সংবাদ

তিন দশকের ছোটগল্পের রূপরূপান্তর

শালুক-এর নির্বাচিত গল্প সংকলন ‘অতিক্রমণ’


রকিবুল হাসান
রকিবুল হাসান
প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৯ পিএম

শালুক-এর নির্বাচিত গল্প সংকলন ‘অতিক্রমণ’


সাতাশ বছর! একটি লিটল ম্যাগাজিনের নিয়মিত প্রকাশনার ক্ষেত্রে এটা দীর্ঘ সময়। এ এক কঠিন ব্রত। ব্রত ব্যতীত এই অসাধ্য সাধন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। একসময় আমি নিজেও লিটল ম্যাগাজিন করেছি। এক দুই করে পাঁচটি লিটল ম্যাগাজিন করেছি। কোনোটাই দু’বছরের বেশি অতিক্রম করতে পারেনি। ফলে যখন দেখি ‘শালুক’ সাতাশ বছর ধরে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে— নিরবচ্ছিন্ন সুবৃহৎ কলেবরের বিশেষায়িতভাবে; এটা সহজসাধ্য ব্যাপার মনে হয় না। সাহিত্যযাত্রায় অধুনাবাদী চিন্তার লিটল ম্যাগাজিন ‘শালুক’ বাংলা ভাষার লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনে অত্যন্ত শক্তিমত্তার পরিচয় দিচ্ছে। এর বহুবিচিত্র বিষয়বিন্যাস একদিকে যেমন অভিভূত করে, অন্যদিকে বিস্মিত করে। রীতিমতো অসাধ্যকে সাধনকরণ। পত্রিকা শুরু থেকেই নির্দিষ্ট একটি লক্ষ্য স্থির করে ক্রমাগত এক একটি পাহাড় অতিক্রম করার মতো করেই এগিয়ে যাচ্ছে। যেখানে শালুকের স্পষ্ট বক্তব্য আছে— শালুক একটি স্বতন্ত্র, বৌদ্ধিক ও নন্দনতাত্ত্বিক পরিসর নির্মাণের প্রয়াস। শালুক সবসময়ই তারুণ্যকে উৎসাহিত করায় বিশ্বাসী। শুধু বিশ্বাস করেই ঘুমিয়ে থাকে না। দৃঢ়তায় পথ হাঁটে এবং পথ থেকে লেখক তুলে আনে। আবার দেশের ও দেশের বাইরের খ্যাতিমান কবিদের জীবন-সাহিত্যকর্ম নিয়ে দীর্ঘ পরিসরে কাজ করে রীতিমতো অবাক করে দেয়। শালুকের বিভিন্ন সংখ্যা এসবের দীপ্র প্রমাণ। শালুকের বিভিন্ন সংখ্যায় বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত ও নবীন গল্পকারদের অসংখ্য উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, গ্রন্থালোচনা প্রকাশিত হয়েছে। 

কবি ওবায়েদ আকাশ ও কবি মাহফুজ আল-হোসেনের সম্পাদনায় ‘শালুক ক্রিয়েটিভ’ থেকে প্রথম প্রকাশিত হলো গল্প সংকলন “অতিক্রমণ”। এটি শালুকের ২৭ বছরে প্রকাশিত ২৯টি সংখ্যা থেকে বাছাই করা গল্পের সংকলন। এটা যে আবেগবর্জিত, বাস্তবধর্মী নির্মোহ সম্পাদনায় প্রকাশিত গ্রন্থ তা গ্রন্থটির পাতা ওল্টালেই বোঝা যাবে।

‘শালুক ক্রিয়েটিভ’ কোনো গতানুগতিক উদ্যোগ নয়। এদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাভাবনা ভিন্ন। সময় থেকে বহু এগিয়ে। নিঃসন্দেহে বিশেষায়িত একটি কার্যক্রম। তাদের সুনির্দিষ্ট চিন্তা-চেতনা, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য রয়েছে— যা বাণিজ্যিকীকরণ নয়। নিজেদের পুঁজির বিকাশ ঘটানো নয়। সাহিত্যের বিকাশের ধারায় কার্যকরি অর্থবহ ভূমিকা রাখার চেষ্টায় রত। ওবায়েদ আকাশ পুরোদস্তুর কবি। প্রথম সংখ্যাটিই হতে পারতো কবিতাকেন্দ্রিক। কিন্তু তিনি তা করেননি। নির্দিষ্ট কোনো চিন্তাভাবনা থেকেই গল্পকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে এতে বোঝা যায় তাদের লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট ও সুদূর প্রসারী। এখানে আরও একটি ব্যাপার কাজ করেছে; তা হলো— শালুক ক্রিয়েটিভ শুধু আলোচিত গল্পকারের গল্পকে প্রাধান্য দিয়ে যশখ্যাতি প্রশংসার মোহে আত্মাহুতি দেয়নি। যেসব লেখকের গল্প শালুকে প্রকাশিত হয়েছে সেখান থেকেই নানামাত্রিক বিচার-বিশ্লেষণে গল্প নির্বাচন করে ‘অতিক্রমণে’ জায়গা করে দিয়েছে। যদিও শালুকে অনেক খ্যাতিমান গল্পকারের পাশাপাশি অসংখ্য প্রতিশ্রুতিশীল তরুণের গল্প প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ শালুকের লেখকেদের প্রতি দায়বদ্ধতার পরিচয় লক্ষণীয়। তরুণ লেখকদের নানা রকম প্রতিবন্ধকতার ভেতর দিয়েই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। শালকু এক্ষেত্রে তাদের জন্য সম্মানের ও নির্ভরতার একটা বড় প্লাটফরম হয়ে উঠতে পেরেছে। আর সেটাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে ‘শালুক ক্রিয়েটিভ’।  

সম্পাদকীয়তে সেই উচ্চারণই শুনতে পাই, “সময়ের বিচারে, বিষয়গত বৈচিত্র্যে এবং শিল্প-নির্মাণের স্বাতন্ত্র্যে সেই গল্পগুলোর অনেকগুলোই আজ আমাদের সাহিত্য-ঐতিহ্যের মূল্যবান দলিল। সেই বিপুল ভাণ্ডার থেকেই সতর্ক পাঠ, পুনর্মূল্যায়ন এবং নন্দনতাত্ত্বিক বিবেচনার ভিত্তিতে নির্বাচিত গল্পসমূহ নিয়ে প্রকাশিত হলো ‘অতিক্রমণ’। নামের মধ্যেই এই সংকলনের দর্শন নিহিত— ‘অতিক্রমণ’ মানে কেবল সময়কে অতিক্রম করা নয়, বরং প্রথাসিদ্ধ প্রচলিত চিন্তার সীমায় বিচরণ কিংবা নন্দনের চেনা স্রোতে অবগাহনের মতো কম্ফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে এসে আত্মতুষ্টির সীসার দেয়াল অতিক্রম করা।” সঙ্কলনে গল্পগুলো বিষয়বৈচিত্র্যে ভিন্নতর। গল্পগুলোর পরীক্ষা-নীরিক্ষা আছে। ভাষার যাদুকরী খেলা আছে। ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ আছে।  “লোকজ চেতনা, নগর নিঃসঙ্গতা, স্মৃতির অন্তঃস্রোত, অস্তিত্বের বিপন্নতা এবং কর্পোরেট পুঁজির শোষণ এবং আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে অন্তর্নিহিত ডিস্টোপিয়ার নান্দনিক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে বহুস্বর” গল্পগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে আছে। গল্পগুলো শুধু গল্প নয়— জীবনের বহু রূপ ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে গল্পগুলোতে শিল্পিতভাবে উঠে এসেছে। প্রায় প্রত্যেকটি গল্পের বিষয় ভিন্ন— বলার ধরন ভিন্ন— চিন্তার বলয় ভিন্ন— সমাজচিত্রকে ধরার কৌশল ভিন্ন— বার্তা দেয়ার কৌশলও আলাদা এবং রচনাশৈলীর ক্ষেত্রে প্রত্যেক লেখকই সচেতন ও সচেষ্ট। কোনো গল্পই দায়সারা গোছের পরিলক্ষিত হয়নি।  গল্প বলার জন্য গল্প বলেননি। প্রত্যেকেই নিজস্ব দায় ও কৌশলে সুনিপুণভাবে জীবন-সমাজ-পুঁজির বিকাশ— মনস্তাত্ত্বিকতা-বোধ-মানবিক সম্পর্কসহ দেশকালের নানাবিষয়কে গল্পে অনুষঙ্গ করে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। সেসব বিবেচনায় নিলে ‘অতিক্রমণ’ বাংলা সাহিত্যে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলো। 

গল্প সঙ্কলন নানা সময়ে নানাভাবে বের হয়েছে। কিন্তু নিজের পত্রিকায় প্রকাশিত গল্পকারদের গল্প নিয়ে এরকম সুবৃহৎ গল্প সঙ্কলন বোধ হয় এদেশে এটিই প্রথম। যেখানে পুঁজির সহজ পন্থা নয়, দায়বোধের কঠিন পথ ‘অতিক্রমণে’র প্রত্যয়ের তেজস্বী আলোর বিচ্ছুরণ ছড়ানো। সম্পাদকের কণ্ঠেও সে কথাই উচ্চারিত হয়েছে,  “গল্পগুলো পাঠককে শুধু গল্পপাঠের আনন্দই দেবে না; বরং তাঁকে নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাবে, নতুন পাঠপদ্ধতির দিকে আহ্বান জানাবে এবং মানুষের জীবন, সমাজ, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আরও গভীরভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করবে। সাহিত্য তখনই তার প্রকৃত সার্থকতা লাভ করে, যখন তা পাঠকের চেতনায় একটি স্থায়ী আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেই আলোড়নেরই বিনম্র আহ্বান আমাদের এই প্রকাশনা।”

ছোটগল্পের অসংখ্য সঙ্কলন আছে— সেসব সঙ্কলনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যও ভিন্নতা আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়বোধ থেকে বাণিজ্যিকীকরণই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ‘অতিক্রমণ’ প্রকাশের বিশেষত্ব কী! প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সম্পাদক নিজেই এর উত্তর দিয়েছেন, “আমরা এমন উদ্যোগ নিয়েছি, এককথায় বলতে গেলে— এগুলো ব্যতিক্রমী ও প্রথাবিরুদ্ধ লিটল ম্যাগাজিন ‘শালুক’-এ প্রকাশিত গল্প; এবং শালুকে প্রকাশিত যে কোনো লেখাই চিন্তার উদ্রেক করে। সুতরাং এদিক বিবেচনায় মনে হয়েছে, এই লেখাগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশের আনন্দই আলাদা। ‘শালুক ক্রিয়েটিভ’ বিশ্বাস করে, ভালো গল্প কখনো কেবল পড়া হয় না, তা মানুষের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে। কখনো প্রশ্ন হয়ে, কখনো স্মৃতি হয়ে, কখনো প্রতিবাদ হয়ে, কখনো আবার অপ্রকাশের বেদনায় ছটফট করে শরবিদ্ধ সারসের মতো। এই সংকলনের প্রতিটি গল্পও যেন সেই দীর্ঘস্থায়ী পাঠ-অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে।” 

বিশ্বসিাহিত্যে ছোটগল্পের শক্ত অবস্থান আছে। আমাদের ছোটগল্প নানাভাবে শক্তিমত্তা ধারণ করে। কিন্তু সেটাকে আরও শক্তিশালী করার জন্য তরুণ গল্পকার তৈরির প্রয়োজন— এই তাগিদ শালুক অনুভব করে, সেই তাগিদকে আরও এক একধাপ এগিয়ে ‘অতিক্রমণ’ করেছে। এই দায় সবাই নিতে পারে না। নেয়ও না। দুচারজন যারা নিতে পারেন, তারা সত্যিকারের সাহিত্যেও দায়বোধের জায়গায় ব্রতগ্রহণকারী সাধক। কবি ওবায়েদ আকাশ ও মাহফুজ আল-হোসেনকে আমি এরকমই সাধক হিসেবে বিচেনা করি। ছোটগল্প কখন কীভাবে জন্মেছে, সময়ের নিরিখে তা যথাযথভাবে বলা বেশ কঠিন। কিন্তু জন্মেছে এবং শক্ত অবস্থানে স্থায়ীভাবে বসতি গ্রহণ করে আছে। বাংলা সাহিত্যেও ছোটগল্পের জন্ম একেবারে অঙ্কের মতো নির্দিষ্ট করে প্রমাণ করা যায় না— ছোটগল্প কে কখন প্রথম লিখেছেন! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের সঙ্গে-সঙ্গে বদলে যেতে পারে প্রচলিত ইতিহাস। এরকম ইতিহাস বিদেশি সাহিত্যে যেমন আছে, বাংলা সাহিত্যেও আছে। সুতরাং সাহিত্যের কোনো আবিষ্কারকেই চূড়ান্ত বলে ঘোষণা দেওয়া যায় না। কালের ধারায় তা বদলায়। বদলাতে পারে। আর সেই বদলানোর কাজটা ‘অতিক্রমণে’র মতো সঙ্কলনগুলো অনেকখানি সহজ করে দেয়।  

ছোটগল্পের জন্ম সুদূর পশ্চিমে— আমেরিকায়। তারা কর্মজীবনে অধিক ব্যস্ত— সময়ের স্বল্পতার কথা বিবেচনা করে ছোটগল্প সৃষ্টি করেছিল। যেন সাহিত্যপাঠে বেশি সময় ব্যয় না হয়। কারণ একটা উপন্যাস পাঠে অধিক সময়ের প্রয়োজন হয়। সেকারণেই তাদের মনে হয়েছে চলতি পথে বা স্বল্পসময়ে সাহিত্যের রস আস্বাদনের জন্য উপন্যাসের পরিবর্তে আরও সংক্ষিপ্ত কিছু সৃষ্টি করা যেতে পারে। যেখানে জীবনের বা কোনো বিষয়ের পূর্ণ রূপ না থাকলেও জীবনের খণ্ডিত নানা কাহিনি স্বতন্ত্ররূপে শিল্পের মর্যাদায় সৃষ্টি হতে পারে— সেখানেও জীবন থাকবে— সমাজ থাকবে— অর্থনীতি থাকবে— রাজনীতি থাকবে। এরকম ভাবনা থেকেই ছোটগল্পের উদ্ভব ঘটে। ‘অতিক্রমণে’ যেসব গল্প ছাপা হয়েছে তাতে জীবন-সমাজ-রাজনীতি-ইতিহাস-মনস্তাত্ত্বিকতা বহুকৌণিকভাবে শিল্পিত আঙ্গিকে উপস্থাপিত হয়েছে। 

উপন্যাসের মতো গল্পেরও কাহিনি, চরিত্র, সংলাপ, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, জীবনদর্শন ও শিল্প অনিবার্য। কিন্তু উপন্যাস যেখানে বৃহৎ অর্থে, গল্প সেখানে সংক্ষিপ্ত অর্থে, এবং অনেক বিধিনিষেধে বন্দি থাকতে হয়। গল্পে লেখকের স্বাধীনতা কম। যেটা উপন্যাসে লেখকের আছে। প্রকরণগত চাহিদা এক হলেও গল্পের পটভূমি থাকে সংক্ষিপ্ত। সেই সংক্ষিপ্ত পরিসরের মধ্যে লেখককে তাঁর অভিপ্রায় প্রকাশ করতে হয়। কাজটি নিঃসন্দেহে কঠিন। এই কারণে লেখককে তার কাহিনি এমনভাবে বুনতে হয়; চরিত্র নির্বাচন এমনভাবে করতে হয় এবং পরিবেশ অঙ্কন ও ভাষা প্রয়োগ এমন হতে হয়, যেন পাঠক কোনোক্রমেই ক্লান্তিবোধ না করে। পাঠকের ক্লান্তি তৈরি হলেই ছোটগল্পের আবেদনের ব্যত্যয় ঘটে। উপন্যাসের যে কাহিনি সেটাও গল্প। কিন্তু সেই বিশাল গল্পের প্লট গল্পে নেই। ছোটগল্পের গল্প বা ঘটনা থাকবে ক্ষুদ্র। সেই ক্ষুদ্র পরিসরে গল্পকার যে চরিত্র নির্বাচন করবেন সেখানে দুই-একটি বা দু-চারটি বেশি চরিত্র কখনোই থাকবে না। দু-চারটি চরিত্র থাকলেও একটি দুটি চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব ও পদচারণায় পুরো গল্পের অভিপ্রায়টুকু ফুটে উঠবে। প্রলম্বিত ঘটনা কখনোই ছোটগল্পে থাকবে না। গল্পে গাঁথুনি বা বুনন এমন থাকবে যেন, সবটা মিলে একটা কেন্দ্রীভূত আবেশ অর্থাৎ চৌম্বকাবেশ পরিলক্ষিত হয়। গল্পের ভাষা ও সংলাপ রচনায় গল্পকারকে বিশেষ কলাকৌশলের আশ্রয় নিতে হয়। বাক্যসৃজন কৌশলে লেখককে গল্পের ভাষা নির্মাণে সতর্ক থাকতে হয়, অতিকথনের এখানে কোনো সুযোগ নেই। ‘অতিক্রমণে’র গল্পকারগণের অনেকেই এক্ষেত্রে ভীষণ সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন। ভালো রকমের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। অনেক তরুণ লেখকের গল্প বিস্ময়করভাবে আকৃষ্ট করার ক্ষমতা রাখে। এবং রীতিমতো ভাবায়। তাদের গল্পের ভেতর দক্ষতার যে ছাপ পরিলক্ষিত হয়েছে, তাতে বাংলা ছোটগল্পের আরও বহুদূর অগ্রসরমানতার শক্তি প্রোথিত।  

অধিকাংশ গল্পে চরিত্রের ছড়াছড়ি নেই। দু-একটি বা দুচারটি চরিত্রের মাধ্যমে গল্পকার জীবনের সেই বিশেষ মূহূর্তের রসঘন পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন। এসব আলোকপাত করতে গল্পকার চরিত্রাঙ্কন, বিষয়াবিন্যাস, পরিবেশ নির্মাণ, চরিত্র ও বিষয়ানুগ ভাষা সৃজন করেছেন। সব মিলে অতিক্রমণের অধিকাংশ গল্পকার তাদের গল্প সৃজনে বিশেষ কলাকৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন যা অভিভূত করে। কলাকৌশলগত দিকে গল্পের রস ও বিষয়বস্তুগত বৈচিত্র্য আনয়ন করার ক্ষমতা তাদের গল্পে পরিলক্ষিত হয়। বিষয়বস্তুগতভাবে নানা বিষয়ের গল্প এখানে যুক্ত হয়েছে। জীবনের উপরিতলে যে তরঙ্গ নিত্যদিন খেলা করে, জীবনের ভূপৃষ্ঠে যে আলোকোচ্ছটা স্বাভাবিকভাবে বিকিরিত হয়— সেই বিকিরণের ক্ষণিক আলোকিত মূহূর্তের অতিক্রমণের অনেক গল্পেই লক্ষণীয়।

গ্রামীণ জীবনে ক্ষুধার্ত অসহায় মানুষের স্বপ্নভঙ্গের আর্তি, দুঃখের কলরোল ও আহাজারি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার, পুঁজিবিকাশের অস্বাভাবিকতা এখানকার অনৈক গল্পেই উপজীব্য হয়েছে। নারী পুরুষের যুগপৎ সংগ্রাম, প্রেম, অন্তর্দাহ, দাম্পত্য কলহ, পরকীয়া, অভাব-অনটন, মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা, হতাশা-হাহাকারও অনেক গল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এসেছে। 

অতিক্রমণে মোট ৬৬টা গল্প প্রকাশিত হয়েছে। কলেবর সুবৃহৎ। গল্প ও গল্পকাররা হলেন— ‘দেহাবশেষ’  জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, ‘কার্তিকের হিমে, জ্যোৎস্নায়’ শহীদুল জহির, ‘সম্ভব অসম্ভবে পারাপার’ পূরবী বসু, ‘ত্রিমাত্রিক যুগল’ মোহিত কামাল,‘শরীরী অশরীরী’, সাদ কামালী, ‘মরণোত্তর মৃত্যুদিবস ও নৌকাকাণ্ড’ মামুন হুসাইন, ‘বাসনার মতো শূন্যতায়’ ইমতিয়ার শামীম, ‘রূপান্তরের অকথিত গল্পটা’ আনিসুজ জামান,‘ঘাসফড়িং’ কামাল রাহমান, ‘নীল মর্গের কোরাস’ মুজতবা আহমেদ মুরশেদ, ‘পথহীন পথে’ শাহ্্নাজ মুন্নী,‘অন্য লোকালয়’ জাকির তালুকদার, ‘খরগোশ কিংবা কুকুর সমাচার’ কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, ‘সাঁকো’ মহিবুল আলম, ‘বৃদ্ধ প্রেম’ হাইকেল হাশমী, ‘যাপনের দোলাচল’ পিন্টু ভৌমিক, ‘ডেকেছিল ঘোলাটে চাঁদ’ হাসান অরিন্দম, ‘সুগন্ধ ফুটেছিল’ রবিউল করিম, ‘কদমের হোর্সপাইপ ও আচ্ছালাম...’ রুহুল আমিন বাচ্চু, ‘মানবতা রিলোডেড’ খোকন কায়সার, ‘ছাঁটাই’ মনজুর শামস, ‘হৃদয়ের ভাবসম্প্রসারণ’ আনিস রহমান, ‘আন্তঃঅভ্যন্তরীণ রোদ জল’ আহমেদুর রশীদ, ‘ক্যাডেট কামরান ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকে’ ইকরাম কবীর, ‘প্যারানয়া’ মহসীন হাবিব, ‘রঙমালার বাপ’ আহমেদ ফরিদ,‘অস্তমিত পাহাড়ের বাঁকে’ কাজী রাফি, ‘যদি হারিয়ে যাই, দেখা হবে এখানেই’ আবদুল ওয়াহাব, ‘ট্যারা মিয়ার অলিম্পিক দর্শন’ মিলটন রহমান, ‘শরীয়ত-মারেফত’ রাখাল রাহা, ‘সুতরাং মায়াময় একপ্রস্থ অন্ধকারে নক্ষত্রের আত্মগোপনকারী আলোর উল্লাস’ আবু হেনা মোস্তফা এনাম, ‘উপেন সরকার ও তার তিন কন্যা’ মাহবুব মোর্শেদ, ‘প্যাঁচানো’ নাহার মনিকা, ‘আখেরী বিদায় স্টোর’ জেসমিন মুন্নী, ‘খোয়াজ খিজিরের হাত’ মঈনুল হাসান, ‘আমড়ার বোল’ শিপা সুলতানা, ‘ফৌজিয়া ও কয়েকটি লবণের গাছ’ দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু, ‘পরজীবীর সঙ্গে বসবাস’ লাবণ্য প্রভা, ‘বিকেল’ সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম, ‘পরম করুণাময়, অসীম দয়াল’ আহসান ইকবাল, ‘ব্যুরোক্র্যাট’, অনন্ত মাহফুজ, ‘স্মৃতি ফিরে পাওয়া টেকনোলজির একটি সুইচ’ মির্জা তাহের জামিল, ‘সে রাতে জালালউদ্দিনের সাথে অন্ধকার ছিল’ শাশ্বত নিপ্পন, ‘মা ও ছেলের হিসাববিজ্ঞান’ কাজী মোহাম্মদ আলমগীর, ‘দুঃখের কথাগুলি ব্যথার পাহাড় হয়ে আছে’ তমাল রায়, ‘লাইট-ন্যায়ের আলো প্রেজেন্ট জীবনের গল্প’ মোজাফ্ফর হোসেন, ‘নিথুয়া মংমা’ স্বকৃত নোমান,‘ঝড়’ সাঈদ আজাদ, ‘মানচিত্রের কান্নার রং’ সনোজ কুণ্ডু, ‘দহন’ নাহিদা নাহিদ, ‘ঘোর’ ম্যারিনা নাসরীন, ‘বীজপুরুষ’ ইশরাত তানিয়া, ‘তিনটি গল্প: বিশ্বাস, নীল কষ্ট, ভরা পূর্ণিমা’ নাহিদ পারভেজ, ‘সামছুর চোখে জ্বলে বাজারের দীপশিখা’ জয়নাল আবেদীন শিবু, ‘ছুরির ওপাশে সভ্যতা’ সুমন শাম্স, ‘নতুন কোনো গল্প নেই’ জয়দীপ দে,‘আপদ’ সাগরিকা নাসরীন, ‘চৌকি’ সুমী সিকান্দার, ‘একটা মলিন ২০ টাকার নোট’ খালেদ চৌধুরী, ‘স্বপনদুয়ার’ পলি শাহীনা, ‘বিকেলের বিধুর রং’ পিওনা আফরোজ, ‘খালুইভর্তি হাহাকার’ রনি রেজা, ‘দুপুরচন্দ্র, অন্ধ ফকির ও ঝড়ি বিবির কেচ্ছা’ মিলন আশরাফ,‘বারবিকিউ’ মূর্তালা রামাত,‘যক্ষের ধন’ বুলু রানী ঘোষ ও ‘পাতা ঝরার দিন’ ফারহানা সিনথিয়া।

বাংলা ছোটগল্পকে বিষয়-বৈচিত্র্যে-জীবনবোধে-রচনাশৈলীতে আরও এগিয়ে নিতে অতিক্রমণ গল্প সংকলনটি কতটা ভূমিকা রাখবে সেটা সময়ান্তরে বোঝা যাবে। তবে তারা যে এ পথটিকে এগিয়ে নিতেই দৃঢ় শিল্প-প্রতীজ্ঞ তা সহজেই অনুমিত। অতিক্রমণের কোনো কোনো তরুণ লেখক যে আগামী দিনের বড় গল্পকার হয়ে উঠতে পারেন, সেই আভাসটি খুব ভালো করেই এখানে আছে, যা আগামীতে আলোকিত এক গল্পরাজ্যের জন্ম দিবে— এ প্রত্যাশা শক্তভাবে করা যায়। আর, কিছু লেখক তো এখানে আছেন যারা তাদের গল্পে ইতোমধ্যে সুনাম-সুপরিচিতি-খ্যাতি অর্জন করেছেন। সব মিলিয়েই ‘অতিক্রমণ’ অসামান্য একটি গল্প-সাহিত্যকর্ম হয়ে উঠতে পেরেছে বলে বিবেচিত হওয়ার শক্তি রাখে। 

অতিক্রমণ (শালুক-এর নির্বাচিত গল্প সঙ্কলন)। সম্পাদক: ওবায়েদ আকাশ ও মাহফুজ আল হোসেন ॥ প্রকাশক: শালুক ক্রিয়েটিভ, ঢাকা। প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৬। প্রচ্ছদ: সঞ্জয় দে রিপন। পৃষ্ঠা: ৫১২। মূল্য: ৮০০ টাকা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


শালুক-এর নির্বাচিত গল্প সংকলন ‘অতিক্রমণ’

প্রকাশের তারিখ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image


সাতাশ বছর! একটি লিটল ম্যাগাজিনের নিয়মিত প্রকাশনার ক্ষেত্রে এটা দীর্ঘ সময়। এ এক কঠিন ব্রত। ব্রত ব্যতীত এই অসাধ্য সাধন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। একসময় আমি নিজেও লিটল ম্যাগাজিন করেছি। এক দুই করে পাঁচটি লিটল ম্যাগাজিন করেছি। কোনোটাই দু’বছরের বেশি অতিক্রম করতে পারেনি। ফলে যখন দেখি ‘শালুক’ সাতাশ বছর ধরে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে— নিরবচ্ছিন্ন সুবৃহৎ কলেবরের বিশেষায়িতভাবে; এটা সহজসাধ্য ব্যাপার মনে হয় না। সাহিত্যযাত্রায় অধুনাবাদী চিন্তার লিটল ম্যাগাজিন ‘শালুক’ বাংলা ভাষার লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনে অত্যন্ত শক্তিমত্তার পরিচয় দিচ্ছে। এর বহুবিচিত্র বিষয়বিন্যাস একদিকে যেমন অভিভূত করে, অন্যদিকে বিস্মিত করে। রীতিমতো অসাধ্যকে সাধনকরণ। পত্রিকা শুরু থেকেই নির্দিষ্ট একটি লক্ষ্য স্থির করে ক্রমাগত এক একটি পাহাড় অতিক্রম করার মতো করেই এগিয়ে যাচ্ছে। যেখানে শালুকের স্পষ্ট বক্তব্য আছে— শালুক একটি স্বতন্ত্র, বৌদ্ধিক ও নন্দনতাত্ত্বিক পরিসর নির্মাণের প্রয়াস। শালুক সবসময়ই তারুণ্যকে উৎসাহিত করায় বিশ্বাসী। শুধু বিশ্বাস করেই ঘুমিয়ে থাকে না। দৃঢ়তায় পথ হাঁটে এবং পথ থেকে লেখক তুলে আনে। আবার দেশের ও দেশের বাইরের খ্যাতিমান কবিদের জীবন-সাহিত্যকর্ম নিয়ে দীর্ঘ পরিসরে কাজ করে রীতিমতো অবাক করে দেয়। শালুকের বিভিন্ন সংখ্যা এসবের দীপ্র প্রমাণ। শালুকের বিভিন্ন সংখ্যায় বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত ও নবীন গল্পকারদের অসংখ্য উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, গ্রন্থালোচনা প্রকাশিত হয়েছে। 

কবি ওবায়েদ আকাশ ও কবি মাহফুজ আল-হোসেনের সম্পাদনায় ‘শালুক ক্রিয়েটিভ’ থেকে প্রথম প্রকাশিত হলো গল্প সংকলন “অতিক্রমণ”। এটি শালুকের ২৭ বছরে প্রকাশিত ২৯টি সংখ্যা থেকে বাছাই করা গল্পের সংকলন। এটা যে আবেগবর্জিত, বাস্তবধর্মী নির্মোহ সম্পাদনায় প্রকাশিত গ্রন্থ তা গ্রন্থটির পাতা ওল্টালেই বোঝা যাবে।

‘শালুক ক্রিয়েটিভ’ কোনো গতানুগতিক উদ্যোগ নয়। এদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাভাবনা ভিন্ন। সময় থেকে বহু এগিয়ে। নিঃসন্দেহে বিশেষায়িত একটি কার্যক্রম। তাদের সুনির্দিষ্ট চিন্তা-চেতনা, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য রয়েছে— যা বাণিজ্যিকীকরণ নয়। নিজেদের পুঁজির বিকাশ ঘটানো নয়। সাহিত্যের বিকাশের ধারায় কার্যকরি অর্থবহ ভূমিকা রাখার চেষ্টায় রত। ওবায়েদ আকাশ পুরোদস্তুর কবি। প্রথম সংখ্যাটিই হতে পারতো কবিতাকেন্দ্রিক। কিন্তু তিনি তা করেননি। নির্দিষ্ট কোনো চিন্তাভাবনা থেকেই গল্পকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে এতে বোঝা যায় তাদের লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট ও সুদূর প্রসারী। এখানে আরও একটি ব্যাপার কাজ করেছে; তা হলো— শালুক ক্রিয়েটিভ শুধু আলোচিত গল্পকারের গল্পকে প্রাধান্য দিয়ে যশখ্যাতি প্রশংসার মোহে আত্মাহুতি দেয়নি। যেসব লেখকের গল্প শালুকে প্রকাশিত হয়েছে সেখান থেকেই নানামাত্রিক বিচার-বিশ্লেষণে গল্প নির্বাচন করে ‘অতিক্রমণে’ জায়গা করে দিয়েছে। যদিও শালুকে অনেক খ্যাতিমান গল্পকারের পাশাপাশি অসংখ্য প্রতিশ্রুতিশীল তরুণের গল্প প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ শালুকের লেখকেদের প্রতি দায়বদ্ধতার পরিচয় লক্ষণীয়। তরুণ লেখকদের নানা রকম প্রতিবন্ধকতার ভেতর দিয়েই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। শালকু এক্ষেত্রে তাদের জন্য সম্মানের ও নির্ভরতার একটা বড় প্লাটফরম হয়ে উঠতে পেরেছে। আর সেটাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে ‘শালুক ক্রিয়েটিভ’।  

সম্পাদকীয়তে সেই উচ্চারণই শুনতে পাই, “সময়ের বিচারে, বিষয়গত বৈচিত্র্যে এবং শিল্প-নির্মাণের স্বাতন্ত্র্যে সেই গল্পগুলোর অনেকগুলোই আজ আমাদের সাহিত্য-ঐতিহ্যের মূল্যবান দলিল। সেই বিপুল ভাণ্ডার থেকেই সতর্ক পাঠ, পুনর্মূল্যায়ন এবং নন্দনতাত্ত্বিক বিবেচনার ভিত্তিতে নির্বাচিত গল্পসমূহ নিয়ে প্রকাশিত হলো ‘অতিক্রমণ’। নামের মধ্যেই এই সংকলনের দর্শন নিহিত— ‘অতিক্রমণ’ মানে কেবল সময়কে অতিক্রম করা নয়, বরং প্রথাসিদ্ধ প্রচলিত চিন্তার সীমায় বিচরণ কিংবা নন্দনের চেনা স্রোতে অবগাহনের মতো কম্ফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে এসে আত্মতুষ্টির সীসার দেয়াল অতিক্রম করা।” সঙ্কলনে গল্পগুলো বিষয়বৈচিত্র্যে ভিন্নতর। গল্পগুলোর পরীক্ষা-নীরিক্ষা আছে। ভাষার যাদুকরী খেলা আছে। ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ আছে।  “লোকজ চেতনা, নগর নিঃসঙ্গতা, স্মৃতির অন্তঃস্রোত, অস্তিত্বের বিপন্নতা এবং কর্পোরেট পুঁজির শোষণ এবং আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে অন্তর্নিহিত ডিস্টোপিয়ার নান্দনিক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে বহুস্বর” গল্পগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে আছে। গল্পগুলো শুধু গল্প নয়— জীবনের বহু রূপ ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে গল্পগুলোতে শিল্পিতভাবে উঠে এসেছে। প্রায় প্রত্যেকটি গল্পের বিষয় ভিন্ন— বলার ধরন ভিন্ন— চিন্তার বলয় ভিন্ন— সমাজচিত্রকে ধরার কৌশল ভিন্ন— বার্তা দেয়ার কৌশলও আলাদা এবং রচনাশৈলীর ক্ষেত্রে প্রত্যেক লেখকই সচেতন ও সচেষ্ট। কোনো গল্পই দায়সারা গোছের পরিলক্ষিত হয়নি।  গল্প বলার জন্য গল্প বলেননি। প্রত্যেকেই নিজস্ব দায় ও কৌশলে সুনিপুণভাবে জীবন-সমাজ-পুঁজির বিকাশ— মনস্তাত্ত্বিকতা-বোধ-মানবিক সম্পর্কসহ দেশকালের নানাবিষয়কে গল্পে অনুষঙ্গ করে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। সেসব বিবেচনায় নিলে ‘অতিক্রমণ’ বাংলা সাহিত্যে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলো। 

গল্প সঙ্কলন নানা সময়ে নানাভাবে বের হয়েছে। কিন্তু নিজের পত্রিকায় প্রকাশিত গল্পকারদের গল্প নিয়ে এরকম সুবৃহৎ গল্প সঙ্কলন বোধ হয় এদেশে এটিই প্রথম। যেখানে পুঁজির সহজ পন্থা নয়, দায়বোধের কঠিন পথ ‘অতিক্রমণে’র প্রত্যয়ের তেজস্বী আলোর বিচ্ছুরণ ছড়ানো। সম্পাদকের কণ্ঠেও সে কথাই উচ্চারিত হয়েছে,  “গল্পগুলো পাঠককে শুধু গল্পপাঠের আনন্দই দেবে না; বরং তাঁকে নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাবে, নতুন পাঠপদ্ধতির দিকে আহ্বান জানাবে এবং মানুষের জীবন, সমাজ, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আরও গভীরভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করবে। সাহিত্য তখনই তার প্রকৃত সার্থকতা লাভ করে, যখন তা পাঠকের চেতনায় একটি স্থায়ী আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেই আলোড়নেরই বিনম্র আহ্বান আমাদের এই প্রকাশনা।”

ছোটগল্পের অসংখ্য সঙ্কলন আছে— সেসব সঙ্কলনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যও ভিন্নতা আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়বোধ থেকে বাণিজ্যিকীকরণই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ‘অতিক্রমণ’ প্রকাশের বিশেষত্ব কী! প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সম্পাদক নিজেই এর উত্তর দিয়েছেন, “আমরা এমন উদ্যোগ নিয়েছি, এককথায় বলতে গেলে— এগুলো ব্যতিক্রমী ও প্রথাবিরুদ্ধ লিটল ম্যাগাজিন ‘শালুক’-এ প্রকাশিত গল্প; এবং শালুকে প্রকাশিত যে কোনো লেখাই চিন্তার উদ্রেক করে। সুতরাং এদিক বিবেচনায় মনে হয়েছে, এই লেখাগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশের আনন্দই আলাদা। ‘শালুক ক্রিয়েটিভ’ বিশ্বাস করে, ভালো গল্প কখনো কেবল পড়া হয় না, তা মানুষের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে। কখনো প্রশ্ন হয়ে, কখনো স্মৃতি হয়ে, কখনো প্রতিবাদ হয়ে, কখনো আবার অপ্রকাশের বেদনায় ছটফট করে শরবিদ্ধ সারসের মতো। এই সংকলনের প্রতিটি গল্পও যেন সেই দীর্ঘস্থায়ী পাঠ-অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে।” 

বিশ্বসিাহিত্যে ছোটগল্পের শক্ত অবস্থান আছে। আমাদের ছোটগল্প নানাভাবে শক্তিমত্তা ধারণ করে। কিন্তু সেটাকে আরও শক্তিশালী করার জন্য তরুণ গল্পকার তৈরির প্রয়োজন— এই তাগিদ শালুক অনুভব করে, সেই তাগিদকে আরও এক একধাপ এগিয়ে ‘অতিক্রমণ’ করেছে। এই দায় সবাই নিতে পারে না। নেয়ও না। দুচারজন যারা নিতে পারেন, তারা সত্যিকারের সাহিত্যেও দায়বোধের জায়গায় ব্রতগ্রহণকারী সাধক। কবি ওবায়েদ আকাশ ও মাহফুজ আল-হোসেনকে আমি এরকমই সাধক হিসেবে বিচেনা করি। ছোটগল্প কখন কীভাবে জন্মেছে, সময়ের নিরিখে তা যথাযথভাবে বলা বেশ কঠিন। কিন্তু জন্মেছে এবং শক্ত অবস্থানে স্থায়ীভাবে বসতি গ্রহণ করে আছে। বাংলা সাহিত্যেও ছোটগল্পের জন্ম একেবারে অঙ্কের মতো নির্দিষ্ট করে প্রমাণ করা যায় না— ছোটগল্প কে কখন প্রথম লিখেছেন! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের সঙ্গে-সঙ্গে বদলে যেতে পারে প্রচলিত ইতিহাস। এরকম ইতিহাস বিদেশি সাহিত্যে যেমন আছে, বাংলা সাহিত্যেও আছে। সুতরাং সাহিত্যের কোনো আবিষ্কারকেই চূড়ান্ত বলে ঘোষণা দেওয়া যায় না। কালের ধারায় তা বদলায়। বদলাতে পারে। আর সেই বদলানোর কাজটা ‘অতিক্রমণে’র মতো সঙ্কলনগুলো অনেকখানি সহজ করে দেয়।  

ছোটগল্পের জন্ম সুদূর পশ্চিমে— আমেরিকায়। তারা কর্মজীবনে অধিক ব্যস্ত— সময়ের স্বল্পতার কথা বিবেচনা করে ছোটগল্প সৃষ্টি করেছিল। যেন সাহিত্যপাঠে বেশি সময় ব্যয় না হয়। কারণ একটা উপন্যাস পাঠে অধিক সময়ের প্রয়োজন হয়। সেকারণেই তাদের মনে হয়েছে চলতি পথে বা স্বল্পসময়ে সাহিত্যের রস আস্বাদনের জন্য উপন্যাসের পরিবর্তে আরও সংক্ষিপ্ত কিছু সৃষ্টি করা যেতে পারে। যেখানে জীবনের বা কোনো বিষয়ের পূর্ণ রূপ না থাকলেও জীবনের খণ্ডিত নানা কাহিনি স্বতন্ত্ররূপে শিল্পের মর্যাদায় সৃষ্টি হতে পারে— সেখানেও জীবন থাকবে— সমাজ থাকবে— অর্থনীতি থাকবে— রাজনীতি থাকবে। এরকম ভাবনা থেকেই ছোটগল্পের উদ্ভব ঘটে। ‘অতিক্রমণে’ যেসব গল্প ছাপা হয়েছে তাতে জীবন-সমাজ-রাজনীতি-ইতিহাস-মনস্তাত্ত্বিকতা বহুকৌণিকভাবে শিল্পিত আঙ্গিকে উপস্থাপিত হয়েছে। 

উপন্যাসের মতো গল্পেরও কাহিনি, চরিত্র, সংলাপ, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, জীবনদর্শন ও শিল্প অনিবার্য। কিন্তু উপন্যাস যেখানে বৃহৎ অর্থে, গল্প সেখানে সংক্ষিপ্ত অর্থে, এবং অনেক বিধিনিষেধে বন্দি থাকতে হয়। গল্পে লেখকের স্বাধীনতা কম। যেটা উপন্যাসে লেখকের আছে। প্রকরণগত চাহিদা এক হলেও গল্পের পটভূমি থাকে সংক্ষিপ্ত। সেই সংক্ষিপ্ত পরিসরের মধ্যে লেখককে তাঁর অভিপ্রায় প্রকাশ করতে হয়। কাজটি নিঃসন্দেহে কঠিন। এই কারণে লেখককে তার কাহিনি এমনভাবে বুনতে হয়; চরিত্র নির্বাচন এমনভাবে করতে হয় এবং পরিবেশ অঙ্কন ও ভাষা প্রয়োগ এমন হতে হয়, যেন পাঠক কোনোক্রমেই ক্লান্তিবোধ না করে। পাঠকের ক্লান্তি তৈরি হলেই ছোটগল্পের আবেদনের ব্যত্যয় ঘটে। উপন্যাসের যে কাহিনি সেটাও গল্প। কিন্তু সেই বিশাল গল্পের প্লট গল্পে নেই। ছোটগল্পের গল্প বা ঘটনা থাকবে ক্ষুদ্র। সেই ক্ষুদ্র পরিসরে গল্পকার যে চরিত্র নির্বাচন করবেন সেখানে দুই-একটি বা দু-চারটি বেশি চরিত্র কখনোই থাকবে না। দু-চারটি চরিত্র থাকলেও একটি দুটি চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব ও পদচারণায় পুরো গল্পের অভিপ্রায়টুকু ফুটে উঠবে। প্রলম্বিত ঘটনা কখনোই ছোটগল্পে থাকবে না। গল্পে গাঁথুনি বা বুনন এমন থাকবে যেন, সবটা মিলে একটা কেন্দ্রীভূত আবেশ অর্থাৎ চৌম্বকাবেশ পরিলক্ষিত হয়। গল্পের ভাষা ও সংলাপ রচনায় গল্পকারকে বিশেষ কলাকৌশলের আশ্রয় নিতে হয়। বাক্যসৃজন কৌশলে লেখককে গল্পের ভাষা নির্মাণে সতর্ক থাকতে হয়, অতিকথনের এখানে কোনো সুযোগ নেই। ‘অতিক্রমণে’র গল্পকারগণের অনেকেই এক্ষেত্রে ভীষণ সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন। ভালো রকমের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। অনেক তরুণ লেখকের গল্প বিস্ময়করভাবে আকৃষ্ট করার ক্ষমতা রাখে। এবং রীতিমতো ভাবায়। তাদের গল্পের ভেতর দক্ষতার যে ছাপ পরিলক্ষিত হয়েছে, তাতে বাংলা ছোটগল্পের আরও বহুদূর অগ্রসরমানতার শক্তি প্রোথিত।  

অধিকাংশ গল্পে চরিত্রের ছড়াছড়ি নেই। দু-একটি বা দুচারটি চরিত্রের মাধ্যমে গল্পকার জীবনের সেই বিশেষ মূহূর্তের রসঘন পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন। এসব আলোকপাত করতে গল্পকার চরিত্রাঙ্কন, বিষয়াবিন্যাস, পরিবেশ নির্মাণ, চরিত্র ও বিষয়ানুগ ভাষা সৃজন করেছেন। সব মিলে অতিক্রমণের অধিকাংশ গল্পকার তাদের গল্প সৃজনে বিশেষ কলাকৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন যা অভিভূত করে। কলাকৌশলগত দিকে গল্পের রস ও বিষয়বস্তুগত বৈচিত্র্য আনয়ন করার ক্ষমতা তাদের গল্পে পরিলক্ষিত হয়। বিষয়বস্তুগতভাবে নানা বিষয়ের গল্প এখানে যুক্ত হয়েছে। জীবনের উপরিতলে যে তরঙ্গ নিত্যদিন খেলা করে, জীবনের ভূপৃষ্ঠে যে আলোকোচ্ছটা স্বাভাবিকভাবে বিকিরিত হয়— সেই বিকিরণের ক্ষণিক আলোকিত মূহূর্তের অতিক্রমণের অনেক গল্পেই লক্ষণীয়।

গ্রামীণ জীবনে ক্ষুধার্ত অসহায় মানুষের স্বপ্নভঙ্গের আর্তি, দুঃখের কলরোল ও আহাজারি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার, পুঁজিবিকাশের অস্বাভাবিকতা এখানকার অনৈক গল্পেই উপজীব্য হয়েছে। নারী পুরুষের যুগপৎ সংগ্রাম, প্রেম, অন্তর্দাহ, দাম্পত্য কলহ, পরকীয়া, অভাব-অনটন, মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা, হতাশা-হাহাকারও অনেক গল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এসেছে। 

অতিক্রমণে মোট ৬৬টা গল্প প্রকাশিত হয়েছে। কলেবর সুবৃহৎ। গল্প ও গল্পকাররা হলেন— ‘দেহাবশেষ’  জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, ‘কার্তিকের হিমে, জ্যোৎস্নায়’ শহীদুল জহির, ‘সম্ভব অসম্ভবে পারাপার’ পূরবী বসু, ‘ত্রিমাত্রিক যুগল’ মোহিত কামাল,‘শরীরী অশরীরী’, সাদ কামালী, ‘মরণোত্তর মৃত্যুদিবস ও নৌকাকাণ্ড’ মামুন হুসাইন, ‘বাসনার মতো শূন্যতায়’ ইমতিয়ার শামীম, ‘রূপান্তরের অকথিত গল্পটা’ আনিসুজ জামান,‘ঘাসফড়িং’ কামাল রাহমান, ‘নীল মর্গের কোরাস’ মুজতবা আহমেদ মুরশেদ, ‘পথহীন পথে’ শাহ্্নাজ মুন্নী,‘অন্য লোকালয়’ জাকির তালুকদার, ‘খরগোশ কিংবা কুকুর সমাচার’ কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, ‘সাঁকো’ মহিবুল আলম, ‘বৃদ্ধ প্রেম’ হাইকেল হাশমী, ‘যাপনের দোলাচল’ পিন্টু ভৌমিক, ‘ডেকেছিল ঘোলাটে চাঁদ’ হাসান অরিন্দম, ‘সুগন্ধ ফুটেছিল’ রবিউল করিম, ‘কদমের হোর্সপাইপ ও আচ্ছালাম...’ রুহুল আমিন বাচ্চু, ‘মানবতা রিলোডেড’ খোকন কায়সার, ‘ছাঁটাই’ মনজুর শামস, ‘হৃদয়ের ভাবসম্প্রসারণ’ আনিস রহমান, ‘আন্তঃঅভ্যন্তরীণ রোদ জল’ আহমেদুর রশীদ, ‘ক্যাডেট কামরান ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকে’ ইকরাম কবীর, ‘প্যারানয়া’ মহসীন হাবিব, ‘রঙমালার বাপ’ আহমেদ ফরিদ,‘অস্তমিত পাহাড়ের বাঁকে’ কাজী রাফি, ‘যদি হারিয়ে যাই, দেখা হবে এখানেই’ আবদুল ওয়াহাব, ‘ট্যারা মিয়ার অলিম্পিক দর্শন’ মিলটন রহমান, ‘শরীয়ত-মারেফত’ রাখাল রাহা, ‘সুতরাং মায়াময় একপ্রস্থ অন্ধকারে নক্ষত্রের আত্মগোপনকারী আলোর উল্লাস’ আবু হেনা মোস্তফা এনাম, ‘উপেন সরকার ও তার তিন কন্যা’ মাহবুব মোর্শেদ, ‘প্যাঁচানো’ নাহার মনিকা, ‘আখেরী বিদায় স্টোর’ জেসমিন মুন্নী, ‘খোয়াজ খিজিরের হাত’ মঈনুল হাসান, ‘আমড়ার বোল’ শিপা সুলতানা, ‘ফৌজিয়া ও কয়েকটি লবণের গাছ’ দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু, ‘পরজীবীর সঙ্গে বসবাস’ লাবণ্য প্রভা, ‘বিকেল’ সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম, ‘পরম করুণাময়, অসীম দয়াল’ আহসান ইকবাল, ‘ব্যুরোক্র্যাট’, অনন্ত মাহফুজ, ‘স্মৃতি ফিরে পাওয়া টেকনোলজির একটি সুইচ’ মির্জা তাহের জামিল, ‘সে রাতে জালালউদ্দিনের সাথে অন্ধকার ছিল’ শাশ্বত নিপ্পন, ‘মা ও ছেলের হিসাববিজ্ঞান’ কাজী মোহাম্মদ আলমগীর, ‘দুঃখের কথাগুলি ব্যথার পাহাড় হয়ে আছে’ তমাল রায়, ‘লাইট-ন্যায়ের আলো প্রেজেন্ট জীবনের গল্প’ মোজাফ্ফর হোসেন, ‘নিথুয়া মংমা’ স্বকৃত নোমান,‘ঝড়’ সাঈদ আজাদ, ‘মানচিত্রের কান্নার রং’ সনোজ কুণ্ডু, ‘দহন’ নাহিদা নাহিদ, ‘ঘোর’ ম্যারিনা নাসরীন, ‘বীজপুরুষ’ ইশরাত তানিয়া, ‘তিনটি গল্প: বিশ্বাস, নীল কষ্ট, ভরা পূর্ণিমা’ নাহিদ পারভেজ, ‘সামছুর চোখে জ্বলে বাজারের দীপশিখা’ জয়নাল আবেদীন শিবু, ‘ছুরির ওপাশে সভ্যতা’ সুমন শাম্স, ‘নতুন কোনো গল্প নেই’ জয়দীপ দে,‘আপদ’ সাগরিকা নাসরীন, ‘চৌকি’ সুমী সিকান্দার, ‘একটা মলিন ২০ টাকার নোট’ খালেদ চৌধুরী, ‘স্বপনদুয়ার’ পলি শাহীনা, ‘বিকেলের বিধুর রং’ পিওনা আফরোজ, ‘খালুইভর্তি হাহাকার’ রনি রেজা, ‘দুপুরচন্দ্র, অন্ধ ফকির ও ঝড়ি বিবির কেচ্ছা’ মিলন আশরাফ,‘বারবিকিউ’ মূর্তালা রামাত,‘যক্ষের ধন’ বুলু রানী ঘোষ ও ‘পাতা ঝরার দিন’ ফারহানা সিনথিয়া।

বাংলা ছোটগল্পকে বিষয়-বৈচিত্র্যে-জীবনবোধে-রচনাশৈলীতে আরও এগিয়ে নিতে অতিক্রমণ গল্প সংকলনটি কতটা ভূমিকা রাখবে সেটা সময়ান্তরে বোঝা যাবে। তবে তারা যে এ পথটিকে এগিয়ে নিতেই দৃঢ় শিল্প-প্রতীজ্ঞ তা সহজেই অনুমিত। অতিক্রমণের কোনো কোনো তরুণ লেখক যে আগামী দিনের বড় গল্পকার হয়ে উঠতে পারেন, সেই আভাসটি খুব ভালো করেই এখানে আছে, যা আগামীতে আলোকিত এক গল্পরাজ্যের জন্ম দিবে— এ প্রত্যাশা শক্তভাবে করা যায়। আর, কিছু লেখক তো এখানে আছেন যারা তাদের গল্পে ইতোমধ্যে সুনাম-সুপরিচিতি-খ্যাতি অর্জন করেছেন। সব মিলিয়েই ‘অতিক্রমণ’ অসামান্য একটি গল্প-সাহিত্যকর্ম হয়ে উঠতে পেরেছে বলে বিবেচিত হওয়ার শক্তি রাখে। 

অতিক্রমণ (শালুক-এর নির্বাচিত গল্প সঙ্কলন)। সম্পাদক: ওবায়েদ আকাশ ও মাহফুজ আল হোসেন ॥ প্রকাশক: শালুক ক্রিয়েটিভ, ঢাকা। প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৬। প্রচ্ছদ: সঞ্জয় দে রিপন। পৃষ্ঠা: ৫১২। মূল্য: ৮০০ টাকা।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত