সংবাদ

ছোটগল্প

নির্বাক সাক্ষ্য


মিলন কিবরিয়া
মিলন কিবরিয়া
প্রকাশ: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৪ এএম

নির্বাক সাক্ষ্য


দ্বিতীয় ঘাইটা এসে লাগলো পাঁজরে, বাম দিক ঘেঁষে আর তখনই আসহাব হাবিবের মাথাটা বাম দিকে কাত হয়ে গেল, বিস্ফারিত গোল গোল চোখে দেখতে পেল রাস্তার পাশের দোতলার ব্যালকনিতে এক অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। আসহাব হাবিব যাকে সবাই নামের দুই শব্দের আদ্যাক্ষর দিয়ে আহা নামে ডাকে এতক্ষণ খুব দ্রুতবেগে দৌড়াচ্ছিল। মেয়েটির সৌন্দর্যের মুগ্ধতা এবং ছুরির ঘাই দুই মিলে আহা-র গতি শ্লথ হয়ে এলো। ধীরে ধীরে এক পা দুই পা এগিয়ে যেতে যেতে কাত হয়ে পড়ে যেতে লাগলো। ততক্ষণে আহা-র সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড়ে আসছিলো যে মানুষটি ছুরিসহ তার হাত পাঁজরের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে দৌড়টা জারি রাখলো। ছুরি ধরা ডান হাত মাথার ওপর নাচাতে নাচাতে এক গলি থেকে আরেক গলি পার হয়ে হারিয়ে গেল। রাস্তায় দাঁড়িয়ে, ঠিক সেই মুহূর্তে থেমে যাওয়া রিক্সায় বসে, দোতলা তিনতলার রেলিং-এ দাঁড়িয়ে অনেকেই সেই নৃত্যরত হাতটি এবং ছুরির চকচকে ফলাটির দিকে তাকিয়ে ছিল। পরে নিজেরা যখন ফিসফিস করে আলাপ করছিল তখন তারা ঘাতকের চেহারার বিষয়ে একমত হতে পারেনি। ক্লিন শেভ করা, গোঁফ আছে, দাড়ি আছে এমন সব পরস্পরবিরোধী কথা চালাচালি হচ্ছিল। ছুরিটি এরপর কার দিকে ধেয়ে আসে এমন আতংক তাদের এমনভাবে হতবিহ্বল করে দেয় যে চেহারার দিকে তাকানোর কোনো ফুরসত হয়নি, কেবল ছুরিটিকে অনুসরণ করেছে।

মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর আহা সিনেমার ফ্রেমের ফেড আউট হয়ে যাওয়া দৃশ্যের মতো মেয়েটিকে ঝাপসা থেকে আরো ঝাপসা হয়ে যেতে দেখল। ছোট ছোট সাদা ফুলতোলা হলুদ রঙের জামা, একই রঙের জর্জেটের ওড়না, দুইপাশে কাঁধ পর্যন্ত চুল এই পর্যন্ত স্পষ্ট মনে আছে, এরপর ঝাপসা হয়ে যাওয়া দৃশ্যে ডান হাতটা ওড়না নিয়ে মুখের উপর চেপে ধরে নিমিষেই হারিয়ে গেল, হয়তো ঘরের ভিতর ঢুকে পড়েছে অথবা আহার দেখা ফুরিয়ে গেছে কিংবা দুইই।

ঘটনাটা ঘটে রাত সাড়ে আটটার সময় ৮৯ নম্বর রোডের মসজিদের গেট থেকে একটু দূরে। মসজিদের দারোয়ান যে জুতা পাহারা দেওয়ার কারণে কখনো জামাতে নামাজ পড়তে পারে না, সে এক দৌড়ে মসজিদের ভিতরে ঢুকে গেল আর সাথে সাথে নামাজ শেষে বের হতে যাওয়া মুসল্লিরাও হুড়মুড় করে দারোয়ানকে অনুসরণ করলো। একটু আগের সরব বা আধা-সরব গলিটি হঠাৎ করেই অদ্ভুত পিনপতন নিস্তব্ধতায় নিমজ্জিত হলো। আহা সেই ব্যালকনির দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থায় একবারেই কোনো নড়াচড়া ছাড়া নিথরভাবে পড়ে রইল, চোখ দুইটা আগের মতোই বিস্ফারিত গোল গোল। আধা ঘণ্টা আহা একইভাবে পড়ে রইল। এই আধা ঘণ্টায় মসজিদের ভিতর থেকে কেউ কেউ উঁকিঝুঁকি মেরে আহাকে দেখার চেষ্টা করলো, দেখতে পায় কি পায় নাই আবার ঢুকে গেল ভিতরে। রহমান সাহেব তার ক্রন্দনরত স্ত্রীকে শক্ত করে ধরে বারান্দা থেকে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেলেন। সন্তানদের ঘরের ভিতরে নিয়ে গেল কেউ কেউ। স্ত্রীদের অনেকে কৌতূহলী ও আপাত সাহসী স্বামীদের জোর করে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেল। পথচারীরা খুব ধীর অথচ দ্রুত পায়ে দূরে সরে যেতে লাগলো। ঘটনার একেবারে শুরুতেই যারা ভয়ে ও আতংকে দৌড় দিয়েছিল তার দুই-এক গলি পার হয়ে টং দোকান পেয়ে টুলে বসে চায়ের অর্ডার দিল। তাদের কেউ কেউ একেবারেই চুপ হয়ে গেল আবার কেউ কেউ আশেপাশের লোকজনদের কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া রোমহর্ষক ঘটনার বিবরণ রহস্যময় ভঙ্গিতে বর্ণনা করতে শুরু করলো। সকলেই তারা প্রত্যক্ষদর্শী হলেও তাদের বর্ণনার মধ্যে কিছু কিছু ভিন্নতা ছিল। পরের দিন সকালে প্রত্যক্ষদর্শীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেল এবং সেই সাথে একই ঘটনার বিবরণে অনেক খুঁটিনাটি বিষয় যুক্ত হয়ে ভিন্নতাও আরো বৃদ্ধি পেল।

রাত ৯টার দিকে দেখা গেল ৮৯ নম্বর রোডের পূর্ব দিক থেকে দু’এক জন, পশ্চিম দিক থেকে দু’একজন, মসজিদের ভিতর থেকে দু’একজন আহা-র নিথর দেহের দিকে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসছে। আশেপাশের বাসা থেকে একজনও এলো না কেবল সফিকুদ্দিন ছাড়া। সফিকুদ্দিন ৩৮ নম্বর বাসার তিনতলার চিলেকোঠায় একা থাকে, সেই বাসায় কেয়ারটেকারের কাজ করে। এই কয়জন আহা-র কাছাকাছি আসতে আসতে আশেপাশের বাসার জানালার পর্দা সরিয়ে কৌতূহলী মানুষেরা এরপর কী ঘটতে চলেছে তা দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে পলকহীন তাকিয়ে রইল। সেইসময় পূর্বদিকের রাস্তার মোড় থেকে যেন আকাশ ফুঁড়ে একটা রিক্সা বেল বাজাতে বাজাতে আহা-র পাশে এসে থামলো। রিক্সাচালক ও আরও দুইজন মিলে আহা-কে ধারাধরি করে রিক্সার উপরে তুললো। এই দুইজনের একজন সফিকুদ্দিন আরেকজন মুসল্লি। তখনো এই আধা ঘণ্টা পরেও আহা-র পাঁজরের ক্ষত দিয়ে রক্ত পড়ছে। সেই রক্তে সফিকুদ্দিন ও মুসল্লির হাত ভিজে তাদের জামা-কাপড়েও রক্ত লেগে যেতে লাগলো। একটু আগে আহা যেখানে শুয়ে ছিল সেখানে জমাট বাঁধা রক্তের ভিতরে কয়েক জোড়া স্যান্ডেলের ছাপ আর মাঝখানে কাত হয়ে থাকা মানুষ আকৃতির আপাত শুকনা জায়গা।

রিক্সা সবচেয়ে কাছের একটা ক্লিনিকে পৌঁছার পর গেট থেকেই দারোয়ান ‘এইখানে কোনো ইমার্জেন্সি চিকিৎসা হয় না’ বলে বিদায় করে দিল। আপনজন হিসাবে বলছে এই ভঙ্গীতে আহা-কে সরকারী হাসপাতালে নেয়ার জন্য পরামর্শ দিল। আহা-কে নিয়ে রিক্সা ৩ কিলোমিটার দূরের সরকারি হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তার আহা-কে পরীক্ষা করে জানালো অনেক আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। মৃত ঘোষণার পরপরই হাসপাতালের কর্মচারীরা আহা-কে স্ট্রেচার থেকে নামিয়ে মাটিতে শুইয়ে একটা চাদর দিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে দিল। সফিকুদ্দিনের জানা ছিল না বা আগে কখনো খেয়াল করে নাই হাসপাতালেও পুলিশ থাকে। পুলিশ এসে সফিকুদ্দিনকে জেরা শুরু করলো এবং তখন সফিকুদ্দিন খেয়াল করলো সেই মুসুল্লি ও রিক্সাচালক আশেপাশে নাই। তারা ততক্ষণে যার যার গন্থব্যে রওনা হয়ে গেছে বা সটকে পড়েছে। সফিকুদ্দিন আহা-কে চেনে না কোনোদিন দেখেও নাই। কিন্তু পুলিশ ঠিকই আহা-কে চিনতে পারলো, সন্ত্রাসী হিসাবে আহা-র নাম পুলিশের খাতায় ছিল। পাশেরই কলিমপুর বস্তিতে সে তার মা আর বোনকে নিয়ে থাকে। তবে আহা বেশিরভাগ সময়েই বাইরে বাইরে কাটায়, বাসা যে নিরাপদ না তা সে বিলক্ষণ জানে। পুলিশ আহা-র প্যান্টের পকেট থেকে সুইস নাইফ ও একটা ব্যবহৃত গুলির খোসা আর খালি মানিব্যাগ উদ্ধার করলো। সফিকুদ্দিনের ডুপ্লিকেট এনআইডি দেখে পুলিশ তার নাম ঠিকানা একটা ডায়েরিতে টুকে নিল আবার হাসপাতালের ফাইলেও লিপিবদ্ধ করলো। পুলিশ আহা-র লাশ পোস্টমর্টেমে পাঠানোর প্রস্তুতি নিতে লাগলো। আহা হত্যা মামলায় সফিকুদ্দিনকে দরকার হবে জানিয়ে তাকে বিদায় দিল।

সেইদিনই লেট নাইট নিউজে আহা-র মৃত্যু সংবাদ পাঠ করা হলো, পরের দিন পত্র-পত্রিকার পাতায় নিউজ হলো। কলিমপুর বস্তির ত্রাস সন্ত্রাসী আহা প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছে চাঁদাবাজি সংক্রান্ত বিরোধে। আহা নামটি কোত্থেকে এসেছে জানা গেল এবং অনেকেই আহা নামটিকে ছদ্মনাম হিসাবে সাব্যস্ত করলো।

দুপুর রাত পার করে সফিকুদ্দিন বাসায় ফিরে দেখে চাবি হাতে বাড়িওয়ালা আক্তারুজ্জামান সাহেব নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। সফিকুদ্দিন গেট দিয়ে ভিতরে ঢোকার পর কোনো কথা না বলে আক্তারুজ্জামান তার হাতে চাবি দিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে চলে গেলেন। ঘটনার দুই দিন পরে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারে জুমার নামাজের আগে আক্তারুজ্জামানের ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের পরিবারের কর্তাব্যক্তিরা একটা মিটিং-এ বসলেন। আহা-র ঘটনার সংক্ষিপ্ত আলাপ শেষে আক্তারুজ্জামান মিটিংয়ের উদ্দেশ্য সবাইকে জানালেন। প্রথমেই সবাই সম্মত হলো যে আহা-র ঘটনাটি এই দালানে বসবাসরত কেউই দেখেনি। আসলেও কেউ দেখেছে কিনা সেই আলাপ বাহুল্য বিবেচনায় উত্থাপিতই হলো না। একমাত্র সফিকুদ্দিন এমন কাণ্ড করেছে যে তার পক্ষে না দেখার কোনো সন্দেহ প্রকাশেরও সুযোগ নেই। আবার সে যখনই সুযোগ পাচ্ছে পাড়ার নানাজনকে গল্প করে বেড়াচ্ছে। এই সূত্র ধরে নানা বিড়ম্বনা ও বিপদ আসতে পারে। পুলিশ তো আসবেই সন্দেহ নাই, সফিকুদ্দিনের সাথে সাথে অন্য পরিবারগুলোর ছিমছাম নিরিবিলি জীবন বিঘ্নিত হবে তাতেও সন্দেহ নাই। এমনও হতে পারে আহা-র দলের বা বিপক্ষ দলের লোকজন এসে সফিকুদ্দিনকে হুমকি ধামকি দিতে পারে এমনকি মেরেও ফেলতে পারে। সেই বিবেচনায় এই বিল্ডিংয়ের লোকজনও ঝুঁকিতে পড়েছে। সফিকুদ্দিনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব বাড়িওয়ালা হিসাবে আক্তারুজ্জামানই নিলেন। পরের দিন সকাল ১১টার দিকে আক্তারুজ্জামান সফিকুদ্দিনকে ডেকে পাঠালেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির ঊর্ধ্বগতির কারণ দেখিয়ে ব্যয় সংকোচনের উপায় হিসাবে আপাতত সফিকুদ্দিনকে এই মাসের পুরো বেতন নিয়ে বাড়িতে যেতে বললেন। সময় হলে তিনি আবার সফিকুদ্দিনকে ডেকে পাঠাবেন। কোনো উচ্চবাচ্য না করে সফিকুদ্দিন টাকাগুলো নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে ভাবলো গত সপ্তাহে তার ইনিয়েবিনিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির উচ্চমূল্যের দোহাই দেখিয়ে বেতন বাড়ার আর্জি না জানালেই ভালো ছিল। সে কি বেশি বেতনের লোভ করেছিল তাই কি এমন পরিণতি হলো! কিন্তু জিনিস-পত্রের দাম তো আসলেই বাড়তি!

রকিবুল হক ও জিনিয়া বেগম দম্পতি থাকেন ৩৩ নম্বর বাসায়। সেই দিন রাতে একমাত্র সন্তান রাজীবসহ  তিনজনই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ঘটনার শেষাংশটুকু দেখেছেন। রাজীব মেধাবী ছাত্র রটরডেম কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ছে কিন্তু সরল। মেধাবীরা অনেক সময় বোকা হয়, বিখ্যাত মানুষদের এই ধরনের কাহিনি পত্রিকায় ছাপা হয়, আড্ডার গালগল্প হয়। রাজীব মিথ্যা বলতে পারে না, পারে না মানে চেষ্টা করে দেখেছে ধরা পড়ে যায়। একটু জেরা করলেই সব গুলিয়ে ফেলে আর হড়হড় করে সব সত্য কথা বলে দিতে থাকে। আজ কাল বা পরশু নিশ্চয়ই পুলিশ আসবে, কী জানি তাদের বাসায়ও আসতে পারে। রাজীব তখন কী ঝামেলা পাকিয়ে বসে ঠিক নাই! নির্ঘাত তাকে সাক্ষী বানাবে, জীবনটা ত্যানা ত্যানা হয়ে যাবে, রাজীবের তো বটেই সেই সাথে পুরো পরিবারের। পরদিন সকালে তারা রাজীবকে লক্ষীপুরে ফুফুর বাসায় বেড়াতে যাওয়ার বন্দোবস্ত করে ফেললেন। দুই মাস পরে টেস্ট পরীক্ষা আর কোচিং-এর কথা মাথায় টোকা মারলেও রাজীব চুপ করে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করলো, বেড়ানোটা পণ্ড করার কোনো ইচ্ছা তার ছিল না বরং অনেকদিন ধরেই ফুপু বা মামার বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছার কোনো সুরাহা হচ্ছিল না।

মসজিদের সামনের কোনার বাড়িটায় থাকেন মজিদ-রমিজা দম্পতি আর তাদের দুই ছেলে। বড় সোহান পড়ে ক্লাস এইটে আর ছোট জোহান ক্লাস ফাইভে। তারা দুজনেই কর্মজীবী, সকালে চারজনই বের হয়ে যান চাবিটা পাশের ফ্ল্যাটের জিম্মায় রেখে। দুই ভাই স্কুল থেকে ফিরে চাবি নিয়ে নিজেদের ঘরে যায় তারপর নিজেরাই নিজেদের মতো থাকে। ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে ওভেনে গরম করে খাওয়া ভালোই রপ্ত করেছে, কথায় আছে— গরজ বড় বালাই। ঘটনার দিন রমিজা তার স্বামী সন্তানদের বীভৎস দৃশ্য দেখা থেকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে জোর করে বারান্দা থেকে ঘরে টেনে নিতে নিতে যা দেখার তা তারা দেখে ফেলেছিল। মজিদ ও রমিজা জানেন তারা দুজন সেইদিন কিছুই দেখেননি, সত্যি বলতে কি সেই দিন তারা বারান্দায়ই যাননি। সোহান ও জোহান ছোট তাদের পক্ষে এই ঘটনার বিপজ্জনক দিকটি বোঝার কথা নয়। শুক্রবারে সারাদিন চারজনই বাসায় থাকে, তাই সেইদিনটিতে সকালে নাস্তার পর টেবিলে কথা শুরু করলেন। তারা সোহান ও জোহানকে বিপদের ভয়াবহতা বোঝাতে সক্ষম হলেন। শিশুদের কাবু করার জন্য ভয় দেখানোর কায়দাকানুন মা-বাবারা করে থাকেন। সেইজন্যই দৈত্য দানো, সেই জন্যই ডাইনি বুড়ি, সেইজন্যই বাঘ ভালুক, সেই জন্যই ছেলেধরা। মজিদ ও রমিজা ছেলেদের পুলিশে ধরে নিয়ে যাবে এমন ভয় দেখালেন আর কে না জানে বাঘে ছুঁলে আঠার ঘা ও পুলিশে ধরলে ছত্রিশ। আমসি মুখে সোহান ও জোহান স্বীকার করলো তারাও সেইদিন কিছুই দেখেনি যেমনটি দেখেনি তাদের মা-বাবা।

সেইরাতে আহা মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরপরই শাপলা ব্যালকনি থেকে ঘরের ভিতর ঢুকে ধপাস করে বসার ঘরের সিঙ্গেল সোফার ওপর পড়ে গেল যেন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই নিজের ওপর। শাপলাকে আমরা আগেই দেখেছি বস্তুত শুরুতেই দেখেছি। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছোট সাদা ফুলতোলা হলুদ রঙের জামা ও  একই রঙের জর্জেটের ওড়না গায়ে জড়িয়ে থাকা মেয়েটি শাপলা, বাঁচার প্রবল আকুতি নিয়ে জীবনের শেষ সময়ে আহা যার দিকে বিস্ফারিত নয়নে নির্নিমেষ তাকিয়ে ছিল। পাশের সোফায় বসে টেলিভিশনে সিরিয়াল দেখছিলেন শাপলার মা-বাবা। উভয়েই তারা সাংসারিক কূটকাচালিপূর্ণ সিরিয়ালের এমন ভক্ত যে বাহিরের হইচই বা আহা-র মৃত্যু তাদের মনযোগে বিঘ্ন ঘটাতে পারে নাই। কিন্তু মেয়ের এহেন অবস্থায় উভয়েই পর্দায় সাসপেন্সভরা মুহূর্ত ছেড়ে মেয়ের পাশে এসে তাকে ধরলেন। ঘুমের মধ্যে বোবায় ধরলে যেমন মুখ দিয়ে গো গো আওয়াজ বের হয় শাপলার মুখের ওপর চেপে ধরা ওড়নার পাশ দিয়ে এমন আওয়াজ বের হচ্ছে আর অন্য হাতটি ঘরের বাহিরে ব্যালকনির দিকে নির্দেশ করে আছে। মা পাশে বসে শাপলাকে বুকে জড়িয়ে ধরে জানতে চাইলেন ‘কী হইসে কী হইসে, আম্মু’। বাবা ‘কী হইসে’ দেখার জন্য ব্যালকনিতে গিয়ে খুব দ্রুতই ফিরে এলেন। তিনি দেখতে পেয়েছেন— কী হইসে!

সেই রাতটা শাপলাদের বাসায় খুব খারাপই গেল। বাবা কিছুটা ঘুমাতে পারলেও মা প্রায় নির্ঘুম রাত কাটালেন শাপলার  মতোই তার পাশে শুয়ে বসে। শাপলার মতো হাসিখুশি উচ্ছল একটা মেয়ে পাঁচ কি দশ মিনিটের ব্যবধানে পুরোপুরি পাল্টে গেল। হাসি উধাও হয়ে চেহারায় কেমন যেন ক্লান্তি ও আতংক ভর করেছে, চোখ দুইটা ছোট হয়ে গর্তের ভিতর ঢুকে গেছে আর চোখের নিচে কালি। সারারাত শাপলা আধো ঘুম আর আধো জাগরণের মধ্যে দিয়ে কাটালো। ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে শাপলা হঠাৎ একটা কাঁপুনি দিয়ে চোখ মেলে তাকায়, মেয়ের গায়ের ওপর হাত থাকায় শাপলার মা এই কাঁপুনি টের পান, তিনিও চোখ মেলে মেয়ের দিকে তাকান। শাপলার চোখ দুইটা মরা মাছের মতো ঘোলা দেখায় আর দৃষ্টিতে নিঃসীম শূন্যতা। পর্যায়ক্রমিক ঘুম ও জাগরণ এবং ঘোলা চোখ ও শূন্য দৃষ্টির ভিতর দিয়ে শাপলা ও তার মা রাত পার করলো। সকালে নাস্তার টেবিলে শাপলা অনেকক্ষণ সময় নিয়ে অর্ধেক রুটি ও আলু ভাজি গলা দিয়ে পার করার পর হঠাৎ করেই উঠে দ্রুত বেগে বেসিনের কাছে গিয়ে হড়হড় করে বমি করে যা খেয়েছে সব বের করে দিল। শাপলার মা মেয়ের যত্ন নিলেন, তাকে ঠিকঠাক করে বিছানায় শুইয়ে দিলেন। নিজের ওষুধের বাক্স থেকে একটা ঘুমের বড়ি মেয়েকে খাইয়ে দিলেন। ঘুমের ওষুধ কাজ করলো, শাপলা সন্ধ্যা পর্যন্ত মরার মতো ঘুমালো।

মাগরিবের নামাজ শেষে মেয়ে ও পরিবারের কল্যাণ কামনায় দীর্ঘ মুনাজাতের প্রস্তুতিকালে শাপলার মা তীব্র কণ্ঠে মেয়ের চিৎকার শুনতে পেয়ে তড়িঘড়ি করে বিছানার কাছে ছুটে গেলেন। শাপলা অনবরত ‘ওই যে ওই যে ছুরি ছুরি’ এই কয়টি কথা বলে চলেছে। দৃষ্টি তার সোজা সামনের দিকে আর দেহের ভঙ্গীটা এমন যে অদৃশ্য কোনো ঘাতক উদ্যত ছুরির ফলা হাতে তার দিকেই ধেয়ে আসছে। শাপলার মা নানা কথায় নানাভাবে মেয়েকে শান্ত করার চেষ্টা করতে থাকলেন। এই চেষ্টার ফলেই হোক বা নিজে থেকেই ক্লান্ত হয়ে হোক শাপলা একসময় থামলো। সারা রাত শাপলা এমন কাণ্ড আরো ৩ বার ঘটালো। শাপলার দুই পাশে শুয়ে বাবা আর মা পরস্পরের হাত ধরে থাকলেন, একটা নির্ভরতা একটু স্বস্তি বড়ই প্রয়োজন।

সকালে শাপলার বাবা তার ডাক্তার বন্ধুকে ফোন দিলেন। সব শুনে তিনি শাপলাকে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানোর পরামর্শ দিলেন, পরিচিত একজন সাইকিয়াট্রিস্টের অ্যাপয়েন্টমেন্টও নিয়ে দিলেন। এই সিদ্ধান্তে শাপলার মা হুহু করে কাঁদতে কাঁদতে শাপলার বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমার মেয়ে কি পাগল হয়ে গেল। শাপলার বাবা বুঝতে পারলেন না এটা কি কোনো জিজ্ঞাসা না স্বগতোক্তি। তিনি অনেক কষ্টে কান্না চেপে রাখার পরও দুই ফোঁটা জল চোখের কোনা দিয়ে বের হয়ে এলো।

অধ্যাপক এস এম সাদ দেশের নামকরা সাইকিয়াট্রিস্ট, বিশাল চেম্বার। ওয়েটিং রুমেই বসে আছে গোটা কুড়ি রোগী ও রোগীর স্বজন। খুব অনিচ্ছায় বা ভয়ে পা ঘষটে ঘষটে শাপলা এগোয় কি এগোয় না এমন ভঙ্গিতে একপাশে বাবা আর আরেক পাশে মাকে নিয়ে চেম্বারে প্রবেশ করলো। সামনের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আচমকা শাপলা তীব্র কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলো, ‘ওই যে ওই যে ছুরি ছুরি’! সেই একই দৃষ্টি সেই একই ভঙ্গী এবং একই কথা। সিনেমার রিওয়াইন্ড করা দৃশ্যের মতো বারবার। অধ্যাপক সাদের অফিস স্টাফরা ছুটে এলো শাপলার দিকে। অপেক্ষমাণ রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। এই চেম্বারে তারা হয়তো এমন রোগী আগেও পেয়েছে।

রহমান সাহেব পরদিনই বাড়িওয়ালাকে আগামী মাসে বাড়ি ছাড়ার কথা জানিয়ে শহরের কোনো শান্ত ভদ্র পাড়ায় ভাড়া বাসা খুঁজতে নেমে গেলেন। পত্রিকার বাড়ি ভাড়া, ল্যাম্পপোস্ট ও দেয়ালে সাঁটানো ‘বাড়ি ভাড়া হইবে’ পড়া এবং  রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বিভিন্ন বাসার গেটে টু-লেট লেখা সাইনবোর্ড খোঁজা তার প্রতিদিনের রুটিন কাজে পরিণত হলো, সকালে বের হন, দুপুরে বাসায় ফিরে খেয়ে একটু রেস্ট নিয়ে পত্রিকার বাড়ি ভাড়া বিজ্ঞাপনগুলো বাছাই করে আবার বের হন, সন্ধ্যায় ফিরেন। আগেও পড়তেন কিন্তু এখন পত্রিকা পড়তে গিয়ে অপরাধের খবরগুলোই বেশি চোখে পড়ে, তিনি পড়েনও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। খুঁটিয়ে পড়তে পড়তেই তিনি এতদিনে খেয়াল করলেন, অবাক হলেন ও নিশ্চিত হলেন যে শহরের কোনো এলাকাতেই প্রকৃত শান্ত ও ভদ্র পাড়া নেই।

একমাত্র সফিকুদ্দিন ছাড়া ৮৯ নম্বর রোডের বাসিন্দাদের সকলেই আহা-র ঘটনাটি বিস্মৃতির অতলে পাঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলো এবং আলাপচারিতায় প্রত্যক্ষদর্শিতার বিষয়টি বেমালুম অস্বীকার করতে থাকলো। এর মধ্যেই দুই একজন তাদের অতি ঘনিষ্ঠ দুই একজনের কাছে স্বীকার করলেও অতি গোপনীয় এই বিষয়টি একমাত্র তাকে ছাড়া অন্য কাউকেই জানায়নি এবং শ্রোতাও যেন কাউকে না জানায় তা কসম করিয়ে নিল।

রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট, মসজিদের সাইনবোর্ড, সামনের বাসার নেমপ্লেট, ব্যালকনির গ্রিল, কাপড় শুকানোর দড়ি, কুড়ালের কোপ থেকে বেঁচে থাকা গাছ যারা আহা-র অন্তিম সময়ের ঘটনাটি আদ্যোপান্ত দেখেছিল এবং কোন রংচং না মেখে কোন রাখঢাক না করে পুঙ্খানুপুঙ্খ বলতে পারতো দুঃখের বিষয় তারা কেউই কথা বলতে পারে না। এই কথাটাই ঘুরিয়ে উলটোভাবেও বলা যায়!

milonkibria@yahoo.com
   

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


নির্বাক সাক্ষ্য

প্রকাশের তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image


দ্বিতীয় ঘাইটা এসে লাগলো পাঁজরে, বাম দিক ঘেঁষে আর তখনই আসহাব হাবিবের মাথাটা বাম দিকে কাত হয়ে গেল, বিস্ফারিত গোল গোল চোখে দেখতে পেল রাস্তার পাশের দোতলার ব্যালকনিতে এক অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। আসহাব হাবিব যাকে সবাই নামের দুই শব্দের আদ্যাক্ষর দিয়ে আহা নামে ডাকে এতক্ষণ খুব দ্রুতবেগে দৌড়াচ্ছিল। মেয়েটির সৌন্দর্যের মুগ্ধতা এবং ছুরির ঘাই দুই মিলে আহা-র গতি শ্লথ হয়ে এলো। ধীরে ধীরে এক পা দুই পা এগিয়ে যেতে যেতে কাত হয়ে পড়ে যেতে লাগলো। ততক্ষণে আহা-র সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড়ে আসছিলো যে মানুষটি ছুরিসহ তার হাত পাঁজরের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে দৌড়টা জারি রাখলো। ছুরি ধরা ডান হাত মাথার ওপর নাচাতে নাচাতে এক গলি থেকে আরেক গলি পার হয়ে হারিয়ে গেল। রাস্তায় দাঁড়িয়ে, ঠিক সেই মুহূর্তে থেমে যাওয়া রিক্সায় বসে, দোতলা তিনতলার রেলিং-এ দাঁড়িয়ে অনেকেই সেই নৃত্যরত হাতটি এবং ছুরির চকচকে ফলাটির দিকে তাকিয়ে ছিল। পরে নিজেরা যখন ফিসফিস করে আলাপ করছিল তখন তারা ঘাতকের চেহারার বিষয়ে একমত হতে পারেনি। ক্লিন শেভ করা, গোঁফ আছে, দাড়ি আছে এমন সব পরস্পরবিরোধী কথা চালাচালি হচ্ছিল। ছুরিটি এরপর কার দিকে ধেয়ে আসে এমন আতংক তাদের এমনভাবে হতবিহ্বল করে দেয় যে চেহারার দিকে তাকানোর কোনো ফুরসত হয়নি, কেবল ছুরিটিকে অনুসরণ করেছে।

মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর আহা সিনেমার ফ্রেমের ফেড আউট হয়ে যাওয়া দৃশ্যের মতো মেয়েটিকে ঝাপসা থেকে আরো ঝাপসা হয়ে যেতে দেখল। ছোট ছোট সাদা ফুলতোলা হলুদ রঙের জামা, একই রঙের জর্জেটের ওড়না, দুইপাশে কাঁধ পর্যন্ত চুল এই পর্যন্ত স্পষ্ট মনে আছে, এরপর ঝাপসা হয়ে যাওয়া দৃশ্যে ডান হাতটা ওড়না নিয়ে মুখের উপর চেপে ধরে নিমিষেই হারিয়ে গেল, হয়তো ঘরের ভিতর ঢুকে পড়েছে অথবা আহার দেখা ফুরিয়ে গেছে কিংবা দুইই।

ঘটনাটা ঘটে রাত সাড়ে আটটার সময় ৮৯ নম্বর রোডের মসজিদের গেট থেকে একটু দূরে। মসজিদের দারোয়ান যে জুতা পাহারা দেওয়ার কারণে কখনো জামাতে নামাজ পড়তে পারে না, সে এক দৌড়ে মসজিদের ভিতরে ঢুকে গেল আর সাথে সাথে নামাজ শেষে বের হতে যাওয়া মুসল্লিরাও হুড়মুড় করে দারোয়ানকে অনুসরণ করলো। একটু আগের সরব বা আধা-সরব গলিটি হঠাৎ করেই অদ্ভুত পিনপতন নিস্তব্ধতায় নিমজ্জিত হলো। আহা সেই ব্যালকনির দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থায় একবারেই কোনো নড়াচড়া ছাড়া নিথরভাবে পড়ে রইল, চোখ দুইটা আগের মতোই বিস্ফারিত গোল গোল। আধা ঘণ্টা আহা একইভাবে পড়ে রইল। এই আধা ঘণ্টায় মসজিদের ভিতর থেকে কেউ কেউ উঁকিঝুঁকি মেরে আহাকে দেখার চেষ্টা করলো, দেখতে পায় কি পায় নাই আবার ঢুকে গেল ভিতরে। রহমান সাহেব তার ক্রন্দনরত স্ত্রীকে শক্ত করে ধরে বারান্দা থেকে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেলেন। সন্তানদের ঘরের ভিতরে নিয়ে গেল কেউ কেউ। স্ত্রীদের অনেকে কৌতূহলী ও আপাত সাহসী স্বামীদের জোর করে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেল। পথচারীরা খুব ধীর অথচ দ্রুত পায়ে দূরে সরে যেতে লাগলো। ঘটনার একেবারে শুরুতেই যারা ভয়ে ও আতংকে দৌড় দিয়েছিল তার দুই-এক গলি পার হয়ে টং দোকান পেয়ে টুলে বসে চায়ের অর্ডার দিল। তাদের কেউ কেউ একেবারেই চুপ হয়ে গেল আবার কেউ কেউ আশেপাশের লোকজনদের কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া রোমহর্ষক ঘটনার বিবরণ রহস্যময় ভঙ্গিতে বর্ণনা করতে শুরু করলো। সকলেই তারা প্রত্যক্ষদর্শী হলেও তাদের বর্ণনার মধ্যে কিছু কিছু ভিন্নতা ছিল। পরের দিন সকালে প্রত্যক্ষদর্শীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেল এবং সেই সাথে একই ঘটনার বিবরণে অনেক খুঁটিনাটি বিষয় যুক্ত হয়ে ভিন্নতাও আরো বৃদ্ধি পেল।

রাত ৯টার দিকে দেখা গেল ৮৯ নম্বর রোডের পূর্ব দিক থেকে দু’এক জন, পশ্চিম দিক থেকে দু’একজন, মসজিদের ভিতর থেকে দু’একজন আহা-র নিথর দেহের দিকে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসছে। আশেপাশের বাসা থেকে একজনও এলো না কেবল সফিকুদ্দিন ছাড়া। সফিকুদ্দিন ৩৮ নম্বর বাসার তিনতলার চিলেকোঠায় একা থাকে, সেই বাসায় কেয়ারটেকারের কাজ করে। এই কয়জন আহা-র কাছাকাছি আসতে আসতে আশেপাশের বাসার জানালার পর্দা সরিয়ে কৌতূহলী মানুষেরা এরপর কী ঘটতে চলেছে তা দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে পলকহীন তাকিয়ে রইল। সেইসময় পূর্বদিকের রাস্তার মোড় থেকে যেন আকাশ ফুঁড়ে একটা রিক্সা বেল বাজাতে বাজাতে আহা-র পাশে এসে থামলো। রিক্সাচালক ও আরও দুইজন মিলে আহা-কে ধারাধরি করে রিক্সার উপরে তুললো। এই দুইজনের একজন সফিকুদ্দিন আরেকজন মুসল্লি। তখনো এই আধা ঘণ্টা পরেও আহা-র পাঁজরের ক্ষত দিয়ে রক্ত পড়ছে। সেই রক্তে সফিকুদ্দিন ও মুসল্লির হাত ভিজে তাদের জামা-কাপড়েও রক্ত লেগে যেতে লাগলো। একটু আগে আহা যেখানে শুয়ে ছিল সেখানে জমাট বাঁধা রক্তের ভিতরে কয়েক জোড়া স্যান্ডেলের ছাপ আর মাঝখানে কাত হয়ে থাকা মানুষ আকৃতির আপাত শুকনা জায়গা।

রিক্সা সবচেয়ে কাছের একটা ক্লিনিকে পৌঁছার পর গেট থেকেই দারোয়ান ‘এইখানে কোনো ইমার্জেন্সি চিকিৎসা হয় না’ বলে বিদায় করে দিল। আপনজন হিসাবে বলছে এই ভঙ্গীতে আহা-কে সরকারী হাসপাতালে নেয়ার জন্য পরামর্শ দিল। আহা-কে নিয়ে রিক্সা ৩ কিলোমিটার দূরের সরকারি হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তার আহা-কে পরীক্ষা করে জানালো অনেক আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। মৃত ঘোষণার পরপরই হাসপাতালের কর্মচারীরা আহা-কে স্ট্রেচার থেকে নামিয়ে মাটিতে শুইয়ে একটা চাদর দিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে দিল। সফিকুদ্দিনের জানা ছিল না বা আগে কখনো খেয়াল করে নাই হাসপাতালেও পুলিশ থাকে। পুলিশ এসে সফিকুদ্দিনকে জেরা শুরু করলো এবং তখন সফিকুদ্দিন খেয়াল করলো সেই মুসুল্লি ও রিক্সাচালক আশেপাশে নাই। তারা ততক্ষণে যার যার গন্থব্যে রওনা হয়ে গেছে বা সটকে পড়েছে। সফিকুদ্দিন আহা-কে চেনে না কোনোদিন দেখেও নাই। কিন্তু পুলিশ ঠিকই আহা-কে চিনতে পারলো, সন্ত্রাসী হিসাবে আহা-র নাম পুলিশের খাতায় ছিল। পাশেরই কলিমপুর বস্তিতে সে তার মা আর বোনকে নিয়ে থাকে। তবে আহা বেশিরভাগ সময়েই বাইরে বাইরে কাটায়, বাসা যে নিরাপদ না তা সে বিলক্ষণ জানে। পুলিশ আহা-র প্যান্টের পকেট থেকে সুইস নাইফ ও একটা ব্যবহৃত গুলির খোসা আর খালি মানিব্যাগ উদ্ধার করলো। সফিকুদ্দিনের ডুপ্লিকেট এনআইডি দেখে পুলিশ তার নাম ঠিকানা একটা ডায়েরিতে টুকে নিল আবার হাসপাতালের ফাইলেও লিপিবদ্ধ করলো। পুলিশ আহা-র লাশ পোস্টমর্টেমে পাঠানোর প্রস্তুতি নিতে লাগলো। আহা হত্যা মামলায় সফিকুদ্দিনকে দরকার হবে জানিয়ে তাকে বিদায় দিল।

সেইদিনই লেট নাইট নিউজে আহা-র মৃত্যু সংবাদ পাঠ করা হলো, পরের দিন পত্র-পত্রিকার পাতায় নিউজ হলো। কলিমপুর বস্তির ত্রাস সন্ত্রাসী আহা প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছে চাঁদাবাজি সংক্রান্ত বিরোধে। আহা নামটি কোত্থেকে এসেছে জানা গেল এবং অনেকেই আহা নামটিকে ছদ্মনাম হিসাবে সাব্যস্ত করলো।

দুপুর রাত পার করে সফিকুদ্দিন বাসায় ফিরে দেখে চাবি হাতে বাড়িওয়ালা আক্তারুজ্জামান সাহেব নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। সফিকুদ্দিন গেট দিয়ে ভিতরে ঢোকার পর কোনো কথা না বলে আক্তারুজ্জামান তার হাতে চাবি দিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে চলে গেলেন। ঘটনার দুই দিন পরে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারে জুমার নামাজের আগে আক্তারুজ্জামানের ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের পরিবারের কর্তাব্যক্তিরা একটা মিটিং-এ বসলেন। আহা-র ঘটনার সংক্ষিপ্ত আলাপ শেষে আক্তারুজ্জামান মিটিংয়ের উদ্দেশ্য সবাইকে জানালেন। প্রথমেই সবাই সম্মত হলো যে আহা-র ঘটনাটি এই দালানে বসবাসরত কেউই দেখেনি। আসলেও কেউ দেখেছে কিনা সেই আলাপ বাহুল্য বিবেচনায় উত্থাপিতই হলো না। একমাত্র সফিকুদ্দিন এমন কাণ্ড করেছে যে তার পক্ষে না দেখার কোনো সন্দেহ প্রকাশেরও সুযোগ নেই। আবার সে যখনই সুযোগ পাচ্ছে পাড়ার নানাজনকে গল্প করে বেড়াচ্ছে। এই সূত্র ধরে নানা বিড়ম্বনা ও বিপদ আসতে পারে। পুলিশ তো আসবেই সন্দেহ নাই, সফিকুদ্দিনের সাথে সাথে অন্য পরিবারগুলোর ছিমছাম নিরিবিলি জীবন বিঘ্নিত হবে তাতেও সন্দেহ নাই। এমনও হতে পারে আহা-র দলের বা বিপক্ষ দলের লোকজন এসে সফিকুদ্দিনকে হুমকি ধামকি দিতে পারে এমনকি মেরেও ফেলতে পারে। সেই বিবেচনায় এই বিল্ডিংয়ের লোকজনও ঝুঁকিতে পড়েছে। সফিকুদ্দিনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব বাড়িওয়ালা হিসাবে আক্তারুজ্জামানই নিলেন। পরের দিন সকাল ১১টার দিকে আক্তারুজ্জামান সফিকুদ্দিনকে ডেকে পাঠালেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির ঊর্ধ্বগতির কারণ দেখিয়ে ব্যয় সংকোচনের উপায় হিসাবে আপাতত সফিকুদ্দিনকে এই মাসের পুরো বেতন নিয়ে বাড়িতে যেতে বললেন। সময় হলে তিনি আবার সফিকুদ্দিনকে ডেকে পাঠাবেন। কোনো উচ্চবাচ্য না করে সফিকুদ্দিন টাকাগুলো নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে ভাবলো গত সপ্তাহে তার ইনিয়েবিনিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির উচ্চমূল্যের দোহাই দেখিয়ে বেতন বাড়ার আর্জি না জানালেই ভালো ছিল। সে কি বেশি বেতনের লোভ করেছিল তাই কি এমন পরিণতি হলো! কিন্তু জিনিস-পত্রের দাম তো আসলেই বাড়তি!

রকিবুল হক ও জিনিয়া বেগম দম্পতি থাকেন ৩৩ নম্বর বাসায়। সেই দিন রাতে একমাত্র সন্তান রাজীবসহ  তিনজনই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ঘটনার শেষাংশটুকু দেখেছেন। রাজীব মেধাবী ছাত্র রটরডেম কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ছে কিন্তু সরল। মেধাবীরা অনেক সময় বোকা হয়, বিখ্যাত মানুষদের এই ধরনের কাহিনি পত্রিকায় ছাপা হয়, আড্ডার গালগল্প হয়। রাজীব মিথ্যা বলতে পারে না, পারে না মানে চেষ্টা করে দেখেছে ধরা পড়ে যায়। একটু জেরা করলেই সব গুলিয়ে ফেলে আর হড়হড় করে সব সত্য কথা বলে দিতে থাকে। আজ কাল বা পরশু নিশ্চয়ই পুলিশ আসবে, কী জানি তাদের বাসায়ও আসতে পারে। রাজীব তখন কী ঝামেলা পাকিয়ে বসে ঠিক নাই! নির্ঘাত তাকে সাক্ষী বানাবে, জীবনটা ত্যানা ত্যানা হয়ে যাবে, রাজীবের তো বটেই সেই সাথে পুরো পরিবারের। পরদিন সকালে তারা রাজীবকে লক্ষীপুরে ফুফুর বাসায় বেড়াতে যাওয়ার বন্দোবস্ত করে ফেললেন। দুই মাস পরে টেস্ট পরীক্ষা আর কোচিং-এর কথা মাথায় টোকা মারলেও রাজীব চুপ করে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করলো, বেড়ানোটা পণ্ড করার কোনো ইচ্ছা তার ছিল না বরং অনেকদিন ধরেই ফুপু বা মামার বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছার কোনো সুরাহা হচ্ছিল না।

মসজিদের সামনের কোনার বাড়িটায় থাকেন মজিদ-রমিজা দম্পতি আর তাদের দুই ছেলে। বড় সোহান পড়ে ক্লাস এইটে আর ছোট জোহান ক্লাস ফাইভে। তারা দুজনেই কর্মজীবী, সকালে চারজনই বের হয়ে যান চাবিটা পাশের ফ্ল্যাটের জিম্মায় রেখে। দুই ভাই স্কুল থেকে ফিরে চাবি নিয়ে নিজেদের ঘরে যায় তারপর নিজেরাই নিজেদের মতো থাকে। ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে ওভেনে গরম করে খাওয়া ভালোই রপ্ত করেছে, কথায় আছে— গরজ বড় বালাই। ঘটনার দিন রমিজা তার স্বামী সন্তানদের বীভৎস দৃশ্য দেখা থেকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে জোর করে বারান্দা থেকে ঘরে টেনে নিতে নিতে যা দেখার তা তারা দেখে ফেলেছিল। মজিদ ও রমিজা জানেন তারা দুজন সেইদিন কিছুই দেখেননি, সত্যি বলতে কি সেই দিন তারা বারান্দায়ই যাননি। সোহান ও জোহান ছোট তাদের পক্ষে এই ঘটনার বিপজ্জনক দিকটি বোঝার কথা নয়। শুক্রবারে সারাদিন চারজনই বাসায় থাকে, তাই সেইদিনটিতে সকালে নাস্তার পর টেবিলে কথা শুরু করলেন। তারা সোহান ও জোহানকে বিপদের ভয়াবহতা বোঝাতে সক্ষম হলেন। শিশুদের কাবু করার জন্য ভয় দেখানোর কায়দাকানুন মা-বাবারা করে থাকেন। সেইজন্যই দৈত্য দানো, সেই জন্যই ডাইনি বুড়ি, সেইজন্যই বাঘ ভালুক, সেই জন্যই ছেলেধরা। মজিদ ও রমিজা ছেলেদের পুলিশে ধরে নিয়ে যাবে এমন ভয় দেখালেন আর কে না জানে বাঘে ছুঁলে আঠার ঘা ও পুলিশে ধরলে ছত্রিশ। আমসি মুখে সোহান ও জোহান স্বীকার করলো তারাও সেইদিন কিছুই দেখেনি যেমনটি দেখেনি তাদের মা-বাবা।

সেইরাতে আহা মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরপরই শাপলা ব্যালকনি থেকে ঘরের ভিতর ঢুকে ধপাস করে বসার ঘরের সিঙ্গেল সোফার ওপর পড়ে গেল যেন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই নিজের ওপর। শাপলাকে আমরা আগেই দেখেছি বস্তুত শুরুতেই দেখেছি। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছোট সাদা ফুলতোলা হলুদ রঙের জামা ও  একই রঙের জর্জেটের ওড়না গায়ে জড়িয়ে থাকা মেয়েটি শাপলা, বাঁচার প্রবল আকুতি নিয়ে জীবনের শেষ সময়ে আহা যার দিকে বিস্ফারিত নয়নে নির্নিমেষ তাকিয়ে ছিল। পাশের সোফায় বসে টেলিভিশনে সিরিয়াল দেখছিলেন শাপলার মা-বাবা। উভয়েই তারা সাংসারিক কূটকাচালিপূর্ণ সিরিয়ালের এমন ভক্ত যে বাহিরের হইচই বা আহা-র মৃত্যু তাদের মনযোগে বিঘ্ন ঘটাতে পারে নাই। কিন্তু মেয়ের এহেন অবস্থায় উভয়েই পর্দায় সাসপেন্সভরা মুহূর্ত ছেড়ে মেয়ের পাশে এসে তাকে ধরলেন। ঘুমের মধ্যে বোবায় ধরলে যেমন মুখ দিয়ে গো গো আওয়াজ বের হয় শাপলার মুখের ওপর চেপে ধরা ওড়নার পাশ দিয়ে এমন আওয়াজ বের হচ্ছে আর অন্য হাতটি ঘরের বাহিরে ব্যালকনির দিকে নির্দেশ করে আছে। মা পাশে বসে শাপলাকে বুকে জড়িয়ে ধরে জানতে চাইলেন ‘কী হইসে কী হইসে, আম্মু’। বাবা ‘কী হইসে’ দেখার জন্য ব্যালকনিতে গিয়ে খুব দ্রুতই ফিরে এলেন। তিনি দেখতে পেয়েছেন— কী হইসে!

সেই রাতটা শাপলাদের বাসায় খুব খারাপই গেল। বাবা কিছুটা ঘুমাতে পারলেও মা প্রায় নির্ঘুম রাত কাটালেন শাপলার  মতোই তার পাশে শুয়ে বসে। শাপলার মতো হাসিখুশি উচ্ছল একটা মেয়ে পাঁচ কি দশ মিনিটের ব্যবধানে পুরোপুরি পাল্টে গেল। হাসি উধাও হয়ে চেহারায় কেমন যেন ক্লান্তি ও আতংক ভর করেছে, চোখ দুইটা ছোট হয়ে গর্তের ভিতর ঢুকে গেছে আর চোখের নিচে কালি। সারারাত শাপলা আধো ঘুম আর আধো জাগরণের মধ্যে দিয়ে কাটালো। ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে শাপলা হঠাৎ একটা কাঁপুনি দিয়ে চোখ মেলে তাকায়, মেয়ের গায়ের ওপর হাত থাকায় শাপলার মা এই কাঁপুনি টের পান, তিনিও চোখ মেলে মেয়ের দিকে তাকান। শাপলার চোখ দুইটা মরা মাছের মতো ঘোলা দেখায় আর দৃষ্টিতে নিঃসীম শূন্যতা। পর্যায়ক্রমিক ঘুম ও জাগরণ এবং ঘোলা চোখ ও শূন্য দৃষ্টির ভিতর দিয়ে শাপলা ও তার মা রাত পার করলো। সকালে নাস্তার টেবিলে শাপলা অনেকক্ষণ সময় নিয়ে অর্ধেক রুটি ও আলু ভাজি গলা দিয়ে পার করার পর হঠাৎ করেই উঠে দ্রুত বেগে বেসিনের কাছে গিয়ে হড়হড় করে বমি করে যা খেয়েছে সব বের করে দিল। শাপলার মা মেয়ের যত্ন নিলেন, তাকে ঠিকঠাক করে বিছানায় শুইয়ে দিলেন। নিজের ওষুধের বাক্স থেকে একটা ঘুমের বড়ি মেয়েকে খাইয়ে দিলেন। ঘুমের ওষুধ কাজ করলো, শাপলা সন্ধ্যা পর্যন্ত মরার মতো ঘুমালো।

মাগরিবের নামাজ শেষে মেয়ে ও পরিবারের কল্যাণ কামনায় দীর্ঘ মুনাজাতের প্রস্তুতিকালে শাপলার মা তীব্র কণ্ঠে মেয়ের চিৎকার শুনতে পেয়ে তড়িঘড়ি করে বিছানার কাছে ছুটে গেলেন। শাপলা অনবরত ‘ওই যে ওই যে ছুরি ছুরি’ এই কয়টি কথা বলে চলেছে। দৃষ্টি তার সোজা সামনের দিকে আর দেহের ভঙ্গীটা এমন যে অদৃশ্য কোনো ঘাতক উদ্যত ছুরির ফলা হাতে তার দিকেই ধেয়ে আসছে। শাপলার মা নানা কথায় নানাভাবে মেয়েকে শান্ত করার চেষ্টা করতে থাকলেন। এই চেষ্টার ফলেই হোক বা নিজে থেকেই ক্লান্ত হয়ে হোক শাপলা একসময় থামলো। সারা রাত শাপলা এমন কাণ্ড আরো ৩ বার ঘটালো। শাপলার দুই পাশে শুয়ে বাবা আর মা পরস্পরের হাত ধরে থাকলেন, একটা নির্ভরতা একটু স্বস্তি বড়ই প্রয়োজন।

সকালে শাপলার বাবা তার ডাক্তার বন্ধুকে ফোন দিলেন। সব শুনে তিনি শাপলাকে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানোর পরামর্শ দিলেন, পরিচিত একজন সাইকিয়াট্রিস্টের অ্যাপয়েন্টমেন্টও নিয়ে দিলেন। এই সিদ্ধান্তে শাপলার মা হুহু করে কাঁদতে কাঁদতে শাপলার বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমার মেয়ে কি পাগল হয়ে গেল। শাপলার বাবা বুঝতে পারলেন না এটা কি কোনো জিজ্ঞাসা না স্বগতোক্তি। তিনি অনেক কষ্টে কান্না চেপে রাখার পরও দুই ফোঁটা জল চোখের কোনা দিয়ে বের হয়ে এলো।

অধ্যাপক এস এম সাদ দেশের নামকরা সাইকিয়াট্রিস্ট, বিশাল চেম্বার। ওয়েটিং রুমেই বসে আছে গোটা কুড়ি রোগী ও রোগীর স্বজন। খুব অনিচ্ছায় বা ভয়ে পা ঘষটে ঘষটে শাপলা এগোয় কি এগোয় না এমন ভঙ্গিতে একপাশে বাবা আর আরেক পাশে মাকে নিয়ে চেম্বারে প্রবেশ করলো। সামনের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আচমকা শাপলা তীব্র কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলো, ‘ওই যে ওই যে ছুরি ছুরি’! সেই একই দৃষ্টি সেই একই ভঙ্গী এবং একই কথা। সিনেমার রিওয়াইন্ড করা দৃশ্যের মতো বারবার। অধ্যাপক সাদের অফিস স্টাফরা ছুটে এলো শাপলার দিকে। অপেক্ষমাণ রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। এই চেম্বারে তারা হয়তো এমন রোগী আগেও পেয়েছে।

রহমান সাহেব পরদিনই বাড়িওয়ালাকে আগামী মাসে বাড়ি ছাড়ার কথা জানিয়ে শহরের কোনো শান্ত ভদ্র পাড়ায় ভাড়া বাসা খুঁজতে নেমে গেলেন। পত্রিকার বাড়ি ভাড়া, ল্যাম্পপোস্ট ও দেয়ালে সাঁটানো ‘বাড়ি ভাড়া হইবে’ পড়া এবং  রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বিভিন্ন বাসার গেটে টু-লেট লেখা সাইনবোর্ড খোঁজা তার প্রতিদিনের রুটিন কাজে পরিণত হলো, সকালে বের হন, দুপুরে বাসায় ফিরে খেয়ে একটু রেস্ট নিয়ে পত্রিকার বাড়ি ভাড়া বিজ্ঞাপনগুলো বাছাই করে আবার বের হন, সন্ধ্যায় ফিরেন। আগেও পড়তেন কিন্তু এখন পত্রিকা পড়তে গিয়ে অপরাধের খবরগুলোই বেশি চোখে পড়ে, তিনি পড়েনও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। খুঁটিয়ে পড়তে পড়তেই তিনি এতদিনে খেয়াল করলেন, অবাক হলেন ও নিশ্চিত হলেন যে শহরের কোনো এলাকাতেই প্রকৃত শান্ত ও ভদ্র পাড়া নেই।

একমাত্র সফিকুদ্দিন ছাড়া ৮৯ নম্বর রোডের বাসিন্দাদের সকলেই আহা-র ঘটনাটি বিস্মৃতির অতলে পাঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলো এবং আলাপচারিতায় প্রত্যক্ষদর্শিতার বিষয়টি বেমালুম অস্বীকার করতে থাকলো। এর মধ্যেই দুই একজন তাদের অতি ঘনিষ্ঠ দুই একজনের কাছে স্বীকার করলেও অতি গোপনীয় এই বিষয়টি একমাত্র তাকে ছাড়া অন্য কাউকেই জানায়নি এবং শ্রোতাও যেন কাউকে না জানায় তা কসম করিয়ে নিল।

রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট, মসজিদের সাইনবোর্ড, সামনের বাসার নেমপ্লেট, ব্যালকনির গ্রিল, কাপড় শুকানোর দড়ি, কুড়ালের কোপ থেকে বেঁচে থাকা গাছ যারা আহা-র অন্তিম সময়ের ঘটনাটি আদ্যোপান্ত দেখেছিল এবং কোন রংচং না মেখে কোন রাখঢাক না করে পুঙ্খানুপুঙ্খ বলতে পারতো দুঃখের বিষয় তারা কেউই কথা বলতে পারে না। এই কথাটাই ঘুরিয়ে উলটোভাবেও বলা যায়!

milonkibria@yahoo.com
   


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত