ঋণ, পাওনাদারের হুমকি ও বন্ধকী স্বর্ণ ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ- সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। তিনি কি আর্থিক চাপে আত্মগোপনে গেছেন, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা আছে? অতীতের কয়েকটি ঘটনাও দেখাচ্ছে, এমন ব্যবসায় সংকট তৈরি হলে তার অভিঘাত শুধু ব্যবসায়ীর ওপর পড়ে না, বিপদে পড়েন শত শত গ্রাহক।
চাঁদপুর শহরের একটি ভাড়া বাসা। সেখানেই স্ত্রী রিমি দাস এবং দুই ছেলে প্রিয়ম ও রুপমকে নিয়ে থাকতেন স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু দাস। হঠাৎ জানা গেল, চারজনের কাউকেই পাওয়া যাচ্ছে না। বাসায় নেই, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ। বুধবার (২৬ আগস্ট) বিষয়টি নিশ্চিত করলেন পিন্টু দাসের নিকটাত্মীয় ও চাঁদপুর হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ছাত্র ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক উপমা দে।
পিন্টু দাস চাঁদপুর শহরের ‘এস কে শিল্পালয়’-এর স্বত্বাধিকারী। তার স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ চারজনের নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। পরিবারের স্বজনদের ভাষ্য, পিন্টু দাস ঋণগ্রস্ত ছিলেন। সম্প্রতি এক ব্যক্তি তাকে হুমকি দিচ্ছিলেন বলেও তারা জানতে পারেন। এ কারণে পরিবার নিয়ে তিনি অন্য কোথাও চলে গিয়ে থাকতে পারেন বলে তাদের ধারণা।
কিন্তু স্থানীয় কয়েকজনের বক্তব্যে সামনে এসেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য। তাদের দাবি, পিন্টু দাস শুধু স্বর্ণ ব্যবসা করতেন না, স্বর্ণ বন্ধক রেখে টাকা দেওয়ার ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে বন্ধক নেওয়া স্বর্ণ নির্ধারিত সময়ে ফেরত দিতে পারছিলেন না- এমন অভিযোগও উঠেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সমিতি থেকে ব্যবসার জন্য ঋণ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তিনটি সম্ভাবনা
এখন মূল প্রশ্ন- এই আর্থিক সংকটই কি পিন্টু দাসের সপরিবারে উধাও হওয়ার কারণ? এ মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে তথ্যগুলো পাশাপাশি রাখলে অন্তত তিনটি সম্ভাবনা দেখা যায়।
প্রথমত, আর্থিক চাপ থেকে আত্মগোপন। একজন ব্যবসায়ী যখন নিজের কাছে থাকা বন্ধকী সম্পদ ফেরত দিতে পারেন না, একই সঙ্গে বিভিন্ন জায়গা থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধের চাপ থাকে এবং পাওনাদারদের চাপ বাড়তে থাকে, তখন তার সামনে নগদ অর্থের সংকট তৈরি হতে পারে। পিন্টু দাসের ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল কি না, সেটিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
রাসেল খান নামের একজন দাবি করেছেন, তিনি আড়াই ভরি স্বর্ণ ৫০ হাজার টাকায় বন্ধক রেখেছিলেন। পরে টাকা ফেরত দিয়ে স্বর্ণ নিতে গেলে তাকে পরদিন আসতে বলা হয়। এর পরই তিনি জানতে পারেন, পিন্টু দাস পরিবার নিয়ে চলে গেছেন। তিনি থানায় অভিযোগ করেছেন বলেও জানিয়েছেন। আরও দুজন বন্ধক রাখা স্বর্ণ ফেরত পাওয়ার দাবি করেছেন।
দ্বিতীয়ত, পাওনাদার বা অন্য কারও চাপ কিংবা হুমকি। স্বজনেরা বলেছেন, পিন্টু দাসকে সম্প্রতি একজন হুমকি দিচ্ছিলেন। সত্যিই যদি এমন হুমকি থেকে থাকে, তাহলে তিনি নিরাপত্তার কারণে পরিবার নিয়ে আত্মগোপনে গেছেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে এই বক্তব্যের স্বাধীন সমর্থন এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে এটিকেও আপাতত একটি দাবি বা সম্ভাবনা হিসেবেই দেখতে হবে।
তৃতীয়ত, নিখোঁজ হওয়ার পেছনে অন্য কোনো অপরাধ বা জবরদস্তি আছে কি না।পরিবারের চারজন একই সঙ্গে যোগাযোগের বাইরে চলে যাওয়ায় এই সম্ভাবনাটিও তদন্ত থেকে বাদ দেওয়া যায় না। তারা স্বেচ্ছায় গেছেন, নাকি কারও চাপে বা অন্য কোনো কারণে গেছেন- তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাদের অবস্থান শনাক্ত করা সবচেয়ে জরুরি।
চাঁদপুর সদর মডেল থানার ওসি ফয়েজ আহমেদ বলেছেন, চারজনের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি তারা জানতে পেরেছেন।বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। পুলিশের কাছে বন্ধক রাখা স্বর্ণ ফেরত না পাওয়ার অভিযোগের কথাও তারা জেনেছেন।
ঘটনা নতুন নয়
তবে পিন্টু দাসের এই সপরিবারে উধাও হওয়ার ঘটনা আলাদা করে দেখার পাশাপাশি আগের কয়েকটি ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়। ২০২৫ সালে ভোলার ইলিশায় সুইটি জুয়েলার্সের মালিক সোহাগ বালার বিরুদ্ধে গ্রাহকদের বিপুল পরিমাণ বন্ধকী স্বর্ণ ও নগদ টাকা নিয়ে উধাও হওয়ার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের হিসাবে, শতাধিক গ্রাহকের প্রায় ৫০০ ভরি স্বর্ণ ও ৫০ লাখের বেশি টাকা নিয়ে তিনি উধাও হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছিলেন ভুক্তভোগীরা। তার দোকান ও বাড়ি তালাবদ্ধ পাওয়া যায়।
এখানেও দেখা যায় একই ধরনের একটি প্যাটার্ন। বিশ্বাসের সম্পর্ক থেকে স্বর্ণ বন্ধক রাখা। এতে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক সৃষ্টি হওয়া। তারপর ফেরত দিতে সমস্যা তৈরি হওয়া। সবশেষে ব্যবসায়ীর হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া।
আরেকটা ঘটনা ঘটেছে গত জুলাই মাসেই। বরগুনার পাথরঘাটাতেও বাবুল কুলু নামের এক স্বর্ণকার ও বন্ধকি ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে গ্রাহকদের স্বর্ণালংকার ও টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে থানায় তদন্ত শুরু হয়েছিল।
তবে এসব ঘটনার সঙ্গে পিন্টু দাসের ঘটনার সরাসরি যোগসূত্র নেই। মিলটি শুধু ঘটনার ধরনে। এর সঙ্গে আরও পুরোনো একটি বড় ঘটনা মেলানো যায়।স্বর্ণ বন্ধক ব্যবসার ঝুঁকি বোঝাতে কক্সবাজারের চকরিয়ার নন্দরাম ধরের ঘটনাটিও গুরুত্বপূর্ণ কেসস্টাডি।
২০১৪ সালে যৌথ বাহিনী তার বাড়ি থেকে প্রায় ২৭ কেজি ৭৬৫ গ্রাম বন্ধকি স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থসহ বিভিন্ন জিনিস জব্দ করে। নন্দরাম ও তার দুই ছেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে দেখা যায়, বহু মানুষ তার কাছে স্বর্ণ বন্ধক রেখে টাকা নিয়েছিলেন। ফলে স্বর্ণ জব্দ হওয়ার পর গ্রাহকেরা তাদের গয়না ফেরত পাবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
এই ঘটনা আর পিন্টু দাসের ঘটনা এক নয়। নন্দরামের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও মামলা হয়েছিল। কিন্তু কেসটি একটি বিষয় স্পষ্ট করে- বন্ধকি ব্যবসায় একজন ব্যবসায়ীর হাতে যখন বিপুলসংখ্যক মানুষের সঞ্চিত স্বর্ণ জমা হয়, তখন তার ব্যবসায়িক সংকট খুব দ্রুত বহু পরিবারের সংকটে পরিণত হতে পারে।
আসল ঘটনা কী
পিন্টু দাসের ঘটনায় তাই শুধু ‘তিনি কোথায়?’ প্রশ্নটি যথেষ্ট নয়। তদন্তে অন্তত কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার। প্রথমত, তার কাছে মোট কতজন মানুষ স্বর্ণ বন্ধক রেখেছিলেন? দ্বিতীয়ত, সেই স্বর্ণের মোট পরিমাণ কত? তৃতীয়ত, বন্ধকী স্বর্ণের বিপরীতে তিনি মোট কত টাকা দিয়েছিলেন? চতুর্থত, তার নিজের ব্যবসায়িক সম্পদ ও দেনার পরিমাণ কত?
এরপর পঞ্চমত, বিভিন্ন সমিতি বা ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি কত টাকা ধার করেছিলেন?ষষ্ঠত, শেষ কয়েক সপ্তাহে তিনি কার কার সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করেছেন? সপ্তমত, তার ব্যাংক হিসাব, মোবাইল আর্থিক সেবা ও অন্যান্য লেনদেনে হঠাৎ কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা গেছে কি না? অষ্টমত, তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা শেষ কোথায় ছিলেন? নবমমত, তারা নিজেরাই বাসা ছেড়েছেন, নাকি তাদের কেউ বাধ্য করেছে?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, পিন্টু দাসের কাছে বন্ধক রাখা স্বর্ণ এখন কোথায়?কারণ পিন্টু দাসকে পাওয়া গেলে একটি পরিবারের রহস্যের সমাধান হবে। কিন্তু তার কাছে থাকা অন্য মানুষের স্বর্ণের হিসাব না মিললে সমস্যাটি সেখানেই শেষ হবে না।
স্বর্ণ ব্যবসায় বিশ্বাসই পুঁজি
এটা সত্য যে, স্বর্ণের ব্যবসায় ‘বিশ্বাস’ই যখন মূল পুঁজি। বন্ধকী স্বর্ণের ব্যবসার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো- এখানে ব্যাংকের মতো আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বদলে অনেক সময় ব্যক্তিগত বিশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গ্রামের বা ছোট শহরের মানুষ বিপদে পড়ে ব্যাংকে না গিয়ে পরিচিত মহাজন বা স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছে গয়না রেখে টাকা নেন।
২০২০ সালের করোনাকালে ব্যবসায় মন্দার সময়ও বন্ধকি স্বর্ণের ব্যবসায় চাপ তৈরি হয়েছিল বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছিলেন। সে সময় জাতীয় এক দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, অনেক গ্রাহকের বন্ধক আটকে গিয়েছিল। বন্ধক ছাড়ানোর সক্ষমতা কমে গিয়েছিল।
এই ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীর নগদ অর্থের প্রবাহ যদি কোনো কারণে আটকে যায়, তখন একটি বিপজ্জনক চক্র তৈরি হতে পারে- নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো দায় মেটানো, পুরোনো বন্ধক ছাড়াতে নতুন টাকা খোঁজা, একসময় সব দিক থেকে চাপ তৈরি হওয়া পিন্টু দাসের ব্যবসায় এমন কোনো চক্র তৈরি হয়েছিল কি না, তদন্তেই তার উত্তর মিলবে।
নাকি ‘আত্মগোপন’
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পিন্টু দাস ও তার পরিবারকে নিখোঁজ হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু তারা স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে গেছেন- এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। আবার তাদের অপহরণ বা জোর করে নিয়ে যাওয়ার প্রমাণও নেই। তাই তদন্তের আগে কোনো একটি তত্ত্বকে সত্য ধরে নেওয়া বিপজ্জনক।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার: ঋণের চাপ, বন্ধকী স্বর্ণ ফেরত দেওয়ার অভিযোগ এবং হুমকির তথ্য- তিনটি বিষয় একই সময়ে সামনে এসেছে। এখন পিন্টু দাস ও তার পরিবারের সন্ধান পাওয়া গেলে হয়তো জানা যাবে- তারা কি পাওনাদারের চাপ থেকে পালিয়েছিলেন, নাকি তারা নিজেরাই কোনো বড় বিপদের মধ্যে পড়েছিলেন।
আর যদি তিনি আত্মগোপন করে থাকেন, তাহলে পরের প্রশ্নটি আরও বড়- কত মানুষের স্বর্ণ তার কাছে ছিল? সেই স্বর্ণের কী হলো এবং সেই টাকা গেল কোথায়?এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরই হয়তো চাঁদপুরের পিন্টু দাসের সপরিবারে নিখোঁজ হওয়ার রহস্যের আসল দরজা খুলে দেবে।

বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ আগস্ট ২০২৬
ঋণ, পাওনাদারের হুমকি ও বন্ধকী স্বর্ণ ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ- সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। তিনি কি আর্থিক চাপে আত্মগোপনে গেছেন, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা আছে? অতীতের কয়েকটি ঘটনাও দেখাচ্ছে, এমন ব্যবসায় সংকট তৈরি হলে তার অভিঘাত শুধু ব্যবসায়ীর ওপর পড়ে না, বিপদে পড়েন শত শত গ্রাহক।
চাঁদপুর শহরের একটি ভাড়া বাসা। সেখানেই স্ত্রী রিমি দাস এবং দুই ছেলে প্রিয়ম ও রুপমকে নিয়ে থাকতেন স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু দাস। হঠাৎ জানা গেল, চারজনের কাউকেই পাওয়া যাচ্ছে না। বাসায় নেই, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ। বুধবার (২৬ আগস্ট) বিষয়টি নিশ্চিত করলেন পিন্টু দাসের নিকটাত্মীয় ও চাঁদপুর হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ছাত্র ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক উপমা দে।
পিন্টু দাস চাঁদপুর শহরের ‘এস কে শিল্পালয়’-এর স্বত্বাধিকারী। তার স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ চারজনের নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। পরিবারের স্বজনদের ভাষ্য, পিন্টু দাস ঋণগ্রস্ত ছিলেন। সম্প্রতি এক ব্যক্তি তাকে হুমকি দিচ্ছিলেন বলেও তারা জানতে পারেন। এ কারণে পরিবার নিয়ে তিনি অন্য কোথাও চলে গিয়ে থাকতে পারেন বলে তাদের ধারণা।
কিন্তু স্থানীয় কয়েকজনের বক্তব্যে সামনে এসেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য। তাদের দাবি, পিন্টু দাস শুধু স্বর্ণ ব্যবসা করতেন না, স্বর্ণ বন্ধক রেখে টাকা দেওয়ার ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে বন্ধক নেওয়া স্বর্ণ নির্ধারিত সময়ে ফেরত দিতে পারছিলেন না- এমন অভিযোগও উঠেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সমিতি থেকে ব্যবসার জন্য ঋণ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তিনটি সম্ভাবনা
এখন মূল প্রশ্ন- এই আর্থিক সংকটই কি পিন্টু দাসের সপরিবারে উধাও হওয়ার কারণ? এ মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে তথ্যগুলো পাশাপাশি রাখলে অন্তত তিনটি সম্ভাবনা দেখা যায়।
প্রথমত, আর্থিক চাপ থেকে আত্মগোপন। একজন ব্যবসায়ী যখন নিজের কাছে থাকা বন্ধকী সম্পদ ফেরত দিতে পারেন না, একই সঙ্গে বিভিন্ন জায়গা থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধের চাপ থাকে এবং পাওনাদারদের চাপ বাড়তে থাকে, তখন তার সামনে নগদ অর্থের সংকট তৈরি হতে পারে। পিন্টু দাসের ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল কি না, সেটিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
রাসেল খান নামের একজন দাবি করেছেন, তিনি আড়াই ভরি স্বর্ণ ৫০ হাজার টাকায় বন্ধক রেখেছিলেন। পরে টাকা ফেরত দিয়ে স্বর্ণ নিতে গেলে তাকে পরদিন আসতে বলা হয়। এর পরই তিনি জানতে পারেন, পিন্টু দাস পরিবার নিয়ে চলে গেছেন। তিনি থানায় অভিযোগ করেছেন বলেও জানিয়েছেন। আরও দুজন বন্ধক রাখা স্বর্ণ ফেরত পাওয়ার দাবি করেছেন।
দ্বিতীয়ত, পাওনাদার বা অন্য কারও চাপ কিংবা হুমকি। স্বজনেরা বলেছেন, পিন্টু দাসকে সম্প্রতি একজন হুমকি দিচ্ছিলেন। সত্যিই যদি এমন হুমকি থেকে থাকে, তাহলে তিনি নিরাপত্তার কারণে পরিবার নিয়ে আত্মগোপনে গেছেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে এই বক্তব্যের স্বাধীন সমর্থন এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে এটিকেও আপাতত একটি দাবি বা সম্ভাবনা হিসেবেই দেখতে হবে।
তৃতীয়ত, নিখোঁজ হওয়ার পেছনে অন্য কোনো অপরাধ বা জবরদস্তি আছে কি না।পরিবারের চারজন একই সঙ্গে যোগাযোগের বাইরে চলে যাওয়ায় এই সম্ভাবনাটিও তদন্ত থেকে বাদ দেওয়া যায় না। তারা স্বেচ্ছায় গেছেন, নাকি কারও চাপে বা অন্য কোনো কারণে গেছেন- তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাদের অবস্থান শনাক্ত করা সবচেয়ে জরুরি।
চাঁদপুর সদর মডেল থানার ওসি ফয়েজ আহমেদ বলেছেন, চারজনের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি তারা জানতে পেরেছেন।বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। পুলিশের কাছে বন্ধক রাখা স্বর্ণ ফেরত না পাওয়ার অভিযোগের কথাও তারা জেনেছেন।
ঘটনা নতুন নয়
তবে পিন্টু দাসের এই সপরিবারে উধাও হওয়ার ঘটনা আলাদা করে দেখার পাশাপাশি আগের কয়েকটি ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়। ২০২৫ সালে ভোলার ইলিশায় সুইটি জুয়েলার্সের মালিক সোহাগ বালার বিরুদ্ধে গ্রাহকদের বিপুল পরিমাণ বন্ধকী স্বর্ণ ও নগদ টাকা নিয়ে উধাও হওয়ার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের হিসাবে, শতাধিক গ্রাহকের প্রায় ৫০০ ভরি স্বর্ণ ও ৫০ লাখের বেশি টাকা নিয়ে তিনি উধাও হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছিলেন ভুক্তভোগীরা। তার দোকান ও বাড়ি তালাবদ্ধ পাওয়া যায়।
এখানেও দেখা যায় একই ধরনের একটি প্যাটার্ন। বিশ্বাসের সম্পর্ক থেকে স্বর্ণ বন্ধক রাখা। এতে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক সৃষ্টি হওয়া। তারপর ফেরত দিতে সমস্যা তৈরি হওয়া। সবশেষে ব্যবসায়ীর হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া।
আরেকটা ঘটনা ঘটেছে গত জুলাই মাসেই। বরগুনার পাথরঘাটাতেও বাবুল কুলু নামের এক স্বর্ণকার ও বন্ধকি ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে গ্রাহকদের স্বর্ণালংকার ও টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে থানায় তদন্ত শুরু হয়েছিল।
তবে এসব ঘটনার সঙ্গে পিন্টু দাসের ঘটনার সরাসরি যোগসূত্র নেই। মিলটি শুধু ঘটনার ধরনে। এর সঙ্গে আরও পুরোনো একটি বড় ঘটনা মেলানো যায়।স্বর্ণ বন্ধক ব্যবসার ঝুঁকি বোঝাতে কক্সবাজারের চকরিয়ার নন্দরাম ধরের ঘটনাটিও গুরুত্বপূর্ণ কেসস্টাডি।
২০১৪ সালে যৌথ বাহিনী তার বাড়ি থেকে প্রায় ২৭ কেজি ৭৬৫ গ্রাম বন্ধকি স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থসহ বিভিন্ন জিনিস জব্দ করে। নন্দরাম ও তার দুই ছেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে দেখা যায়, বহু মানুষ তার কাছে স্বর্ণ বন্ধক রেখে টাকা নিয়েছিলেন। ফলে স্বর্ণ জব্দ হওয়ার পর গ্রাহকেরা তাদের গয়না ফেরত পাবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
এই ঘটনা আর পিন্টু দাসের ঘটনা এক নয়। নন্দরামের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও মামলা হয়েছিল। কিন্তু কেসটি একটি বিষয় স্পষ্ট করে- বন্ধকি ব্যবসায় একজন ব্যবসায়ীর হাতে যখন বিপুলসংখ্যক মানুষের সঞ্চিত স্বর্ণ জমা হয়, তখন তার ব্যবসায়িক সংকট খুব দ্রুত বহু পরিবারের সংকটে পরিণত হতে পারে।
আসল ঘটনা কী
পিন্টু দাসের ঘটনায় তাই শুধু ‘তিনি কোথায়?’ প্রশ্নটি যথেষ্ট নয়। তদন্তে অন্তত কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার। প্রথমত, তার কাছে মোট কতজন মানুষ স্বর্ণ বন্ধক রেখেছিলেন? দ্বিতীয়ত, সেই স্বর্ণের মোট পরিমাণ কত? তৃতীয়ত, বন্ধকী স্বর্ণের বিপরীতে তিনি মোট কত টাকা দিয়েছিলেন? চতুর্থত, তার নিজের ব্যবসায়িক সম্পদ ও দেনার পরিমাণ কত?
এরপর পঞ্চমত, বিভিন্ন সমিতি বা ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি কত টাকা ধার করেছিলেন?ষষ্ঠত, শেষ কয়েক সপ্তাহে তিনি কার কার সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করেছেন? সপ্তমত, তার ব্যাংক হিসাব, মোবাইল আর্থিক সেবা ও অন্যান্য লেনদেনে হঠাৎ কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা গেছে কি না? অষ্টমত, তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা শেষ কোথায় ছিলেন? নবমমত, তারা নিজেরাই বাসা ছেড়েছেন, নাকি তাদের কেউ বাধ্য করেছে?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, পিন্টু দাসের কাছে বন্ধক রাখা স্বর্ণ এখন কোথায়?কারণ পিন্টু দাসকে পাওয়া গেলে একটি পরিবারের রহস্যের সমাধান হবে। কিন্তু তার কাছে থাকা অন্য মানুষের স্বর্ণের হিসাব না মিললে সমস্যাটি সেখানেই শেষ হবে না।
স্বর্ণ ব্যবসায় বিশ্বাসই পুঁজি
এটা সত্য যে, স্বর্ণের ব্যবসায় ‘বিশ্বাস’ই যখন মূল পুঁজি। বন্ধকী স্বর্ণের ব্যবসার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো- এখানে ব্যাংকের মতো আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বদলে অনেক সময় ব্যক্তিগত বিশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গ্রামের বা ছোট শহরের মানুষ বিপদে পড়ে ব্যাংকে না গিয়ে পরিচিত মহাজন বা স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছে গয়না রেখে টাকা নেন।
২০২০ সালের করোনাকালে ব্যবসায় মন্দার সময়ও বন্ধকি স্বর্ণের ব্যবসায় চাপ তৈরি হয়েছিল বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছিলেন। সে সময় জাতীয় এক দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, অনেক গ্রাহকের বন্ধক আটকে গিয়েছিল। বন্ধক ছাড়ানোর সক্ষমতা কমে গিয়েছিল।
এই ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীর নগদ অর্থের প্রবাহ যদি কোনো কারণে আটকে যায়, তখন একটি বিপজ্জনক চক্র তৈরি হতে পারে- নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো দায় মেটানো, পুরোনো বন্ধক ছাড়াতে নতুন টাকা খোঁজা, একসময় সব দিক থেকে চাপ তৈরি হওয়া পিন্টু দাসের ব্যবসায় এমন কোনো চক্র তৈরি হয়েছিল কি না, তদন্তেই তার উত্তর মিলবে।
নাকি ‘আত্মগোপন’
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পিন্টু দাস ও তার পরিবারকে নিখোঁজ হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু তারা স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে গেছেন- এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। আবার তাদের অপহরণ বা জোর করে নিয়ে যাওয়ার প্রমাণও নেই। তাই তদন্তের আগে কোনো একটি তত্ত্বকে সত্য ধরে নেওয়া বিপজ্জনক।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার: ঋণের চাপ, বন্ধকী স্বর্ণ ফেরত দেওয়ার অভিযোগ এবং হুমকির তথ্য- তিনটি বিষয় একই সময়ে সামনে এসেছে। এখন পিন্টু দাস ও তার পরিবারের সন্ধান পাওয়া গেলে হয়তো জানা যাবে- তারা কি পাওনাদারের চাপ থেকে পালিয়েছিলেন, নাকি তারা নিজেরাই কোনো বড় বিপদের মধ্যে পড়েছিলেন।
আর যদি তিনি আত্মগোপন করে থাকেন, তাহলে পরের প্রশ্নটি আরও বড়- কত মানুষের স্বর্ণ তার কাছে ছিল? সেই স্বর্ণের কী হলো এবং সেই টাকা গেল কোথায়?এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরই হয়তো চাঁদপুরের পিন্টু দাসের সপরিবারে নিখোঁজ হওয়ার রহস্যের আসল দরজা খুলে দেবে।

আপনার মতামত লিখুন