সংবাদ

মাদকের নীল থাবায় আপনজনই যখন শিকার


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০১:০৪ পিএম

মাদকের নীল থাবায় আপনজনই যখন শিকার
ছবি: এআই

মাদক শুধু একজন মানুষকে ধ্বংস করে না, কখনো কখনো তার নীল ছোবল পৌঁছে যায় সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটিতেও- নিজের ঘরে। মাদকের টাকা, মাদক সেবনে বাধা কিংবা মাদকজনিত সন্দেহ ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী কিংবা সন্তানসহ আপনজনেরাই। দেশের বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি হত্যাকাণ্ড সেই ভয়াবহ বাস্তবতারই সাক্ষ্য দেয়।

সাম্প্রতিক সময়ে রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনা সেই তালিকায় নতুন করে আতঙ্ক যোগ করেছে। গত ২৩ আগস্ট রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ১২ বছরের ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই যুবক তাদের হত্যা করেছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এর মাত্র কয়েক দিন আগে, গত ১৪ আগস্ট ঝিনাইদহের মহেশপুরে শখের বানু (৫৭) নামের এক নারীকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ ওঠে তার ছেলে ইখলাসুর রহমানের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানিয়েছে, মাদক সেবন ও মাদকের টাকা নিয়ে মা-ছেলের মধ্যে বিরোধ ছিল। ঘটনার পর ইখলাসুরকে আটক করা হয়।

ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে। কিন্তু গত এক দশকের সংবাদপত্রের পাতা ঘাঁটলে দেখা যায়, একই ধরনের অভিযোগ বারবার ফিরে এসেছে। কখনো মাদকের টাকা না পেয়ে মা খুন, কখনো মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় বাবা-মা খুন, আবার কখনো মাদকজনিত সহিংসতার শিকার হয়েছে শিশুরা।

২০১৩ সালে রাজধানীর চামেলীবাগে পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্ন রহমান হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল। তাদের মেয়ে ঐশী রহমানকে এই হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় মাদকসেবন ও মাদকসংক্রান্ত পারিবারিক দ্বন্দ্বের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

সামাজিক অপরাধ বাড়াচ্ছে মাদকাসক্তি

এরপর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একই ধরনের বহু ঘটনা সংবাদে এসেছে। ২০২০ সালে সাতক্ষীরার কলারোয়ায় একটি পরিবারের চার সদস্য- ভাই, ভাবি ও তাদের দুই শিশুসন্তান- হত্যার ঘটনা ঘটে। ২০২১ সালে কুষ্টিয়ার মিরপুরে মাদকের টাকা না পেয়ে ঘুমন্ত বাবা-মায়ের ঘরে আগুন দেওয়ার এবং পরে বাবাকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে ছেলের বিরুদ্ধে। একই বছর বরিশালের বাকেরগঞ্জে মাদকের টাকা ও পারিবারিক বিরোধের জেরে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী হত্যার ঘটনাও সংবাদে আসে।

২০২২ সালে পাবনার চাটমোহরে মাদকাসক্ত এক যুবকের বিরুদ্ধে প্রতিবেশীর মাত্র পাঁচ মাস বয়সী শিশুকে মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিয়ে আছাড় দিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। একই বছর মাদারীপুরে মাদকের টাকা নিয়ে মাকে মারধরের একপর্যায়ে তার মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

২০২৩ সালেও এমন ঘটনা থামেনি। চট্টগ্রামের পটিয়ায় দাদি ও ফুফুকে হত্যার অভিযোগ ওঠে এক যুবকের বিরুদ্ধে। ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে মাদকের টাকা না দেওয়ায় ঘুমন্ত দাদাকে কুড়াল দিয়ে হত্যার অভিযোগ আসে। বগুড়ায় চুরি করতে গিয়ে খালা জেগে ওঠায় তাকে হত্যা করার অভিযোগ ওঠে এক মাদকাসক্ত ভাগ্নের বিরুদ্ধে। নরসিংদীর রায়পুরায় দেড় বছরের শিশুকন্যাকে হত্যা করার অভিযোগ ওঠে তার বাবার বিরুদ্ধে।

২০২৪ সালেও তালিকাটি দীর্ঘ হয়েছে। টেকনাফে মাদকের টাকা না পেয়ে মাকে হত্যার অভিযোগ, খুলনায় মাদকের টাকা নিয়ে বিরোধে বাবাকে ইট দিয়ে আঘাত করে হত্যার অভিযোগ এবং গাজীপুরে বৃদ্ধা নানিকে হত্যা করে টাকা-স্বর্ণ নেওয়ার অভিযোগ- এসব ঘটনা দেখিয়েছে, মাদকের অর্থের কাছে কখনো কখনো পারিবারিক সম্পর্কও কতটা অসহায় হয়ে পড়ে।

শুধু ঘরের মানুষ নয়, মাদকজনিত সহিংসতার শিকার হতে হয়েছে পথচারীদেরও। রাজধানীর ডেমরায় মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনায় শিশুসহ পথচারী নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অর্থাৎ মাদকের ঝুঁকি শুধু একজন ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত ঝুঁকি নয়; তার আচরণে অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে পুরো সমাজ।

বাংলাদেশে মাদকের গল্প নতুন নয়। তবে এর চরিত্র বদলেছে বারবার। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ইতিহাসে দেখা যায়, এ দেশে আফিম, গাঁজা ও মদের ব্যবহার ছিল বহু পুরোনো। ব্রিটিশ আমলে আফিমের চাষ, বাণিজ্য ও বিক্রিকে ঘিরে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও গড়ে উঠেছিল। পরে কোকেনসহ বিভিন্ন মাদকের বিস্তার ঠেকাতে ১৯৩০ সালে ‘ডেঞ্জারাস ড্রাগস অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করা হয়।

উচ্চ শিক্ষিতরাও ঝুঁকে পড়েছে মাদকে

স্বাধীনতার পর মাদকের ধরন বদলাতে থাকে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭০ সাল পর্যন্ত দেশে মূলত গাঁজা, আফিম ও মদ ব্যবহৃত হতো। এরপর নতুন নতুন মাদক যুক্ত হতে থাকে-আশির দশকে হেরোইন, নব্বইয়ের দশকে ফেনসিডিল, ২০০০ সালের দিকে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ এবং ২০০৫ সালের পর ইয়াবার বিস্তার শুরু হয়।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায় মাদকের ভৌগোলিক মানচিত্রও। একসময় মাদকের সমস্যা মূলত শহরকেন্দ্রিক ছিল। ঢাকার বস্তি, অপরাধপ্রবণ এলাকা ও নগরের নির্দিষ্ট আড্ডা থেকে ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে জেলা শহর, মহাসড়কঘেঁষা জনপদ এবং প্রত্যন্ত গ্রামে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে, শুরুতে মাদকাসক্তি শহুরে জীবনে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে তা গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে।

ভৌগোলিক অবস্থান এই বিস্তারের বড় কারণ। বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনের প্রধান দেশ না হলেও একদিকে ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত, অন্যদিকে মিয়ানমারের সীমান্ত এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাদক উৎপাদন অঞ্চলগুলোর কাছাকাছি অবস্থান দেশটিকে পাচারের ঝুঁকিতে রেখেছে। গাঁজা ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক ভারতের সীমান্ত দিয়ে আসে; ইয়াবার প্রধান উৎস মিয়ানমার।

ইয়াবা এই বিস্তারের চিত্রটিই সবচেয়ে নাটকীয়ভাবে বদলে দিয়েছে। ২০০৯ সালের পর ইয়াবার বিস্তার দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০২২ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবা দেশের ‘প্রতিটি প্রান্তে’ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ওই বছর টেকনাফে একেকটি ইয়াবা আটকের ঘটনায় গড়ে ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার এবং ঢাকায় ২০০ থেকে ৫ হাজার বড়ি পাওয়া গেছে।

অর্থাৎ মাদকের পথটিও যেন বদলে গেছে- সীমান্ত থেকে শহর, শহর থেকে জেলা, জেলা থেকে গ্রাম, আর গ্রাম থেকে পরিবারের দরজা পর্যন্ত। একসময় যে সমস্যা দূরের কোনো বস্তি, অপরাধী চক্র কিংবা নগরের অন্ধকার গলির বলে মনে করা হতো, এখন তার অভিঘাত পৌঁছে গেছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শোবার ঘরেও।

আর সেখানেই মাদকের সবচেয়ে ভয়ংকর রূপটি দেখা যাচ্ছে- মাদক কেনার টাকা না পেয়ে সন্তান মাকে হত্যা করছে, মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় বাবা-মা খুন হচ্ছেন, আবার কখনো মাদকজনিত সহিংসতার শিকার হচ্ছে শিশু। মাদকের বিস্তার তাই এখন আর শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়; এটি ধীরে ধীরে বাংলাদেশের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর ভেতরেও ঢুকে পড়া এক গভীর সংকট।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মাদকাসক্তিকে শুধু ‘খারাপ অভ্যাস’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে মেথামফেটামিনজাতীয় মাদক- যেমন ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ- দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের পুরস্কারব্যবস্থা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আত্মসংযমের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে বাস্তবতা বিচার করার ক্ষমতা দুর্বল হওয়া, সন্দেহপ্রবণতা, আবেগের বিস্ফোরণ ও আক্রমণাত্মক আচরণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তবে মাদকাসক্ত হলেই কেউ খুনি হয়ে যায়- এমন সরল সিদ্ধান্তও বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। অপরাধের পেছনে ব্যক্তির মানসিক অবস্থা, পারিবারিক পরিবেশ, পূর্বের সহিংস আচরণ, অর্থনৈতিক চাপ, অপরাধী চক্র এবং মাদকের ধরন ও মাত্রাসহ একাধিক কারণ কাজ করে।

শুধু অভিযান দিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। মাদকের সরবরাহ বন্ধ করতে সীমান্ত ও চোরাচালানবিরোধী কঠোর ব্যবস্থা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানো। পরিবারের সদস্যদেরও বুঝতে হবে- মাদকাসক্তিকে লুকিয়ে রাখা বা বারবার টাকা দিয়ে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সমাধান নয়।

মেধা ক্ষয় করে দিচ্ছে মাদক।

একই সঙ্গে তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞানচর্চা ও যুক্তিবাদী বিনোদনের পরিসর বাড়াতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাদকবিরোধী প্রচারণাও হতে হবে ভয় দেখানোর বদলে বিজ্ঞানভিত্তিক ও আকর্ষণীয়। কারণ মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু পুলিশের নয়। এটি পরিবার, চিকিৎসাব্যবস্থা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্র- সব পক্ষের লড়াই।

রংপুরের চারটি নিথর মুখ কিংবা ঝিনাইদহের শখের বানুর রক্তাক্ত শরীর তাই শুধু দুটি হত্যাকাণ্ডের খবর নয়। এগুলো সমাজের জন্য সতর্কবার্তা- মাদক যখন ঘরে ঢোকে, তখন সবচেয়ে কাছের মানুষটিও কখনো কখনো সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়ে।  মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ দরকার। সীমান্তেও মাদকের পথ বন্ধ করা জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি, পরিবারের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া নেশাটিকে সেখানেই থামিয়ে দেওয়া।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬


মাদকের নীল থাবায় আপনজনই যখন শিকার

প্রকাশের তারিখ : ২৬ আগস্ট ২০২৬

featured Image

মাদক শুধু একজন মানুষকে ধ্বংস করে না, কখনো কখনো তার নীল ছোবল পৌঁছে যায় সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটিতেও- নিজের ঘরে। মাদকের টাকা, মাদক সেবনে বাধা কিংবা মাদকজনিত সন্দেহ ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী কিংবা সন্তানসহ আপনজনেরাই। দেশের বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি হত্যাকাণ্ড সেই ভয়াবহ বাস্তবতারই সাক্ষ্য দেয়।

সাম্প্রতিক সময়ে রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনা সেই তালিকায় নতুন করে আতঙ্ক যোগ করেছে। গত ২৩ আগস্ট রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ১২ বছরের ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই যুবক তাদের হত্যা করেছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এর মাত্র কয়েক দিন আগে, গত ১৪ আগস্ট ঝিনাইদহের মহেশপুরে শখের বানু (৫৭) নামের এক নারীকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ ওঠে তার ছেলে ইখলাসুর রহমানের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানিয়েছে, মাদক সেবন ও মাদকের টাকা নিয়ে মা-ছেলের মধ্যে বিরোধ ছিল। ঘটনার পর ইখলাসুরকে আটক করা হয়।

ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে। কিন্তু গত এক দশকের সংবাদপত্রের পাতা ঘাঁটলে দেখা যায়, একই ধরনের অভিযোগ বারবার ফিরে এসেছে। কখনো মাদকের টাকা না পেয়ে মা খুন, কখনো মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় বাবা-মা খুন, আবার কখনো মাদকজনিত সহিংসতার শিকার হয়েছে শিশুরা।

২০১৩ সালে রাজধানীর চামেলীবাগে পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্ন রহমান হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল। তাদের মেয়ে ঐশী রহমানকে এই হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় মাদকসেবন ও মাদকসংক্রান্ত পারিবারিক দ্বন্দ্বের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

সামাজিক অপরাধ বাড়াচ্ছে মাদকাসক্তি

এরপর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একই ধরনের বহু ঘটনা সংবাদে এসেছে। ২০২০ সালে সাতক্ষীরার কলারোয়ায় একটি পরিবারের চার সদস্য- ভাই, ভাবি ও তাদের দুই শিশুসন্তান- হত্যার ঘটনা ঘটে। ২০২১ সালে কুষ্টিয়ার মিরপুরে মাদকের টাকা না পেয়ে ঘুমন্ত বাবা-মায়ের ঘরে আগুন দেওয়ার এবং পরে বাবাকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে ছেলের বিরুদ্ধে। একই বছর বরিশালের বাকেরগঞ্জে মাদকের টাকা ও পারিবারিক বিরোধের জেরে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী হত্যার ঘটনাও সংবাদে আসে।

২০২২ সালে পাবনার চাটমোহরে মাদকাসক্ত এক যুবকের বিরুদ্ধে প্রতিবেশীর মাত্র পাঁচ মাস বয়সী শিশুকে মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিয়ে আছাড় দিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। একই বছর মাদারীপুরে মাদকের টাকা নিয়ে মাকে মারধরের একপর্যায়ে তার মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

২০২৩ সালেও এমন ঘটনা থামেনি। চট্টগ্রামের পটিয়ায় দাদি ও ফুফুকে হত্যার অভিযোগ ওঠে এক যুবকের বিরুদ্ধে। ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে মাদকের টাকা না দেওয়ায় ঘুমন্ত দাদাকে কুড়াল দিয়ে হত্যার অভিযোগ আসে। বগুড়ায় চুরি করতে গিয়ে খালা জেগে ওঠায় তাকে হত্যা করার অভিযোগ ওঠে এক মাদকাসক্ত ভাগ্নের বিরুদ্ধে। নরসিংদীর রায়পুরায় দেড় বছরের শিশুকন্যাকে হত্যা করার অভিযোগ ওঠে তার বাবার বিরুদ্ধে।

২০২৪ সালেও তালিকাটি দীর্ঘ হয়েছে। টেকনাফে মাদকের টাকা না পেয়ে মাকে হত্যার অভিযোগ, খুলনায় মাদকের টাকা নিয়ে বিরোধে বাবাকে ইট দিয়ে আঘাত করে হত্যার অভিযোগ এবং গাজীপুরে বৃদ্ধা নানিকে হত্যা করে টাকা-স্বর্ণ নেওয়ার অভিযোগ- এসব ঘটনা দেখিয়েছে, মাদকের অর্থের কাছে কখনো কখনো পারিবারিক সম্পর্কও কতটা অসহায় হয়ে পড়ে।

শুধু ঘরের মানুষ নয়, মাদকজনিত সহিংসতার শিকার হতে হয়েছে পথচারীদেরও। রাজধানীর ডেমরায় মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনায় শিশুসহ পথচারী নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অর্থাৎ মাদকের ঝুঁকি শুধু একজন ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত ঝুঁকি নয়; তার আচরণে অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে পুরো সমাজ।

বাংলাদেশে মাদকের গল্প নতুন নয়। তবে এর চরিত্র বদলেছে বারবার। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ইতিহাসে দেখা যায়, এ দেশে আফিম, গাঁজা ও মদের ব্যবহার ছিল বহু পুরোনো। ব্রিটিশ আমলে আফিমের চাষ, বাণিজ্য ও বিক্রিকে ঘিরে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও গড়ে উঠেছিল। পরে কোকেনসহ বিভিন্ন মাদকের বিস্তার ঠেকাতে ১৯৩০ সালে ‘ডেঞ্জারাস ড্রাগস অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করা হয়।

উচ্চ শিক্ষিতরাও ঝুঁকে পড়েছে মাদকে

স্বাধীনতার পর মাদকের ধরন বদলাতে থাকে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭০ সাল পর্যন্ত দেশে মূলত গাঁজা, আফিম ও মদ ব্যবহৃত হতো। এরপর নতুন নতুন মাদক যুক্ত হতে থাকে-আশির দশকে হেরোইন, নব্বইয়ের দশকে ফেনসিডিল, ২০০০ সালের দিকে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ এবং ২০০৫ সালের পর ইয়াবার বিস্তার শুরু হয়।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায় মাদকের ভৌগোলিক মানচিত্রও। একসময় মাদকের সমস্যা মূলত শহরকেন্দ্রিক ছিল। ঢাকার বস্তি, অপরাধপ্রবণ এলাকা ও নগরের নির্দিষ্ট আড্ডা থেকে ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে জেলা শহর, মহাসড়কঘেঁষা জনপদ এবং প্রত্যন্ত গ্রামে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে, শুরুতে মাদকাসক্তি শহুরে জীবনে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে তা গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে।

ভৌগোলিক অবস্থান এই বিস্তারের বড় কারণ। বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনের প্রধান দেশ না হলেও একদিকে ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত, অন্যদিকে মিয়ানমারের সীমান্ত এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাদক উৎপাদন অঞ্চলগুলোর কাছাকাছি অবস্থান দেশটিকে পাচারের ঝুঁকিতে রেখেছে। গাঁজা ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক ভারতের সীমান্ত দিয়ে আসে; ইয়াবার প্রধান উৎস মিয়ানমার।

ইয়াবা এই বিস্তারের চিত্রটিই সবচেয়ে নাটকীয়ভাবে বদলে দিয়েছে। ২০০৯ সালের পর ইয়াবার বিস্তার দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০২২ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবা দেশের ‘প্রতিটি প্রান্তে’ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ওই বছর টেকনাফে একেকটি ইয়াবা আটকের ঘটনায় গড়ে ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার এবং ঢাকায় ২০০ থেকে ৫ হাজার বড়ি পাওয়া গেছে।

অর্থাৎ মাদকের পথটিও যেন বদলে গেছে- সীমান্ত থেকে শহর, শহর থেকে জেলা, জেলা থেকে গ্রাম, আর গ্রাম থেকে পরিবারের দরজা পর্যন্ত। একসময় যে সমস্যা দূরের কোনো বস্তি, অপরাধী চক্র কিংবা নগরের অন্ধকার গলির বলে মনে করা হতো, এখন তার অভিঘাত পৌঁছে গেছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শোবার ঘরেও।

আর সেখানেই মাদকের সবচেয়ে ভয়ংকর রূপটি দেখা যাচ্ছে- মাদক কেনার টাকা না পেয়ে সন্তান মাকে হত্যা করছে, মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় বাবা-মা খুন হচ্ছেন, আবার কখনো মাদকজনিত সহিংসতার শিকার হচ্ছে শিশু। মাদকের বিস্তার তাই এখন আর শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়; এটি ধীরে ধীরে বাংলাদেশের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর ভেতরেও ঢুকে পড়া এক গভীর সংকট।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মাদকাসক্তিকে শুধু ‘খারাপ অভ্যাস’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে মেথামফেটামিনজাতীয় মাদক- যেমন ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ- দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের পুরস্কারব্যবস্থা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আত্মসংযমের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে বাস্তবতা বিচার করার ক্ষমতা দুর্বল হওয়া, সন্দেহপ্রবণতা, আবেগের বিস্ফোরণ ও আক্রমণাত্মক আচরণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তবে মাদকাসক্ত হলেই কেউ খুনি হয়ে যায়- এমন সরল সিদ্ধান্তও বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। অপরাধের পেছনে ব্যক্তির মানসিক অবস্থা, পারিবারিক পরিবেশ, পূর্বের সহিংস আচরণ, অর্থনৈতিক চাপ, অপরাধী চক্র এবং মাদকের ধরন ও মাত্রাসহ একাধিক কারণ কাজ করে।

শুধু অভিযান দিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। মাদকের সরবরাহ বন্ধ করতে সীমান্ত ও চোরাচালানবিরোধী কঠোর ব্যবস্থা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানো। পরিবারের সদস্যদেরও বুঝতে হবে- মাদকাসক্তিকে লুকিয়ে রাখা বা বারবার টাকা দিয়ে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সমাধান নয়।

মেধা ক্ষয় করে দিচ্ছে মাদক।

একই সঙ্গে তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞানচর্চা ও যুক্তিবাদী বিনোদনের পরিসর বাড়াতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাদকবিরোধী প্রচারণাও হতে হবে ভয় দেখানোর বদলে বিজ্ঞানভিত্তিক ও আকর্ষণীয়। কারণ মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু পুলিশের নয়। এটি পরিবার, চিকিৎসাব্যবস্থা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্র- সব পক্ষের লড়াই।

রংপুরের চারটি নিথর মুখ কিংবা ঝিনাইদহের শখের বানুর রক্তাক্ত শরীর তাই শুধু দুটি হত্যাকাণ্ডের খবর নয়। এগুলো সমাজের জন্য সতর্কবার্তা- মাদক যখন ঘরে ঢোকে, তখন সবচেয়ে কাছের মানুষটিও কখনো কখনো সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়ে।  মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ দরকার। সীমান্তেও মাদকের পথ বন্ধ করা জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি, পরিবারের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া নেশাটিকে সেখানেই থামিয়ে দেওয়া।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত