সংবাদ

সীমান্তে মাদক: আড়ালেই গডফাদাররা


বাকী বিল্লাহ
বাকী বিল্লাহ
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৯ পিএম

সীমান্তে মাদক: আড়ালেই গডফাদাররা

পর্যটন জেলা কক্সবাজারের সীমান্ত এলাকা দিয়ে পাশের দেশ মিয়ানমার থেকে বস্তায় বস্তায় ঢুকছে মরণনেশা ইয়াবার বিশাল সব চালান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে মাদক কারবারিরা কখনো পাটের বস্তা, আবার কখনো জেলের ছদ্মবেশে মাছের ঝুড়িতে করে আনছে এই বিপুল পরিমাণ মাদক।

সীমান্ত পার হয়ে এই ইয়াবা চলে যাচ্ছে দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জে। তবে একের পর এক চালান আটক হলেও এই ধ্বংসাত্মক সিন্ডিকেটের নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী গডফাদাররা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

উখিয়ায় বিজিবির অভিযান

সীমান্ত দিয়ে মাদকের বড় চালান প্রবেশের খবর পেয়ে সম্প্রতি বিশেষ অভিযান চালায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বিজিবি সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে উখিয়ার বালুখালী পালংখালীর বিজিবি টহল দল যৌথভাবে স্থানীয় আঞ্জুমানপাড়া ফাইসাখালী এলাকায় অবস্থান নেয়।

গভীর রাতে থেকে জনের একটি সন্দেহভাজন দলকে মিয়ানমার সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে দেখে বিজিবির সদস্যরা। টহল দল তাদের চ্যালেঞ্জ করলে চোরাকারবারিরা হাতে থাকা ৫টি বস্তা ফেলে রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে ফেলে যাওয়া বস্তাগুলো তল্লাশি করে নীল রঙের বায়ুরোধী প্যাকেটে মোড়ানো মোট লাখ ৭২ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়।

মাছের ঝুড়িতে মিললো লাখো ইয়াবা

বিজিবির চোখ ফাঁকি দিতে একের পর এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করছে চোরাচালানকারীরা। উখিয়া ব্যাটালিয়নের (৬৪ বিজিবি) অধীনস্থ পালংখালী এলাকায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে উলুবনিয়া বিএসপি পোস্টের কাছে মিয়ানমার দিক থেকে আসা জন ব্যক্তিকে জেলের ছদ্মবেশে দুটি মাছের ঝুড়ি হাতে প্রবেশ করতে দেখে বিজিবি।

টহল দল তাদের চ্যালেঞ্জ করলে তারা ঝুড়ি ফেলে রেখে পাশের গ্রামে পালিয়ে যায়। পরে সেই মাছের ঝুড়ি তল্লাশি করে নীল রঙের বায়ুরোধী প্যাকেট থেকে আরও লাখ ৩০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

উখিয়া বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, "উদ্ধারকৃত ইয়াবার চালানের সঙ্গে জড়িত সরবরাহকারী চোরাকারবারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা নজরদারি তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে।"

তিনি আরও জানান, সীমান্ত নিরাপত্তা বজায় রাখতে এবং মাদকসহ সব ধরনের অবৈধ কার্যক্রম দমনে বিজিবি সার্বক্ষণিক সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

সীমান্ত ছাড়িয়ে দিনাজপুরে সাপের বিষ উদ্ধার

মাদকের পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক চোরাচালান প্রতিরোধেও তৎপর রয়েছে বিজিবি। সম্প্রতি দিনাজপুর চিরিরবন্দর উপজেলায় অভিযান চালিয়ে একটি আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের চার সদস্যকে আটক করেছে বিজিবি।

তাদের কাছ থেকে কেজি ৭০০ গ্রাম সাপের বিষ, একটি প্রাইভেটকার, ২টি মোটরসাইকেল, ৪টি মোবাইল ফোন ৬টি সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত এই সাপের বিষের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। আদালতের নির্দেশে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হলে উদ্ধারকৃত তরল সাপের বিষ হিসেবেই শনাক্ত হয়।

দিনাজপুর ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল্লাহ আল মঈন হাসান জানান, "দেশের অতি মূল্যবান সম্পদ বন্যপ্রাণীজাত পণ্যসহ যেকোনো অবৈধ দ্রব্যের পাচার ঠেকাতে বিজিবি সর্বদা সতর্ক তৎপর রয়েছে।"

গডফাদাররা অধরা, গ্রাম থেকে শহরে জালের মতো বিস্তার

সীমান্তে বিজিবির তৎপরতায় কোটি কোটি টাকার ইয়াবা চোরাচালানি পণ্য আটক হলেও মূল হোতারা সবসময় অন্তরালেই থেকে যাচ্ছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযানে কেবল বাহক বা দিনমজুররাই মাঝে মধ্যে ধরা পড়ে, কিন্তু অর্থ জোগানদাতা প্রভাবশালী গডফাদারদের আইনের আওতায় না আনায় এই ব্যবসা থামানো যাচ্ছে না। একসময় রাজধানী বা শহরকেন্দ্রিক মাদকের প্রভাব থাকলেও এখন তা প্রান্তিক গ্রাম-গঞ্জ, এমনকি অটোরিকশা চালক থেকে শুরু করে সাধারণ দিনমজুরদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।

তবে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সারা দেশে মাদক উদ্ধারে নিয়মিত মামলা দায়ের কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বার্তা অনুযায়ী, অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, কাউকেই কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।

 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬


সীমান্তে মাদক: আড়ালেই গডফাদাররা

প্রকাশের তারিখ : ২২ আগস্ট ২০২৬

featured Image

পর্যটন জেলা কক্সবাজারের সীমান্ত এলাকা দিয়ে পাশের দেশ মিয়ানমার থেকে বস্তায় বস্তায় ঢুকছে মরণনেশা ইয়াবার বিশাল সব চালান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে মাদক কারবারিরা কখনো পাটের বস্তা, আবার কখনো জেলের ছদ্মবেশে মাছের ঝুড়িতে করে আনছে এই বিপুল পরিমাণ মাদক।

সীমান্ত পার হয়ে এই ইয়াবা চলে যাচ্ছে দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জে। তবে একের পর এক চালান আটক হলেও এই ধ্বংসাত্মক সিন্ডিকেটের নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী গডফাদাররা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

উখিয়ায় বিজিবির অভিযান

সীমান্ত দিয়ে মাদকের বড় চালান প্রবেশের খবর পেয়ে সম্প্রতি বিশেষ অভিযান চালায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বিজিবি সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে উখিয়ার বালুখালী পালংখালীর বিজিবি টহল দল যৌথভাবে স্থানীয় আঞ্জুমানপাড়া ফাইসাখালী এলাকায় অবস্থান নেয়।

গভীর রাতে থেকে জনের একটি সন্দেহভাজন দলকে মিয়ানমার সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে দেখে বিজিবির সদস্যরা। টহল দল তাদের চ্যালেঞ্জ করলে চোরাকারবারিরা হাতে থাকা ৫টি বস্তা ফেলে রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে ফেলে যাওয়া বস্তাগুলো তল্লাশি করে নীল রঙের বায়ুরোধী প্যাকেটে মোড়ানো মোট লাখ ৭২ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়।

মাছের ঝুড়িতে মিললো লাখো ইয়াবা

বিজিবির চোখ ফাঁকি দিতে একের পর এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করছে চোরাচালানকারীরা। উখিয়া ব্যাটালিয়নের (৬৪ বিজিবি) অধীনস্থ পালংখালী এলাকায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে উলুবনিয়া বিএসপি পোস্টের কাছে মিয়ানমার দিক থেকে আসা জন ব্যক্তিকে জেলের ছদ্মবেশে দুটি মাছের ঝুড়ি হাতে প্রবেশ করতে দেখে বিজিবি।

টহল দল তাদের চ্যালেঞ্জ করলে তারা ঝুড়ি ফেলে রেখে পাশের গ্রামে পালিয়ে যায়। পরে সেই মাছের ঝুড়ি তল্লাশি করে নীল রঙের বায়ুরোধী প্যাকেট থেকে আরও লাখ ৩০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

উখিয়া বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, "উদ্ধারকৃত ইয়াবার চালানের সঙ্গে জড়িত সরবরাহকারী চোরাকারবারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা নজরদারি তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে।"

তিনি আরও জানান, সীমান্ত নিরাপত্তা বজায় রাখতে এবং মাদকসহ সব ধরনের অবৈধ কার্যক্রম দমনে বিজিবি সার্বক্ষণিক সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

সীমান্ত ছাড়িয়ে দিনাজপুরে সাপের বিষ উদ্ধার

মাদকের পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক চোরাচালান প্রতিরোধেও তৎপর রয়েছে বিজিবি। সম্প্রতি দিনাজপুর চিরিরবন্দর উপজেলায় অভিযান চালিয়ে একটি আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের চার সদস্যকে আটক করেছে বিজিবি।

তাদের কাছ থেকে কেজি ৭০০ গ্রাম সাপের বিষ, একটি প্রাইভেটকার, ২টি মোটরসাইকেল, ৪টি মোবাইল ফোন ৬টি সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত এই সাপের বিষের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। আদালতের নির্দেশে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হলে উদ্ধারকৃত তরল সাপের বিষ হিসেবেই শনাক্ত হয়।

দিনাজপুর ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল্লাহ আল মঈন হাসান জানান, "দেশের অতি মূল্যবান সম্পদ বন্যপ্রাণীজাত পণ্যসহ যেকোনো অবৈধ দ্রব্যের পাচার ঠেকাতে বিজিবি সর্বদা সতর্ক তৎপর রয়েছে।"

গডফাদাররা অধরা, গ্রাম থেকে শহরে জালের মতো বিস্তার

সীমান্তে বিজিবির তৎপরতায় কোটি কোটি টাকার ইয়াবা চোরাচালানি পণ্য আটক হলেও মূল হোতারা সবসময় অন্তরালেই থেকে যাচ্ছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযানে কেবল বাহক বা দিনমজুররাই মাঝে মধ্যে ধরা পড়ে, কিন্তু অর্থ জোগানদাতা প্রভাবশালী গডফাদারদের আইনের আওতায় না আনায় এই ব্যবসা থামানো যাচ্ছে না। একসময় রাজধানী বা শহরকেন্দ্রিক মাদকের প্রভাব থাকলেও এখন তা প্রান্তিক গ্রাম-গঞ্জ, এমনকি অটোরিকশা চালক থেকে শুরু করে সাধারণ দিনমজুরদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।

তবে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সারা দেশে মাদক উদ্ধারে নিয়মিত মামলা দায়ের কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বার্তা অনুযায়ী, অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, কাউকেই কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।

 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত