গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলে আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্য দিয়ে যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, আজ তার ছয় মাস পূর্ণ হলো। তেহরানে ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর বিশ্বরাজনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো বিদ্যমান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে শেষ করার দাবি করলেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।
গত ছয় মাসের এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আহত হয়েছেন আরও কয়েক হাজার। যুদ্ধ এখন কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হোরমোজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের লড়াইয়ে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
মার্কিন লক্ষ্য ও বাস্তবতা
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে তিনি ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ‘ধূলিসাৎ’ করে দিয়েছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, তেহরানের কাছে এখনো ৪৪০ কেজি উচ্চ মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে সক্ষম। এ ছাড়া গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার মাধ্যমে ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ (রেজিম চেঞ্জ) যে চেষ্টা করা হয়েছিল, তাও সফল হয়নি। বর্তমানে প্রয়াত খামেনির ছেলে মোতজবা খামেনির নেতৃত্বে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আগের মতোই অটুট রয়েছে।

সামরিক ও আঞ্চলিক প্রভাব
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের নৌবাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের ওপর একের পর এক হামলার দাবি করেছে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ইরানের প্রায় ৮২ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। তবে ইরান এখনো পাল্টাহামলা চালিয়ে যাচ্ছে; যার প্রমাণ গত জুলাই মাসে জর্ডানে তিন মার্কিন সেনার মৃত্যু। একই সঙ্গে হিজবুল্লাহ ও হুতিদের মতো আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর তেহরানের প্রভাব ও সমর্থন কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
অর্থনৈতিক ধাক্কা
ইরানের অর্থনীতির ওপর এই যুদ্ধের প্রভাব ভয়াবহ। দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি তুঙ্গে এবং মুদ্রার মানের চরম পতন ঘটেছে। মার্কিন নৌ-অবরোধের ফলে ইরানের তেল রপ্তানি আয় কমেছে অন্তত ৬ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, আমেরিকাতেও তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় যুদ্ধের জনপ্রিয়তা কমেছে। জুলাইয়ের এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশ আমেরিকান এই যুদ্ধের বিপক্ষে। ক্যালিফোর্নিয়ার মতো অঙ্গরাজ্যগুলোতে জ্বালানির দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
বৈশ্বিক মেরুকরণ
এই যুদ্ধ বিশ্বব্যবস্থাকে নতুন করে সাজাচ্ছে। ন্যাটো মিত্রদের অনেকেই এই যুদ্ধে আমেরিকার পাশে দাঁড়াতে অনীহা প্রকাশ করেছে। ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন ও ইতালি সরাসরি অবরোধে অংশ নিতে অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
বিজয় কি কারো হয়েছে?
পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘ ছয় মাসে কোনো পক্ষই নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করতে পারেনি। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলম সালেহ বলেন, ‘আমেরিকা মধ্যম শক্তির দেশ ইরানের ওপর সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখলেও কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। আবার ইরান টিকে থাকলেও তারা নিজেদের বিজয়ী দাবি করতে পারে না। এটি মূলত একটি দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার রূপ নিয়েছে।’
আপনার মতামত লিখুন