বাংলাদেশের মানচিত্রে শ্রীমঙ্গল একটি উপজেলা। কিন্তু পরিচয়ের দিক থেকে এটি যেন একটি আলাদা ভূগোল। চারদিকে হাওর, পাহাড়, টিলা, বিল, হ্রদ, বনাঞ্চল, সংরক্ষিত বনভূমি আর সারি সারি চা-বাগান—সব মিলিয়ে শ্রীমঙ্গলকে দূর থেকে দেখলে মনে হয় প্রকৃতির হাতে আঁকা কোনো ছবি। দেশের মানুষের কাছে এটি চায়ের রাজধানী, আর বিদেশি পর্যটকদের কাছেও বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত পর্যটন গন্তব্য।
শ্রীমঙ্গলের চারপাশের চা-অঞ্চলটি ঐতিহাসিকভাবে বালিশিরা ভ্যালি নামে পরিচিত। এর সঙ্গে লস্করপুর, লংলা, মনু-ধলই ও নর্থ সিলেট ভ্যালি মিলিয়ে স্বাধীনতার আগে বৃহত্তর সুরমা ভ্যালির চা-অঞ্চল গড়ে উঠেছিল। আঁকাবাঁকা, চড়াই-উতরাই পথের দুই পাশে যতদূর চোখ যায় শুধু চা-বাগান। কোথাও সমতল, কোথাও ঢেউ খেলানো টিলা। সিন্দুরখান, রাজঘাট, কাকিয়াছড়া, ফুলছড়া, কেজুরীছড়া, ভূরভুরিয়া—নামগুলোও যেন এই ভূদৃশ্যের সঙ্গে মিশে থাকা কোনো পুরোনো কবিতার পঙ্ক্তি।
ধান, সরিষা কিংবা সবজির ক্ষেতের চেনা গ্রামীণ দৃশ্য এখানে খুব বেশি চোখে পড়ে না। এখানে মূল দৃশ্যই চা, আর চা।
বাগানের ভেতরে দূরে দূরে শ্রমিকদের পাড়া। মাটির দেয়ালের ওপর পুরোনো ঢেউটিন কিংবা ছনের দোচালা ঘর। কোনো কোনো বাড়ির দেয়ালে হাতে আঁকা আলপনা, উঠোন ঝকঝকে পরিষ্কার। কোথাও আবার গাছপালায় ঘেরা আসাম-ধাঁচের টিনের ছাউনি দেওয়া বাংলো। আধুনিক অট্টালিকার দৃষ্টিকটু ভিড় নেই। প্রকৃতি আর মানুষের পুরোনো জীবনযাপন এখানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
চা-বাগানের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তার পাশে এই সমাধিক্ষেত্র। চারপাশ এতটাই পরিচ্ছন্ন যে শ্যাওলা কিংবা আগাছাকেও যেন বাড়তে দেওয়া হয়নি। শ্রীপুরের কাওরাই এলাকার ব্রাহ্ম সমাধিস্থলের মতো এখানে সাপ-সরীসৃপের ভয়ে সতর্ক হয়ে পা ফেলতে হয় না। বরং প্রবেশের আগে জায়গাটির পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা দেখে অনেকেরই স্বতঃস্ফূর্তভাবে জুতো খুলে বাইরে রেখে দিতে ইচ্ছে করে।
নকশায় ৪৩টি সমাধির উল্লেখ রয়েছে। তবে ২ ও ৩৩ নম্বর দুটি সমাধি এখন ফাঁকা। ফলে বর্তমানে এখানে রয়েছে ৪১টি সমাধি। আকারে এটি কুমিল্লার ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রির মতো বিশাল নয়। সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত মিত্রবাহিনীর ৭৩৬ জন সৈনিকের সমাধি রয়েছে, সারিবদ্ধ অসংখ্য সমাধিফলকও চোখে পড়ে। ডিনস্টন সিমেট্রি তার তুলনায় ছোট, সমতল এবং অনেকটাই অনুল্লেখযোগ্য মনে হতে পারে। কিন্তু এই ছোট্ট সমাধিক্ষেত্রের আসল বিস্ময় লুকিয়ে আছে তার সমাধিফলকগুলোর শিল্পকর্ম ও ইতিহাসে।
এখানে বড় বড় সমাধিসৌধ নেই। প্রতিটি সমাধিতে রয়েছে সাদা পাথরে খোদাই করা নকশাযুক্ত সমাধিফলক। আকারে খুব বড় নয়, কিন্তু ফলকের গায়ে যে সূক্ষ্ম কারুকাজ, তা বিস্ময় জাগায়। এমন শিল্পসমৃদ্ধ সমাধিফলকের এক-দুটি দৃষ্টান্ত আর্মেনীয় চার্চের প্রাঙ্গণে দেখা গেলেও এ ধরনের কাজ সচরাচর চোখে পড়ে না।
সমাধিফলকের তথ্য থেকে অন্তত ১৯ জনের পরিচয় ও জীবন সম্পর্কে জানা যায়। তাদের মৃত্যুসাল ১৮৮০ থেকে ১৯২২। অর্থাৎ সুরমা ভ্যালিতে চা-বাগান গড়ে ওঠার একেবারে শুরুর সময়ের ইউরোপীয়দেরও সমাধি রয়েছে এখানে।
কেউ মারা গেছেন ৩০ বছর বয়সে, কেউ ৪০ বা ৫০-এর মধ্যে। কেউ আবার মাত্র কয়েক মাসের শিশু। একজন সার্জেন্ট মেজরের মাত্র সাড়ে নয় মাস বয়সী ছেলে ‘সনি’র সমাধিও রয়েছে এখানে।
২৪ বছর বয়সী তরুণ জেমস পিটার রাসেল মারা যান ১৮৮৮ সালে। সমাধিফলকের তথ্য অনুযায়ী, সিন্দুরখান চা-বাগানের কাছাকাছি এক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। সে সময় এই অঞ্চলে আজকের মতো মোটরগাড়ির চলাচলও ছিল না।
এই নামগুলো পড়তে পড়তে বোঝা যায়, বিদেশের মাটিতে জীবন গড়তে এসে কত তরুণ-তরুণীকে কত অল্প বয়সেই থেমে যেতে হয়েছিল। তাঁদের অনেকের হয়তো আর নিজ দেশে ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এখানেই মৃত্যু শেষ পর্যন্ত সবাইকে সমান করে দিয়েছে—দেশ থেকে বহু দূরে এসে দুর্ঘটনা, রোগ কিংবা অকালমৃত্যুর শিকার হওয়া মানুষকে।
সমাধিফলকের ভাষাতেও সেই নিঃসঙ্গতার ছাপ রয়েছে। শিশুদের সমাধিতে বাবা-মায়ের কথা, নারীদের সমাধিতে স্বামী কিংবা পরিবারের কথা পাওয়া যায়। কিন্তু তরুণ পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় ‘ভাই চা-বাগান মালিক’ কিংবা ‘ভাই চা-বাগান মালিক ও বন্ধুবর্গ’-এর উল্লেখ। অনেক ফলকেই লেখা রয়েছে—“তার ভাই চা-বাগান মালিকদের দ্বারা নির্মিত” অথবা “ভাই চা-বাগান মালিক ও বন্ধুবর্গের দ্বারা নির্মিত”।
অর্থাৎ পরিবার ছিল বহু দূরে। বিদেশের মাটিতে তাদের আপনজন হয়ে উঠেছিলেন একই পেশায় থাকা অন্য চা-বাগানকর্মীরাই। সমাধিক্ষেত্রে থাকা ১৯টি পরিচিত সমাধির মধ্যে তিনটি শিশুর। একজন প্রায় পৌনে তিন বছরের ক্রিস্টিনা অ্যানি। আর একজন তরুণী এমিলি গ্রাহাম, যাঁর মৃত্যু হয়েছিল ম্যালেরিয়ায়। এ অঞ্চলে তখন ম্যালেরিয়া ছিল ভয়াবহ বাস্তবতা। আজকের পরিচিত, সবুজে ঘেরা পর্যটননগরী শ্রীমঙ্গলের জায়গায় একসময় ছিল ঘন অরণ্য, বাঘের বিচরণভূমি এবং মশাবাহিত রোগের প্রকোপ। তবু সেই সময়ের ইউরোপীয় তরুণদের কাছে ‘আসাম’ ছিল এক ধরনের স্বপ্নের নাম।
ডিনস্টন সিমেট্রি যেন এক টুকরো স্কটল্যান্ড
সুরমা ভ্যালিতে চা-বাগানের বিস্তার শুরু হয় ১৮৬০-এর দশকে। আসাম ও সিলেটকে ঘিরে ব্রিটিশদের মধ্যে তখন এক ধরনের ‘চায়ের উন্মাদনা’ তৈরি হয়েছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকা যুক্ত ছিল। কেউ কেউ এই অঞ্চলের চা-উন্মাদনাকে আমেরিকার ‘ক্যালিফোর্নিয়া গোল্ড রাশ’-এর সঙ্গেও তুলনা করতেন।
চা-বাগানে সহজে বিপুল মুনাফা করা যায়—এমন প্রচার ছড়িয়ে পড়েছিল। ফলে জাহাজের কাপ্তান থেকে অফিসের কেরানি—বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ চা-বাগান ব্যবসায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। তৎকালীন ব্রিটেনের কর্মহীন তরুণদের কাছে ‘আসাম’ হয়ে উঠেছিল এক রোমাঞ্চকর সম্ভাবনার নাম। ‘স্বর্গীয় স্থান আসাম’—এই ধারণা তাঁদের আকৃষ্ট করেছিল। সেই সময়ের কবিতাতেও আসাম-সিলেটে ছুটে আসা ব্রিটিশ তরুণদের নিয়ে রসিকতা করা হয়েছে।
কেন সবাই স্কটিশ?
সমাধিক্ষেত্রটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো—এখানে সমাধিস্থ ইউরোপীয়দের মধ্যে যাদের জন্মস্থান সমাধিফলকে পাওয়া গেছে, তাদের সবাই স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকার মানুষ। ইংল্যান্ড কিংবা আয়ারল্যান্ডের কাউকে এখানে পাওয়া যায়নি বলে সমাধিফলকের তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয়।
স্থানীয় মানুষের কাছে তারা সবাই ছিলেন ‘সাহেব’। কিন্তু সাহেবদের মধ্যেও যে আলাদা পরিচয়, আঞ্চলিকতা ও সামাজিক ইতিহাস ছিল, ডিনস্টন সিমেট্রি তার একটি চমৎকার উদাহরণ।
রাজঘাট, কালীঘাট, কেজুরীছড়া, কাকিয়াছড়া, উদনাছড়া, শ্রীমঙ্গল, দারাগাঁও কিংবা সিন্দুরখান—বালিশিরা ভ্যালির বিভিন্ন চা-বাগানে কাজ করতে এসে মৃত্যুবরণ করা এসব মানুষকে শেষ পর্যন্ত কবর দেওয়া হয়েছে এই সমাধিক্ষেত্রে। তাদের জন্মভূমি কিন্তু ছিল হাজার মাইল দূরের স্কটল্যান্ড।
স্কটিশ ইতিহাসের সঙ্গে এই গল্পের একটি গভীর যোগসূত্রও রয়েছে। একসময় বাংলাদেশের স্কুল পাঠ্যসূচিতে রবার্ট ব্রুসের গল্প পড়ানো হতো। যুদ্ধে বারবার পরাজিত হয়ে পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেওয়া ব্রুস একটি মাকড়সাকে জাল বেয়ে উঠতে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। বারবার পড়ে গিয়ে সপ্তমবারে মাকড়সাটি সফল হয়। ব্রুসও নতুন উদ্যমে যুদ্ধ শুরু করেন এবং ১৩১৪ সালে ইংল্যান্ডের রাজা এডওয়ার্ড দ্বিতীয়কে পরাজিত করে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেন।
‘ব্রেভহার্ট’ চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় চরিত্র উইলিয়াম ওয়ালেসও ঐতিহাসিকভাবে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত। রবার্ট ব্রুস ও উইলিয়াম ওয়ালেস—দুজনই স্কটল্যান্ডের জাতীয় বীর।
পরবর্তী সময়ে ১৭০৭ সালে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের রাজনৈতিক একীকরণের মাধ্যমে গ্রেট ব্রিটেন রাজ্য গঠিত হয়। কিন্তু তার আগে দীর্ঘ সময় ধরে ইংরেজ আধিপত্যের বিরুদ্ধে স্কটিশদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও জাতীয় পরিচয়ের সংগ্রাম ছিল।
ডিনস্টন সিমেট্রি দেড়শ বছরের স্মৃতি
সুরমা ভ্যালির চা-বাগানের প্রাথমিক উত্থানের সময় অনেক ব্যবসায়ী অল্প দামে পরিত্যক্ত টিলা ও জমি কিনেছিলেন। কেউ কেউ ১০০ টাকার জমি ৩০০ টাকায় কিনেছিলেন। কিন্তু জায়গা, আবহাওয়া ও ব্যবসার বাস্তবতা না বুঝে বিনিয়োগ করায় তাঁদের অনেকেই অল্প সময়ের মধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে নেন।
চা-বাগান ব্যবসা কয়েক বছরের মধ্যে ঘুরে দাঁড়ালে মাঠে আসে জেমস ফিনলে কোম্পানি। ১৮৭০ সালের দিকে পূর্বে ইউরোপীয় উদ্যোক্তাদের হাতে গড়ে ওঠা বেশ কিছু চা-বাগান ক্রমে ফিনলের মালিকানায় চলে আসে।
পরবর্তী সময়ে কোম্পানিটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিশাল শক্তিতে পরিণত হয়। এর উন্নতির সঙ্গে জন মুইরের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কোম্পানির পূর্ণ মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এলেও মানুষের মুখে জেমস ফিনলে নামটিই থেকে যায়। এই উত্থানের অন্যতম ভিত্তি ছিল সুরমা ভ্যালির চা-বাগানে তাদের বিনিয়োগ।
জন মুইর শুধু দেউলিয়া হয়ে যাওয়া বাগান কিনে নেননি; বালিশিরা ভ্যালির বিপুল পতিত জমিও তাঁর উদ্যোগে বন্দোবস্ত নেওয়া হয়। ত্রিপুরার মহারাজার কাছ থেকে ১৩,৬০৯ একর জমি নেওয়ার পাশাপাশি এলাকায় ব্যক্তি মালিকানাধীন টিলা ও জমিও ক্রয় করা হয়। ধীরে ধীরে সুরমা ভ্যালিতে তারা বৃহত্তম চা-বাগান মালিকদের অন্যতম হয়ে ওঠে।
১৮৮৫ সালের দিকে শুধু বালিশিরা ভ্যালিতেই ফিনলের মালিকানাধীন চা-বাগানের আয়তন সিলেটের মোট চা-আবাদি এলাকার অর্ধেকের বেশি হয়ে যায় বলে তথ্য পাওয়া যায়। ১৯০০ সালের দিকে তৎকালীন আসামের সব জেলার মধ্যে সিলেটের চা উৎপাদন ছিল সর্বাধিক।
চা-বাগানের মালিকদের তখন সিলেটের ঐতিহ্যবাহী অভিজাত জমিদারদের মতোই সামাজিক মর্যাদা দেওয়া হতো।
ডিনস্টন নামের পেছনের গল্প
সমাধিক্ষেত্রটির নাম ডিনস্টন সিমেট্রি—আর ডিনস্টন হচ্ছে স্কটল্যান্ডের একটি ছোট গ্রাম। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই ছোট্ট স্কটিশ গ্রামের নাম বহনকারী সমাধিক্ষেত্রটি হাজার হাজার মাইল দূরে শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। ডিনস্টনেই সমাধিস্থ আছেন জন মুইর, যার হাত ধরে জেমস ফিনলে প্রতিষ্ঠানটি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল বলে এই ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।
অর্থাৎ ডিনস্টন নামটি কেবল একটি সমাধিক্ষেত্রের নাম নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে স্কটল্যান্ডের একটি ছোট জনপদ, একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী এবং সিলেটের চা-বাগান অর্থনীতির মধ্যে এক অদ্ভুত ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক সংযোগ।
ডিনস্টনের পেছনের গল্প রোমাঞ্চকর
এই সমাধিক্ষেত্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অ্যাডাম হেয়ার নামের আরেক ব্যক্তির স্মৃতিও। তিনি এই অঞ্চলের চা-বাগানের দায়িত্বে ছিলেন। ১০০ বছর বয়সে তার মৃত্যু হলে স্কটল্যান্ডের সংবাদপত্র দ্য হেরাল্ড ২২ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে তাঁকে নিয়ে পূর্ণ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল “চা-বাগানের ব্যবস্থাপক যিনি বাগানগুলো পরিচালনা করতেন”। বিস্ময়করভাবে, তার সামরিক পরিচয়—রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভাল রিজার্ভের লেফটেন্যান্ট কমান্ডার—থাকার পরও চা-বাগানের ব্যবস্থাপক হিসেবে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
চা-বাগানের সঙ্গে শ্রমিকদের অন্য ইতিহাস
তবে ডিনস্টন সিমেট্রির গল্প কেবল স্কটিশ সাহেবদের গল্প নয়। এর আড়ালে রয়েছে চা-শ্রমিকদের দীর্ঘ এবং বেদনাময় ইতিহাসও। চা-বাগানের শ্রমিকদের বিভিন্ন সময় ভারতবর্ষের নানা অঞ্চল থেকে এনে বসতি স্থাপন করানো হয়েছিল। ‘গাছ হিলায়েগা তো পয়সা মিলায়েগা’- এ ধরনের প্রলোভনের কথা বলে তাঁদের আনা হয়েছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
চা-বাগান গড়ে ওঠার সঙ্গে তাদের শ্রম ও জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। তাদের বহু প্রজন্মের জীবন কেটেছে বাগানের ভেতরেই। তাই সুরমা ভ্যালির চা-শিল্পের ইতিহাস যেমন স্কটিশ উদ্যোক্তা ও ইউরোপীয় ব্যবস্থাপকদের ইতিহাস, তেমনি এটি চা-শ্রমিকদের দীর্ঘ সংগ্রাম ও বঞ্চনার ইতিহাসও।
চা-শিল্প এই অঞ্চলে তৎকালীন সময়ে এক ধরনের অর্থনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল। রেলপথ গড়ে ওঠে, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয় এবং শ্রীমঙ্গল দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়।
রেললাইন বদলে দিয়েছিল শ্রীমঙ্গলকে
ব্রিটিশ আমলেই চা-শিল্পের প্রয়োজন মেটাতে এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি শুরু হয়। রেলপথ স্থাপনের ফলে চা-বাগানের উৎপাদন পরিবহন সহজ হয় এবং শ্রীমঙ্গল দেশের বৃহত্তর যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।
আজকের পর্যটননগরী শ্রীমঙ্গলের ভিত্তি তাই শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এর পেছনে রয়েছে চা-শিল্প, রেলপথ, বাণিজ্য, ঔপনিবেশিক অর্থনীতি এবং বহু মানুষের শ্রমের দীর্ঘ ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের একটি ছোট, নীরব অধ্যায় সংরক্ষণ করে রেখেছে ডিনস্টন সিমেট্রি।
কেউ এসেছিলেন স্কটল্যান্ডের কোনো ছোট শহর বা গ্রামের পথ পেরিয়ে। কেউ হয়তো ভেবেছিলেন, কয়েক বছরের মধ্যে অর্থ উপার্জন করে দেশে ফিরে যাবেন। কেউ চা-বাগানের ব্যবস্থাপক হয়েছেন, কেউ সহকারী, কেউ হয়তো অন্য কোনো দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু সবার গল্পের শেষ অধ্যায় লেখা হয়েছে শ্রীমঙ্গলের মাটিতে।
গল্পেরা ধূসর হয় স্মৃতিস্তম্ভের শরীরে
সময় বদলেছে। ব্রিটিশ শাসন শেষ হয়েছে। চা-বাগানের মালিকানাও বদলেছে। জেমস ফিনলে ২০০৬ সালে বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় তাদের সম্পদ কনসোলিডেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ড কোম্পানি (বিডি) লিমিটেড-এর কাছে বিক্রি করে যায়।
কিন্তু মালিকানা বদলালেও ডিনস্টন সিমেট্রি থেকে মুছে যায়নি সেই পুরোনো ইতিহাস। সমাধিফলকের গায়ে এখনো স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন জনপদের নাম। আর পুরো সমাধিক্ষেত্রটি বহন করে চলেছে স্কটল্যান্ডের ছোট্ট একটি গ্রামের নাম—ডিনস্টন।
জানা যায়, আজও কখনো কখনো সমাধিস্থ ব্যক্তিদের বংশধরেরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শ্রীমঙ্গলে আসেন তাঁদের পূর্বপুরুষদের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে। তাদের জন্য এটি শুধু একটি কবরস্থান নয়। এটি তাদের পারিবারিক ইতিহাসের একটি দূরবর্তী অধ্যায়—যে অধ্যায় লেখা হয়েছিল সিলেটের চা-বাগানের সবুজের মধ্যে।
স্কটল্যান্ডের পাহাড়ি জনপদ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে বাংলাদেশের একটি চা-বাগানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই সমাধিক্ষেত্র যেন দুই ভূখণ্ডের মধ্যে এক অদৃশ্য সেতু। একদিকে স্কটল্যান্ডের ডিনস্টন, অন্যদিকে সিলেটের বালিশিরা ভ্যালি।
একদিকে চা-বাগান গড়ে তোলা ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের স্বপ্ন, অন্যদিকে সেই বাগানের মাটি ও পাতার সঙ্গে জীবন বেঁধে ফেলা চা-শ্রমিকদের ইতিহাস। আর মাঝখানে ৪১টি নীরব সমাধি—যারা কথা বলে না, কিন্তু যাদের পাথরের ফলক আজও বলে যায় শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানের এক বিস্মৃত সময়ের গল্প।
এখানে প্রতিটি টিলা, প্রতিটি পুরোনো বাংলো, প্রতিটি রেললাইন এবং এমনকি একটি ছোট সমাধিক্ষেত্রও বহন করে চলেছে অতীতের কোনো না কোনো গল্প। সেই গল্পের সবচেয়ে নীরব অথচ বিস্ময়কর সাক্ষীদের একজন—ডিনস্টন সিমেট্রি।

শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের মানচিত্রে শ্রীমঙ্গল একটি উপজেলা। কিন্তু পরিচয়ের দিক থেকে এটি যেন একটি আলাদা ভূগোল। চারদিকে হাওর, পাহাড়, টিলা, বিল, হ্রদ, বনাঞ্চল, সংরক্ষিত বনভূমি আর সারি সারি চা-বাগান—সব মিলিয়ে শ্রীমঙ্গলকে দূর থেকে দেখলে মনে হয় প্রকৃতির হাতে আঁকা কোনো ছবি। দেশের মানুষের কাছে এটি চায়ের রাজধানী, আর বিদেশি পর্যটকদের কাছেও বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত পর্যটন গন্তব্য।
শ্রীমঙ্গলের চারপাশের চা-অঞ্চলটি ঐতিহাসিকভাবে বালিশিরা ভ্যালি নামে পরিচিত। এর সঙ্গে লস্করপুর, লংলা, মনু-ধলই ও নর্থ সিলেট ভ্যালি মিলিয়ে স্বাধীনতার আগে বৃহত্তর সুরমা ভ্যালির চা-অঞ্চল গড়ে উঠেছিল। আঁকাবাঁকা, চড়াই-উতরাই পথের দুই পাশে যতদূর চোখ যায় শুধু চা-বাগান। কোথাও সমতল, কোথাও ঢেউ খেলানো টিলা। সিন্দুরখান, রাজঘাট, কাকিয়াছড়া, ফুলছড়া, কেজুরীছড়া, ভূরভুরিয়া—নামগুলোও যেন এই ভূদৃশ্যের সঙ্গে মিশে থাকা কোনো পুরোনো কবিতার পঙ্ক্তি।
ধান, সরিষা কিংবা সবজির ক্ষেতের চেনা গ্রামীণ দৃশ্য এখানে খুব বেশি চোখে পড়ে না। এখানে মূল দৃশ্যই চা, আর চা।
বাগানের ভেতরে দূরে দূরে শ্রমিকদের পাড়া। মাটির দেয়ালের ওপর পুরোনো ঢেউটিন কিংবা ছনের দোচালা ঘর। কোনো কোনো বাড়ির দেয়ালে হাতে আঁকা আলপনা, উঠোন ঝকঝকে পরিষ্কার। কোথাও আবার গাছপালায় ঘেরা আসাম-ধাঁচের টিনের ছাউনি দেওয়া বাংলো। আধুনিক অট্টালিকার দৃষ্টিকটু ভিড় নেই। প্রকৃতি আর মানুষের পুরোনো জীবনযাপন এখানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
চা-বাগানের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তার পাশে এই সমাধিক্ষেত্র। চারপাশ এতটাই পরিচ্ছন্ন যে শ্যাওলা কিংবা আগাছাকেও যেন বাড়তে দেওয়া হয়নি। শ্রীপুরের কাওরাই এলাকার ব্রাহ্ম সমাধিস্থলের মতো এখানে সাপ-সরীসৃপের ভয়ে সতর্ক হয়ে পা ফেলতে হয় না। বরং প্রবেশের আগে জায়গাটির পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা দেখে অনেকেরই স্বতঃস্ফূর্তভাবে জুতো খুলে বাইরে রেখে দিতে ইচ্ছে করে।
নকশায় ৪৩টি সমাধির উল্লেখ রয়েছে। তবে ২ ও ৩৩ নম্বর দুটি সমাধি এখন ফাঁকা। ফলে বর্তমানে এখানে রয়েছে ৪১টি সমাধি। আকারে এটি কুমিল্লার ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রির মতো বিশাল নয়। সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত মিত্রবাহিনীর ৭৩৬ জন সৈনিকের সমাধি রয়েছে, সারিবদ্ধ অসংখ্য সমাধিফলকও চোখে পড়ে। ডিনস্টন সিমেট্রি তার তুলনায় ছোট, সমতল এবং অনেকটাই অনুল্লেখযোগ্য মনে হতে পারে। কিন্তু এই ছোট্ট সমাধিক্ষেত্রের আসল বিস্ময় লুকিয়ে আছে তার সমাধিফলকগুলোর শিল্পকর্ম ও ইতিহাসে।
এখানে বড় বড় সমাধিসৌধ নেই। প্রতিটি সমাধিতে রয়েছে সাদা পাথরে খোদাই করা নকশাযুক্ত সমাধিফলক। আকারে খুব বড় নয়, কিন্তু ফলকের গায়ে যে সূক্ষ্ম কারুকাজ, তা বিস্ময় জাগায়। এমন শিল্পসমৃদ্ধ সমাধিফলকের এক-দুটি দৃষ্টান্ত আর্মেনীয় চার্চের প্রাঙ্গণে দেখা গেলেও এ ধরনের কাজ সচরাচর চোখে পড়ে না।
সমাধিফলকের তথ্য থেকে অন্তত ১৯ জনের পরিচয় ও জীবন সম্পর্কে জানা যায়। তাদের মৃত্যুসাল ১৮৮০ থেকে ১৯২২। অর্থাৎ সুরমা ভ্যালিতে চা-বাগান গড়ে ওঠার একেবারে শুরুর সময়ের ইউরোপীয়দেরও সমাধি রয়েছে এখানে।
কেউ মারা গেছেন ৩০ বছর বয়সে, কেউ ৪০ বা ৫০-এর মধ্যে। কেউ আবার মাত্র কয়েক মাসের শিশু। একজন সার্জেন্ট মেজরের মাত্র সাড়ে নয় মাস বয়সী ছেলে ‘সনি’র সমাধিও রয়েছে এখানে।
২৪ বছর বয়সী তরুণ জেমস পিটার রাসেল মারা যান ১৮৮৮ সালে। সমাধিফলকের তথ্য অনুযায়ী, সিন্দুরখান চা-বাগানের কাছাকাছি এক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। সে সময় এই অঞ্চলে আজকের মতো মোটরগাড়ির চলাচলও ছিল না।
এই নামগুলো পড়তে পড়তে বোঝা যায়, বিদেশের মাটিতে জীবন গড়তে এসে কত তরুণ-তরুণীকে কত অল্প বয়সেই থেমে যেতে হয়েছিল। তাঁদের অনেকের হয়তো আর নিজ দেশে ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এখানেই মৃত্যু শেষ পর্যন্ত সবাইকে সমান করে দিয়েছে—দেশ থেকে বহু দূরে এসে দুর্ঘটনা, রোগ কিংবা অকালমৃত্যুর শিকার হওয়া মানুষকে।
সমাধিফলকের ভাষাতেও সেই নিঃসঙ্গতার ছাপ রয়েছে। শিশুদের সমাধিতে বাবা-মায়ের কথা, নারীদের সমাধিতে স্বামী কিংবা পরিবারের কথা পাওয়া যায়। কিন্তু তরুণ পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় ‘ভাই চা-বাগান মালিক’ কিংবা ‘ভাই চা-বাগান মালিক ও বন্ধুবর্গ’-এর উল্লেখ। অনেক ফলকেই লেখা রয়েছে—“তার ভাই চা-বাগান মালিকদের দ্বারা নির্মিত” অথবা “ভাই চা-বাগান মালিক ও বন্ধুবর্গের দ্বারা নির্মিত”।
অর্থাৎ পরিবার ছিল বহু দূরে। বিদেশের মাটিতে তাদের আপনজন হয়ে উঠেছিলেন একই পেশায় থাকা অন্য চা-বাগানকর্মীরাই। সমাধিক্ষেত্রে থাকা ১৯টি পরিচিত সমাধির মধ্যে তিনটি শিশুর। একজন প্রায় পৌনে তিন বছরের ক্রিস্টিনা অ্যানি। আর একজন তরুণী এমিলি গ্রাহাম, যাঁর মৃত্যু হয়েছিল ম্যালেরিয়ায়। এ অঞ্চলে তখন ম্যালেরিয়া ছিল ভয়াবহ বাস্তবতা। আজকের পরিচিত, সবুজে ঘেরা পর্যটননগরী শ্রীমঙ্গলের জায়গায় একসময় ছিল ঘন অরণ্য, বাঘের বিচরণভূমি এবং মশাবাহিত রোগের প্রকোপ। তবু সেই সময়ের ইউরোপীয় তরুণদের কাছে ‘আসাম’ ছিল এক ধরনের স্বপ্নের নাম।
ডিনস্টন সিমেট্রি যেন এক টুকরো স্কটল্যান্ড
সুরমা ভ্যালিতে চা-বাগানের বিস্তার শুরু হয় ১৮৬০-এর দশকে। আসাম ও সিলেটকে ঘিরে ব্রিটিশদের মধ্যে তখন এক ধরনের ‘চায়ের উন্মাদনা’ তৈরি হয়েছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকা যুক্ত ছিল। কেউ কেউ এই অঞ্চলের চা-উন্মাদনাকে আমেরিকার ‘ক্যালিফোর্নিয়া গোল্ড রাশ’-এর সঙ্গেও তুলনা করতেন।
চা-বাগানে সহজে বিপুল মুনাফা করা যায়—এমন প্রচার ছড়িয়ে পড়েছিল। ফলে জাহাজের কাপ্তান থেকে অফিসের কেরানি—বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ চা-বাগান ব্যবসায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। তৎকালীন ব্রিটেনের কর্মহীন তরুণদের কাছে ‘আসাম’ হয়ে উঠেছিল এক রোমাঞ্চকর সম্ভাবনার নাম। ‘স্বর্গীয় স্থান আসাম’—এই ধারণা তাঁদের আকৃষ্ট করেছিল। সেই সময়ের কবিতাতেও আসাম-সিলেটে ছুটে আসা ব্রিটিশ তরুণদের নিয়ে রসিকতা করা হয়েছে।
কেন সবাই স্কটিশ?
সমাধিক্ষেত্রটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো—এখানে সমাধিস্থ ইউরোপীয়দের মধ্যে যাদের জন্মস্থান সমাধিফলকে পাওয়া গেছে, তাদের সবাই স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকার মানুষ। ইংল্যান্ড কিংবা আয়ারল্যান্ডের কাউকে এখানে পাওয়া যায়নি বলে সমাধিফলকের তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয়।
স্থানীয় মানুষের কাছে তারা সবাই ছিলেন ‘সাহেব’। কিন্তু সাহেবদের মধ্যেও যে আলাদা পরিচয়, আঞ্চলিকতা ও সামাজিক ইতিহাস ছিল, ডিনস্টন সিমেট্রি তার একটি চমৎকার উদাহরণ।
রাজঘাট, কালীঘাট, কেজুরীছড়া, কাকিয়াছড়া, উদনাছড়া, শ্রীমঙ্গল, দারাগাঁও কিংবা সিন্দুরখান—বালিশিরা ভ্যালির বিভিন্ন চা-বাগানে কাজ করতে এসে মৃত্যুবরণ করা এসব মানুষকে শেষ পর্যন্ত কবর দেওয়া হয়েছে এই সমাধিক্ষেত্রে। তাদের জন্মভূমি কিন্তু ছিল হাজার মাইল দূরের স্কটল্যান্ড।
স্কটিশ ইতিহাসের সঙ্গে এই গল্পের একটি গভীর যোগসূত্রও রয়েছে। একসময় বাংলাদেশের স্কুল পাঠ্যসূচিতে রবার্ট ব্রুসের গল্প পড়ানো হতো। যুদ্ধে বারবার পরাজিত হয়ে পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেওয়া ব্রুস একটি মাকড়সাকে জাল বেয়ে উঠতে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। বারবার পড়ে গিয়ে সপ্তমবারে মাকড়সাটি সফল হয়। ব্রুসও নতুন উদ্যমে যুদ্ধ শুরু করেন এবং ১৩১৪ সালে ইংল্যান্ডের রাজা এডওয়ার্ড দ্বিতীয়কে পরাজিত করে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেন।
‘ব্রেভহার্ট’ চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় চরিত্র উইলিয়াম ওয়ালেসও ঐতিহাসিকভাবে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত। রবার্ট ব্রুস ও উইলিয়াম ওয়ালেস—দুজনই স্কটল্যান্ডের জাতীয় বীর।
পরবর্তী সময়ে ১৭০৭ সালে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের রাজনৈতিক একীকরণের মাধ্যমে গ্রেট ব্রিটেন রাজ্য গঠিত হয়। কিন্তু তার আগে দীর্ঘ সময় ধরে ইংরেজ আধিপত্যের বিরুদ্ধে স্কটিশদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও জাতীয় পরিচয়ের সংগ্রাম ছিল।
ডিনস্টন সিমেট্রি দেড়শ বছরের স্মৃতি
সুরমা ভ্যালির চা-বাগানের প্রাথমিক উত্থানের সময় অনেক ব্যবসায়ী অল্প দামে পরিত্যক্ত টিলা ও জমি কিনেছিলেন। কেউ কেউ ১০০ টাকার জমি ৩০০ টাকায় কিনেছিলেন। কিন্তু জায়গা, আবহাওয়া ও ব্যবসার বাস্তবতা না বুঝে বিনিয়োগ করায় তাঁদের অনেকেই অল্প সময়ের মধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে নেন।
চা-বাগান ব্যবসা কয়েক বছরের মধ্যে ঘুরে দাঁড়ালে মাঠে আসে জেমস ফিনলে কোম্পানি। ১৮৭০ সালের দিকে পূর্বে ইউরোপীয় উদ্যোক্তাদের হাতে গড়ে ওঠা বেশ কিছু চা-বাগান ক্রমে ফিনলের মালিকানায় চলে আসে।
পরবর্তী সময়ে কোম্পানিটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিশাল শক্তিতে পরিণত হয়। এর উন্নতির সঙ্গে জন মুইরের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কোম্পানির পূর্ণ মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এলেও মানুষের মুখে জেমস ফিনলে নামটিই থেকে যায়। এই উত্থানের অন্যতম ভিত্তি ছিল সুরমা ভ্যালির চা-বাগানে তাদের বিনিয়োগ।
জন মুইর শুধু দেউলিয়া হয়ে যাওয়া বাগান কিনে নেননি; বালিশিরা ভ্যালির বিপুল পতিত জমিও তাঁর উদ্যোগে বন্দোবস্ত নেওয়া হয়। ত্রিপুরার মহারাজার কাছ থেকে ১৩,৬০৯ একর জমি নেওয়ার পাশাপাশি এলাকায় ব্যক্তি মালিকানাধীন টিলা ও জমিও ক্রয় করা হয়। ধীরে ধীরে সুরমা ভ্যালিতে তারা বৃহত্তম চা-বাগান মালিকদের অন্যতম হয়ে ওঠে।
১৮৮৫ সালের দিকে শুধু বালিশিরা ভ্যালিতেই ফিনলের মালিকানাধীন চা-বাগানের আয়তন সিলেটের মোট চা-আবাদি এলাকার অর্ধেকের বেশি হয়ে যায় বলে তথ্য পাওয়া যায়। ১৯০০ সালের দিকে তৎকালীন আসামের সব জেলার মধ্যে সিলেটের চা উৎপাদন ছিল সর্বাধিক।
চা-বাগানের মালিকদের তখন সিলেটের ঐতিহ্যবাহী অভিজাত জমিদারদের মতোই সামাজিক মর্যাদা দেওয়া হতো।
ডিনস্টন নামের পেছনের গল্প
সমাধিক্ষেত্রটির নাম ডিনস্টন সিমেট্রি—আর ডিনস্টন হচ্ছে স্কটল্যান্ডের একটি ছোট গ্রাম। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই ছোট্ট স্কটিশ গ্রামের নাম বহনকারী সমাধিক্ষেত্রটি হাজার হাজার মাইল দূরে শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। ডিনস্টনেই সমাধিস্থ আছেন জন মুইর, যার হাত ধরে জেমস ফিনলে প্রতিষ্ঠানটি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল বলে এই ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।
অর্থাৎ ডিনস্টন নামটি কেবল একটি সমাধিক্ষেত্রের নাম নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে স্কটল্যান্ডের একটি ছোট জনপদ, একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী এবং সিলেটের চা-বাগান অর্থনীতির মধ্যে এক অদ্ভুত ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক সংযোগ।
ডিনস্টনের পেছনের গল্প রোমাঞ্চকর
এই সমাধিক্ষেত্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অ্যাডাম হেয়ার নামের আরেক ব্যক্তির স্মৃতিও। তিনি এই অঞ্চলের চা-বাগানের দায়িত্বে ছিলেন। ১০০ বছর বয়সে তার মৃত্যু হলে স্কটল্যান্ডের সংবাদপত্র দ্য হেরাল্ড ২২ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে তাঁকে নিয়ে পূর্ণ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল “চা-বাগানের ব্যবস্থাপক যিনি বাগানগুলো পরিচালনা করতেন”। বিস্ময়করভাবে, তার সামরিক পরিচয়—রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভাল রিজার্ভের লেফটেন্যান্ট কমান্ডার—থাকার পরও চা-বাগানের ব্যবস্থাপক হিসেবে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
চা-বাগানের সঙ্গে শ্রমিকদের অন্য ইতিহাস
তবে ডিনস্টন সিমেট্রির গল্প কেবল স্কটিশ সাহেবদের গল্প নয়। এর আড়ালে রয়েছে চা-শ্রমিকদের দীর্ঘ এবং বেদনাময় ইতিহাসও। চা-বাগানের শ্রমিকদের বিভিন্ন সময় ভারতবর্ষের নানা অঞ্চল থেকে এনে বসতি স্থাপন করানো হয়েছিল। ‘গাছ হিলায়েগা তো পয়সা মিলায়েগা’- এ ধরনের প্রলোভনের কথা বলে তাঁদের আনা হয়েছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
চা-বাগান গড়ে ওঠার সঙ্গে তাদের শ্রম ও জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। তাদের বহু প্রজন্মের জীবন কেটেছে বাগানের ভেতরেই। তাই সুরমা ভ্যালির চা-শিল্পের ইতিহাস যেমন স্কটিশ উদ্যোক্তা ও ইউরোপীয় ব্যবস্থাপকদের ইতিহাস, তেমনি এটি চা-শ্রমিকদের দীর্ঘ সংগ্রাম ও বঞ্চনার ইতিহাসও।
চা-শিল্প এই অঞ্চলে তৎকালীন সময়ে এক ধরনের অর্থনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল। রেলপথ গড়ে ওঠে, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয় এবং শ্রীমঙ্গল দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়।
রেললাইন বদলে দিয়েছিল শ্রীমঙ্গলকে
ব্রিটিশ আমলেই চা-শিল্পের প্রয়োজন মেটাতে এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি শুরু হয়। রেলপথ স্থাপনের ফলে চা-বাগানের উৎপাদন পরিবহন সহজ হয় এবং শ্রীমঙ্গল দেশের বৃহত্তর যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।
আজকের পর্যটননগরী শ্রীমঙ্গলের ভিত্তি তাই শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এর পেছনে রয়েছে চা-শিল্প, রেলপথ, বাণিজ্য, ঔপনিবেশিক অর্থনীতি এবং বহু মানুষের শ্রমের দীর্ঘ ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের একটি ছোট, নীরব অধ্যায় সংরক্ষণ করে রেখেছে ডিনস্টন সিমেট্রি।
কেউ এসেছিলেন স্কটল্যান্ডের কোনো ছোট শহর বা গ্রামের পথ পেরিয়ে। কেউ হয়তো ভেবেছিলেন, কয়েক বছরের মধ্যে অর্থ উপার্জন করে দেশে ফিরে যাবেন। কেউ চা-বাগানের ব্যবস্থাপক হয়েছেন, কেউ সহকারী, কেউ হয়তো অন্য কোনো দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু সবার গল্পের শেষ অধ্যায় লেখা হয়েছে শ্রীমঙ্গলের মাটিতে।
গল্পেরা ধূসর হয় স্মৃতিস্তম্ভের শরীরে
সময় বদলেছে। ব্রিটিশ শাসন শেষ হয়েছে। চা-বাগানের মালিকানাও বদলেছে। জেমস ফিনলে ২০০৬ সালে বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় তাদের সম্পদ কনসোলিডেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ড কোম্পানি (বিডি) লিমিটেড-এর কাছে বিক্রি করে যায়।
কিন্তু মালিকানা বদলালেও ডিনস্টন সিমেট্রি থেকে মুছে যায়নি সেই পুরোনো ইতিহাস। সমাধিফলকের গায়ে এখনো স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন জনপদের নাম। আর পুরো সমাধিক্ষেত্রটি বহন করে চলেছে স্কটল্যান্ডের ছোট্ট একটি গ্রামের নাম—ডিনস্টন।
জানা যায়, আজও কখনো কখনো সমাধিস্থ ব্যক্তিদের বংশধরেরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শ্রীমঙ্গলে আসেন তাঁদের পূর্বপুরুষদের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে। তাদের জন্য এটি শুধু একটি কবরস্থান নয়। এটি তাদের পারিবারিক ইতিহাসের একটি দূরবর্তী অধ্যায়—যে অধ্যায় লেখা হয়েছিল সিলেটের চা-বাগানের সবুজের মধ্যে।
স্কটল্যান্ডের পাহাড়ি জনপদ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে বাংলাদেশের একটি চা-বাগানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই সমাধিক্ষেত্র যেন দুই ভূখণ্ডের মধ্যে এক অদৃশ্য সেতু। একদিকে স্কটল্যান্ডের ডিনস্টন, অন্যদিকে সিলেটের বালিশিরা ভ্যালি।
একদিকে চা-বাগান গড়ে তোলা ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের স্বপ্ন, অন্যদিকে সেই বাগানের মাটি ও পাতার সঙ্গে জীবন বেঁধে ফেলা চা-শ্রমিকদের ইতিহাস। আর মাঝখানে ৪১টি নীরব সমাধি—যারা কথা বলে না, কিন্তু যাদের পাথরের ফলক আজও বলে যায় শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানের এক বিস্মৃত সময়ের গল্প।
এখানে প্রতিটি টিলা, প্রতিটি পুরোনো বাংলো, প্রতিটি রেললাইন এবং এমনকি একটি ছোট সমাধিক্ষেত্রও বহন করে চলেছে অতীতের কোনো না কোনো গল্প। সেই গল্পের সবচেয়ে নীরব অথচ বিস্ময়কর সাক্ষীদের একজন—ডিনস্টন সিমেট্রি।

আপনার মতামত লিখুন