বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৯১ সাল ছিল গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসানের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ওই বছরই অনুষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। তবে জনগণের সরাসরি ভোটে নয় বরং জনগণের দ্বারা নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটেই নির্বাচিত হন রাষ্ট্রপতি।
১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান
বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের
মনোনীত সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট। ৩৩০ সদস্যের সংসদে
ভোট দেন ২৬৪ জন সদস্য।
কেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল?
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকারের পতনের পর
বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তার নেতৃত্বাধীন
অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার অধীনে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন
অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংসদে বিএনপির ছিল ১৪০টি, আওয়ামী
লীগের ৮৮টি, জাতীয় পার্টির ৩৫টি, জামায়াতে
ইসলামীর ১৮টি, বাকশালের ৫টি এবং সিপিবির ৫টি আসন। সংসদে
সংরক্ষিত নারী আসন ছিল ৩০টি।
কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি ওই নির্বাচনে। পরে জামায়াতের
সমর্থন নিয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার গঠন করে।
এরপর ১৯৯১ সালের আগস্টে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে আবার সংসদীয়
সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হয়। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক
প্রধান হলেও নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী। সংবিধানের ৪৮
অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার কথা সংসদ সদস্যদের ভোটে।
ফলে অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের স্থলে একজন
নিয়মিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই প্রয়োজনেই অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১
সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।
কবে হয়েছিল নির্বাচন?
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর। ৯ অক্টোবরে দৈনিক সংবাদের খবরে বলা হয়, ‘সংসদ কক্ষে স্পিকারের বিশাল চেয়ারটির বদলে একটি ছোট চেয়ার বসানো হয়। এতে উপবিষ্ট ছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। ঠিক বেলা ২টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়।’ খবরে বলা হয়, ২টা তিন মিনিটে খালেদা জিয়ার ভোটদানের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল ভোটগ্রহণ। এরপর আব্দুর রহমান বিশ্বাস, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকারসহ বিএনপি প্রার্থীরা একে একে ভোট দেন।
জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদকক্ষে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। নির্বাচন
পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুর রউফ।
ভোটগ্রহণ শেষে গণনা করা হয় এবং সন্ধ্যার দিকে ফলাফল ঘোষণা করা হয়।
আবদুর রহমান বিশ্বাস পরদিন, ৯ অক্টোবর ১৯৯১, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতির
কার্যালয়ের সরকারি তালিকাতেও তার দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ ৯ অক্টোবর ১৯৯১ উল্লেখ
রয়েছে।
প্রার্থী ছিলেন যারা
১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল দুজনের মধ্যে। তারা
হলেন –
আবদুর রহমান বিশ্বাস – বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)
তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি তাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়। তিনি তখন জাতীয়
সংসদের স্পিকারও ছিলেন।
বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী – বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
আওয়ামী লীগ বিরোধী দল হিসেবে সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে
প্রার্থী করে।
এ কারণে নির্বাচনটি ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। পরবর্তী রাষ্ট্রপতি
নির্বাচনগুলোর অধিকাংশের মতো এটি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন ছিল না।
যারা ভোট দিয়েছিলেন
১৯৯১ সালের সংসদে মোট সদস্য ছিলেন ৩৩০ জন–৩০০ সাধারণ আসনের পাশাপাশি ৩০টি সংরক্ষিত নারী আসন ছিল।
এর মধ্যে ২৬৪ জন সংসদ সদস্য
ভোট দেন এবং ৬৬ জন ভোট দেননি। ভোট দেওয়া প্রত্যেক সদস্যের একটি করে ভোট ছিল। রাষ্ট্রপতি
নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী এই ভোট ছিল প্রকাশ্য
ভোট।
ফলাফল ছিল–
|
প্রার্থী |
দল |
ভোট |
|
আবদুর রহমান বিশ্বাস |
বিএনপি |
১৭২ |
|
বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী |
আওয়ামী লীগ |
৯২ |
|
মোট ভোট |
২৬৪ |
আবদুর রহমান বিশ্বাস বিএনপির ১৭০ সংসদ সদস্যের পাশাপাশি দুজন স্বতন্ত্র সংসদ
সদস্যের ভোট পান। তারা ছিলেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও নুরুল ইসলাম মনি।
অন্যদিকে বদরুল হায়দার চৌধুরী আওয়ামী লীগের ৯১ জন সদস্যের ভোট পান। এর সঙ্গে
গণতন্ত্রী পার্টির সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ভোটও যোগ হয়। আওয়ামী লীগের সংসদ
সদস্য আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু তখন বিদেশে থাকায় ভোট দিতে পারেননি।
ভোটের একটি বিশেষ দিক
১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু ফলাফলের কারণে নয়, ভোট দেওয়ার পদ্ধতির কারণেও আলোচিত হয়ে আছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ১০ ধারায়
বলা হয়েছিল, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে নির্বাচিত হবেন এবং প্রত্যেক সংসদ সদস্যের থাকবে একটি ভোট।
সেদিন সংসদকক্ষেই ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। সংসদ সদস্যদের বিভক্তি নম্বর
অনুযায়ী কয়েকটি ভাগে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের
কর্মকর্তারা ভোট গ্রহণ করেন এবং দলগুলোর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
এই প্রকাশ্য ভোট নিয়ে সে সময় বিরোধী দলের মধ্যে আপত্তিও দেখা দিয়েছিল। কারণ
সংসদ সদস্য কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা গোপন ব্যালটের মতো পুরোপুরি গোপন থাকছিল না।
কেন ১৭২ ভোট পেলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস?
এর মূল কারণ ছিল পঞ্চম জাতীয় সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ১৯৯১ সালের
নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি সাধারণ আসন পায়। সংরক্ষিত নারী আসন যুক্ত হওয়ার পর সংসদে
বিএনপির সদস্যসংখ্যা দাঁড়ায় ১৭০। ফলে নিজেদের দলের সব সদস্যের সমর্থন পেলে বিএনপি
প্রার্থীর জয় প্রায় নিশ্চিত ছিল।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৮৮টি সাধারণ আসন এবং সংরক্ষিত আসনসহ তাদের মোট
সদস্যসংখ্যা ছিল ৯২। ফলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীও নিজের দলের প্রায় সব সদস্যের ভোট
পান।
১৯৯১ সালে আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পরদিন দৈনিক সংবাদের প্রথম পাতা। ছবি: সংগৃহীত
জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ
কয়েকটি দলের সদস্যরা ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। মোট ৬৬ জন ভোট না দেওয়ায় তাদের
ভোট ফলাফলে কোনো প্রার্থীর পক্ষে যোগ হয়নি।
জনগণের ভোটে নির্বাচিত তিন রাষ্ট্রপতি
১৯৭২ সালের সংবিধানে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান রাখা
হয়েছিল। পরবর্তীতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরাসরি
ভোটের ব্যবস্থা চালু করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালে সাধারণ ভোটারদের সরাসরি
ভোটে প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জিয়াউর রহমান। এরপর ১৯৮১ ও ১৯৮৬ সালেও সাধারণ
ভোটারদের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৭৮ সালের নির্বাচনে জিয়াউর রহমান প্রায় ৭৭ শতাংশ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি
নির্বাচিত হন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জেনারেল এম এ জি ওসমানী আওয়ামী লীগসহ
অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সমর্থন নিয়ে প্রায় ২২ শতাংশ ভোট পান।
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর আবার
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে বিচারপতি
আবদুস সাত্তার ৬৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী
ড. কামাল হোসেন পান ২৬ শতাংশ ভোট।
এরপর বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে সরিয়ে সামরিক শাসক হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন
এইচ এম এরশাদ। তার শাসনামলে ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই
নির্বাচনে এরশাদ ৮৪ শতাংশ ভোট পেয়েছেন বলে সরকারি ফলাফলে জানানো হয়। তার নিকটতম
প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মাওলানা মুহাম্মদ উল্লাহ (হাফেজ্জী হুজুর), যিনি প্রায় ৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন বলে জানানো হয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের রাজনৈতিক তাৎপর্য
১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসার
একটি প্রতীকী ও সাংবিধানিক ধাপ। এর মাধ্যমে একদিকে বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের
অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের অবসান ঘটে, অন্যদিকে সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকার নতুন অধ্যায় শুরু
হয়।
এই নির্বাচন আরও একটি কারণে ঐতিহাসিক–এটি
ছিল দীর্ঘ সময় পর সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে অনুষ্ঠিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীই
সাধারণত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনটিই
শেষবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হিসেবে ইতিহাসে রয়েছে।
আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এবং ১৯৯৬
সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত এই পদে ছিলেন। রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সরকারি নথিতেও তার
মেয়াদ ৯ অক্টোবর ১৯৯১ থেকে ৯ অক্টোবর ১৯৯৬ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে।
এক নজরে ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৯১ সাল ছিল গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসানের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ওই বছরই অনুষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। তবে জনগণের সরাসরি ভোটে নয় বরং জনগণের দ্বারা নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটেই নির্বাচিত হন রাষ্ট্রপতি।
১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান
বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের
মনোনীত সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট। ৩৩০ সদস্যের সংসদে
ভোট দেন ২৬৪ জন সদস্য।
কেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল?
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকারের পতনের পর
বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তার নেতৃত্বাধীন
অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার অধীনে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন
অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংসদে বিএনপির ছিল ১৪০টি, আওয়ামী
লীগের ৮৮টি, জাতীয় পার্টির ৩৫টি, জামায়াতে
ইসলামীর ১৮টি, বাকশালের ৫টি এবং সিপিবির ৫টি আসন। সংসদে
সংরক্ষিত নারী আসন ছিল ৩০টি।
কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি ওই নির্বাচনে। পরে জামায়াতের
সমর্থন নিয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার গঠন করে।
এরপর ১৯৯১ সালের আগস্টে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে আবার সংসদীয়
সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হয়। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক
প্রধান হলেও নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী। সংবিধানের ৪৮
অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার কথা সংসদ সদস্যদের ভোটে।
ফলে অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের স্থলে একজন
নিয়মিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই প্রয়োজনেই অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১
সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।
কবে হয়েছিল নির্বাচন?
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর। ৯ অক্টোবরে দৈনিক সংবাদের খবরে বলা হয়, ‘সংসদ কক্ষে স্পিকারের বিশাল চেয়ারটির বদলে একটি ছোট চেয়ার বসানো হয়। এতে উপবিষ্ট ছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। ঠিক বেলা ২টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়।’ খবরে বলা হয়, ২টা তিন মিনিটে খালেদা জিয়ার ভোটদানের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল ভোটগ্রহণ। এরপর আব্দুর রহমান বিশ্বাস, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকারসহ বিএনপি প্রার্থীরা একে একে ভোট দেন।
জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদকক্ষে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। নির্বাচন
পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুর রউফ।
ভোটগ্রহণ শেষে গণনা করা হয় এবং সন্ধ্যার দিকে ফলাফল ঘোষণা করা হয়।
আবদুর রহমান বিশ্বাস পরদিন, ৯ অক্টোবর ১৯৯১, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতির
কার্যালয়ের সরকারি তালিকাতেও তার দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ ৯ অক্টোবর ১৯৯১ উল্লেখ
রয়েছে।
প্রার্থী ছিলেন যারা
১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল দুজনের মধ্যে। তারা
হলেন –
আবদুর রহমান বিশ্বাস – বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)
তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি তাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়। তিনি তখন জাতীয়
সংসদের স্পিকারও ছিলেন।
বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী – বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
আওয়ামী লীগ বিরোধী দল হিসেবে সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে
প্রার্থী করে।
এ কারণে নির্বাচনটি ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। পরবর্তী রাষ্ট্রপতি
নির্বাচনগুলোর অধিকাংশের মতো এটি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন ছিল না।
যারা ভোট দিয়েছিলেন
১৯৯১ সালের সংসদে মোট সদস্য ছিলেন ৩৩০ জন–৩০০ সাধারণ আসনের পাশাপাশি ৩০টি সংরক্ষিত নারী আসন ছিল।
এর মধ্যে ২৬৪ জন সংসদ সদস্য
ভোট দেন এবং ৬৬ জন ভোট দেননি। ভোট দেওয়া প্রত্যেক সদস্যের একটি করে ভোট ছিল। রাষ্ট্রপতি
নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী এই ভোট ছিল প্রকাশ্য
ভোট।
ফলাফল ছিল–
|
প্রার্থী |
দল |
ভোট |
|
আবদুর রহমান বিশ্বাস |
বিএনপি |
১৭২ |
|
বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী |
আওয়ামী লীগ |
৯২ |
|
মোট ভোট |
২৬৪ |
আবদুর রহমান বিশ্বাস বিএনপির ১৭০ সংসদ সদস্যের পাশাপাশি দুজন স্বতন্ত্র সংসদ
সদস্যের ভোট পান। তারা ছিলেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও নুরুল ইসলাম মনি।
অন্যদিকে বদরুল হায়দার চৌধুরী আওয়ামী লীগের ৯১ জন সদস্যের ভোট পান। এর সঙ্গে
গণতন্ত্রী পার্টির সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ভোটও যোগ হয়। আওয়ামী লীগের সংসদ
সদস্য আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু তখন বিদেশে থাকায় ভোট দিতে পারেননি।
ভোটের একটি বিশেষ দিক
১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু ফলাফলের কারণে নয়, ভোট দেওয়ার পদ্ধতির কারণেও আলোচিত হয়ে আছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ১০ ধারায়
বলা হয়েছিল, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে নির্বাচিত হবেন এবং প্রত্যেক সংসদ সদস্যের থাকবে একটি ভোট।
সেদিন সংসদকক্ষেই ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। সংসদ সদস্যদের বিভক্তি নম্বর
অনুযায়ী কয়েকটি ভাগে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের
কর্মকর্তারা ভোট গ্রহণ করেন এবং দলগুলোর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
এই প্রকাশ্য ভোট নিয়ে সে সময় বিরোধী দলের মধ্যে আপত্তিও দেখা দিয়েছিল। কারণ
সংসদ সদস্য কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা গোপন ব্যালটের মতো পুরোপুরি গোপন থাকছিল না।
কেন ১৭২ ভোট পেলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস?
এর মূল কারণ ছিল পঞ্চম জাতীয় সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ১৯৯১ সালের
নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি সাধারণ আসন পায়। সংরক্ষিত নারী আসন যুক্ত হওয়ার পর সংসদে
বিএনপির সদস্যসংখ্যা দাঁড়ায় ১৭০। ফলে নিজেদের দলের সব সদস্যের সমর্থন পেলে বিএনপি
প্রার্থীর জয় প্রায় নিশ্চিত ছিল।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৮৮টি সাধারণ আসন এবং সংরক্ষিত আসনসহ তাদের মোট
সদস্যসংখ্যা ছিল ৯২। ফলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীও নিজের দলের প্রায় সব সদস্যের ভোট
পান।
১৯৯১ সালে আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পরদিন দৈনিক সংবাদের প্রথম পাতা। ছবি: সংগৃহীত
জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ
কয়েকটি দলের সদস্যরা ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। মোট ৬৬ জন ভোট না দেওয়ায় তাদের
ভোট ফলাফলে কোনো প্রার্থীর পক্ষে যোগ হয়নি।
জনগণের ভোটে নির্বাচিত তিন রাষ্ট্রপতি
১৯৭২ সালের সংবিধানে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান রাখা
হয়েছিল। পরবর্তীতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরাসরি
ভোটের ব্যবস্থা চালু করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালে সাধারণ ভোটারদের সরাসরি
ভোটে প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জিয়াউর রহমান। এরপর ১৯৮১ ও ১৯৮৬ সালেও সাধারণ
ভোটারদের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৭৮ সালের নির্বাচনে জিয়াউর রহমান প্রায় ৭৭ শতাংশ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি
নির্বাচিত হন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জেনারেল এম এ জি ওসমানী আওয়ামী লীগসহ
অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সমর্থন নিয়ে প্রায় ২২ শতাংশ ভোট পান।
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর আবার
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে বিচারপতি
আবদুস সাত্তার ৬৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী
ড. কামাল হোসেন পান ২৬ শতাংশ ভোট।
এরপর বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে সরিয়ে সামরিক শাসক হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন
এইচ এম এরশাদ। তার শাসনামলে ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই
নির্বাচনে এরশাদ ৮৪ শতাংশ ভোট পেয়েছেন বলে সরকারি ফলাফলে জানানো হয়। তার নিকটতম
প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মাওলানা মুহাম্মদ উল্লাহ (হাফেজ্জী হুজুর), যিনি প্রায় ৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন বলে জানানো হয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের রাজনৈতিক তাৎপর্য
১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসার
একটি প্রতীকী ও সাংবিধানিক ধাপ। এর মাধ্যমে একদিকে বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের
অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের অবসান ঘটে, অন্যদিকে সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকার নতুন অধ্যায় শুরু
হয়।
এই নির্বাচন আরও একটি কারণে ঐতিহাসিক–এটি
ছিল দীর্ঘ সময় পর সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে অনুষ্ঠিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীই
সাধারণত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনটিই
শেষবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হিসেবে ইতিহাসে রয়েছে।
আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এবং ১৯৯৬
সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত এই পদে ছিলেন। রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সরকারি নথিতেও তার
মেয়াদ ৯ অক্টোবর ১৯৯১ থেকে ৯ অক্টোবর ১৯৯৬ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে।
এক নজরে ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

আপনার মতামত লিখুন