সংবাদ

জলবায়ুর থাবায় সাগরে ডুববে বহু মেগাসিটি


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৪৪ পিএম

জলবায়ুর থাবায় সাগরে ডুববে বহু মেগাসিটি
ছবি: এআই

গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে আশঙ্কাজনক হারে। বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের সতর্কবাণী এখন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বেশ কিছু প্রাচীন ও আধুনিক মেগাসিটি। মানুষের তৈরি পরিবেশ দূষণ আর প্রকৃতির এই পাল্টা আঘাত সভ্যতার অস্তিত্বকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলেছে।

গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন থেকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি। এর ফলে মেরুর বরফ গলন।  সেখান থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, আর তাতে উপকূলীয় শহর নিমজ্জন- এই শৃঙ্খলটি এখন আর ভবিষ্যতের গল্প নয়, চরম বাস্তবতা।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সম্প্রতি নিরাপত্তা পরিষদে জানিয়েছেন, গত ১১ হাজার বছরের যেকোনো সময়ের চেয়ে গত শতাব্দীতে মহাসাগর সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়েছে। আর মেরু অঞ্চলের বরফ গলার হারও অভূতপূর্ব।

নাসার তথ্য বলছে, অ্যান্টার্কটিকায় প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৫০ বিলিয়ন টন বরফ গলে যাচ্ছে; গ্রিনল্যান্ড হারাচ্ছে ২৭০ বিলিয়ন টন ।

ডুবন্ত শহরের তালিকায় যারা এগিয়ে

জাকার্তা (ইন্দোনেশিয়া): বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত ডুবতে থাকা শহর এটি। ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে শহরটি প্রতি বছর ১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দেবে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে ইন্দোনেশিয়া তাদের রাজধানী জাকার্তা থেকে সরিয়ে বোর্নিও দ্বীপে ‘নুসান্তারা’য় স্থানান্তর করছে । বিজ্ঞানীদের মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই শহরের কিছু অংশ সম্পূর্ণ পানির নিচে চলে যেতে পারে।

ভেনিস (ইতালি): তার অপরূপ খালের জন্য বিখ্যাত এই প্রাচীন শহরটি প্রায়ই উচ্চ জোয়ার বা ‘আকুয়া আলতা’র কারণে প্লাবিত হচ্ছে। সাগরের পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে এই শতাব্দী শেষে শহরটি পুরোপুরি পানির নিচে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।

সাংহাই ও মুম্বাই: এশিয়ার আরও দুটি মেগাসিটি ঝুঁকির মুখে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে এই বিশাল শহরগুলোর নিচু এলাকা হুমকির সম্মুখীন ।

বাংলাদেশ এই জলবায়ু সংকটের অন্যতম প্রধান শিকার। আইপিসিসি (জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত আন্তসরকার প্যানেল) এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের অন্তত ১৭ শতাংশ ভূমি সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাবে। ইতোমধ্যে দেশের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৈশ্বিক গড়ের চেয়েও দ্রুত বাড়ছে।

বুয়েটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের উপকূলে গড় উচ্চতা বৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৮ মিলিমিটার। যা বৈশ্বিক গড় ৩ দশমিক ৪২ মিলিমিটারের চেয়ে অনেক বেশি।

সমুদ্রের নোনা জল দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ফসলি জমিতে ঢুকে পড়ছে, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপের মতো প্রাকৃতিক ঐতিহ্য হুমকির মুখে। ইতোমধ্যে খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে লবণাক্ততা বাড়ায় আবাদি জমি অনুর্বর হয়ে পড়েছে।

প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে ‘ক্লাইমেট রিফিউজি’ বা জলবায়ু শরণার্থী হয়ে রাজধানী ঢাকায় আশ্রয় নিচ্ছেন। সাতক্ষীরার দাতিনাখালী গ্রামের বাসিন্দা শেফালী বিবির মতো লাখো মানুষের দিনযাপন এখন অনিশ্চয়তায় ভরা।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিচ্ছেন- বৈশ্বিক কার্বন নির্গমন অবিলম্বে না কমালে এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ থেকে ২ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

জাতিসংঘ মহাসচিবের ভাষায়, বিশ্ব যদি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণায়নের সীমা অতিক্রম করে, তবে তা দুর্বল দেশগুলোর জন্য কার্যত ‘মৃত্যুদণ্ড’ হবে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, হুমকির মুখে লন্ডন, লস অ্যাঞ্জেলেস, নিউ ইয়র্কসহ বিশ্বের বড় শহরগুলো। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধাক্কা সামাল দিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, বনভূমি সংরক্ষণ এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিকল্প নেই। নইলে প্রকৃতি আমাদের চিরচেনা ভূখণ্ডের মানচিত্র চিরতরে বদলে দেবে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬


জলবায়ুর থাবায় সাগরে ডুববে বহু মেগাসিটি

প্রকাশের তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬

featured Image

গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে আশঙ্কাজনক হারে। বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের সতর্কবাণী এখন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বেশ কিছু প্রাচীন ও আধুনিক মেগাসিটি। মানুষের তৈরি পরিবেশ দূষণ আর প্রকৃতির এই পাল্টা আঘাত সভ্যতার অস্তিত্বকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলেছে।

গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন থেকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি। এর ফলে মেরুর বরফ গলন।  সেখান থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, আর তাতে উপকূলীয় শহর নিমজ্জন- এই শৃঙ্খলটি এখন আর ভবিষ্যতের গল্প নয়, চরম বাস্তবতা।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সম্প্রতি নিরাপত্তা পরিষদে জানিয়েছেন, গত ১১ হাজার বছরের যেকোনো সময়ের চেয়ে গত শতাব্দীতে মহাসাগর সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়েছে। আর মেরু অঞ্চলের বরফ গলার হারও অভূতপূর্ব।

নাসার তথ্য বলছে, অ্যান্টার্কটিকায় প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৫০ বিলিয়ন টন বরফ গলে যাচ্ছে; গ্রিনল্যান্ড হারাচ্ছে ২৭০ বিলিয়ন টন ।

ডুবন্ত শহরের তালিকায় যারা এগিয়ে

জাকার্তা (ইন্দোনেশিয়া): বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত ডুবতে থাকা শহর এটি। ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে শহরটি প্রতি বছর ১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দেবে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে ইন্দোনেশিয়া তাদের রাজধানী জাকার্তা থেকে সরিয়ে বোর্নিও দ্বীপে ‘নুসান্তারা’য় স্থানান্তর করছে । বিজ্ঞানীদের মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই শহরের কিছু অংশ সম্পূর্ণ পানির নিচে চলে যেতে পারে।

ভেনিস (ইতালি): তার অপরূপ খালের জন্য বিখ্যাত এই প্রাচীন শহরটি প্রায়ই উচ্চ জোয়ার বা ‘আকুয়া আলতা’র কারণে প্লাবিত হচ্ছে। সাগরের পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে এই শতাব্দী শেষে শহরটি পুরোপুরি পানির নিচে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।

সাংহাই ও মুম্বাই: এশিয়ার আরও দুটি মেগাসিটি ঝুঁকির মুখে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে এই বিশাল শহরগুলোর নিচু এলাকা হুমকির সম্মুখীন ।

বাংলাদেশ এই জলবায়ু সংকটের অন্যতম প্রধান শিকার। আইপিসিসি (জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত আন্তসরকার প্যানেল) এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের অন্তত ১৭ শতাংশ ভূমি সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাবে। ইতোমধ্যে দেশের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৈশ্বিক গড়ের চেয়েও দ্রুত বাড়ছে।

বুয়েটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের উপকূলে গড় উচ্চতা বৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৮ মিলিমিটার। যা বৈশ্বিক গড় ৩ দশমিক ৪২ মিলিমিটারের চেয়ে অনেক বেশি।

সমুদ্রের নোনা জল দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ফসলি জমিতে ঢুকে পড়ছে, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপের মতো প্রাকৃতিক ঐতিহ্য হুমকির মুখে। ইতোমধ্যে খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে লবণাক্ততা বাড়ায় আবাদি জমি অনুর্বর হয়ে পড়েছে।

প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে ‘ক্লাইমেট রিফিউজি’ বা জলবায়ু শরণার্থী হয়ে রাজধানী ঢাকায় আশ্রয় নিচ্ছেন। সাতক্ষীরার দাতিনাখালী গ্রামের বাসিন্দা শেফালী বিবির মতো লাখো মানুষের দিনযাপন এখন অনিশ্চয়তায় ভরা।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিচ্ছেন- বৈশ্বিক কার্বন নির্গমন অবিলম্বে না কমালে এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ থেকে ২ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

জাতিসংঘ মহাসচিবের ভাষায়, বিশ্ব যদি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণায়নের সীমা অতিক্রম করে, তবে তা দুর্বল দেশগুলোর জন্য কার্যত ‘মৃত্যুদণ্ড’ হবে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, হুমকির মুখে লন্ডন, লস অ্যাঞ্জেলেস, নিউ ইয়র্কসহ বিশ্বের বড় শহরগুলো। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধাক্কা সামাল দিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, বনভূমি সংরক্ষণ এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিকল্প নেই। নইলে প্রকৃতি আমাদের চিরচেনা ভূখণ্ডের মানচিত্র চিরতরে বদলে দেবে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত