সংবাদ

অভিমানী শিউলি: শরতের স্নিগ্ধতায় মাখা এক বিষাদময় সৌন্দর্য


শারমিন সুলতানা
শারমিন সুলতানা
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩০ পিএম

অভিমানী শিউলি: শরতের স্নিগ্ধতায় মাখা এক বিষাদময় সৌন্দর্য
ছবি : সংগৃহীত

আশ্বিন আর কার্তিকের ভোরে প্রকৃতি যখন কুয়াশার হালকা চাদর গায়ে দেয়, তখন চারপাশ এক মায়াবী সুবাসে ভরে ওঠে। রাতের শেষ প্রহরে গাছতলায় নেমে আসে সাদা পাপড়ির নরম চাদর। প্রতিটি ফুলের মাঝখানে জ্বলজ্বল করে কমলা-জাফরানি রঙের বোঁটা। চারপাশে ছড়িয়ে থাকে মিষ্টি অথচ তীব্র এক সুবাস। সেই ফুলের নাম শিউলি। একে বলা হয় শরতের রানি।

বাংলার প্রকৃতিতে শরতের আগমনী বার্তা বহন করা ফুলগুলোর মধ্যে শিউলি সবচেয়ে আপন। কাশফুলের দোল, নীল আকাশ, সাদা মেঘ আর ভোরের শিশির–সবকিছুর সঙ্গে শিউলির এক গভীর সম্পর্ক। কিন্তু এই ফুলের সৌন্দর্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক আশ্চর্য বিষাদও। সন্ধ্যার পর ফুটে ওঠে, আর সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ার আগেই ঝরে পড়ে। যেন রাতের আঁধারেই তার জন্ম, আর ভোরের আলোয় তার বিদায়।

শিউলির এই স্বভাবই তাকে অন্য ফুলের চেয়ে আলাদা করেছে। দিনের বেলায় গাছটিকে খুব সাধারণ মনে হলেও রাত নামতেই তার ডালে ডালে ফুটতে শুরু করে অসংখ্য সুগন্ধি ফুল। ভোরে দেখা যায়, গাছের নিচে ছড়িয়ে আছে ঝরে পড়া ফুলের স্তর। ফুলটি যেন গাছে থাকার চেয়ে মাটিতে পড়ে থাকতেই বেশি স্বচ্ছন্দ। শিশিরভেজা ঘাসের ওপর সেই ফুল কুড়াতে কুড়াতে গ্রামের কিশোরী কিংবা শহরের কোনো ছাদবাগানের মানুষ–সবাই যেন ফিরে যায় শৈশবের কোনো এক নির্মল সকালে।

নামের মাহাত্ম্য ও বৈজ্ঞানিক পরিচয়

শিউলি কেবল একটি ফুল নয়, এটি বাঙালির আবেগ। একে আমরা ‘শেফালিকা’ নামেও চিনি। তবে এর বৈজ্ঞানিক নাম শুনলে এর প্রতি মায়া আরও বেড়ে যায়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Nyctanthes arbor-tristis L.। লাতিন এই নামের শব্দগুলো বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়–নিকট্যানথিস’ মানে সন্ধ্যায় ফোটা এবং ‘আর্বর-ট্রিস্টিস’ মানে বিষণ্ন গাছ। সূর্য ওঠার আগেই এই ফুল ঝরে পড়ে বলে একে ইংরেজিতে ‘নাইট জেসমিন’ বা ‘ট্রি অফ সরো’ (দুঃখের বৃক্ষ) বলা হয়। মূলত দিনের আলোয় এর উজ্জ্বলতা ম্লান হয়ে যায় বলেই এমন বিষাদময় নামকরণ। তবে নামের মধ্যে ‘জেসমিন’ থাকলেও এটি প্রকৃত জুঁই পরিবারের ফুল নয়; এটি Oleaceae পরিবারের উদ্ভিদ। এটি মূলত দক্ষিণ এশিয়ার উদ্ভিদ। ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও থাইল্যান্ড–এই পুরো অঞ্চলেই শিউলির আধিপত্য দেখা যায়। এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ‘রাজ্য ফুল’ এবং থাইল্যান্ডের কাঞ্চনাবুরি প্রদেশের প্রতীক।

ইতিহাস বলে, শিউলি এই উপমহাদেশের নিজস্ব উদ্ভিদ। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৬ অব্দে কবি কালিদাসের কাব্যেও শিউলির সরব উপস্থিতি পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে শিউলি আমাদের মাটিরই সন্তান। বাংলায় শিউলি ছাড়াও শেফালি বা শেফালিকা নামে পরিচিত এই ফুল ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে পারিজাত, হরসিঙ্গারসহ নানা নামে পরিচিত। 

প্রকৃতি ও প্রকারভেদ

শিউলি সাধারণত একটি বহুবর্ষজীবী গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। এর ছাল ধূসর ও খসখসে, পাতা ডিম্বাকার, কিছুটা খসখসে এবং আগার দিকে সূচালো। গাছটি ১০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর পাতাগুলো ৬-৭ সেন্টিমিটার লম্বা এবং বিপরীতমুখী থাকে। ফুল ছোট, সাদা পাপড়ির সঙ্গে কমলা বা জাফরানি নলাকার বোঁটা থাকে। ফুলগুলো সাধারণত ছোট ছোট গুচ্ছে ফোটে এবং সুগন্ধ ছড়ায়।

শিউলির আরেকটি আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এর ফুল ফোটার সময়। সাধারণত সন্ধ্যার পর ফুল ফুটতে শুরু করে এবং ভোরের আগেই অনেক ফুল ঝরে যায়। ফলে দিনের আলোয় শিউলির গাছের যে চেহারা, রাতের বেলায় তার রূপ একেবারেই অন্যরকম।

সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত শিউলি ফোটার প্রধান মৌসুম। তবে প্রকৃতিভেদে কিছু ভিন্নতাও আছে। বর্তমানে শিউলির একটি বারোমাসি জাত দেখা যায়, যাতে সারা বছরই কমবেশি ফুল ফোটে। তবে শরতের শিউলির মতো সেই মাদকতাময় সুবাস সেখানে অতটা তীব্র হয় না।

শিউলিকে ঘিরে পৌরাণিক ও লোককথা

শিউলি ফুল


সূর্যের সঙ্গে অভিমানী শিউলির গল্প

শিউলিকে ঘিরে সবচেয়ে জনপ্রিয় কাহিনিগুলোর একটি হলো সূর্য ও শিউলির ব্যর্থ প্রেমের গ্রিক উপাখ্যান। এই কাহিনিতে শিউলি সূর্যের প্রতারিত স্ত্রী।কথিত আছে, সূর্যদেব একসময় শিউলির প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে অন্য নারীর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। এতে শিউলির মনে জন্ম নেয় তীব্র অভিমান ও বেদনা। শেষ পর্যন্ত প্রচণ্ড ঘৃণা ও অভিমানে তিনি সূর্যকে ত্যাগ করেন। সেই থেকেই শিউলিকে বলা হয় ‘নিশি বিষাদিনী’ – রাতের বিষণ্ন ফুল। লোককথায় বলা হয়, সূর্যের মুখোমুখি হতে না চাওয়ার কারণেই শিউলি রাতের আঁধারে ফুটে ওঠে এবং সূর্য ওঠার আগেই ঝরে পড়ে। ভোরের মাটিতে পড়ে থাকা অসংখ্য শিউলি ফুলকে তাই এই কাহিনিতে অভিমানী শিউলির নীরব অশ্রু হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে।

পারিজাতিকা ও সূর্যের ব্যর্থ প্রেম

আরেকটি বহুল প্রচলিত কাহিনিতে শিউলির সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারিজাতিকা নামে এক অপরূপা রাজকন্যার করুণ প্রেমের গল্প। কথিত আছে, পারিজাতিকা ছিলেন নাগরাজের সুন্দরী কন্যা। একসময় তিনি সূর্যের প্রেমে পড়েন। সূর্যের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল গভীর ও একনিষ্ঠ। কিন্তু সেই প্রেমের পরিণতি হওয়ার ছিল না। ব্যর্থ প্রেমের বেদনা ক্রমেই তাকে গ্রাস করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত প্রচণ্ড দুঃখ ও হতাশায় পারিজাতিকা আত্মহত্যা করেন। লোককথা বলে, তার দেহের চিতাভস্ম থেকেই জন্ম নেয় এক অপূর্ব বৃক্ষ – পারিজাত। এই কাহিনির সঙ্গে শিউলির ফুল ঝরে পড়ার বিষয়টিকেও যুক্ত করা হয়েছে। বলা হয়, পারিজাতিকা মৃত্যুর পরও সূর্যকে ক্ষমা করতে পারেননি। তাই তাঁর রূপান্তরিত সত্তা সূর্যের আলো সহ্য করতে পারে না। রাতের আঁধারে সে ফুল ফোটায়, চারদিকে সুবাস ছড়িয়ে দেয়; কিন্তু সূর্য ওঠার আগেই নীরবে মাটিতে ঝরে পড়ে। প্রতিটি ঝরে পড়া ফুল যেন সেই ব্যর্থ প্রেমিকার একটি করে অশ্রুবিন্দু। সাদা পাপড়ি আর গৈরিক-কমলা বোঁটায় যেন ফুটে ওঠে তার শুভ্র দেহ আর দুঃখের আগুন। এ কারণেই লোককথায় শিউলি হয়ে ওঠে নীরব, ব্যর্থ প্রেম ও চিরন্তন অভিমানের প্রতীক।

স্বর্গের পারিজাত ও কৃষ্ণের কাহিনি

শিউলি বা পারিজাতকে ঘিরে হিন্দু পুরাণে আরেকটি বিখ্যাত কাহিনি রয়েছে শ্রীকৃষ্ণকে কেন্দ্র করে। পুরাণের বিভিন্ন আখ্যানে পারিজাতকে স্বর্গের এক অসাধারণ বৃক্ষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এর ফুলের সৌন্দর্য ও সুবাস দেবলোককে মুগ্ধ করে রাখত। দেবরাজ ইন্দ্রের স্বর্গীয় উদ্যানেই ছিল এই পারিজাত বৃক্ষ। কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষ্ণের দুই স্ত্রী সত্যভামা ও রুক্মিণীর প্রসঙ্গ। পারিজাতের সৌন্দর্য ও সুবাসের কথা শুনে তাদেরও ইচ্ছা জাগে নিজেদের বাগানে এই স্বর্গীয় ফুল ফুটুক। বিশেষ করে সত্যভামার মনে পারিজাত বৃক্ষ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে তাদের মধ্যে কৃষ্ণ কাকে বেশি ভালোবাসেন – সত্যভামা নাকি রুক্মিণী – এমন মান-অভিমানের প্রসঙ্গও লোককথায় যুক্ত হয়েছে। একপর্যায়ে কৃষ্ণ সত্যভামাকে খুশি করতে স্বর্গ থেকে পারিজাত বৃক্ষ মর্ত্যে নিয়ে আসেন। কাহিনির বিভিন্ন সংস্করণে কখনো বৃক্ষ উপড়ে আনার কথা, আবার কোথাও তার অংশ বা চারা নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। কৃষ্ণ সেই পারিজাত সত্যভামার বাগানে রোপণ করলেও তার ফুল রুক্মিণীর বাগানেও ঝরে পড়ত। ফলে পারিজাতের সুবাস দুই বাগানেই ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এই ঘটনাকে দুই স্ত্রীর মধ্যে কৃষ্ণের ভালোবাসার সমতার প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়।

তবে স্বর্গ থেকে পারিজাত মর্ত্যে চলে যাওয়ার ঘটনা দেবরাজ ইন্দ্র সহজভাবে মেনে নেননি। পারিজাত ছিল দেবলোকের ঐশ্বর্যের অন্যতম প্রতীক। তাই কৃষ্ণের হাতে স্বর্গীয় বৃক্ষ মর্ত্যে চলে যাওয়ায় ইন্দ্র ক্ষুব্ধ হন। এই কারণে তিনি কৃষ্ণকে শাপ দেন কৃষ্ণের বাগানের পারিজাত বৃক্ষ ফুল দেবে ঠিকই কিন্তু ফল কোনদিন আসবে না, তার বীজে কখনও নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে না। এখান থেকেই কৃষ্ণ ও ইন্দ্রের মধ্যে সংঘাতের কাহিনি তৈরি হয়।

কবি-সাহিত্যিকদের লেখায় শিউলি ফুল

আবহমান বাংলার চিরচেনা শিউলি ফুল নিয়ে সেই পৌরাণিক কাল থেকে কত গান, কাব্য, সাহিত্য রচিত হয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। বাংলার সাহিত্য ভাণ্ডারে শিউলি এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিউলি কেবল কবিদেরই বিমুগ্ধ করেনি, যুগে যুগে অসংখ্য মুগ্ধ অনুরাগী তৈরি হয়েছে। এই শিউলিকে শেফালি নামে গেয়েছেন কবিগুরু রবীন্দ্রসংগীত –

হে ক্ষণিকের অতিথি...

এলে প্রভাতে কারে চাহিয়া।

ঝরা শেফালির পথ চাহিয়া॥

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আদর মেখে ‘শিউলি-মালা’ কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন–

শিউলি তলায় ভোর বেলায় কুসুম কুড়ায় পল্লী-বালা।

শেফালি পুলকে ঝ’রে পড়ে মুখে খোঁপাতে চিবুকে আবেশ-উতলা।।

সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ও দরদি সুরে গেয়েছেন শিউলি ফুলকে নিয়ে–

‘শিউলি ফুলের মালা গেঁথে কারে পরাবো!

কারে আমি এ ব্যাথা জানাবো!’

শুধু কবিতা নয়, গ্রামবাংলার লোকসংগীতেও শিউলি এসেছে প্রেম ও বিচ্ছেদের প্রতীক হয়ে।

ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব

শিউলি হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। পূজা-পার্বণে এই ফুল ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে দুর্গাপূজার সময় শিউলির উপস্থিতি শরতের আবহকে আরও অর্থবহ করে তোলে।

শিউলির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো–ফুলটি গাছ থেকে ছিঁড়ে নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। স্বাভাবিকভাবেই ঝরে পড়া ফুল সংগ্রহ করে পূজায় ব্যবহার করা হয়। সনাতন ধর্মে শিউলিই একমাত্র ফুল যা মাটিতে ঝরে পড়লেও তা দেবতার চরণে দেওয়া যায়। দুর্গাপূজায় শিউলি ছাড়া অষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলি যেন অসম্পূর্ণ। ফলে ভোরের শিউলি কুড়ানোর সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতি যেমন যুক্ত হয়েছে, তেমনি যুক্ত হয়েছে পারিবারিক ও সামাজিক স্মৃতিও।

এই ফুলের সাদা পাপড়ি পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়, আর কমলা বোঁটা ফুলটির সৌন্দর্যে আলাদা বৈশিষ্ট্য যোগ করে। অনেকের কাছে শিউলি মানেই দুর্গাপূজার আগমনী অনুভূতি, শৈশবের সকাল আর উৎসবের গন্ধ। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছেও পবিত্র পুষ্প হিসেবে বিবেচিত হয় শিউলি।

শিউলির ফল ও বংশবিস্তার

শিউলি ফুলের বীজ

শিউলি ফুল ঝরে যাওয়ার পর সেখানে ছোট ছোট ফল ধরে। এই ফলগুলো চ্যাপ্টা, হৃৎপিণ্ডাকৃতির এবং বাদামী রঙের হয়। ফলের ব্যাস সাধারণত ২ সেন্টিমিটারের মতো। প্রতিটি ফল দুই ভাগে বিভক্ত থাকে এবং প্রতিটি ভাগে একটি করে বীজ থাকে। এই বীজ থেকেই নতুন চারা তৈরি করা যায়। তবে অনেকে গুটিকলমের মাধ্যমেও বংশবিস্তার করে থাকেন, যা দ্রুত ফুল পেতে সহায়তা করে।

বাড়ির আঙিনায় কিংবা টবেও শিউলি

শিউলির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি খুব আদুরে গাছ নয়। উপযুক্ত আলো, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং মাঝারি উর্বর মাটি পেলে বাড়ির আঙিনায় ভালোভাবেই বেড়ে উঠতে পারে। জলাবদ্ধতা এড়িয়ে চলা জরুরি। পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায় এমন জায়গা শিউলির জন্য উপযোগী।

শহরের বাসিন্দারাও অনায়াসেই বারান্দায় বা ছাদে বড় টবে শিউলি চাষ করতে পারেন। তবে টবের আকার যথেষ্ট বড় হওয়া এবং নিচে পানি বের হওয়ার ব্যবস্থা থাকা দরকার। মাটি যেন শক্ত হয়ে পানি আটকে না রাখে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। গাছ বড় হলে প্রয়োজন অনুযায়ী ছাঁটাই করা যায়। এতে গাছের আকৃতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয় এবং নতুন ডাল বের হওয়ার সুযোগ বাড়ে। শিউলি লাগানোর উপযুক্ত সময় এপ্রিল। বীজ থেকে চারা তৈরি করা গেলেও টবে চাষের জন্য নার্সারি থেকে গুটিকলমের গাছ নেওয়াই ভালো। এতে দ্রুত বৃদ্ধি ও ফুল পাওয়া যায়।

টব নির্বাচন : টবে শিউলি লাগানোর ক্ষেত্রে ভালো ড্রেনেজ ব্যবস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গোড়ায় পানি জমে থাকলে গাছ নষ্ট হতে পারে। প্রথমে ছোট টবে গাছ বসিয়ে ধীরে ধীরে ৮ থেকে ১২ ইঞ্চির বড় টবে স্থানান্তর করতে হবে। গাছের শিকড় বেশি বেড়ে গেলে টব বদলের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী শিকড় ছাঁটাই করা জরুরি।

মাটি প্রস্তুতি: মাটির সঙ্গে গোবর সার, হাড়গুঁড়ো ও পুরনো সরষের খোল মিশিয়ে নিলে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়। শিউলি খুব বেশি রোদনির্ভর নয়; প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা সরাসরি রোদ পেলেই ভালো ফুল আসে। গ্রীষ্মের শুরুতে গাছের ডগা সামান্য ছেঁটে দিলে গাছ ঝোপালো হয় এবং ফুলও বাড়তে পারে।

গাছের খাবার : সারের ক্ষেত্রে জৈব সারই বেশি উপযোগী। ছোট গাছে পরিমিত সরষের খোলের তরল সার দেওয়া যেতে পারে। পরিণত গাছে বছরে এক-দুবার গোবর সার, সরষের খোল ও প্রয়োজন অনুযায়ী হাড়গুঁড়ো ব্যবহার করা যায়।

পোকামাকড় : শিউলি গাছে শুঁয়োপোকাসহ বিভিন্ন পোকামাকড়ের আক্রমণ হতে পারে। নিয়মিত পাতা পরীক্ষা করে আক্রান্ত পাতা সরিয়ে ফেলা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিমতেল বা নিমপাতার দ্রবণ স্প্রে করলে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। নিয়মিত পরিচর্যা করলে বাড়ির আঙিনা, ছাদ কিংবা বারান্দার টবেও সহজেই ফুটতে পারে শরতের প্রিয় শিউলি।

শিউলি ফুল ও পাতার বহুমুখী ব্যবহার

প্রাকৃতিক রং তৈরিতে: শিউলি ফুলের কমলা-জাফরানি বোঁটায় প্রাকৃতিক রঞ্জক পদার্থ রয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে এই অংশ থেকে হলুদাভ বা কমলা রঙ তৈরি করা হতো। কাপড় ও বিভিন্ন সামগ্রীতে প্রাকৃতিক রং হিসেবে এর ব্যবহার ছিল বলে জানা যায়। বর্তমানে কৃত্রিম রঙের বিকল্প হিসেবেও শিউলির রঞ্জক নিয়ে গবেষণা হচ্ছে।

ভেষজ ব্যবহারের ঐতিহ্য: আয়ুর্বেদ ও লোকজ চিকিৎসায় শিউলির পাতা, ফুল, বীজ ও ছালের বিভিন্ন ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে জ্বর, প্রদাহ, বাতজাতীয় সমস্যা, কৃমি ও কিছু ত্বকের সমস্যায় এর বিভিন্ন অংশ ব্যবহারের ঐতিহ্য পাওয়া যায়। আধুনিক গবেষণাতেও শিউলিতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, প্রদাহনাশক ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্যের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। শিউলি পাতার রস অত্যন্ত তিতকুটে হলেও সায়াটিকা বা আর্থারাইটিসের ব্যথায় এটি মহৌষধ। রোজ সকালে কয়েকটি পাতা জলে ফুটিয়ে সেই জল খেলে বাতের ব্যথা কমে। এছাড়া দীর্ঘস্থায়ী জ্বর ও কৃমিনাশক হিসেবেও এর পাতার রস ব্যবহৃত হয়।

তবে শিউলির পাতা বা অন্য কোনো অংশকে সরাসরি ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। গবেষণায় কোনো সম্ভাব্য ঔষধি গুণ পাওয়া গেলেই তা মানুষের চিকিৎসায় প্রমাণিত ও নিরাপদ–এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে ঘরোয়া চিকিৎসায় শিউলির নির্যাস বা পাতার রস ব্যবহারের আগে চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।

শিউলি আমাদের শেখায়–স্বল্পস্থায়ী জীবনও কতটা সুগন্ধি আর সুন্দর হতে পারে। সারা রাত জেগে থেকে ভোরের আলো ফুটতেই নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার এই যে আত্মত্যাগ, তা কেবল শিউলির পক্ষেই সম্ভব। ইট-কাঠের এই যান্ত্রিক শহরেও একটি শিউলি গাছ আপনার সকালকে করে তুলতে পারে স্নিগ্ধ আর প্রশান্তিময়। তাই এই শরতে একটি শিউলি গাছ রোপণ করে আপনিও হয়ে উঠতে পারেন প্রকৃতির এক অংশীদার।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬


অভিমানী শিউলি: শরতের স্নিগ্ধতায় মাখা এক বিষাদময় সৌন্দর্য

প্রকাশের তারিখ : ২২ আগস্ট ২০২৬

featured Image

আশ্বিন আর কার্তিকের ভোরে প্রকৃতি যখন কুয়াশার হালকা চাদর গায়ে দেয়, তখন চারপাশ এক মায়াবী সুবাসে ভরে ওঠে। রাতের শেষ প্রহরে গাছতলায় নেমে আসে সাদা পাপড়ির নরম চাদর। প্রতিটি ফুলের মাঝখানে জ্বলজ্বল করে কমলা-জাফরানি রঙের বোঁটা। চারপাশে ছড়িয়ে থাকে মিষ্টি অথচ তীব্র এক সুবাস। সেই ফুলের নাম শিউলি। একে বলা হয় শরতের রানি।

বাংলার প্রকৃতিতে শরতের আগমনী বার্তা বহন করা ফুলগুলোর মধ্যে শিউলি সবচেয়ে আপন। কাশফুলের দোল, নীল আকাশ, সাদা মেঘ আর ভোরের শিশির–সবকিছুর সঙ্গে শিউলির এক গভীর সম্পর্ক। কিন্তু এই ফুলের সৌন্দর্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক আশ্চর্য বিষাদও। সন্ধ্যার পর ফুটে ওঠে, আর সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ার আগেই ঝরে পড়ে। যেন রাতের আঁধারেই তার জন্ম, আর ভোরের আলোয় তার বিদায়।

শিউলির এই স্বভাবই তাকে অন্য ফুলের চেয়ে আলাদা করেছে। দিনের বেলায় গাছটিকে খুব সাধারণ মনে হলেও রাত নামতেই তার ডালে ডালে ফুটতে শুরু করে অসংখ্য সুগন্ধি ফুল। ভোরে দেখা যায়, গাছের নিচে ছড়িয়ে আছে ঝরে পড়া ফুলের স্তর। ফুলটি যেন গাছে থাকার চেয়ে মাটিতে পড়ে থাকতেই বেশি স্বচ্ছন্দ। শিশিরভেজা ঘাসের ওপর সেই ফুল কুড়াতে কুড়াতে গ্রামের কিশোরী কিংবা শহরের কোনো ছাদবাগানের মানুষ–সবাই যেন ফিরে যায় শৈশবের কোনো এক নির্মল সকালে।

নামের মাহাত্ম্য ও বৈজ্ঞানিক পরিচয়

শিউলি কেবল একটি ফুল নয়, এটি বাঙালির আবেগ। একে আমরা ‘শেফালিকা’ নামেও চিনি। তবে এর বৈজ্ঞানিক নাম শুনলে এর প্রতি মায়া আরও বেড়ে যায়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Nyctanthes arbor-tristis L.। লাতিন এই নামের শব্দগুলো বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়–নিকট্যানথিস’ মানে সন্ধ্যায় ফোটা এবং ‘আর্বর-ট্রিস্টিস’ মানে বিষণ্ন গাছ। সূর্য ওঠার আগেই এই ফুল ঝরে পড়ে বলে একে ইংরেজিতে ‘নাইট জেসমিন’ বা ‘ট্রি অফ সরো’ (দুঃখের বৃক্ষ) বলা হয়। মূলত দিনের আলোয় এর উজ্জ্বলতা ম্লান হয়ে যায় বলেই এমন বিষাদময় নামকরণ। তবে নামের মধ্যে ‘জেসমিন’ থাকলেও এটি প্রকৃত জুঁই পরিবারের ফুল নয়; এটি Oleaceae পরিবারের উদ্ভিদ। এটি মূলত দক্ষিণ এশিয়ার উদ্ভিদ। ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও থাইল্যান্ড–এই পুরো অঞ্চলেই শিউলির আধিপত্য দেখা যায়। এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ‘রাজ্য ফুল’ এবং থাইল্যান্ডের কাঞ্চনাবুরি প্রদেশের প্রতীক।

ইতিহাস বলে, শিউলি এই উপমহাদেশের নিজস্ব উদ্ভিদ। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৬ অব্দে কবি কালিদাসের কাব্যেও শিউলির সরব উপস্থিতি পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে শিউলি আমাদের মাটিরই সন্তান। বাংলায় শিউলি ছাড়াও শেফালি বা শেফালিকা নামে পরিচিত এই ফুল ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে পারিজাত, হরসিঙ্গারসহ নানা নামে পরিচিত। 

প্রকৃতি ও প্রকারভেদ

শিউলি সাধারণত একটি বহুবর্ষজীবী গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। এর ছাল ধূসর ও খসখসে, পাতা ডিম্বাকার, কিছুটা খসখসে এবং আগার দিকে সূচালো। গাছটি ১০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর পাতাগুলো ৬-৭ সেন্টিমিটার লম্বা এবং বিপরীতমুখী থাকে। ফুল ছোট, সাদা পাপড়ির সঙ্গে কমলা বা জাফরানি নলাকার বোঁটা থাকে। ফুলগুলো সাধারণত ছোট ছোট গুচ্ছে ফোটে এবং সুগন্ধ ছড়ায়।

শিউলির আরেকটি আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এর ফুল ফোটার সময়। সাধারণত সন্ধ্যার পর ফুল ফুটতে শুরু করে এবং ভোরের আগেই অনেক ফুল ঝরে যায়। ফলে দিনের আলোয় শিউলির গাছের যে চেহারা, রাতের বেলায় তার রূপ একেবারেই অন্যরকম।

সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত শিউলি ফোটার প্রধান মৌসুম। তবে প্রকৃতিভেদে কিছু ভিন্নতাও আছে। বর্তমানে শিউলির একটি বারোমাসি জাত দেখা যায়, যাতে সারা বছরই কমবেশি ফুল ফোটে। তবে শরতের শিউলির মতো সেই মাদকতাময় সুবাস সেখানে অতটা তীব্র হয় না।

শিউলিকে ঘিরে পৌরাণিক ও লোককথা

শিউলি ফুল


সূর্যের সঙ্গে অভিমানী শিউলির গল্প

শিউলিকে ঘিরে সবচেয়ে জনপ্রিয় কাহিনিগুলোর একটি হলো সূর্য ও শিউলির ব্যর্থ প্রেমের গ্রিক উপাখ্যান। এই কাহিনিতে শিউলি সূর্যের প্রতারিত স্ত্রী।কথিত আছে, সূর্যদেব একসময় শিউলির প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে অন্য নারীর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। এতে শিউলির মনে জন্ম নেয় তীব্র অভিমান ও বেদনা। শেষ পর্যন্ত প্রচণ্ড ঘৃণা ও অভিমানে তিনি সূর্যকে ত্যাগ করেন। সেই থেকেই শিউলিকে বলা হয় ‘নিশি বিষাদিনী’ – রাতের বিষণ্ন ফুল। লোককথায় বলা হয়, সূর্যের মুখোমুখি হতে না চাওয়ার কারণেই শিউলি রাতের আঁধারে ফুটে ওঠে এবং সূর্য ওঠার আগেই ঝরে পড়ে। ভোরের মাটিতে পড়ে থাকা অসংখ্য শিউলি ফুলকে তাই এই কাহিনিতে অভিমানী শিউলির নীরব অশ্রু হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে।

পারিজাতিকা ও সূর্যের ব্যর্থ প্রেম

আরেকটি বহুল প্রচলিত কাহিনিতে শিউলির সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারিজাতিকা নামে এক অপরূপা রাজকন্যার করুণ প্রেমের গল্প। কথিত আছে, পারিজাতিকা ছিলেন নাগরাজের সুন্দরী কন্যা। একসময় তিনি সূর্যের প্রেমে পড়েন। সূর্যের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল গভীর ও একনিষ্ঠ। কিন্তু সেই প্রেমের পরিণতি হওয়ার ছিল না। ব্যর্থ প্রেমের বেদনা ক্রমেই তাকে গ্রাস করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত প্রচণ্ড দুঃখ ও হতাশায় পারিজাতিকা আত্মহত্যা করেন। লোককথা বলে, তার দেহের চিতাভস্ম থেকেই জন্ম নেয় এক অপূর্ব বৃক্ষ – পারিজাত। এই কাহিনির সঙ্গে শিউলির ফুল ঝরে পড়ার বিষয়টিকেও যুক্ত করা হয়েছে। বলা হয়, পারিজাতিকা মৃত্যুর পরও সূর্যকে ক্ষমা করতে পারেননি। তাই তাঁর রূপান্তরিত সত্তা সূর্যের আলো সহ্য করতে পারে না। রাতের আঁধারে সে ফুল ফোটায়, চারদিকে সুবাস ছড়িয়ে দেয়; কিন্তু সূর্য ওঠার আগেই নীরবে মাটিতে ঝরে পড়ে। প্রতিটি ঝরে পড়া ফুল যেন সেই ব্যর্থ প্রেমিকার একটি করে অশ্রুবিন্দু। সাদা পাপড়ি আর গৈরিক-কমলা বোঁটায় যেন ফুটে ওঠে তার শুভ্র দেহ আর দুঃখের আগুন। এ কারণেই লোককথায় শিউলি হয়ে ওঠে নীরব, ব্যর্থ প্রেম ও চিরন্তন অভিমানের প্রতীক।

স্বর্গের পারিজাত ও কৃষ্ণের কাহিনি

শিউলি বা পারিজাতকে ঘিরে হিন্দু পুরাণে আরেকটি বিখ্যাত কাহিনি রয়েছে শ্রীকৃষ্ণকে কেন্দ্র করে। পুরাণের বিভিন্ন আখ্যানে পারিজাতকে স্বর্গের এক অসাধারণ বৃক্ষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এর ফুলের সৌন্দর্য ও সুবাস দেবলোককে মুগ্ধ করে রাখত। দেবরাজ ইন্দ্রের স্বর্গীয় উদ্যানেই ছিল এই পারিজাত বৃক্ষ। কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষ্ণের দুই স্ত্রী সত্যভামা ও রুক্মিণীর প্রসঙ্গ। পারিজাতের সৌন্দর্য ও সুবাসের কথা শুনে তাদেরও ইচ্ছা জাগে নিজেদের বাগানে এই স্বর্গীয় ফুল ফুটুক। বিশেষ করে সত্যভামার মনে পারিজাত বৃক্ষ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে তাদের মধ্যে কৃষ্ণ কাকে বেশি ভালোবাসেন – সত্যভামা নাকি রুক্মিণী – এমন মান-অভিমানের প্রসঙ্গও লোককথায় যুক্ত হয়েছে। একপর্যায়ে কৃষ্ণ সত্যভামাকে খুশি করতে স্বর্গ থেকে পারিজাত বৃক্ষ মর্ত্যে নিয়ে আসেন। কাহিনির বিভিন্ন সংস্করণে কখনো বৃক্ষ উপড়ে আনার কথা, আবার কোথাও তার অংশ বা চারা নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। কৃষ্ণ সেই পারিজাত সত্যভামার বাগানে রোপণ করলেও তার ফুল রুক্মিণীর বাগানেও ঝরে পড়ত। ফলে পারিজাতের সুবাস দুই বাগানেই ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এই ঘটনাকে দুই স্ত্রীর মধ্যে কৃষ্ণের ভালোবাসার সমতার প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়।

তবে স্বর্গ থেকে পারিজাত মর্ত্যে চলে যাওয়ার ঘটনা দেবরাজ ইন্দ্র সহজভাবে মেনে নেননি। পারিজাত ছিল দেবলোকের ঐশ্বর্যের অন্যতম প্রতীক। তাই কৃষ্ণের হাতে স্বর্গীয় বৃক্ষ মর্ত্যে চলে যাওয়ায় ইন্দ্র ক্ষুব্ধ হন। এই কারণে তিনি কৃষ্ণকে শাপ দেন কৃষ্ণের বাগানের পারিজাত বৃক্ষ ফুল দেবে ঠিকই কিন্তু ফল কোনদিন আসবে না, তার বীজে কখনও নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে না। এখান থেকেই কৃষ্ণ ও ইন্দ্রের মধ্যে সংঘাতের কাহিনি তৈরি হয়।

কবি-সাহিত্যিকদের লেখায় শিউলি ফুল

আবহমান বাংলার চিরচেনা শিউলি ফুল নিয়ে সেই পৌরাণিক কাল থেকে কত গান, কাব্য, সাহিত্য রচিত হয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। বাংলার সাহিত্য ভাণ্ডারে শিউলি এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিউলি কেবল কবিদেরই বিমুগ্ধ করেনি, যুগে যুগে অসংখ্য মুগ্ধ অনুরাগী তৈরি হয়েছে। এই শিউলিকে শেফালি নামে গেয়েছেন কবিগুরু রবীন্দ্রসংগীত –

হে ক্ষণিকের অতিথি...

এলে প্রভাতে কারে চাহিয়া।

ঝরা শেফালির পথ চাহিয়া॥

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আদর মেখে ‘শিউলি-মালা’ কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন–

শিউলি তলায় ভোর বেলায় কুসুম কুড়ায় পল্লী-বালা।

শেফালি পুলকে ঝ’রে পড়ে মুখে খোঁপাতে চিবুকে আবেশ-উতলা।।

সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ও দরদি সুরে গেয়েছেন শিউলি ফুলকে নিয়ে–

‘শিউলি ফুলের মালা গেঁথে কারে পরাবো!

কারে আমি এ ব্যাথা জানাবো!’

শুধু কবিতা নয়, গ্রামবাংলার লোকসংগীতেও শিউলি এসেছে প্রেম ও বিচ্ছেদের প্রতীক হয়ে।

ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব

শিউলি হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। পূজা-পার্বণে এই ফুল ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে দুর্গাপূজার সময় শিউলির উপস্থিতি শরতের আবহকে আরও অর্থবহ করে তোলে।

শিউলির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো–ফুলটি গাছ থেকে ছিঁড়ে নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। স্বাভাবিকভাবেই ঝরে পড়া ফুল সংগ্রহ করে পূজায় ব্যবহার করা হয়। সনাতন ধর্মে শিউলিই একমাত্র ফুল যা মাটিতে ঝরে পড়লেও তা দেবতার চরণে দেওয়া যায়। দুর্গাপূজায় শিউলি ছাড়া অষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলি যেন অসম্পূর্ণ। ফলে ভোরের শিউলি কুড়ানোর সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতি যেমন যুক্ত হয়েছে, তেমনি যুক্ত হয়েছে পারিবারিক ও সামাজিক স্মৃতিও।

এই ফুলের সাদা পাপড়ি পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়, আর কমলা বোঁটা ফুলটির সৌন্দর্যে আলাদা বৈশিষ্ট্য যোগ করে। অনেকের কাছে শিউলি মানেই দুর্গাপূজার আগমনী অনুভূতি, শৈশবের সকাল আর উৎসবের গন্ধ। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছেও পবিত্র পুষ্প হিসেবে বিবেচিত হয় শিউলি।

শিউলির ফল ও বংশবিস্তার

শিউলি ফুলের বীজ

শিউলি ফুল ঝরে যাওয়ার পর সেখানে ছোট ছোট ফল ধরে। এই ফলগুলো চ্যাপ্টা, হৃৎপিণ্ডাকৃতির এবং বাদামী রঙের হয়। ফলের ব্যাস সাধারণত ২ সেন্টিমিটারের মতো। প্রতিটি ফল দুই ভাগে বিভক্ত থাকে এবং প্রতিটি ভাগে একটি করে বীজ থাকে। এই বীজ থেকেই নতুন চারা তৈরি করা যায়। তবে অনেকে গুটিকলমের মাধ্যমেও বংশবিস্তার করে থাকেন, যা দ্রুত ফুল পেতে সহায়তা করে।

বাড়ির আঙিনায় কিংবা টবেও শিউলি

শিউলির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি খুব আদুরে গাছ নয়। উপযুক্ত আলো, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং মাঝারি উর্বর মাটি পেলে বাড়ির আঙিনায় ভালোভাবেই বেড়ে উঠতে পারে। জলাবদ্ধতা এড়িয়ে চলা জরুরি। পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায় এমন জায়গা শিউলির জন্য উপযোগী।

শহরের বাসিন্দারাও অনায়াসেই বারান্দায় বা ছাদে বড় টবে শিউলি চাষ করতে পারেন। তবে টবের আকার যথেষ্ট বড় হওয়া এবং নিচে পানি বের হওয়ার ব্যবস্থা থাকা দরকার। মাটি যেন শক্ত হয়ে পানি আটকে না রাখে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। গাছ বড় হলে প্রয়োজন অনুযায়ী ছাঁটাই করা যায়। এতে গাছের আকৃতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয় এবং নতুন ডাল বের হওয়ার সুযোগ বাড়ে। শিউলি লাগানোর উপযুক্ত সময় এপ্রিল। বীজ থেকে চারা তৈরি করা গেলেও টবে চাষের জন্য নার্সারি থেকে গুটিকলমের গাছ নেওয়াই ভালো। এতে দ্রুত বৃদ্ধি ও ফুল পাওয়া যায়।

টব নির্বাচন : টবে শিউলি লাগানোর ক্ষেত্রে ভালো ড্রেনেজ ব্যবস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গোড়ায় পানি জমে থাকলে গাছ নষ্ট হতে পারে। প্রথমে ছোট টবে গাছ বসিয়ে ধীরে ধীরে ৮ থেকে ১২ ইঞ্চির বড় টবে স্থানান্তর করতে হবে। গাছের শিকড় বেশি বেড়ে গেলে টব বদলের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী শিকড় ছাঁটাই করা জরুরি।

মাটি প্রস্তুতি: মাটির সঙ্গে গোবর সার, হাড়গুঁড়ো ও পুরনো সরষের খোল মিশিয়ে নিলে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়। শিউলি খুব বেশি রোদনির্ভর নয়; প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা সরাসরি রোদ পেলেই ভালো ফুল আসে। গ্রীষ্মের শুরুতে গাছের ডগা সামান্য ছেঁটে দিলে গাছ ঝোপালো হয় এবং ফুলও বাড়তে পারে।

গাছের খাবার : সারের ক্ষেত্রে জৈব সারই বেশি উপযোগী। ছোট গাছে পরিমিত সরষের খোলের তরল সার দেওয়া যেতে পারে। পরিণত গাছে বছরে এক-দুবার গোবর সার, সরষের খোল ও প্রয়োজন অনুযায়ী হাড়গুঁড়ো ব্যবহার করা যায়।

পোকামাকড় : শিউলি গাছে শুঁয়োপোকাসহ বিভিন্ন পোকামাকড়ের আক্রমণ হতে পারে। নিয়মিত পাতা পরীক্ষা করে আক্রান্ত পাতা সরিয়ে ফেলা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিমতেল বা নিমপাতার দ্রবণ স্প্রে করলে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। নিয়মিত পরিচর্যা করলে বাড়ির আঙিনা, ছাদ কিংবা বারান্দার টবেও সহজেই ফুটতে পারে শরতের প্রিয় শিউলি।

শিউলি ফুল ও পাতার বহুমুখী ব্যবহার

প্রাকৃতিক রং তৈরিতে: শিউলি ফুলের কমলা-জাফরানি বোঁটায় প্রাকৃতিক রঞ্জক পদার্থ রয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে এই অংশ থেকে হলুদাভ বা কমলা রঙ তৈরি করা হতো। কাপড় ও বিভিন্ন সামগ্রীতে প্রাকৃতিক রং হিসেবে এর ব্যবহার ছিল বলে জানা যায়। বর্তমানে কৃত্রিম রঙের বিকল্প হিসেবেও শিউলির রঞ্জক নিয়ে গবেষণা হচ্ছে।

ভেষজ ব্যবহারের ঐতিহ্য: আয়ুর্বেদ ও লোকজ চিকিৎসায় শিউলির পাতা, ফুল, বীজ ও ছালের বিভিন্ন ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে জ্বর, প্রদাহ, বাতজাতীয় সমস্যা, কৃমি ও কিছু ত্বকের সমস্যায় এর বিভিন্ন অংশ ব্যবহারের ঐতিহ্য পাওয়া যায়। আধুনিক গবেষণাতেও শিউলিতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, প্রদাহনাশক ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্যের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। শিউলি পাতার রস অত্যন্ত তিতকুটে হলেও সায়াটিকা বা আর্থারাইটিসের ব্যথায় এটি মহৌষধ। রোজ সকালে কয়েকটি পাতা জলে ফুটিয়ে সেই জল খেলে বাতের ব্যথা কমে। এছাড়া দীর্ঘস্থায়ী জ্বর ও কৃমিনাশক হিসেবেও এর পাতার রস ব্যবহৃত হয়।

তবে শিউলির পাতা বা অন্য কোনো অংশকে সরাসরি ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। গবেষণায় কোনো সম্ভাব্য ঔষধি গুণ পাওয়া গেলেই তা মানুষের চিকিৎসায় প্রমাণিত ও নিরাপদ–এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে ঘরোয়া চিকিৎসায় শিউলির নির্যাস বা পাতার রস ব্যবহারের আগে চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।

শিউলি আমাদের শেখায়–স্বল্পস্থায়ী জীবনও কতটা সুগন্ধি আর সুন্দর হতে পারে। সারা রাত জেগে থেকে ভোরের আলো ফুটতেই নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার এই যে আত্মত্যাগ, তা কেবল শিউলির পক্ষেই সম্ভব। ইট-কাঠের এই যান্ত্রিক শহরেও একটি শিউলি গাছ আপনার সকালকে করে তুলতে পারে স্নিগ্ধ আর প্রশান্তিময়। তাই এই শরতে একটি শিউলি গাছ রোপণ করে আপনিও হয়ে উঠতে পারেন প্রকৃতির এক অংশীদার।



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত