সংবাদ

৩০% নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পোশাক খাতের ব্যয় কমবে ১৫.৭%: সিপিডি


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১২ পিএম

৩০% নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পোশাক খাতের ব্যয় কমবে ১৫.৭%: সিপিডি

  • জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিএসআরইএ, পেট্রোবাংলাসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান

দেশের পোশাক কারখানাগুলোর বিদ্যুৎ চাহিদার ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণ করা গেলে গড় মাসিক জ্বালানি ব্যয় '১৫ দশমিক ৭ শতাংশ' কমানো সম্ভব। ৩৫০টি তৈরি পোশাক কারখানার তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

র‌বিবার ( ১৬ আগস্ট) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে সিপিডি। রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক ইনে ‘পোশাক খাতে শিল্প কার্বন নিঃসরণ হ্রাসকরণ বিষয়ক আলোচনা: কীভাবে এটিকে এগিয়ে নেওয়া যায়?’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা পোশাকশিল্পের ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি তৈরি করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের চাপও বাড়ছে। এ কারণে পোশাকশিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়ার গতি বাড়ানো জরুরি।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, চলমান গ্যাস–সংকট আরও বাড়তে পারে। এতে পোশাকশিল্পসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে ব্যয়ের চাপ বাড়বে।

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে শুধু আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভর করা টেকসই হবে না।’

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, তৈরি পোশাকশিল্পের সংগঠন বিজিএমইএ ইতিমধ্যে সদস্য কারখানাগুলোকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহিত করছে। তবে এ বিষয়ে কারখানাগুলোকে অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত বিকল্প সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য দেওয়া প্রয়োজন।

ছাদ সৌরবিদ্যুতে কমতে পারে ব্যয়

সিপিডির হিসাবে, 'কোনো কারখানার বিদ্যুৎ চাহিদার ৩০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা গেলে ওই কারখানার গড় মাসিক জ্বালানি ব্যয় ৯ লাখ ৯৮ হাজার ১৯০ টাকা থেকে কমে ৮ লাখ ৪৬ হাজার ৪৩৫ টাকায় নামতে পারে। এতে ব্যয় কমবে ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ।'

এমনকি বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা গেলেও গড় মাসিক ব্যয় '৫ দশমিক ৫ শতাংশ' কমতে পারে।

গবেষণায় ১ হাজার সম্ভাব্য পরিস্থিতি ধরে করা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করলে ৯৬ শতাংশ কারখানায় মাসিক জ্বালানি ব্যয়ের ওঠানামা কমতে পারে।

তবে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে এখনই ওয়াশিং ও ডাইংয়ের মতো কাজে ব্যবহৃত গ্যাসচালিত বয়লার পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে সিপিডি।

এসব কাজে জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণও বেশি। তাই নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের পাশাপাশি কম জ্বালানি ব্যবহার করে এমন প্রযুক্তি এবং শিল্পের তাপ উৎপাদনের বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণার পরামর্শ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ইউরোপিয়ান ক্রেতাদের চাপ বাড়ছে

পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাজ্যের নতুন পরিবেশগত বিধিনিষেধের কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের হাতে বেশি সময় নেই।

বিজিএমইএর সহসভাপতি ও দেশ গার্মেন্টস লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক বিদিয়া অমৃত খান বলেন, প্রচলিত জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়া এখন বৈশ্বিক প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আগামী কয়েক বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের একাধিক নির্দেশনা ও বিধিমালা কার্যকর হবে, যেখানে জ্বালানি রূপান্তরের বিষয়টি রয়েছে। তাই আমাদের হাতে সময় খুবই কম।’

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগে কর ও অতিরিক্ত ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বিদিয়া অমৃত খান বলেন, ‘আমরা অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ ভ্যাট ছাড়াই শূন্য শতাংশ কর চাই। সরকার যদি শূন্য শতাংশ করের দিকে যায়, তাহলে এনবিআর কেন এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখছে না?’

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, সরকার ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের লক্ষ্য ঠিক করলেও কিছু নীতিগত বাধা রয়ে গেছে।

সৌরপ্রযুক্তির ওপর করের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এনবিআরের এসআরও এখনো একটি বড় বাধা। সৌরপ্রযুক্তির ওপর ৫০ শতাংশের বেশি ভ্যাট রয়ে গেছে।’

এসব বাধা দূর করতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারকে ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়ে এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে না পারলে আমরা আরও বড় জ্বালানি বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ইইউর অনেক বিধিমালা রয়েছে। আমাদের অনেক তহবিল আছে, কিন্তু সেগুলো সহজলভ্য নয়। এসব তহবিলে কীভাবে প্রবেশাধিকার পাওয়া যায়, সেই পথ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।’

ছোট কারখানায় দক্ষতার ঘাটতি বেশি

সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, বড় কারখানার তুলনায় ছোট কারখানাগুলোতে জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা কম।

সবচেয়ে ছোট কারখানাগুলোর জ্বালানি সাশ্রয়ের সম্ভাব্য ঘাটতি ৫৭ দশমিক ৩ শতাংশ। বড় কারখানার ক্ষেত্রে এই ঘাটতি ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। পুরোনো যন্ত্রপাতি এবং ছোট কারখানাগুলোর অর্থায়নসংকটকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

একই কাজের বিভিন্ন যন্ত্রের মধ্যেও জ্বালানি ব্যবহারে বড় পার্থক্য রয়েছে।

একটি ব্যান্ড-নাইফ কাটিং মেশিন প্রতি ইউনিট উৎপাদনে লেজার কাটিং মেশিনের তুলনায় প্রায় ৩০০ গুণ বেশি জ্বালানি ব্যবহার করে। আবার একটি বাটনহোল মেশিন সবচেয়ে দক্ষ সেলাই মেশিনের তুলনায় প্রায় ১৪০ গুণ বেশি জ্বালানি ব্যবহার করে।

সিপিডির হিসাবে, ৩৫০টি কারখানায় যন্ত্রপাতি উন্নত বা পরিবর্তন করা গেলে কারখানাপ্রতি গড়ে ১০ দশমিক ১৭ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব।

তবে এর জন্য বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। ৫০ শতাংশ কারখানায় এই পরিবর্তন আনতে প্রায় ৬ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা এবং সব কারখানায় করতে প্রায় ১৩ হাজার ২০৯ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।

সিপিডি বলেছে, শুধু যন্ত্রপাতি পরিবর্তন করে পোশাকশিল্পের কার্বন নিঃসরণ বড় মাত্রায় কমানো সম্ভব নয়। কারণ, পোশাক কারখানার মোট যন্ত্রপাতির ৮৫ দশমিক ২ শতাংশই সেলাই বিভাগের, যার বড় অংশ সহজে পরিবর্তন করা যায় না।

বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রস্তাব

ডিবিএল গ্রুপের প্রধান সাসটেইনেবিলিটি কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের ডিকার্বনাইজেশনের প্রধান উপায় হতে পারে সৌরবিদ্যুৎ।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য ডিকার্বনাইজেশনের মূল সমাধানই হলো সৌর নবায়নযোগ্য জ্বালানি।’

ভারত, পাকিস্তান ও ভিয়েতনাম নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে এগিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ তাদের কাছে পোশাকের ক্রয়াদেশ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জাহিদুল্লাহ বলেন, বড় পরিবর্তনের জন্য শুধু কারখানাভিত্তিক রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ যথেষ্ট নয়। বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব প্রয়োজন।

তার প্রস্তাব, বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সরকার জমির ব্যবস্থা করতে পারে এবং শিল্প খাত সম্মিলিতভাবে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারে।

অর্থায়ন বড় বাধা

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে শুরুতেই বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন, নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে তথ্যের ঘাটতি, বিনিয়োগের টাকা ফেরত পেতে দীর্ঘ সময় এবং ঝুঁকি নেওয়ার অনীহা। ছোট কারখানাগুলো এ সমস্যায় বেশি পড়ছে।

সিপিডি বেসরকারি বিনিয়োগ, সহজ শর্তের ঋণ ও সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত ঋণের সমন্বয়ে অর্থায়ন বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজ ও মানসম্মত মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর পরামর্শ দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো এখন সরবরাহকারী কারখানার কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক অবকাঠামোয় অতিরিক্ত বিনিয়োগ ভবিষ্যতে অকার্যকর হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে সিপিডি।

সংস্থাটি রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ বাড়ানো, নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতিতে প্রণোদনা, শিল্পের তাপ উৎপাদনের বিকল্প প্রযুক্তি, নিয়মিত জ্বালানি নিরীক্ষা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার সুপারিশ করেছে।

সিপিডির মতে, তৈরি পোশাকশিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়। উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বর্তমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করতে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিএসআরইএ, পেট্রোবাংলাসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি যৌথ কমিটির আওতায় এনে একসঙ্গে বসে সংকটের সমাধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের পথে থাকা বাধাগুলো দূর করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

/শামীম রিজভী

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬


৩০% নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পোশাক খাতের ব্যয় কমবে ১৫.৭%: সিপিডি

প্রকাশের তারিখ : ১৬ আগস্ট ২০২৬

featured Image

  • জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিএসআরইএ, পেট্রোবাংলাসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান

দেশের পোশাক কারখানাগুলোর বিদ্যুৎ চাহিদার ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণ করা গেলে গড় মাসিক জ্বালানি ব্যয় '১৫ দশমিক ৭ শতাংশ' কমানো সম্ভব। ৩৫০টি তৈরি পোশাক কারখানার তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

র‌বিবার ( ১৬ আগস্ট) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে সিপিডি। রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক ইনে ‘পোশাক খাতে শিল্প কার্বন নিঃসরণ হ্রাসকরণ বিষয়ক আলোচনা: কীভাবে এটিকে এগিয়ে নেওয়া যায়?’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা পোশাকশিল্পের ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি তৈরি করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের চাপও বাড়ছে। এ কারণে পোশাকশিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়ার গতি বাড়ানো জরুরি।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, চলমান গ্যাস–সংকট আরও বাড়তে পারে। এতে পোশাকশিল্পসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে ব্যয়ের চাপ বাড়বে।

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে শুধু আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভর করা টেকসই হবে না।’

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, তৈরি পোশাকশিল্পের সংগঠন বিজিএমইএ ইতিমধ্যে সদস্য কারখানাগুলোকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহিত করছে। তবে এ বিষয়ে কারখানাগুলোকে অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত বিকল্প সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য দেওয়া প্রয়োজন।

ছাদ সৌরবিদ্যুতে কমতে পারে ব্যয়

সিপিডির হিসাবে, 'কোনো কারখানার বিদ্যুৎ চাহিদার ৩০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা গেলে ওই কারখানার গড় মাসিক জ্বালানি ব্যয় ৯ লাখ ৯৮ হাজার ১৯০ টাকা থেকে কমে ৮ লাখ ৪৬ হাজার ৪৩৫ টাকায় নামতে পারে। এতে ব্যয় কমবে ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ।'

এমনকি বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা গেলেও গড় মাসিক ব্যয় '৫ দশমিক ৫ শতাংশ' কমতে পারে।

গবেষণায় ১ হাজার সম্ভাব্য পরিস্থিতি ধরে করা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করলে ৯৬ শতাংশ কারখানায় মাসিক জ্বালানি ব্যয়ের ওঠানামা কমতে পারে।

তবে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে এখনই ওয়াশিং ও ডাইংয়ের মতো কাজে ব্যবহৃত গ্যাসচালিত বয়লার পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে সিপিডি।

এসব কাজে জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণও বেশি। তাই নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের পাশাপাশি কম জ্বালানি ব্যবহার করে এমন প্রযুক্তি এবং শিল্পের তাপ উৎপাদনের বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণার পরামর্শ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ইউরোপিয়ান ক্রেতাদের চাপ বাড়ছে

পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাজ্যের নতুন পরিবেশগত বিধিনিষেধের কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের হাতে বেশি সময় নেই।

বিজিএমইএর সহসভাপতি ও দেশ গার্মেন্টস লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক বিদিয়া অমৃত খান বলেন, প্রচলিত জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়া এখন বৈশ্বিক প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আগামী কয়েক বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের একাধিক নির্দেশনা ও বিধিমালা কার্যকর হবে, যেখানে জ্বালানি রূপান্তরের বিষয়টি রয়েছে। তাই আমাদের হাতে সময় খুবই কম।’

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগে কর ও অতিরিক্ত ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বিদিয়া অমৃত খান বলেন, ‘আমরা অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ ভ্যাট ছাড়াই শূন্য শতাংশ কর চাই। সরকার যদি শূন্য শতাংশ করের দিকে যায়, তাহলে এনবিআর কেন এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখছে না?’

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, সরকার ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের লক্ষ্য ঠিক করলেও কিছু নীতিগত বাধা রয়ে গেছে।

সৌরপ্রযুক্তির ওপর করের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এনবিআরের এসআরও এখনো একটি বড় বাধা। সৌরপ্রযুক্তির ওপর ৫০ শতাংশের বেশি ভ্যাট রয়ে গেছে।’

এসব বাধা দূর করতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারকে ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়ে এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে না পারলে আমরা আরও বড় জ্বালানি বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ইইউর অনেক বিধিমালা রয়েছে। আমাদের অনেক তহবিল আছে, কিন্তু সেগুলো সহজলভ্য নয়। এসব তহবিলে কীভাবে প্রবেশাধিকার পাওয়া যায়, সেই পথ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।’

ছোট কারখানায় দক্ষতার ঘাটতি বেশি

সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, বড় কারখানার তুলনায় ছোট কারখানাগুলোতে জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা কম।

সবচেয়ে ছোট কারখানাগুলোর জ্বালানি সাশ্রয়ের সম্ভাব্য ঘাটতি ৫৭ দশমিক ৩ শতাংশ। বড় কারখানার ক্ষেত্রে এই ঘাটতি ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। পুরোনো যন্ত্রপাতি এবং ছোট কারখানাগুলোর অর্থায়নসংকটকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

একই কাজের বিভিন্ন যন্ত্রের মধ্যেও জ্বালানি ব্যবহারে বড় পার্থক্য রয়েছে।

একটি ব্যান্ড-নাইফ কাটিং মেশিন প্রতি ইউনিট উৎপাদনে লেজার কাটিং মেশিনের তুলনায় প্রায় ৩০০ গুণ বেশি জ্বালানি ব্যবহার করে। আবার একটি বাটনহোল মেশিন সবচেয়ে দক্ষ সেলাই মেশিনের তুলনায় প্রায় ১৪০ গুণ বেশি জ্বালানি ব্যবহার করে।

সিপিডির হিসাবে, ৩৫০টি কারখানায় যন্ত্রপাতি উন্নত বা পরিবর্তন করা গেলে কারখানাপ্রতি গড়ে ১০ দশমিক ১৭ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব।

তবে এর জন্য বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। ৫০ শতাংশ কারখানায় এই পরিবর্তন আনতে প্রায় ৬ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা এবং সব কারখানায় করতে প্রায় ১৩ হাজার ২০৯ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।

সিপিডি বলেছে, শুধু যন্ত্রপাতি পরিবর্তন করে পোশাকশিল্পের কার্বন নিঃসরণ বড় মাত্রায় কমানো সম্ভব নয়। কারণ, পোশাক কারখানার মোট যন্ত্রপাতির ৮৫ দশমিক ২ শতাংশই সেলাই বিভাগের, যার বড় অংশ সহজে পরিবর্তন করা যায় না।

বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রস্তাব

ডিবিএল গ্রুপের প্রধান সাসটেইনেবিলিটি কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের ডিকার্বনাইজেশনের প্রধান উপায় হতে পারে সৌরবিদ্যুৎ।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য ডিকার্বনাইজেশনের মূল সমাধানই হলো সৌর নবায়নযোগ্য জ্বালানি।’

ভারত, পাকিস্তান ও ভিয়েতনাম নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে এগিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ তাদের কাছে পোশাকের ক্রয়াদেশ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জাহিদুল্লাহ বলেন, বড় পরিবর্তনের জন্য শুধু কারখানাভিত্তিক রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ যথেষ্ট নয়। বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব প্রয়োজন।

তার প্রস্তাব, বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সরকার জমির ব্যবস্থা করতে পারে এবং শিল্প খাত সম্মিলিতভাবে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারে।

অর্থায়ন বড় বাধা

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে শুরুতেই বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন, নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে তথ্যের ঘাটতি, বিনিয়োগের টাকা ফেরত পেতে দীর্ঘ সময় এবং ঝুঁকি নেওয়ার অনীহা। ছোট কারখানাগুলো এ সমস্যায় বেশি পড়ছে।

সিপিডি বেসরকারি বিনিয়োগ, সহজ শর্তের ঋণ ও সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত ঋণের সমন্বয়ে অর্থায়ন বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজ ও মানসম্মত মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর পরামর্শ দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো এখন সরবরাহকারী কারখানার কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক অবকাঠামোয় অতিরিক্ত বিনিয়োগ ভবিষ্যতে অকার্যকর হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে সিপিডি।

সংস্থাটি রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ বাড়ানো, নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতিতে প্রণোদনা, শিল্পের তাপ উৎপাদনের বিকল্প প্রযুক্তি, নিয়মিত জ্বালানি নিরীক্ষা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার সুপারিশ করেছে।

সিপিডির মতে, তৈরি পোশাকশিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়। উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বর্তমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করতে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিএসআরইএ, পেট্রোবাংলাসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি যৌথ কমিটির আওতায় এনে একসঙ্গে বসে সংকটের সমাধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের পথে থাকা বাধাগুলো দূর করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

/শামীম রিজভী


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত