একসময় মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন বনাঞ্চলে বর্ষা এলেই দেখা মিলত ছোট আকৃতির সুস্বাদু বুনো ফল চাম কাঁঠাল বা চাপালিশের। পাহাড়ি বন থেকে সংগ্রহ করা এই ফল শ্রীমঙ্গলের বাজারেও বিক্রি হতো প্রচুর। কিন্তু নির্বিচারে বন উজাড়, পুরোনো গাছ নিধন এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে আজ বিলুপ্তির পথে দেশীয় এই বনজ ফল। এতে শুধু একটি উদ্ভিদই হারিয়ে যাচ্ছে না, বরং তীব্র খাদ্যসংকটে পড়ছে বনাঞ্চলের নানা প্রজাতির বন্য প্রাণী।
চাম কাঁঠাল বা চাপালিশ কাঁঠালেরই একটি বুনো প্রজাতি। এর ইংরেজি নাম ‘মাঙ্কি জ্যাক’ (Monkey Jack) এবং বৈজ্ঞানিক নাম Artocarpus chama। বিশেষজ্ঞরা জানান, চাম কাঁঠাল বানর, হনুমান, উল্লুক ও গন্ধগোকুলসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণীর অত্যন্ত প্রিয় খাদ্য। এমনকি হাতিও এই ফল খেয়ে থাকে। বন থেকে গাছটি হারিয়ে যাওয়ায় এসব প্রাণীর প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎস সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
চাম কাঁঠাল দেখতে অনেকটা কাঁঠালের মতো হলেও আকারে বেশ ছোট ও গোলাকার। স্বাদে টক-মিষ্টি হওয়ায় মানুষের কাছেও এটি জনপ্রিয়। স্থানীয়ভাবে একে পাহাড়ি কাঁঠাল বা বন কাঁঠালও বলা হয়। একসময় মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, বড়লেখা, কুলাউড়া ও জুড়ী এবং হবিগঞ্জের চুনারুঘাটসহ সিলেট অঞ্চলের পাহাড়ি বনে এই গাছ প্রচুর দেখা যেত। বর্তমানে এর দেখা মেলা ভার। গারো সম্প্রদায়ের কাছে এটি ‘বলস্রাম’ এবং মগ ভাষায় ‘টোপোনি’ নামে পরিচিত।
বন গবেষকদের মতে, চাপালিশ একটি বড় আকারের পত্রঝরা বৃক্ষ। গাছটি প্রায় ৩০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাছে ফুল ও ফল ধরে। তবে পাহাড়ি বন ছাড়া এই গাছ সহজে জন্মায় না। নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে এর প্রাকৃতিক বংশবিস্তার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
খাদ্যগুণের পাশাপাশি চাপালিশের কাঠ বাদামি, শক্ত ও টেকসই। ঘরবাড়ি নির্মাণ ও আসবাবপত্র তৈরিতে এই কাঠের বাণিজ্যিক চাহিদা অনেক। এই বাড়তি চাহিদাই গাছটি উজাড় হওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশে সিলেট বিভাগ ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং মধুপুর বনাঞ্চলে এই গাছ জন্মায়। মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া ও হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে এখনো কিছু গাছ টিকে আছে। রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের বাংলোর পাশে প্রায় ৩১৮ বছরের পুরোনো একটি বিশালাকায় চাপালিশ গাছ এখনো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ১০৩ ফুট উঁচু এই গাছটির পরিধি প্রায় ২৫ ফুট।
বন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাপালিশ শুধু একটি ফল নয়, এটি বনজ জীববৈচিত্র্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বন্য প্রাণীর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই দেশীয় প্রজাতির গাছ সংরক্ষণ এবং বনাঞ্চলে ব্যাপকভাবে রোপণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে দেশের বন থেকে চাম কাঁঠাল চিরতরে হারিয়ে যাবে, যা বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্য বড় হুমকি।

বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬
একসময় মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন বনাঞ্চলে বর্ষা এলেই দেখা মিলত ছোট আকৃতির সুস্বাদু বুনো ফল চাম কাঁঠাল বা চাপালিশের। পাহাড়ি বন থেকে সংগ্রহ করা এই ফল শ্রীমঙ্গলের বাজারেও বিক্রি হতো প্রচুর। কিন্তু নির্বিচারে বন উজাড়, পুরোনো গাছ নিধন এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে আজ বিলুপ্তির পথে দেশীয় এই বনজ ফল। এতে শুধু একটি উদ্ভিদই হারিয়ে যাচ্ছে না, বরং তীব্র খাদ্যসংকটে পড়ছে বনাঞ্চলের নানা প্রজাতির বন্য প্রাণী।
চাম কাঁঠাল বা চাপালিশ কাঁঠালেরই একটি বুনো প্রজাতি। এর ইংরেজি নাম ‘মাঙ্কি জ্যাক’ (Monkey Jack) এবং বৈজ্ঞানিক নাম Artocarpus chama। বিশেষজ্ঞরা জানান, চাম কাঁঠাল বানর, হনুমান, উল্লুক ও গন্ধগোকুলসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণীর অত্যন্ত প্রিয় খাদ্য। এমনকি হাতিও এই ফল খেয়ে থাকে। বন থেকে গাছটি হারিয়ে যাওয়ায় এসব প্রাণীর প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎস সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
চাম কাঁঠাল দেখতে অনেকটা কাঁঠালের মতো হলেও আকারে বেশ ছোট ও গোলাকার। স্বাদে টক-মিষ্টি হওয়ায় মানুষের কাছেও এটি জনপ্রিয়। স্থানীয়ভাবে একে পাহাড়ি কাঁঠাল বা বন কাঁঠালও বলা হয়। একসময় মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, বড়লেখা, কুলাউড়া ও জুড়ী এবং হবিগঞ্জের চুনারুঘাটসহ সিলেট অঞ্চলের পাহাড়ি বনে এই গাছ প্রচুর দেখা যেত। বর্তমানে এর দেখা মেলা ভার। গারো সম্প্রদায়ের কাছে এটি ‘বলস্রাম’ এবং মগ ভাষায় ‘টোপোনি’ নামে পরিচিত।
বন গবেষকদের মতে, চাপালিশ একটি বড় আকারের পত্রঝরা বৃক্ষ। গাছটি প্রায় ৩০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাছে ফুল ও ফল ধরে। তবে পাহাড়ি বন ছাড়া এই গাছ সহজে জন্মায় না। নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে এর প্রাকৃতিক বংশবিস্তার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
খাদ্যগুণের পাশাপাশি চাপালিশের কাঠ বাদামি, শক্ত ও টেকসই। ঘরবাড়ি নির্মাণ ও আসবাবপত্র তৈরিতে এই কাঠের বাণিজ্যিক চাহিদা অনেক। এই বাড়তি চাহিদাই গাছটি উজাড় হওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশে সিলেট বিভাগ ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং মধুপুর বনাঞ্চলে এই গাছ জন্মায়। মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া ও হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে এখনো কিছু গাছ টিকে আছে। রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের বাংলোর পাশে প্রায় ৩১৮ বছরের পুরোনো একটি বিশালাকায় চাপালিশ গাছ এখনো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ১০৩ ফুট উঁচু এই গাছটির পরিধি প্রায় ২৫ ফুট।
বন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাপালিশ শুধু একটি ফল নয়, এটি বনজ জীববৈচিত্র্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বন্য প্রাণীর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই দেশীয় প্রজাতির গাছ সংরক্ষণ এবং বনাঞ্চলে ব্যাপকভাবে রোপণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে দেশের বন থেকে চাম কাঁঠাল চিরতরে হারিয়ে যাবে, যা বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্য বড় হুমকি।

আপনার মতামত লিখুন