রণালয় আলাদাভাবে হাওর নিয়ে কাজ করায় তৈরি হচ্ছে চরম সমন্বয়হীনতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি। এই সংকট কাটাতে একক কর্তৃপক্ষের অধীনে সমন্বিত পরিকল্পনা, গবেষণা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি এখন সময়ের প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
নুরুল হক আফেন্দীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান, দৈনিক সুনামগঞ্জের ডাক-এর সম্পাদক অধ্যক্ষ শের গুল আহমেদ, দৈনিক সুনামকণ্ঠ সম্পাদক বিজন সেন রায়, সুনামগঞ্জ জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি লতিফুর রহমান রাজু, মো. আলী নূর, জিয়াউর রহমান, আবু নেছার, সৈয়দ মহিবুল ইসলাম, সুখেন্দু সেন, মো. ইয়াকুব বখত, দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর-এর সম্পাদক পঙ্কজ দে, আনিসুল হক, হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন, সাংবাদিক এ কে কুদরত পাশা, কর্ণবাবু, প্রীতম দাস, শাল্লা কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক অশেষ তালুকদার এবং রীনা আক্তারসহ স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির উপস্থাপিত নথি অনুযায়ী, অকাল বন্যা ও পাহাড়ি ঢল থেকে বোরো ধান রক্ষায় প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। চলতি ২০২৬ সালে সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় ৭১০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০২ কিলোমিটার মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী কাজ শুরু হওয়ার কথা ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে এবং শেষ হওয়ার কথা ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ কাজ শুরু হয় ফেব্রুয়ারি বা মার্চে। তড়িঘড়িতে নিম্নমানের কাজ এবং কান্দা থেকে অপরিকল্পিতভাবে মাটি কাটার ফলে বাঁধের স্থায়িত্ব থাকছে না, একই সঙ্গে হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। ফলে অস্থায়ী মাটির বাঁধ কৃষকের নিরাপত্তার বদলে পরিণত হয়েছে দুর্নীতি ও হাওর ধ্বংসের প্রতীকে।
অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং নদী-খাল ভরাটের কারণে হাওরের দেশি মাছের সম্পদ ধ্বংসের মুখে পড়েছে। কৃত্রিম সারের নাইট্রোজেন ও ফসফরাস পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে দিচ্ছে, যা মাছের খাদ্য প্লাঙ্কটন ধ্বংস করছে। এই সংকট মোকাবিলায় অস্থায়ী বাঁধের বদলে নদী, খাল ও বিল পুনঃখনন, বিজ্ঞানভিত্তিক স্লুইসগেট নির্মাণ, হিজল-করচ গাছ রোপণ, গভীর বিলে মাছের অভয়াশ্রম তৈরি এবং জলবায়ু সহনশীল ও স্বল্পমেয়াদি ধানের চাষ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে হাওরাঞ্চলের বিপর্যস্ত চিকিৎসাব্যবস্থার চিত্রও তুলে ধরা হয়। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই সড়কে মুমূর্ষু রোগীর মৃত্যুর ঘটনা নিত্যদিনের বলে জানান বক্তারা। পাঁচ বছর আগে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও যন্ত্রপাতির অভাবে হাসপাতালটি এখনো চালু হয়নি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রেখে চলতি বছরের আগস্ট মাসের মধ্যেই হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর আলটিমেটাম দিয়েছেন নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ।
চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জের ১৯৩টি হাওরে উৎপাদিত প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টন ধান—যার বাজারমূল্য প্রায় ৪ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা—জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখছে। দেশের পরিবেশ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের লাখো মানুষের অস্তিত্ব রক্ষায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে অবিলম্বে বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা। নতুন গঠিত ৫১ সদস্যের এই পরিষদ এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যদের ভূমিকার মধ্য দিয়ে হাওরবাসীর দীর্ঘদিনের এই দাবি আদায় জোরালো হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬
একসময় হাওরে মিলত ১৪০ থেকে ১৫০ প্রজাতির দেশি মাছ, এখন তা নেমে এসেছে ৬০-৭০টিতে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে প্রতিবছর ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ হলেও মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না—এমন অভিযোগের মধ্যেই সুনামগঞ্জে গঠিত হলো ‘হাওর মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন পরিষদ’।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সন্ধ্যা ৮টায় সুনামগঞ্জ শহরের শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাঠাগারে এক মতবিনিময় সভায় এই কমিটি গঠন করা হয়। সভায় বাংলাদেশের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে ‘হাওর বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠন এবং ফসল রক্ষা বাঁধের নামে অনিয়ম-লুটপাট বন্ধের দাবি জানানো হয়।
সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সুনামগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা রেখে নুরুল হক আফিন্দীকে সভাপতি ও এ কে কুদরত পাশাকে সাধারণ সম্পাদক করে ৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়।
বক্তারা বলেন, মাছ-বালু-ধানই সুনামগঞ্জের প্রাণ, কিন্তু আজ তা গভীর সংকটে। কৃষি, পানিসম্পদ, মৎস্য, পরিবেশ, স্থানীয় সরকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও নৌপরিবহনসহ একাধিক মন্ত্রণালয় আলাদাভাবে হাওর নিয়ে কাজ করায় তৈরি হচ্ছে চরম সমন্বয়হীনতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি। এই সংকট কাটাতে একক কর্তৃপক্ষের অধীনে সমন্বিত পরিকল্পনা, গবেষণা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি এখন সময়ের প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
নুরুল হক আফেন্দীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান, দৈনিক সুনামগঞ্জের ডাক-এর সম্পাদক অধ্যক্ষ শের গুল আহমেদ, দৈনিক সুনামকণ্ঠ সম্পাদক বিজন সেন রায়, সুনামগঞ্জ জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি লতিফুর রহমান রাজু, মো. আলী নূর, জিয়াউর রহমান, আবু নেছার, সৈয়দ মহিবুল ইসলাম, সুখেন্দু সেন, মো. ইয়াকুব বখত, দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর-এর সম্পাদক পঙ্কজ দে, আনিসুল হক, হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন, সাংবাদিক এ কে কুদরত পাশা, কর্ণবাবু, প্রীতম দাস, শাল্লা কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক অশেষ তালুকদার এবং রীনা আক্তারসহ স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির উপস্থাপিত নথি অনুযায়ী, অকাল বন্যা ও পাহাড়ি ঢল থেকে বোরো ধান রক্ষায় প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। চলতি ২০২৬ সালে সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় ৭১০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০২ কিলোমিটার মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী কাজ শুরু হওয়ার কথা ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে এবং শেষ হওয়ার কথা ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ কাজ শুরু হয় ফেব্রুয়ারি বা মার্চে। তড়িঘড়িতে নিম্নমানের কাজ এবং কান্দা থেকে অপরিকল্পিতভাবে মাটি কাটার ফলে বাঁধের স্থায়িত্ব থাকছে না, একই সঙ্গে হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। ফলে অস্থায়ী মাটির বাঁধ কৃষকের নিরাপত্তার বদলে পরিণত হয়েছে দুর্নীতি ও হাওর ধ্বংসের প্রতীকে।
অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং নদী-খাল ভরাটের কারণে হাওরের দেশি মাছের সম্পদ ধ্বংসের মুখে পড়েছে। কৃত্রিম সারের নাইট্রোজেন ও ফসফরাস পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে দিচ্ছে, যা মাছের খাদ্য প্লাঙ্কটন ধ্বংস করছে। এই সংকট মোকাবিলায় অস্থায়ী বাঁধের বদলে নদী, খাল ও বিল পুনঃখনন, বিজ্ঞানভিত্তিক স্লুইসগেট নির্মাণ, হিজল-করচ গাছ রোপণ, গভীর বিলে মাছের অভয়াশ্রম তৈরি এবং জলবায়ু সহনশীল ও স্বল্পমেয়াদি ধানের চাষ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে হাওরাঞ্চলের বিপর্যস্ত চিকিৎসাব্যবস্থার চিত্রও তুলে ধরা হয়। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই সড়কে মুমূর্ষু রোগীর মৃত্যুর ঘটনা নিত্যদিনের বলে জানান বক্তারা। পাঁচ বছর আগে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও যন্ত্রপাতির অভাবে হাসপাতালটি এখনো চালু হয়নি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রেখে চলতি বছরের আগস্ট মাসের মধ্যেই হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর আলটিমেটাম দিয়েছেন নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ।
চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জের ১৯৩টি হাওরে উৎপাদিত প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টন ধান—যার বাজারমূল্য প্রায় ৪ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা—জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখছে। দেশের পরিবেশ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের লাখো মানুষের অস্তিত্ব রক্ষায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে অবিলম্বে বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা। নতুন গঠিত ৫১ সদস্যের এই পরিষদ এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যদের ভূমিকার মধ্য দিয়ে হাওরবাসীর দীর্ঘদিনের এই দাবি আদায় জোরালো হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন