সংবাদ

আগামী দুই দশকে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে কি ভারত ও চীন?


সংগ্রাম দত্ত
সংগ্রাম দত্ত
প্রকাশ: ৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৭ এএম

আগামী দুই দশকে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে কি ভারত ও চীন?
ছবি : সংগৃহীত

বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতার ভরকেন্দ্র দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বৈশ্বিক অর্থনীতি ও কূটনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল, সেখানে এখন ক্রমেই গুরুত্ব বাড়ছে এশিয়ার। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুই দেশ—ভারত ও চীন।

চীন ইতিমধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক উৎপাদনশিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, তরুণ জনসংখ্যা, প্রযুক্তিখাতের সম্প্রসারণ ও ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক প্রভাবের কারণে ভারত ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উঠে আসছে।

তবে প্রশ্ন হলো—আগামী দুই দশকে বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতার ভারসাম্যে ভারত ও চীন কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবে?

অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিল্প উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ক্ষেত্রে চীন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ। গত কয়েক দশকে দেশটি দ্রুত শিল্পায়ন ও রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেমিকন্ডাক্টর ও মহাকাশ গবেষণায় চীনের ব্যাপক বিনিয়োগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে আলোচিত। একই সঙ্গে আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বেইজিং তার কৌশলগত প্রভাবও সম্প্রসারণ করছে। তবে জনসংখ্যার বার্ধক্য, আবাসন খাতের চাপ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা চীনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই কর্মক্ষম জনশক্তি দেশটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, স্টার্টআপ ও মহাকাশ গবেষণায় ভারতের অগ্রগতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বিস্তার ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবাখাতের সম্প্রসারণ দেশটির অর্থনীতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বিশ্বের অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এখন উৎপাদন ও বিনিয়োগের বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে ভারতের দিকে নজর দিচ্ছে। বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার ও ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেশটিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির অপরিহার্য অংশে পরিণত করছে। তবে অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও আয়বৈষম্য কমানো ভারতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

বিশ্ব নেতৃত্ব শুধু অর্থনীতির আকার দিয়ে নির্ধারিত হয় না। সামরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, শিক্ষা ও গবেষণা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, কূটনৈতিক প্রভাব ও সাংস্কৃতিক উপস্থিতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তিগুলোর একটি। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতিও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দুই দশকের বিশ্ব সম্ভবত একক কোনো দেশের নেতৃত্বে পরিচালিত হবে না। বরং এটি হবে একটি বহুমেরু (Multipolar) বিশ্ব, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করবে। সে ক্ষেত্রে চীন ও ভারত হবে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রধান অংশীদার।

আগামী দুই দশকে ভারত ও চীন অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও ভূরাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে—এ বিষয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় বিশ্বের নেতৃত্ব কোনো একক দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং একাধিক প্রভাবশালী শক্তির সহাবস্থানে একটি বহুমাত্রিক ক্ষমতার ভারসাম্য গড়ে উঠতে পারে, যেখানে ভারত ও চীন নিঃসন্দেহে চালকের আসনে থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬


আগামী দুই দশকে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে কি ভারত ও চীন?

প্রকাশের তারিখ : ০৯ আগস্ট ২০২৬

featured Image

বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতার ভরকেন্দ্র দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বৈশ্বিক অর্থনীতি ও কূটনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল, সেখানে এখন ক্রমেই গুরুত্ব বাড়ছে এশিয়ার। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুই দেশ—ভারত ও চীন।

চীন ইতিমধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক উৎপাদনশিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, তরুণ জনসংখ্যা, প্রযুক্তিখাতের সম্প্রসারণ ও ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক প্রভাবের কারণে ভারত ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উঠে আসছে।

তবে প্রশ্ন হলো—আগামী দুই দশকে বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতার ভারসাম্যে ভারত ও চীন কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবে?

অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিল্প উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ক্ষেত্রে চীন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ। গত কয়েক দশকে দেশটি দ্রুত শিল্পায়ন ও রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেমিকন্ডাক্টর ও মহাকাশ গবেষণায় চীনের ব্যাপক বিনিয়োগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে আলোচিত। একই সঙ্গে আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বেইজিং তার কৌশলগত প্রভাবও সম্প্রসারণ করছে। তবে জনসংখ্যার বার্ধক্য, আবাসন খাতের চাপ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা চীনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই কর্মক্ষম জনশক্তি দেশটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, স্টার্টআপ ও মহাকাশ গবেষণায় ভারতের অগ্রগতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বিস্তার ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবাখাতের সম্প্রসারণ দেশটির অর্থনীতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বিশ্বের অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এখন উৎপাদন ও বিনিয়োগের বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে ভারতের দিকে নজর দিচ্ছে। বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার ও ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেশটিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির অপরিহার্য অংশে পরিণত করছে। তবে অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও আয়বৈষম্য কমানো ভারতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

বিশ্ব নেতৃত্ব শুধু অর্থনীতির আকার দিয়ে নির্ধারিত হয় না। সামরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, শিক্ষা ও গবেষণা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, কূটনৈতিক প্রভাব ও সাংস্কৃতিক উপস্থিতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তিগুলোর একটি। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতিও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দুই দশকের বিশ্ব সম্ভবত একক কোনো দেশের নেতৃত্বে পরিচালিত হবে না। বরং এটি হবে একটি বহুমেরু (Multipolar) বিশ্ব, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করবে। সে ক্ষেত্রে চীন ও ভারত হবে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রধান অংশীদার।

আগামী দুই দশকে ভারত ও চীন অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও ভূরাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে—এ বিষয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় বিশ্বের নেতৃত্ব কোনো একক দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং একাধিক প্রভাবশালী শক্তির সহাবস্থানে একটি বহুমাত্রিক ক্ষমতার ভারসাম্য গড়ে উঠতে পারে, যেখানে ভারত ও চীন নিঃসন্দেহে চালকের আসনে থাকবে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত