ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। দিনে-রাতে দুই থেকে তিনবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ঘরে ঘরে অস্বস্তির পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। এতে কারও নাক বন্ধ হচ্ছে, কারও শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, আবার কারও জ্বর আসছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ সমস্যা ও লোডশেডিংয়ের কারণে হৃদরোগীদের শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করা কষ্টকর হয়ে উঠছে। এতে কারও কারও নিউমোনিয়াও হচ্ছে। গরম ও ঠান্ডার মধ্যে দোলাচলে এখন অসুস্থ ব্যক্তিরা আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এ অবস্থায় বেঁচে থাকাটাই যেন ভাগ্যের বিষয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দিনে-রাতে দুই থেকে তিনবার বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার মধ্যে শিশু থেকে বয়স্করা অস্বস্তিতে পড়ছেন। এতে নাক দিয়ে পানি পড়া, শ্বাসতন্ত্রে সমস্যা, প্রসাবে জ্বালাপোড়াসহ নানা উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। অনেকেই শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারছেন না। ফুঁসফুঁসে সমস্যা তো রয়েছেই, হৃদ্রোগীদের জন্য তো এটি আরও বড় ঝুঁকি বলে মন্তব্য করেছেন চিকিৎসকরা।
পুরান পল্টনে সোহান আকবর নামের এক অসুস্থ রোগী বলেন, রাতে পরপর দুবার লোডশেডিং হওয়ার কারণে প্রথমে তার নাক বন্ধ হয়ে যায়। এরপর শ্বাসকষ্ট ও জ্বর হয়। তিনি প্রেসারের রোগী হওয়ায় তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটছে। তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ সেবন করছেন। গত তিন-চার দিনে তার শরীরের অবস্থার অবনতি হয়েছে। তাঁর মতো ঘরে ঘরে অনেক পরিবারের সদস্য নানা কষ্টে দিন কাটছেন।
সেন্ট্রাল রোডের গৃহবধূ বেগম বলেন, তার বাসায় গ্যাস সংকট। গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাসের চুলা না জ্বলায় তারা ঘরে থাকা মাটির চুলায় কাঠের টুকরো (লাকড়ি) দিয়ে রান্না করছেন। কয়েক বছর আগে কিনে জমিয়ে রাখা লাকড়ি দিয়ে বারান্দায় মাটির চুলায় রান্না করতে হচ্ছে।
ধোঁয়া ও ধূলাবালির মধ্যে কোনোক্রমে বসে তরকারি রান্না করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। পরপর কয়েকদিন রান্না করতে গিয়ে ওই নারী অসুস্থ বোধ করছেন। তারপরও রান্না করে খেতে হবে। তার মতো বহু পরিবার এইভাবে গভীর রাতে রান্না করে কোনোক্রমে দিন কাটাচ্ছেন।
রাজধানীর শনির আখড়া এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ হান্নান বলেন, বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার মধ্যে তাদের রাত কাটে। বিদ্যুৎ না থাকলে বাসাজুড়ে অস্থিরতা তৈরি হয়। শিশুরা কান্নাকাটি করতে থাকে। প্রায় সময় এলাকায় বিদ্যুৎ থাকে না। এতে শিশুদের খুব কষ্ট হয়।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ডা. দেবব্রত বণিক বলেন, এখন নগরীতে দুর্বিষহ জীবন চলছে। ঘন ঘন লোডশেডিং, কিছুক্ষণ ফ্যানের নিচে থাকা, আবার এসির মধ্যে থাকা, আবার বন্ধ ঘরে অবস্থান- এসবের কারণে শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে সুস্থ মানুষও অসুস্থ বোধ করছেন। অনেকের নাক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, দেখা দিচ্ছে শ্বাসকষ্ট।
এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে হৃদরোগীদের অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়। শরীরে প্রেসার বেড়ে যায়। শরীর থেকে পানি কমে গেলে কিডনিতে সমস্যা হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে শরীরে নানা সমস্যা দেখা দেয় এবং ক্ষতিকর ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া বাড়ে। এতে পেটব্যথা দেখা দেয়। শরীরে অক্সিজেনের সমস্যাও হয়।
ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের এক সিনিয়র অধ্যাপক জানান, তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে শরীরে ঠান্ডা-কাশি থেকে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। আবার ফ্রিজে রাখা খাবার নষ্ট হচ্ছে। আবার অনেকে ঠান্ডা খাবার খেয়ে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকিতেও পড়তে পারেন।
এই শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন, শিশুদের নিউমোনিয়া, ঠান্ডা, কাশি, অ্যাজমাসহ নানা রোগ হতে পারে। চিকিৎসকদের চেম্বারে এখন ঠান্ডা-কাশির রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালের বহিবিভাগে শিশু রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করে বলেন, সারাদেশে এখন প্রতিদিন হাম ও ডেঙ্গুতে শিশু থেকে বয়স্করা আক্রান্ত হচ্ছেন। এতে মৃত্যুও ঘটছে। আবার অনেকেই হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। নতুন করে ঘন ঘন লোডশেডিং শহর থেকে গ্রাম-গঞ্জ পর্যন্ত ঘরে ঘরে মানুষকে দুর্বিষহ দিন কাটাতে বাধ্য করছে।
লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা মুন্নী বেগম বলেন, বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার মধ্যে তাদের দিন কাটছে। কখনো দিনে, আবার কখনো রাতে বিদ্যুৎ থাকে না। বিদ্যুৎ না থাকলে শিশুদের হাত-পাখা দিয়ে বাতাস করার পরও জ্বালা-যন্ত্রণা থাকে। শিশুরা কান্নাকাটি করে। এইভাবে রাত কাটে।
তবে দিনের বেলায় গ্রাম-গঞ্জের মানুষ ঘরের বাইরে থাকায় খুব সমস্যা না হলেও রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে অস্থিরতা ও শিশুদের কান্নাকাটি শুরু হয়ে যায়। আবার চুরির ভয়ে ঘরের জানালাও রাতে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এইভাবে গ্রাম-গঞ্জের মানুষ লোডশেডিংয়ের কারণে শিশু থেকে বয়স্করা কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।
লোডশেডিংজনিত স্বাস্থ্যগত সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে অনেকেই নাম প্রকাশে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ আগস্ট ২০২৬
ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। দিনে-রাতে দুই থেকে তিনবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ঘরে ঘরে অস্বস্তির পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। এতে কারও নাক বন্ধ হচ্ছে, কারও শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, আবার কারও জ্বর আসছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ সমস্যা ও লোডশেডিংয়ের কারণে হৃদরোগীদের শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করা কষ্টকর হয়ে উঠছে। এতে কারও কারও নিউমোনিয়াও হচ্ছে। গরম ও ঠান্ডার মধ্যে দোলাচলে এখন অসুস্থ ব্যক্তিরা আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এ অবস্থায় বেঁচে থাকাটাই যেন ভাগ্যের বিষয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দিনে-রাতে দুই থেকে তিনবার বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার মধ্যে শিশু থেকে বয়স্করা অস্বস্তিতে পড়ছেন। এতে নাক দিয়ে পানি পড়া, শ্বাসতন্ত্রে সমস্যা, প্রসাবে জ্বালাপোড়াসহ নানা উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। অনেকেই শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারছেন না। ফুঁসফুঁসে সমস্যা তো রয়েছেই, হৃদ্রোগীদের জন্য তো এটি আরও বড় ঝুঁকি বলে মন্তব্য করেছেন চিকিৎসকরা।
পুরান পল্টনে সোহান আকবর নামের এক অসুস্থ রোগী বলেন, রাতে পরপর দুবার লোডশেডিং হওয়ার কারণে প্রথমে তার নাক বন্ধ হয়ে যায়। এরপর শ্বাসকষ্ট ও জ্বর হয়। তিনি প্রেসারের রোগী হওয়ায় তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটছে। তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ সেবন করছেন। গত তিন-চার দিনে তার শরীরের অবস্থার অবনতি হয়েছে। তাঁর মতো ঘরে ঘরে অনেক পরিবারের সদস্য নানা কষ্টে দিন কাটছেন।
সেন্ট্রাল রোডের গৃহবধূ বেগম বলেন, তার বাসায় গ্যাস সংকট। গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাসের চুলা না জ্বলায় তারা ঘরে থাকা মাটির চুলায় কাঠের টুকরো (লাকড়ি) দিয়ে রান্না করছেন। কয়েক বছর আগে কিনে জমিয়ে রাখা লাকড়ি দিয়ে বারান্দায় মাটির চুলায় রান্না করতে হচ্ছে।
ধোঁয়া ও ধূলাবালির মধ্যে কোনোক্রমে বসে তরকারি রান্না করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। পরপর কয়েকদিন রান্না করতে গিয়ে ওই নারী অসুস্থ বোধ করছেন। তারপরও রান্না করে খেতে হবে। তার মতো বহু পরিবার এইভাবে গভীর রাতে রান্না করে কোনোক্রমে দিন কাটাচ্ছেন।
রাজধানীর শনির আখড়া এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ হান্নান বলেন, বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার মধ্যে তাদের রাত কাটে। বিদ্যুৎ না থাকলে বাসাজুড়ে অস্থিরতা তৈরি হয়। শিশুরা কান্নাকাটি করতে থাকে। প্রায় সময় এলাকায় বিদ্যুৎ থাকে না। এতে শিশুদের খুব কষ্ট হয়।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ডা. দেবব্রত বণিক বলেন, এখন নগরীতে দুর্বিষহ জীবন চলছে। ঘন ঘন লোডশেডিং, কিছুক্ষণ ফ্যানের নিচে থাকা, আবার এসির মধ্যে থাকা, আবার বন্ধ ঘরে অবস্থান- এসবের কারণে শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে সুস্থ মানুষও অসুস্থ বোধ করছেন। অনেকের নাক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, দেখা দিচ্ছে শ্বাসকষ্ট।
এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে হৃদরোগীদের অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়। শরীরে প্রেসার বেড়ে যায়। শরীর থেকে পানি কমে গেলে কিডনিতে সমস্যা হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে শরীরে নানা সমস্যা দেখা দেয় এবং ক্ষতিকর ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া বাড়ে। এতে পেটব্যথা দেখা দেয়। শরীরে অক্সিজেনের সমস্যাও হয়।
ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের এক সিনিয়র অধ্যাপক জানান, তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে শরীরে ঠান্ডা-কাশি থেকে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। আবার ফ্রিজে রাখা খাবার নষ্ট হচ্ছে। আবার অনেকে ঠান্ডা খাবার খেয়ে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকিতেও পড়তে পারেন।
এই শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন, শিশুদের নিউমোনিয়া, ঠান্ডা, কাশি, অ্যাজমাসহ নানা রোগ হতে পারে। চিকিৎসকদের চেম্বারে এখন ঠান্ডা-কাশির রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালের বহিবিভাগে শিশু রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করে বলেন, সারাদেশে এখন প্রতিদিন হাম ও ডেঙ্গুতে শিশু থেকে বয়স্করা আক্রান্ত হচ্ছেন। এতে মৃত্যুও ঘটছে। আবার অনেকেই হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। নতুন করে ঘন ঘন লোডশেডিং শহর থেকে গ্রাম-গঞ্জ পর্যন্ত ঘরে ঘরে মানুষকে দুর্বিষহ দিন কাটাতে বাধ্য করছে।
লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা মুন্নী বেগম বলেন, বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার মধ্যে তাদের দিন কাটছে। কখনো দিনে, আবার কখনো রাতে বিদ্যুৎ থাকে না। বিদ্যুৎ না থাকলে শিশুদের হাত-পাখা দিয়ে বাতাস করার পরও জ্বালা-যন্ত্রণা থাকে। শিশুরা কান্নাকাটি করে। এইভাবে রাত কাটে।
তবে দিনের বেলায় গ্রাম-গঞ্জের মানুষ ঘরের বাইরে থাকায় খুব সমস্যা না হলেও রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে অস্থিরতা ও শিশুদের কান্নাকাটি শুরু হয়ে যায়। আবার চুরির ভয়ে ঘরের জানালাও রাতে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এইভাবে গ্রাম-গঞ্জের মানুষ লোডশেডিংয়ের কারণে শিশু থেকে বয়স্করা কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।
লোডশেডিংজনিত স্বাস্থ্যগত সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে অনেকেই নাম প্রকাশে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

আপনার মতামত লিখুন