বাংলাদেশের বনাঞ্চল থেকে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে উল্লুক (Western Hoolock Gibbon) ও চশমাপরা হনুমান (Phayre’s Langur)। বন উজাড় ও দখল, আবাসস্থল ধ্বংস, খাদ্যসংকট, পাচার, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া এবং সড়কে গাড়িচাপায় প্রাণ হারানো–সব মিলিয়ে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে এই দুই প্রজাতির প্রাইমেট।
বিশ্বের সবচেয়ে বিপন্ন প্রাইমেট নিয়ে প্রকাশিত Primates in Peril: The World’s 25 Most Endangered Primates (2023–25) শীর্ষক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের উল্লুক ও চশমাপরা হনুমানকে বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিশ্বের সবচেয়ে বিপন্ন ২৫টি প্রাইমেটের পাশাপাশি আরও কয়েকটি বিপন্ন প্রজাতির কথাও বলা হয়েছে। বাংলাদেশের এই দুই প্রজাতি সেগুলোর মধ্যে রয়েছে।
চশমাপরা হনুমানের বিস্তৃতি এখন বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলে সীমিত হয়ে পড়েছে। প্রজাতিটির সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। তবে প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন প্রজন্মে এর সংখ্যা ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। বাংলাদেশ ও ভারতে শিকার ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে অনেক এলাকায় এ প্রজাতি ইতিমধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পাচার, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া ও সড়ক দুর্ঘটনাও এদের টিকে থাকার পথে বড় বাধা। প্রায় দুই দশক ধরে চশমাপরা হনুমান আইইউসিএনের বিপন্ন প্রজাতির লাল তালিকায় রয়েছে।
সিলেটের বনে চশমাপরা হনুমান ৪৮৪টি
২০২৫ সালে জার্মান প্রাইমেট সেন্টারের এক গবেষণায় সিলেটের বনাঞ্চলে মাত্র ৪৮৪টি চশমাপরা হনুমানের অস্তিত্বের তথ্য পাওয়া যায়। হবিগঞ্জের সাতছড়ি, রেমা-কালেঙ্গা এবং মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া, আদমপুর, পাথারিয়া ও সাগরনাল বনে এসব হনুমান টিকে আছে।
বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তবর্তী বনাঞ্চল, বিশেষ করে লাউয়াছড়া, রেমা-কালেঙ্গা, সাতছড়ি, পাবলাখালি ও কাপ্তাইয়ের বনেও চশমাপরা হনুমানের দেখা মেলে। তবে বন ছোট হয়ে যাওয়া এবং ফাঁকা হয়ে পড়ার কারণে এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।
চশমাপরা হনুমান (Phayre's Leaf Monkey), বৈজ্ঞানিক নাম Trachypithecus phayrei। ফ্যায়র্স ল্যাঙ্গুর (Phayre's Langur), কালো হনুমান বা কালা বান্দর নামেও পরিচিত। বাংলাদেশে এ প্রজাতি মহাবিপন্ন। ১৯৭৪ ও ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তফসিল-১ অনুযায়ী এটি সংরক্ষিত প্রজাতি।
চশমাপরা হনুমানের দেহ তুলনামূলক ছোট, তবে লেজ বড়। স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের মাথা থেকে লেজের গোড়া পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ৫৫ থেকে ৬৫ সেন্টিমিটার এবং লেজের দৈর্ঘ্য ৬৫ থেকে ৮০ সেন্টিমিটার। গায়ের লোম মেটে বাদামি থেকে কালচে বাদামি। বুক ও পেট সাদাটে। চোখের চারপাশের সাদা লোমের কারণে মনে হয় যেন চোখে চশমা পরে আছে। মুখের রংও সাদা। প্রাপ্তবয়স্ক হনুমানের মাথার লোম বড় হওয়ায় অনেকটা পরচুলা পরা মনে হয়। হাত-পা কালো। বাচ্চাদের গায়ের রং সাদা, গোলাপি ও বাদামির মিশ্রণ।
অন্য অনেক হনুমানের তুলনায় এরা লাজুক। দিনের বেলায় ঘন বনের ছায়াযুক্ত জায়গায় থাকতে পছন্দ করে এবং সহজে মাটিতে নামে না। দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করলেও তাদের সহজে চোখে পড়ে না। সাধারণত একটি পুরুষের নেতৃত্বে বাচ্চাসহ দল চলাফেরা করে।
চশমাপরা হনুমান গাছের কচি পাতা, ফুল, ফল, বীজ, কীটপতঙ্গ ও পাখির ডিম খায়। পানির চাহিদা মেটাতে শিশিরভেজা পাতা চাটে কিংবা পানিবহুল লতাগুল্ম খায়। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল তাদের প্রজননকাল। স্ত্রী হনুমান ১৫০ থেকে ২০০ দিন গর্ভধারণের পর একটি বাচ্চা প্রসব করে। গড়ে প্রতি দুই বছরে একবার বাচ্চা দেয়। চার থেকে পাঁচ মাস বয়স থেকেই বাচ্চারা শক্ত খাবার খাওয়া শুরু করে। পুরুষ পাঁচ থেকে ছয় এবং স্ত্রী তিন থেকে চার বছর বয়সে প্রজননক্ষম হয়। এদের আয়ুষ্কাল প্রায় ২০ বছর।
চশমাপরা হনুমান বৃক্ষবাসী। ঘুম, চলাফেরা, খাবার সংগ্রহ, খেলাধুলা ও বিশ্রাম–সবই গাছে সম্পন্ন করে। সাধারণত একটি শক্তিশালী পুরুষের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১৫টি হনুমানের দল বিচরণ করে। চিরহরিৎ বনের এই প্রাণী বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, চীন, থাইল্যান্ড ও লাওসসহ বিভিন্ন দেশে দেখা যায়।
উল্লুকও কমছে দ্রুত
উল্লুক নিয়েও একই ধরনের আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে Primates in Peril প্রতিবেদনে। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল–আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরাম–এবং মিয়ানমারের ইরাবতী ও চিন্দুইন নদীর পশ্চিমাঞ্চলে উল্লুকের বিস্তৃতি রয়েছে।
আবাসস্থল ক্রমাগত ধ্বংস হওয়া, শিকার ও চোরাচালান এ প্রাণীর অস্তিত্বের প্রধান হুমকি। বাংলাদেশ ও ভারতে উল্লুকের সংখ্যা কমছে। তবে মিয়ানমারে এদের সংখ্যা স্থিতিশীল বলে ধরা যায়। প্রজাতিটি আইইউসিএনের বিপন্ন প্রজাতির লাল তালিকায় রয়েছে। ২০০৮ সালের Primates in Peril তালিকার প্রথম ২৫টি বিপন্ন প্রাইমেটের মধ্যেও উল্লুক ছিল।
২০২০ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এক গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে উল্লুকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ হাজার। সেটি কমে দাঁড়িয়েছে ৪৬৮টিতে। গবেষণায় আরও বলা হয়, দেশে উল্লুকের বসবাসের উপযোগী বনভূমি আছে মাত্র ২৯৪ বর্গকিলোমিটার।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দেওয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হাবিবুন নাহার বলেন, একসময় দেশের ২২টি বনে উল্লুক পাওয়া যেত। এখন ১০টি বন থেকে উল্লুক বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
হাবিবুন নাহারের মতে, আবাসস্থল ধ্বংস, পাচার ও সামাজিক বনায়ন–এই দুই প্রজাতির প্রাইমেটের জন্যই বড় হুমকি। তার ভাষায়, 'উল্লুক ও হনুমান গাছের ওপর থাকে। তাদের খাদ্য গাছের পাতা। তাই গাছ না থাকলে তারা টিকে থাকবে না।'
একসময় ২২ বনে, এখন কোথায়?
উল্লুক গিবন (হাইলোবাটিডি) পরিবারের দুটি প্রজাতির প্রাণীর সাধারণ নাম। গিবনজাতীয় প্রাইমেটদের মধ্যে আকারে এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম; বৃহত্তম হলো সিয়ামাং। উল্লুকের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৬ থেকে ৯ কেজি।
পুরুষ ও স্ত্রী উল্লুকের আকার প্রায় একই হলেও গায়ের রঙে পার্থক্য রয়েছে। পুরুষের গায়ের রং কালো, সঙ্গে রয়েছে সাদা ভ্রু। স্ত্রী উল্লুকের শরীর ধূসর-বাদামি লোমে ঢাকা। গলা ও ঘাড়ের কাছে লোম বেশি কালো। চোখ ও মুখের চারপাশের সাদা লোম অনেকটা মুখোশের মতো দেখায়।
প্রায় ছয় থেকে সাত মাসের গর্ভাবস্থার পর শিশু উল্লুকের জন্ম হয়। জন্মের সময় তাদের গায়ে ঘোলাটে সাদা লোম থাকে। ছয় মাস পর লিঙ্গভেদে সেই লোম কালো অথবা বাদামি-ধূসর রং ধারণ করে। জন্মের আট থেকে নয় বছর পর উল্লুক প্রাপ্তবয়স্ক হয়। তাদের আয়ুষ্কাল প্রায় ২৫ বছর।
উল্লুক মূলত বিভিন্ন ধরনের ফল ও ডুমুর খায়। পাশাপাশি পতঙ্গ, ফুল ও কচি পাতাও খাদ্যতালিকায় রয়েছে।
এরা সামাজিক প্রাণী এবং পরিবারবদ্ধভাবে বসবাস করে। একটি পরিবারে মা-বাবাসহ তিন-চারটি বা তার বেশি উল্লুক থাকতে পারে। উঁচু গাছের মাথায় থাকতে পছন্দ করে। লম্বা হাত ও পায়ের সাহায্যে এক গাছ থেকে অন্য গাছে চলাচল করে। উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে নিজেদের এলাকা থেকে অন্য উল্লুককে দূরে রাখে এবং পরিবারের সদস্যদের অবস্থান জানান দেয়। নিজেদের এলাকা ও সীমানা রক্ষায় পরিবারগুলোর মধ্যে সীমানা ও খাদ্যের উৎসের অধিকার নিয়ে বিরোধও হয়।
একসময় বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বের বৃহত্তর সিলেট এবং দক্ষিণ-পূর্বের চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনেও উল্লুক দেখা যেত। ভারত, মিয়ানমার ও চীনের কিছু বনাঞ্চলেও এ প্রাণীর বিস্তৃতি রয়েছে। তবে বাংলাদেশে এখন বিপন্ন উল্লুকের অস্তিত্ব মূলত মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া বনাঞ্চলেই টিকে আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পৃথিবীজুড়েও এ প্রজাতি বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। লাউয়াছড়াতেও উল্লুকের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে।
গত কয়েক বছরে উল্লুকের প্রজাতি শ্রেণিবিন্যাসে বিভিন্ন পরিবর্তন হয়েছে।
বন দখলে হারাচ্ছে বন্যপ্রাণীর আশ্রয়
প্রাইমেট দুটির সংকট শুধু শিকার বা পাচারের কারণে নয়; তাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয় বনাঞ্চলও ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে।
সিলেটের বন বিভাগের প্রায় ১ লাখ ৫৪ হাজার ৭১৪ একর জমির মধ্যে প্রায় ৫৮ হাজার একর বেদখলে রয়েছে। নতুন করেও অনেক জমি বেদখল হচ্ছে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জমি বেদখলে থাকলেও তা উদ্ধারে বন বিভাগের তৎপরতা সামান্য–২০২১ সালের ১১ এপ্রিল দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য প্রকাশিত হয়।
অবস্থা আরও গুরুতর পাথারিয়া হিলস রিজার্ভ ফরেস্টে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবৈধ দখল ও জনবসতি স্থাপনের কারণে গত অর্ধশত বছরে এ বনাঞ্চলের আয়তন ১ হাজার ১৫২ বর্গকিলোমিটার থেকে কমে মাত্র ১৩৫ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে। বনভূমির এই সংকোচন বন্যপ্রাণী ও পরিবেশের জন্য বড় হুমকি।
লাউয়াছড়া বনাঞ্চলসহ মৌলভীবাজারের বড়লেখা ও জুড়ী এবং হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে বিভিন্ন সময়ে চশমাপরা হনুমানের মৃত্যুর খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এসব খবর এসেছে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
বন উজাড়, তারপর লোকালয়ে বন্যপ্রাণী
গত পাঁচ দশকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান–যা একসময় ভানুগাছ পাহাড় নামে পরিচিত ছিল–এ একশ্রেণির প্রভাবশালী গোষ্ঠী সংঘবদ্ধভাবে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বনাঞ্চলে ঢুকে মূল্যবান গাছ ও বাঁশসহ বিভিন্ন বনজ সম্পদ কেটে উজাড় করেছে বলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অনেকে রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক এবং পরে জনপ্রতিনিধি ও বড় রাজনৈতিক দলের নেতা হয়েছেন বলেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
বন দখল করে বসতি স্থাপন, রিসোর্ট ও চা-বাগান তৈরি এবং বনজ সম্পদ ধ্বংসের ফলে বন্যপ্রাণীর খাদ্যসংকটও বাড়ছে। খাদ্যের সন্ধানে প্রাণীরা বন ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসছে। সেখানে কখনো মানুষের হাতে, আবার কখনো সড়কে গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে তারা। অনেক বন্যপ্রাণী মানুষের হাতে ধরাও পড়ছে।
শ্রীমঙ্গল থানার বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে বাসাবাড়ি, ক্ষেতের ফসল, মাঠ ও ঝোপঝাড়ে বিষাক্ত সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী ধরা পড়ার খবর পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন-শ্রীমঙ্গল দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময় ধরে শ্রীমঙ্গল উপজেলা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় দুই হাজারের উপর বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে স্থানীয় বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেছে বলে জানা গেছে।

শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের বনাঞ্চল থেকে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে উল্লুক (Western Hoolock Gibbon) ও চশমাপরা হনুমান (Phayre’s Langur)। বন উজাড় ও দখল, আবাসস্থল ধ্বংস, খাদ্যসংকট, পাচার, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া এবং সড়কে গাড়িচাপায় প্রাণ হারানো–সব মিলিয়ে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে এই দুই প্রজাতির প্রাইমেট।
বিশ্বের সবচেয়ে বিপন্ন প্রাইমেট নিয়ে প্রকাশিত Primates in Peril: The World’s 25 Most Endangered Primates (2023–25) শীর্ষক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের উল্লুক ও চশমাপরা হনুমানকে বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিশ্বের সবচেয়ে বিপন্ন ২৫টি প্রাইমেটের পাশাপাশি আরও কয়েকটি বিপন্ন প্রজাতির কথাও বলা হয়েছে। বাংলাদেশের এই দুই প্রজাতি সেগুলোর মধ্যে রয়েছে।
চশমাপরা হনুমানের বিস্তৃতি এখন বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলে সীমিত হয়ে পড়েছে। প্রজাতিটির সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। তবে প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন প্রজন্মে এর সংখ্যা ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। বাংলাদেশ ও ভারতে শিকার ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে অনেক এলাকায় এ প্রজাতি ইতিমধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পাচার, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া ও সড়ক দুর্ঘটনাও এদের টিকে থাকার পথে বড় বাধা। প্রায় দুই দশক ধরে চশমাপরা হনুমান আইইউসিএনের বিপন্ন প্রজাতির লাল তালিকায় রয়েছে।
সিলেটের বনে চশমাপরা হনুমান ৪৮৪টি
২০২৫ সালে জার্মান প্রাইমেট সেন্টারের এক গবেষণায় সিলেটের বনাঞ্চলে মাত্র ৪৮৪টি চশমাপরা হনুমানের অস্তিত্বের তথ্য পাওয়া যায়। হবিগঞ্জের সাতছড়ি, রেমা-কালেঙ্গা এবং মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া, আদমপুর, পাথারিয়া ও সাগরনাল বনে এসব হনুমান টিকে আছে।
বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তবর্তী বনাঞ্চল, বিশেষ করে লাউয়াছড়া, রেমা-কালেঙ্গা, সাতছড়ি, পাবলাখালি ও কাপ্তাইয়ের বনেও চশমাপরা হনুমানের দেখা মেলে। তবে বন ছোট হয়ে যাওয়া এবং ফাঁকা হয়ে পড়ার কারণে এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।
চশমাপরা হনুমান (Phayre's Leaf Monkey), বৈজ্ঞানিক নাম Trachypithecus phayrei। ফ্যায়র্স ল্যাঙ্গুর (Phayre's Langur), কালো হনুমান বা কালা বান্দর নামেও পরিচিত। বাংলাদেশে এ প্রজাতি মহাবিপন্ন। ১৯৭৪ ও ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তফসিল-১ অনুযায়ী এটি সংরক্ষিত প্রজাতি।
চশমাপরা হনুমানের দেহ তুলনামূলক ছোট, তবে লেজ বড়। স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের মাথা থেকে লেজের গোড়া পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ৫৫ থেকে ৬৫ সেন্টিমিটার এবং লেজের দৈর্ঘ্য ৬৫ থেকে ৮০ সেন্টিমিটার। গায়ের লোম মেটে বাদামি থেকে কালচে বাদামি। বুক ও পেট সাদাটে। চোখের চারপাশের সাদা লোমের কারণে মনে হয় যেন চোখে চশমা পরে আছে। মুখের রংও সাদা। প্রাপ্তবয়স্ক হনুমানের মাথার লোম বড় হওয়ায় অনেকটা পরচুলা পরা মনে হয়। হাত-পা কালো। বাচ্চাদের গায়ের রং সাদা, গোলাপি ও বাদামির মিশ্রণ।
অন্য অনেক হনুমানের তুলনায় এরা লাজুক। দিনের বেলায় ঘন বনের ছায়াযুক্ত জায়গায় থাকতে পছন্দ করে এবং সহজে মাটিতে নামে না। দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করলেও তাদের সহজে চোখে পড়ে না। সাধারণত একটি পুরুষের নেতৃত্বে বাচ্চাসহ দল চলাফেরা করে।
চশমাপরা হনুমান গাছের কচি পাতা, ফুল, ফল, বীজ, কীটপতঙ্গ ও পাখির ডিম খায়। পানির চাহিদা মেটাতে শিশিরভেজা পাতা চাটে কিংবা পানিবহুল লতাগুল্ম খায়। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল তাদের প্রজননকাল। স্ত্রী হনুমান ১৫০ থেকে ২০০ দিন গর্ভধারণের পর একটি বাচ্চা প্রসব করে। গড়ে প্রতি দুই বছরে একবার বাচ্চা দেয়। চার থেকে পাঁচ মাস বয়স থেকেই বাচ্চারা শক্ত খাবার খাওয়া শুরু করে। পুরুষ পাঁচ থেকে ছয় এবং স্ত্রী তিন থেকে চার বছর বয়সে প্রজননক্ষম হয়। এদের আয়ুষ্কাল প্রায় ২০ বছর।
চশমাপরা হনুমান বৃক্ষবাসী। ঘুম, চলাফেরা, খাবার সংগ্রহ, খেলাধুলা ও বিশ্রাম–সবই গাছে সম্পন্ন করে। সাধারণত একটি শক্তিশালী পুরুষের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১৫টি হনুমানের দল বিচরণ করে। চিরহরিৎ বনের এই প্রাণী বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, চীন, থাইল্যান্ড ও লাওসসহ বিভিন্ন দেশে দেখা যায়।
উল্লুকও কমছে দ্রুত
উল্লুক নিয়েও একই ধরনের আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে Primates in Peril প্রতিবেদনে। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল–আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরাম–এবং মিয়ানমারের ইরাবতী ও চিন্দুইন নদীর পশ্চিমাঞ্চলে উল্লুকের বিস্তৃতি রয়েছে।
আবাসস্থল ক্রমাগত ধ্বংস হওয়া, শিকার ও চোরাচালান এ প্রাণীর অস্তিত্বের প্রধান হুমকি। বাংলাদেশ ও ভারতে উল্লুকের সংখ্যা কমছে। তবে মিয়ানমারে এদের সংখ্যা স্থিতিশীল বলে ধরা যায়। প্রজাতিটি আইইউসিএনের বিপন্ন প্রজাতির লাল তালিকায় রয়েছে। ২০০৮ সালের Primates in Peril তালিকার প্রথম ২৫টি বিপন্ন প্রাইমেটের মধ্যেও উল্লুক ছিল।
২০২০ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এক গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে উল্লুকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ হাজার। সেটি কমে দাঁড়িয়েছে ৪৬৮টিতে। গবেষণায় আরও বলা হয়, দেশে উল্লুকের বসবাসের উপযোগী বনভূমি আছে মাত্র ২৯৪ বর্গকিলোমিটার।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দেওয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হাবিবুন নাহার বলেন, একসময় দেশের ২২টি বনে উল্লুক পাওয়া যেত। এখন ১০টি বন থেকে উল্লুক বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
হাবিবুন নাহারের মতে, আবাসস্থল ধ্বংস, পাচার ও সামাজিক বনায়ন–এই দুই প্রজাতির প্রাইমেটের জন্যই বড় হুমকি। তার ভাষায়, 'উল্লুক ও হনুমান গাছের ওপর থাকে। তাদের খাদ্য গাছের পাতা। তাই গাছ না থাকলে তারা টিকে থাকবে না।'
একসময় ২২ বনে, এখন কোথায়?
উল্লুক গিবন (হাইলোবাটিডি) পরিবারের দুটি প্রজাতির প্রাণীর সাধারণ নাম। গিবনজাতীয় প্রাইমেটদের মধ্যে আকারে এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম; বৃহত্তম হলো সিয়ামাং। উল্লুকের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৬ থেকে ৯ কেজি।
পুরুষ ও স্ত্রী উল্লুকের আকার প্রায় একই হলেও গায়ের রঙে পার্থক্য রয়েছে। পুরুষের গায়ের রং কালো, সঙ্গে রয়েছে সাদা ভ্রু। স্ত্রী উল্লুকের শরীর ধূসর-বাদামি লোমে ঢাকা। গলা ও ঘাড়ের কাছে লোম বেশি কালো। চোখ ও মুখের চারপাশের সাদা লোম অনেকটা মুখোশের মতো দেখায়।
প্রায় ছয় থেকে সাত মাসের গর্ভাবস্থার পর শিশু উল্লুকের জন্ম হয়। জন্মের সময় তাদের গায়ে ঘোলাটে সাদা লোম থাকে। ছয় মাস পর লিঙ্গভেদে সেই লোম কালো অথবা বাদামি-ধূসর রং ধারণ করে। জন্মের আট থেকে নয় বছর পর উল্লুক প্রাপ্তবয়স্ক হয়। তাদের আয়ুষ্কাল প্রায় ২৫ বছর।
উল্লুক মূলত বিভিন্ন ধরনের ফল ও ডুমুর খায়। পাশাপাশি পতঙ্গ, ফুল ও কচি পাতাও খাদ্যতালিকায় রয়েছে।
এরা সামাজিক প্রাণী এবং পরিবারবদ্ধভাবে বসবাস করে। একটি পরিবারে মা-বাবাসহ তিন-চারটি বা তার বেশি উল্লুক থাকতে পারে। উঁচু গাছের মাথায় থাকতে পছন্দ করে। লম্বা হাত ও পায়ের সাহায্যে এক গাছ থেকে অন্য গাছে চলাচল করে। উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে নিজেদের এলাকা থেকে অন্য উল্লুককে দূরে রাখে এবং পরিবারের সদস্যদের অবস্থান জানান দেয়। নিজেদের এলাকা ও সীমানা রক্ষায় পরিবারগুলোর মধ্যে সীমানা ও খাদ্যের উৎসের অধিকার নিয়ে বিরোধও হয়।
একসময় বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বের বৃহত্তর সিলেট এবং দক্ষিণ-পূর্বের চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনেও উল্লুক দেখা যেত। ভারত, মিয়ানমার ও চীনের কিছু বনাঞ্চলেও এ প্রাণীর বিস্তৃতি রয়েছে। তবে বাংলাদেশে এখন বিপন্ন উল্লুকের অস্তিত্ব মূলত মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া বনাঞ্চলেই টিকে আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পৃথিবীজুড়েও এ প্রজাতি বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। লাউয়াছড়াতেও উল্লুকের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে।
গত কয়েক বছরে উল্লুকের প্রজাতি শ্রেণিবিন্যাসে বিভিন্ন পরিবর্তন হয়েছে।
বন দখলে হারাচ্ছে বন্যপ্রাণীর আশ্রয়
প্রাইমেট দুটির সংকট শুধু শিকার বা পাচারের কারণে নয়; তাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয় বনাঞ্চলও ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে।
সিলেটের বন বিভাগের প্রায় ১ লাখ ৫৪ হাজার ৭১৪ একর জমির মধ্যে প্রায় ৫৮ হাজার একর বেদখলে রয়েছে। নতুন করেও অনেক জমি বেদখল হচ্ছে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জমি বেদখলে থাকলেও তা উদ্ধারে বন বিভাগের তৎপরতা সামান্য–২০২১ সালের ১১ এপ্রিল দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য প্রকাশিত হয়।
অবস্থা আরও গুরুতর পাথারিয়া হিলস রিজার্ভ ফরেস্টে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবৈধ দখল ও জনবসতি স্থাপনের কারণে গত অর্ধশত বছরে এ বনাঞ্চলের আয়তন ১ হাজার ১৫২ বর্গকিলোমিটার থেকে কমে মাত্র ১৩৫ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে। বনভূমির এই সংকোচন বন্যপ্রাণী ও পরিবেশের জন্য বড় হুমকি।
লাউয়াছড়া বনাঞ্চলসহ মৌলভীবাজারের বড়লেখা ও জুড়ী এবং হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে বিভিন্ন সময়ে চশমাপরা হনুমানের মৃত্যুর খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এসব খবর এসেছে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
বন উজাড়, তারপর লোকালয়ে বন্যপ্রাণী
গত পাঁচ দশকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান–যা একসময় ভানুগাছ পাহাড় নামে পরিচিত ছিল–এ একশ্রেণির প্রভাবশালী গোষ্ঠী সংঘবদ্ধভাবে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বনাঞ্চলে ঢুকে মূল্যবান গাছ ও বাঁশসহ বিভিন্ন বনজ সম্পদ কেটে উজাড় করেছে বলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অনেকে রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক এবং পরে জনপ্রতিনিধি ও বড় রাজনৈতিক দলের নেতা হয়েছেন বলেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
বন দখল করে বসতি স্থাপন, রিসোর্ট ও চা-বাগান তৈরি এবং বনজ সম্পদ ধ্বংসের ফলে বন্যপ্রাণীর খাদ্যসংকটও বাড়ছে। খাদ্যের সন্ধানে প্রাণীরা বন ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসছে। সেখানে কখনো মানুষের হাতে, আবার কখনো সড়কে গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে তারা। অনেক বন্যপ্রাণী মানুষের হাতে ধরাও পড়ছে।
শ্রীমঙ্গল থানার বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে বাসাবাড়ি, ক্ষেতের ফসল, মাঠ ও ঝোপঝাড়ে বিষাক্ত সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী ধরা পড়ার খবর পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন-শ্রীমঙ্গল দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময় ধরে শ্রীমঙ্গল উপজেলা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় দুই হাজারের উপর বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে স্থানীয় বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেছে বলে জানা গেছে।

আপনার মতামত লিখুন