সংবাদ

বৈশ্বিক মাদক অর্থনীতি, অদৃশ্য এক সাম্রাজ্য


মো. জোহান
মো. জোহান
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৩:২৬ পিএম

বৈশ্বিক মাদক অর্থনীতি, অদৃশ্য এক সাম্রাজ্য
মাদকের রুট বিশ্বজুড়েই

এক প্রান্তে আন্দিজ পর্বতমালা, অন্য প্রান্তে মিয়ানমারের শান প্রদেশ। কোথাও আফগানিস্তানের পোস্তখেত, কোথাও মেক্সিকোর গোপন ল্যাবরেটরি, আবার কোথাও ইউরোপের ব্যস্ত সমুদ্রবন্দর। মাঝখানে আছে সাগর, সীমান্ত, যুদ্ধ, দুর্নীতি, কালো টাকা, বন্দুক এবং শত শত কোটি ডলারের লেনদেন। এই পুরো ব্যবস্থাটির নাম- বিশ্বের অবৈধ মাদক অর্থনীতি।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) বলছে, ২০২৪ সালে বিশ্বের আনুমানিক ৩৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ গত এক বছরে কোনো না কোনো মাদক ব্যবহার করেছে। ২০১৪ সালের তুলনায় এই সংখ্যা ৩৪ শতাংশ বেশি। শুধু ক্যানাবিস ব্যবহারকারীর সংখ্যাই আনুমানিক ২৫ কোটি ৬০ লাখ; নন-মেডিকেল ওপিওয়েড ব্যবহারকারী ৬ কোটি ৩০ লাখ। আর কোকেন ব্যবহারকারী প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ।

অন্যদিকে, এই বিপুল চাহিদার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে এমন এক অপরাধ অর্থনীতি। যার বৈশ্বিক খুচরা বিক্রয়মূল্য বছরে শত শত বিলিয়ন ডলার। এই অর্থের বড় অংশ তৈরি হয় খুচরা বাজারে। তবে বিপুল মুনাফা নিয়ন্ত্রণ করে আন্তর্জাতিক ও পাইকারি পর্যায়ের তুলনামূলক কমসংখ্যক অপরাধী নেটওয়ার্ক। 

আফিম থেকে সিনথেটিক ড্রাগ

মাদকবাণিজ্যের ইতিহাস বহু পুরোনো। উনিশ শতকে আফিম বাণিজ্যকে ঘিরে চীন ও ইউরোপীয় শক্তির সংঘাত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গভীর ছাপ ফেলেছিল। ১৯০৯ সালের সাংহাইয়ে আন্তর্জাতিক আফিম কমিশন থেকে আধুনিক আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়। পরে ১৯৬১ সালের সিঙ্গেল কনভেনশন, ১৯৭১ সালের সাইকোট্রফিক সাবস্টেন্সেস কনভেনশন এবং ১৯৮৮ সালের ইলিসিট ট্রাফিক কনভেনশন বর্তমান বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করে।

বিশ্বজুড়ে নেটওয়ার্ক

কিন্তু আইনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলেছে অপরাধী অর্থনীতিও। একসময় মূল সাম্রাজ্য ছিল আফিম ও হেরোইনকে ঘিরে। পরে কোকেন, গাঁজা ও ফেনসাইক্লিডিন-জাতীয় বাজার বিস্তৃত হয়েছে। একবিংশ শতকে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে সিনথেটিক ড্রাগে। কারণটি খুবই সহজ। 

গাছ লাগিয়ে অপেক্ষা করতে হয় না। রাসায়নিক উপাদান থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই বাজারের কাছাকাছি উৎপাদন করা যায়। ফলে উৎপাদন-স্থানের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কমে যায়। পরিবহন ব্যয় কমে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য উৎস শনাক্ত করা কঠিন হয়। ইউএনওডিসি বলছে, বিশ্বজুড়ে সিনথেটিক ড্রাগের বাজার ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে।

২০২৪ সালে অ্যামফেটামিন-টাইপ স্টিমুল্যান্ট (এটিএস) জব্দের পরিমাণ রেকর্ড ৬০৪ টনে পৌঁছায়। এর বড় অংশ মেথামফেটামিন।

এক পৃথিবী, বহু মাদকপথ

আন্দিজ থেকে বিশ্ব: কোকেনের সাম্রাজ্যের রুট।  কোকেনের মূল ভৌগোলিক কেন্দ্র দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ অঞ্চল। কলম্বিয়া, পেরু ও বলিভিয়া দীর্ঘদিন ধরে কোকা চাষের প্রধান কেন্দ্র। ২০২৪ সালে বিশ্বে অবৈধ কোকা চাষের পরিমাণ রেকর্ড ৩ লাখ ৮৫ হাজার ১০০ হেক্টরে পৌঁছায়- এক দশক আগের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। একই বছরে সম্ভাব্য কোকেন উৎপাদন দাঁড়ায় প্রায় ৪,১০০ টন।

এখান থেকে কোকেনের প্রধান প্রবাহ যায় উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের দিকে। ইউএনওডিসি-এর ২০২৬ তথ্য অনুযায়ী, ২০২০–২০২৪ সময়ে কলম্বিয়া, পেরু ও ব্রাজিল ছিল বিশ্বব্যাপী কোকেন চালানের প্রধান উৎসদেশ। কলম্বিয়া ও ইকুয়েডর উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ, আর ব্রাজিল ইউরোপের পাশাপাশি আফ্রিকা ও এশিয়ার দিকেও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। কোকেনের বাজার এখন আর শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে সীমাবদ্ধ নেই। আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপের কিছু নতুন বাজারেও চাহিদা বাড়ছে।

হেরোইনের পুরোনো মহাসড়ক

ইউএনওডিসির তৎপরতা

বিশ্বের অন্যতম ঐতিহাসিক মাদকপথ হলো তথাকথিত বলকান রুট। আফগানিস্তান থেকে উৎপাদিত আফিমজাত মাদক ইরান ও তুরস্ক হয়ে ইউরোপের দিকে যায়। ২০২৬ সালের ইউএনওডিসি বিশ্লেষণ বলছে, ২০১৯–২০২২ সময়ে এই রুটে মাদক পাচারের মোট অবৈধ বার্ষিক আয় আনুমানিক ১৩.৯ থেকে ২১.৪ বিলিয়ন ডলার ছিল। এর প্রায় ৯০ শতাংশই এসেছে ওপিয়েট থেকে।

তবে আফগানিস্তানে পোস্তচাষে নিষেধাজ্ঞার পর বিশ্ব আফিম অর্থনীতির মানচিত্র বদলে গেছে। ২০২৫ সালে বিশ্বে অবৈধ আফিম উৎপাদন প্রায় ২,১০০ টনে নেমে আসে- ২০২২ সালের তুলনায় ৭০ শতাংশের বেশি কম। একই সময়ে মিয়ানমার বিশ্বের সবচেয়ে বড় আফিম উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে।

গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল

মিয়ানমারের শান রাজ্য, লাওস ও থাইল্যান্ডকে ঘিরে দীর্ঘদিনের ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ আফিমের জন্য পরিচিত হলেও এখন এর আরেকটি ভয়ংকর পরিচয় তৈরি হয়েছে- মেথামফেটামিনের বিশাল উৎপাদনকেন্দ্র। ২০২৪ সালে এশিয়ায় মেথামফেটামিন জব্দের পরিমাণ রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছায়। বিশ্বের মোট মেথামফেটামিন জব্দের প্রায় ৪৮ শতাংশই ছিল পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। 

এখানে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো- অপরাধী নেটওয়ার্ক এখন শুধু মাদক বিক্রি করে না; তারা উৎপাদন, সরবরাহ, স্থানীয় অর্থনীতি ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে পুরো অঞ্চলের ওপর প্রভাব তৈরি করে। ইউএনওডিসি-এর বিশ্লেষণে দেখা যায়, মিয়ানমারের সংঘাত ও মাদক অর্থনীতি একে অপরকে শক্তিশালী করছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মাদক থেকে অর্থ পায়, আবার সংঘাত ও দুর্বল রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ মাদক অর্থনীতিকে আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ দেয়।

মাফিয়া থেকে শিল্প

উত্তর আমেরিকার মাদক অর্থনীতির কেন্দ্রে রয়েছে মেক্সিকো। বিশেষ করে মেথামফেটামিন ও ফেন্টানিলের ক্ষেত্রে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ও সরবরাহকেন্দ্র। ইউএনওডিসি-এর ২০২৬ তথ্য বলছে, উত্তর আমেরিকায় অবৈধভাবে সরবরাহ করা ফেন্টানিলের বড় অংশ মেক্সিকোতেই উৎপাদিত হয় এবং এই অঞ্চলের বাজারেই প্রধানত ব্যবহৃত হয়। এখানে মাদক কারবার আর ঐতিহ্যগত ‘মাফিয়া’ কাঠামোয় সীমাবদ্ধ নেই। এটি ক্রমশ হয়ে উঠেছে একটি বহুমাত্রিক অপরাধ ব্যবসা- যেখানে উৎপাদন, পরিবহন, অর্থপাচার, অস্ত্র, ভয় দেখানো এবং দুর্নীতি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

ট্রানজিটের সাম্রাজ্য

ইউরোপ এখন কেবল মাদকের ভোক্তা বাজার নয়; এটি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। বিশেষ করে বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, স্পেনসহ ইউরোপের বড় বন্দরগুলো কোকেন পাচারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের একটি অভিযানে ইউরোপোল দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইউরোপে আসা কনটেইনারভিত্তিক পাচারের সঙ্গে যুক্ত একটি নেটওয়ার্কের কাছ থেকে ৩৫ টন কোকেন জব্দের কথা জানায়।

ঘরে ঘরে মাদক

সমস্যার গভীরতা বোঝা যায় বন্দরের দুর্বলতা থেকে। ইউরোপের বড় বন্দরগুলোতে বছরে বিপুল সংখ্যক কনটেইনার আসে, কিন্তু সব কনটেইনার পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। অপরাধী নেটওয়ার্কগুলো এই বিশাল বৈধ বাণিজ্যব্যবস্থার ভেতরেই নিজেদের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করে। ইউরোপোল দেখিয়েছে, বন্দরের কর্মী, পরিবহনব্যবস্থা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য বৈধ কাঠামোর দুর্নীতিগ্রস্ত অংশকে কাজে লাগানো হতে পারে।

রাষ্ট্রীয় ঝুঁকি

দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইউরোপের সরাসরি পথ কঠিন হলে অপরাধী নেটওয়ার্ক নতুন মধ্যবর্তী অঞ্চল খুঁজেছে। পশ্চিম আফ্রিকা তার একটি উদাহরণ। ইউএনওডিসি-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দক্ষিণ আমেরিকার কোকেন পশ্চিম আফ্রিকা হয়ে ইউরোপের দিকে প্রবাহিত হয়েছে। এই বাণিজ্য শুধু অপরাধী নেটওয়ার্কের আয় বাড়ায়নি; দুর্বল শাসন, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে এর সম্পর্কও তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ মাদক কখনো শুধু ‘পণ্য’ থাকে না। বড় অর্থের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর এটি স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামোও বদলে দিতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে ক্যাপ্টাগন

মধ্যপ্রাচ্যে মাদক অর্থনীতির আরেকটি আলাদা অধ্যায় হলো ক্যাপ্টাগন। গত এক দশকে সিরিয়া ও লেবাননকে ঘিরে এর উৎপাদন ও পাচার বিস্তার লাভ করে। ২০২০–২০২৪ সময়ে বিশ্বের ক্যাপ্টাগন জব্দের ৭৭ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যে হয়েছে। ২০২৪ সালের সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বড় কয়েকটি উৎপাদনকেন্দ্র ধ্বংস করা হলেও বাজার পুরোপুরি অদৃশ্য হয়নি। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জব্দের তথ্য বলছে, পাচার এখনো চলছে এবং নেটওয়ার্কগুলো পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে।

ট্রামাডল

পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায় মাদক সংকটের একটি ভিন্ন চেহারা দেখা যায়- ট্রামাডলসহ ফার্মাসিউটিক্যাল ওপিওয়েডের অপব্যবহার। ২০২০ থেকে ২০২৪ সময়ে বিশ্বে ট্রামাডল জব্দের পরিমাণ আবার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, বিশেষ করে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায়। এখানে বৈধ ওষুধের সরবরাহব্যবস্থা এবং অবৈধ বাজারের সীমারেখা কখনো অস্পষ্ট হয়ে যায়- যা মাদক নিয়ন্ত্রণকে আরও জটিল করে।

এক কেজি মাদক উৎপাদনের খরচ আর শেষ বাজারে তার মূল্য এক নয়। সীমান্ত পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকি, দুষ্প্রাপ্যতা ও বাজারমূল্য বাড়ে। সবচেয়ে বড় অর্থ তৈরি হয় খুচরা পর্যায়ে। ইউএনওডিসি বলছে, বিশ্বে মাদকবাণিজ্য থেকে বছরে শত শত বিলিয়ন ডলার আয় হয় এবং সংগঠিত অপরাধী গোষ্ঠীর আয়ের বড় অংশ আসে এই ব্যবসা থেকে।

মাদকের নীল থাবা

বালকান রুটের ১৩.৯–২১.৪ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক অবৈধ আয় কিংবা মিয়ানমারের ২০২৪ সালের আফিম অর্থনীতির আনুমানিক ৫৮৯ মিলিয়ন থেকে ১.৫৭ বিলিয়ন ডলারের মূল্য দেখায়- কিছু দেশের অর্থনীতির সঙ্গে এই কালো অর্থনীতি কতটা বড় হয়ে উঠতে পারে। মিয়ানমারে ওই অর্থনীতি দেশটির ২০২৩ সালের জিডিপির আনুমানিক ০.৯ থেকে ২.৪ শতাংশের সমান ছিল। পুরোনো সিনেমার মাফিয়াকে মনে করলে চোখে ভেসে ওঠে বন্দুকধারী কয়েকজন মানুষ। আধুনিক মাদক নেটওয়ার্ক তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

ইউরোপোল-এর ২০২৪ সালের বিশ্লেষণে ইউরোপের ৮২১টি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অপরাধী নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর অর্ধেক মাদক পাচারকে প্রধান বা অন্যতম প্রধান অপরাধ হিসেবে ব্যবহার করছিল; ৭০ শতাংশের বেশি নেটওয়ার্ক দুর্নীতি ব্যবহার করছিল এবং ৬৮ শতাংশ সহিংসতা ও ভয় দেখানোকে কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ব্যবহার করছিল। ২০২৬ সালের নতুন বিশ্লেষণে ইউরোপোল দেখিয়েছে, অপরাধী নেটওয়ার্কগুলো বৈধ ব্যবসা, আর্থিক ব্যবস্থা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অর্থপাচারের কৌশল ব্যবহার করে নিজেদের টিকিয়ে রাখছে। এখানেই মাদকবাণিজ্যের সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি।

অপরাধী নেটওয়ার্ক যত বেশি অর্থ পায়, তত বেশি তারা বৈধ অর্থনীতিতে ঢোকার সুযোগ পায়। পরিবহন, নির্মাণ, আমদানি-রপ্তানি, রিয়েল এস্টেট, বিনোদন কিংবা অন্য ব্যবসার আড়ালে কালো টাকা সাদা করার চেষ্টা হতে পারে। ফলে একসময় ‘অপরাধী’ ও ‘বৈধ ব্যবসায়ী’ অর্থনীতির সীমারেখাও ঝাপসা হয়ে যায়। ইউরোপোল-এর গবেষণা বৈধ ব্যবসা কাঠামোকে অপরাধী নেটওয়ার্কের প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

যুদ্ধ, দুর্নীতি ও রাষ্ট্র

মাদক অর্থনীতি যেখানে শক্তিশালী, সেখানে শুধু অপরাধ বাড়ে না- রাষ্ট্রের সক্ষমতাও ক্ষয়ে যেতে পারে। মিয়ানমারে মাদক অর্থনীতি ও সশস্ত্র সংঘাতের সম্পর্ক তার বড় উদাহরণ। লাতিন আমেরিকার কিছু অঞ্চলেও মাদকগোষ্ঠী স্থানীয় অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর এমন প্রভাব তৈরি করেছে যে তারা কার্যত বিকল্প ক্ষমতাকাঠামোর মতো আচরণ করতে পারে। ইউএনওডিসি বলছে, মাদক পাচারের প্রভাব কোথাও বাণিজ্যকেন্দ্রিক ও লাভনির্ভর, আবার কোথাও সংগঠিত গোষ্ঠীগুলো ভূখণ্ড ও বাজার নিয়ন্ত্রণের দিকে যায়। অর্থাৎ মাদক ব্যবসা রাষ্ট্রকে সবসময় সরাসরি দখল করে না; কখনো তার চেয়েও ভয়ংকরভাবে রাষ্ট্রের দুর্বল জায়গাগুলো দখল করে।

ডার্ক ওয়েব

মাদকের পুরোনো রুট ছিল সড়ক, নদী, সীমান্ত ও সমুদ্র। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল জগত। ইউএনওডিসি-এর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ডার্কনেটভিত্তিক মাদক বিক্রির পরিমাণ আনুমানিক ২.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে খুচরা অনলাইন বিক্রির বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের মাদকপথ শুধু মানচিত্রে আঁকা যাবে না। একটি অংশ থাকবে সমুদ্রপথে, আরেকটি থাকবে এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে।

বাংলাদেশ

বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক মানচিত্রের বাইরে নয়। বরং ভৌগোলিক অবস্থানই দেশটিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাদক উৎপাদন অঞ্চল, ভারতের বিস্তৃত সীমান্ত এবং বঙ্গোপসাগরীয় যোগাযোগব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশকে একই সঙ্গে গন্তব্য, ট্রানজিট ও আঞ্চলিক বাজারের সম্ভাব্য সংযোগস্থল হিসেবে দেখতে হয়।

বিশ্বের মাদকবাজারের বিবর্তন থেকে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো- মাদককে শুধু সীমান্তের সমস্যা ভাবলে চলবে না। কারণ আধুনিক মাদক অর্থনীতি একই সঙ্গে একটি অপরাধ, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, দুর্নীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার সমস্যা। মাদকবিরোধী অভিযান প্রয়োজন। কিন্তু শুধু মাদক জব্দ করে এই সাম্রাজ্য ভাঙা যাবে না।

যে টাকা মাদক থেকে আসে, সেই টাকা কোথায় যায়- তা অনুসরণ করতে হবে। যে ব্যবসায় কালো টাকা ঢোকে, তা শনাক্ত করতে হবে। যে বন্দরে দুর্নীতি হয়, তা ঠেকাতে হবে। যে সশস্ত্র গোষ্ঠী মাদক থেকে অর্থ পায়, তাদের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল করতে হবে। আর যে তরুণ মাদক ব্যবহার করছে, তাকে শুধু অপরাধী হিসেবে নয়, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন থাকা মানুষ হিসেবেও দেখতে হবে।

মাদকের নীল থাবায় নারীরা

বিশ্বের মাদক সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যটি সম্ভবত এখানেই- মাদক আর কোনো একটি দেশের সমস্যা নয়। এটি সীমান্তহীন এক অর্থনীতি।

কোকেনের শুরু আন্দিজে, শেষ হতে পারে ইউরোপে। আফিমের শিকড় মিয়ানমারে, বাজার হতে পারে বহু হাজার কিলোমিটার দূরে। সিনথেটিক মাদকের উৎপাদন বাজারের কাছেই চলে আসতে পারে। টাকা ঢুকতে পারে বৈধ ব্যবসায়। অপরাধী নেটওয়ার্ক ঢুকে যেতে পারে বন্দরে। আর সেই কালো অর্থ কখনো কখনো প্রভাব ফেলতে পারে রাজনীতি, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানেও।

অতএব মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই আসলে একটি প্যাকেট বা একটি চালানের বিরুদ্ধে লড়াই নয়। এটি সেই পুরো অদৃশ্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ- যেখানে নেশা পণ্য, অপরাধ ব্যবসা, টাকা শক্তি এবং দুর্বল রাষ্ট্র সবচেয়ে বড় বাজার।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬


বৈশ্বিক মাদক অর্থনীতি, অদৃশ্য এক সাম্রাজ্য

প্রকাশের তারিখ : ২৬ আগস্ট ২০২৬

featured Image

এক প্রান্তে আন্দিজ পর্বতমালা, অন্য প্রান্তে মিয়ানমারের শান প্রদেশ। কোথাও আফগানিস্তানের পোস্তখেত, কোথাও মেক্সিকোর গোপন ল্যাবরেটরি, আবার কোথাও ইউরোপের ব্যস্ত সমুদ্রবন্দর। মাঝখানে আছে সাগর, সীমান্ত, যুদ্ধ, দুর্নীতি, কালো টাকা, বন্দুক এবং শত শত কোটি ডলারের লেনদেন। এই পুরো ব্যবস্থাটির নাম- বিশ্বের অবৈধ মাদক অর্থনীতি।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) বলছে, ২০২৪ সালে বিশ্বের আনুমানিক ৩৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ গত এক বছরে কোনো না কোনো মাদক ব্যবহার করেছে। ২০১৪ সালের তুলনায় এই সংখ্যা ৩৪ শতাংশ বেশি। শুধু ক্যানাবিস ব্যবহারকারীর সংখ্যাই আনুমানিক ২৫ কোটি ৬০ লাখ; নন-মেডিকেল ওপিওয়েড ব্যবহারকারী ৬ কোটি ৩০ লাখ। আর কোকেন ব্যবহারকারী প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ।

অন্যদিকে, এই বিপুল চাহিদার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে এমন এক অপরাধ অর্থনীতি। যার বৈশ্বিক খুচরা বিক্রয়মূল্য বছরে শত শত বিলিয়ন ডলার। এই অর্থের বড় অংশ তৈরি হয় খুচরা বাজারে। তবে বিপুল মুনাফা নিয়ন্ত্রণ করে আন্তর্জাতিক ও পাইকারি পর্যায়ের তুলনামূলক কমসংখ্যক অপরাধী নেটওয়ার্ক। 

আফিম থেকে সিনথেটিক ড্রাগ

মাদকবাণিজ্যের ইতিহাস বহু পুরোনো। উনিশ শতকে আফিম বাণিজ্যকে ঘিরে চীন ও ইউরোপীয় শক্তির সংঘাত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গভীর ছাপ ফেলেছিল। ১৯০৯ সালের সাংহাইয়ে আন্তর্জাতিক আফিম কমিশন থেকে আধুনিক আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়। পরে ১৯৬১ সালের সিঙ্গেল কনভেনশন, ১৯৭১ সালের সাইকোট্রফিক সাবস্টেন্সেস কনভেনশন এবং ১৯৮৮ সালের ইলিসিট ট্রাফিক কনভেনশন বর্তমান বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করে।

বিশ্বজুড়ে নেটওয়ার্ক

কিন্তু আইনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলেছে অপরাধী অর্থনীতিও। একসময় মূল সাম্রাজ্য ছিল আফিম ও হেরোইনকে ঘিরে। পরে কোকেন, গাঁজা ও ফেনসাইক্লিডিন-জাতীয় বাজার বিস্তৃত হয়েছে। একবিংশ শতকে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে সিনথেটিক ড্রাগে। কারণটি খুবই সহজ। 

গাছ লাগিয়ে অপেক্ষা করতে হয় না। রাসায়নিক উপাদান থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই বাজারের কাছাকাছি উৎপাদন করা যায়। ফলে উৎপাদন-স্থানের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কমে যায়। পরিবহন ব্যয় কমে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য উৎস শনাক্ত করা কঠিন হয়। ইউএনওডিসি বলছে, বিশ্বজুড়ে সিনথেটিক ড্রাগের বাজার ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে।

২০২৪ সালে অ্যামফেটামিন-টাইপ স্টিমুল্যান্ট (এটিএস) জব্দের পরিমাণ রেকর্ড ৬০৪ টনে পৌঁছায়। এর বড় অংশ মেথামফেটামিন।

এক পৃথিবী, বহু মাদকপথ

আন্দিজ থেকে বিশ্ব: কোকেনের সাম্রাজ্যের রুট।  কোকেনের মূল ভৌগোলিক কেন্দ্র দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ অঞ্চল। কলম্বিয়া, পেরু ও বলিভিয়া দীর্ঘদিন ধরে কোকা চাষের প্রধান কেন্দ্র। ২০২৪ সালে বিশ্বে অবৈধ কোকা চাষের পরিমাণ রেকর্ড ৩ লাখ ৮৫ হাজার ১০০ হেক্টরে পৌঁছায়- এক দশক আগের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। একই বছরে সম্ভাব্য কোকেন উৎপাদন দাঁড়ায় প্রায় ৪,১০০ টন।

এখান থেকে কোকেনের প্রধান প্রবাহ যায় উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের দিকে। ইউএনওডিসি-এর ২০২৬ তথ্য অনুযায়ী, ২০২০–২০২৪ সময়ে কলম্বিয়া, পেরু ও ব্রাজিল ছিল বিশ্বব্যাপী কোকেন চালানের প্রধান উৎসদেশ। কলম্বিয়া ও ইকুয়েডর উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ, আর ব্রাজিল ইউরোপের পাশাপাশি আফ্রিকা ও এশিয়ার দিকেও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। কোকেনের বাজার এখন আর শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে সীমাবদ্ধ নেই। আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপের কিছু নতুন বাজারেও চাহিদা বাড়ছে।

হেরোইনের পুরোনো মহাসড়ক

ইউএনওডিসির তৎপরতা

বিশ্বের অন্যতম ঐতিহাসিক মাদকপথ হলো তথাকথিত বলকান রুট। আফগানিস্তান থেকে উৎপাদিত আফিমজাত মাদক ইরান ও তুরস্ক হয়ে ইউরোপের দিকে যায়। ২০২৬ সালের ইউএনওডিসি বিশ্লেষণ বলছে, ২০১৯–২০২২ সময়ে এই রুটে মাদক পাচারের মোট অবৈধ বার্ষিক আয় আনুমানিক ১৩.৯ থেকে ২১.৪ বিলিয়ন ডলার ছিল। এর প্রায় ৯০ শতাংশই এসেছে ওপিয়েট থেকে।

তবে আফগানিস্তানে পোস্তচাষে নিষেধাজ্ঞার পর বিশ্ব আফিম অর্থনীতির মানচিত্র বদলে গেছে। ২০২৫ সালে বিশ্বে অবৈধ আফিম উৎপাদন প্রায় ২,১০০ টনে নেমে আসে- ২০২২ সালের তুলনায় ৭০ শতাংশের বেশি কম। একই সময়ে মিয়ানমার বিশ্বের সবচেয়ে বড় আফিম উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে।

গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল

মিয়ানমারের শান রাজ্য, লাওস ও থাইল্যান্ডকে ঘিরে দীর্ঘদিনের ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ আফিমের জন্য পরিচিত হলেও এখন এর আরেকটি ভয়ংকর পরিচয় তৈরি হয়েছে- মেথামফেটামিনের বিশাল উৎপাদনকেন্দ্র। ২০২৪ সালে এশিয়ায় মেথামফেটামিন জব্দের পরিমাণ রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছায়। বিশ্বের মোট মেথামফেটামিন জব্দের প্রায় ৪৮ শতাংশই ছিল পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। 

এখানে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো- অপরাধী নেটওয়ার্ক এখন শুধু মাদক বিক্রি করে না; তারা উৎপাদন, সরবরাহ, স্থানীয় অর্থনীতি ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে পুরো অঞ্চলের ওপর প্রভাব তৈরি করে। ইউএনওডিসি-এর বিশ্লেষণে দেখা যায়, মিয়ানমারের সংঘাত ও মাদক অর্থনীতি একে অপরকে শক্তিশালী করছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মাদক থেকে অর্থ পায়, আবার সংঘাত ও দুর্বল রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ মাদক অর্থনীতিকে আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ দেয়।

মাফিয়া থেকে শিল্প

উত্তর আমেরিকার মাদক অর্থনীতির কেন্দ্রে রয়েছে মেক্সিকো। বিশেষ করে মেথামফেটামিন ও ফেন্টানিলের ক্ষেত্রে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ও সরবরাহকেন্দ্র। ইউএনওডিসি-এর ২০২৬ তথ্য বলছে, উত্তর আমেরিকায় অবৈধভাবে সরবরাহ করা ফেন্টানিলের বড় অংশ মেক্সিকোতেই উৎপাদিত হয় এবং এই অঞ্চলের বাজারেই প্রধানত ব্যবহৃত হয়। এখানে মাদক কারবার আর ঐতিহ্যগত ‘মাফিয়া’ কাঠামোয় সীমাবদ্ধ নেই। এটি ক্রমশ হয়ে উঠেছে একটি বহুমাত্রিক অপরাধ ব্যবসা- যেখানে উৎপাদন, পরিবহন, অর্থপাচার, অস্ত্র, ভয় দেখানো এবং দুর্নীতি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

ট্রানজিটের সাম্রাজ্য

ইউরোপ এখন কেবল মাদকের ভোক্তা বাজার নয়; এটি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। বিশেষ করে বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, স্পেনসহ ইউরোপের বড় বন্দরগুলো কোকেন পাচারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের একটি অভিযানে ইউরোপোল দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইউরোপে আসা কনটেইনারভিত্তিক পাচারের সঙ্গে যুক্ত একটি নেটওয়ার্কের কাছ থেকে ৩৫ টন কোকেন জব্দের কথা জানায়।

ঘরে ঘরে মাদক

সমস্যার গভীরতা বোঝা যায় বন্দরের দুর্বলতা থেকে। ইউরোপের বড় বন্দরগুলোতে বছরে বিপুল সংখ্যক কনটেইনার আসে, কিন্তু সব কনটেইনার পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। অপরাধী নেটওয়ার্কগুলো এই বিশাল বৈধ বাণিজ্যব্যবস্থার ভেতরেই নিজেদের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করে। ইউরোপোল দেখিয়েছে, বন্দরের কর্মী, পরিবহনব্যবস্থা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য বৈধ কাঠামোর দুর্নীতিগ্রস্ত অংশকে কাজে লাগানো হতে পারে।

রাষ্ট্রীয় ঝুঁকি

দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইউরোপের সরাসরি পথ কঠিন হলে অপরাধী নেটওয়ার্ক নতুন মধ্যবর্তী অঞ্চল খুঁজেছে। পশ্চিম আফ্রিকা তার একটি উদাহরণ। ইউএনওডিসি-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দক্ষিণ আমেরিকার কোকেন পশ্চিম আফ্রিকা হয়ে ইউরোপের দিকে প্রবাহিত হয়েছে। এই বাণিজ্য শুধু অপরাধী নেটওয়ার্কের আয় বাড়ায়নি; দুর্বল শাসন, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে এর সম্পর্কও তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ মাদক কখনো শুধু ‘পণ্য’ থাকে না। বড় অর্থের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর এটি স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামোও বদলে দিতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে ক্যাপ্টাগন

মধ্যপ্রাচ্যে মাদক অর্থনীতির আরেকটি আলাদা অধ্যায় হলো ক্যাপ্টাগন। গত এক দশকে সিরিয়া ও লেবাননকে ঘিরে এর উৎপাদন ও পাচার বিস্তার লাভ করে। ২০২০–২০২৪ সময়ে বিশ্বের ক্যাপ্টাগন জব্দের ৭৭ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যে হয়েছে। ২০২৪ সালের সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বড় কয়েকটি উৎপাদনকেন্দ্র ধ্বংস করা হলেও বাজার পুরোপুরি অদৃশ্য হয়নি। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জব্দের তথ্য বলছে, পাচার এখনো চলছে এবং নেটওয়ার্কগুলো পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে।

ট্রামাডল

পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায় মাদক সংকটের একটি ভিন্ন চেহারা দেখা যায়- ট্রামাডলসহ ফার্মাসিউটিক্যাল ওপিওয়েডের অপব্যবহার। ২০২০ থেকে ২০২৪ সময়ে বিশ্বে ট্রামাডল জব্দের পরিমাণ আবার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, বিশেষ করে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায়। এখানে বৈধ ওষুধের সরবরাহব্যবস্থা এবং অবৈধ বাজারের সীমারেখা কখনো অস্পষ্ট হয়ে যায়- যা মাদক নিয়ন্ত্রণকে আরও জটিল করে।

এক কেজি মাদক উৎপাদনের খরচ আর শেষ বাজারে তার মূল্য এক নয়। সীমান্ত পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকি, দুষ্প্রাপ্যতা ও বাজারমূল্য বাড়ে। সবচেয়ে বড় অর্থ তৈরি হয় খুচরা পর্যায়ে। ইউএনওডিসি বলছে, বিশ্বে মাদকবাণিজ্য থেকে বছরে শত শত বিলিয়ন ডলার আয় হয় এবং সংগঠিত অপরাধী গোষ্ঠীর আয়ের বড় অংশ আসে এই ব্যবসা থেকে।

মাদকের নীল থাবা

বালকান রুটের ১৩.৯–২১.৪ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক অবৈধ আয় কিংবা মিয়ানমারের ২০২৪ সালের আফিম অর্থনীতির আনুমানিক ৫৮৯ মিলিয়ন থেকে ১.৫৭ বিলিয়ন ডলারের মূল্য দেখায়- কিছু দেশের অর্থনীতির সঙ্গে এই কালো অর্থনীতি কতটা বড় হয়ে উঠতে পারে। মিয়ানমারে ওই অর্থনীতি দেশটির ২০২৩ সালের জিডিপির আনুমানিক ০.৯ থেকে ২.৪ শতাংশের সমান ছিল। পুরোনো সিনেমার মাফিয়াকে মনে করলে চোখে ভেসে ওঠে বন্দুকধারী কয়েকজন মানুষ। আধুনিক মাদক নেটওয়ার্ক তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

ইউরোপোল-এর ২০২৪ সালের বিশ্লেষণে ইউরোপের ৮২১টি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অপরাধী নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর অর্ধেক মাদক পাচারকে প্রধান বা অন্যতম প্রধান অপরাধ হিসেবে ব্যবহার করছিল; ৭০ শতাংশের বেশি নেটওয়ার্ক দুর্নীতি ব্যবহার করছিল এবং ৬৮ শতাংশ সহিংসতা ও ভয় দেখানোকে কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ব্যবহার করছিল। ২০২৬ সালের নতুন বিশ্লেষণে ইউরোপোল দেখিয়েছে, অপরাধী নেটওয়ার্কগুলো বৈধ ব্যবসা, আর্থিক ব্যবস্থা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অর্থপাচারের কৌশল ব্যবহার করে নিজেদের টিকিয়ে রাখছে। এখানেই মাদকবাণিজ্যের সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি।

অপরাধী নেটওয়ার্ক যত বেশি অর্থ পায়, তত বেশি তারা বৈধ অর্থনীতিতে ঢোকার সুযোগ পায়। পরিবহন, নির্মাণ, আমদানি-রপ্তানি, রিয়েল এস্টেট, বিনোদন কিংবা অন্য ব্যবসার আড়ালে কালো টাকা সাদা করার চেষ্টা হতে পারে। ফলে একসময় ‘অপরাধী’ ও ‘বৈধ ব্যবসায়ী’ অর্থনীতির সীমারেখাও ঝাপসা হয়ে যায়। ইউরোপোল-এর গবেষণা বৈধ ব্যবসা কাঠামোকে অপরাধী নেটওয়ার্কের প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

যুদ্ধ, দুর্নীতি ও রাষ্ট্র

মাদক অর্থনীতি যেখানে শক্তিশালী, সেখানে শুধু অপরাধ বাড়ে না- রাষ্ট্রের সক্ষমতাও ক্ষয়ে যেতে পারে। মিয়ানমারে মাদক অর্থনীতি ও সশস্ত্র সংঘাতের সম্পর্ক তার বড় উদাহরণ। লাতিন আমেরিকার কিছু অঞ্চলেও মাদকগোষ্ঠী স্থানীয় অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর এমন প্রভাব তৈরি করেছে যে তারা কার্যত বিকল্প ক্ষমতাকাঠামোর মতো আচরণ করতে পারে। ইউএনওডিসি বলছে, মাদক পাচারের প্রভাব কোথাও বাণিজ্যকেন্দ্রিক ও লাভনির্ভর, আবার কোথাও সংগঠিত গোষ্ঠীগুলো ভূখণ্ড ও বাজার নিয়ন্ত্রণের দিকে যায়। অর্থাৎ মাদক ব্যবসা রাষ্ট্রকে সবসময় সরাসরি দখল করে না; কখনো তার চেয়েও ভয়ংকরভাবে রাষ্ট্রের দুর্বল জায়গাগুলো দখল করে।

ডার্ক ওয়েব

মাদকের পুরোনো রুট ছিল সড়ক, নদী, সীমান্ত ও সমুদ্র। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল জগত। ইউএনওডিসি-এর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ডার্কনেটভিত্তিক মাদক বিক্রির পরিমাণ আনুমানিক ২.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে খুচরা অনলাইন বিক্রির বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের মাদকপথ শুধু মানচিত্রে আঁকা যাবে না। একটি অংশ থাকবে সমুদ্রপথে, আরেকটি থাকবে এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে।

বাংলাদেশ

বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক মানচিত্রের বাইরে নয়। বরং ভৌগোলিক অবস্থানই দেশটিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাদক উৎপাদন অঞ্চল, ভারতের বিস্তৃত সীমান্ত এবং বঙ্গোপসাগরীয় যোগাযোগব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশকে একই সঙ্গে গন্তব্য, ট্রানজিট ও আঞ্চলিক বাজারের সম্ভাব্য সংযোগস্থল হিসেবে দেখতে হয়।

বিশ্বের মাদকবাজারের বিবর্তন থেকে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো- মাদককে শুধু সীমান্তের সমস্যা ভাবলে চলবে না। কারণ আধুনিক মাদক অর্থনীতি একই সঙ্গে একটি অপরাধ, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, দুর্নীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার সমস্যা। মাদকবিরোধী অভিযান প্রয়োজন। কিন্তু শুধু মাদক জব্দ করে এই সাম্রাজ্য ভাঙা যাবে না।

যে টাকা মাদক থেকে আসে, সেই টাকা কোথায় যায়- তা অনুসরণ করতে হবে। যে ব্যবসায় কালো টাকা ঢোকে, তা শনাক্ত করতে হবে। যে বন্দরে দুর্নীতি হয়, তা ঠেকাতে হবে। যে সশস্ত্র গোষ্ঠী মাদক থেকে অর্থ পায়, তাদের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল করতে হবে। আর যে তরুণ মাদক ব্যবহার করছে, তাকে শুধু অপরাধী হিসেবে নয়, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন থাকা মানুষ হিসেবেও দেখতে হবে।

মাদকের নীল থাবায় নারীরা

বিশ্বের মাদক সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যটি সম্ভবত এখানেই- মাদক আর কোনো একটি দেশের সমস্যা নয়। এটি সীমান্তহীন এক অর্থনীতি।

কোকেনের শুরু আন্দিজে, শেষ হতে পারে ইউরোপে। আফিমের শিকড় মিয়ানমারে, বাজার হতে পারে বহু হাজার কিলোমিটার দূরে। সিনথেটিক মাদকের উৎপাদন বাজারের কাছেই চলে আসতে পারে। টাকা ঢুকতে পারে বৈধ ব্যবসায়। অপরাধী নেটওয়ার্ক ঢুকে যেতে পারে বন্দরে। আর সেই কালো অর্থ কখনো কখনো প্রভাব ফেলতে পারে রাজনীতি, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানেও।

অতএব মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই আসলে একটি প্যাকেট বা একটি চালানের বিরুদ্ধে লড়াই নয়। এটি সেই পুরো অদৃশ্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ- যেখানে নেশা পণ্য, অপরাধ ব্যবসা, টাকা শক্তি এবং দুর্বল রাষ্ট্র সবচেয়ে বড় বাজার।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত